আশরাফ উদ্দিন, সীতাকুণ্ড (চট্টগ্রাম)
প্রকাশ : ০৮ সেপ্টেম্বর ২০২৫ ১২:২১ পিএম
একচালা ঘর, কাঁচা বাঁশের বেড়া, মাথার ওপরের টিনও অনেক জায়গায় উধাও। এ ঘরেই চলছে মধ্যেরধারী সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের পাঠদান। রবিবার তোলা। প্রবা ফটো
ভাঙাচোরা সড়কের পাশে একচালা একটি ঘর। কোথাও কাঁচা বাঁশের বেড়া, কোথাও খোলা আকাশ। মাথার ওপরের টিনও অনেক জায়গায় উধাও। ছোট ছোট শিশু ঝাড়ু হাতে মেঝে পরিষ্কার করছে। দূর থেকে দেখে মনে হবে গোয়ালঘর। অথচ এটিই একটি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়।
চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ড উপজেলার সৈয়দপুর ইউনিয়নের মধ্যেরধারী সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়। ২০২০ সালের শুরুতে এ বিদ্যালয়ের নতুন ভবনের কাজ শুরু হয় কিন্তু পাঁচ বছরেও তা শেষ হয়নি। ফলে ৩৫০ জন শিক্ষার্থীকে অস্থায়ী ঝুপড়িতে পড়তে হচ্ছে প্রতিনিয়ত। বর্ষা এলেই বন্ধ হয়ে যায় পাঠদান।
এ উপজেলার আরও পাঁচটি স্কুলের চিত্রও প্রায় একই। নেই পর্যাপ্ত শিক্ষক, নেই শৌচাগার, বিশুদ্ধ পানির ব্যবস্থা কিংবা শিক্ষার ন্যূনতম পরিবেশ। শিক্ষকরা বদলি হয়ে আসতে চান না। ফলে চলছে শিক্ষক সংকট।
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, চলতি বছরের জুন মাসে এই ছয় স্কুলের ভবন নির্মাণ কার্যক্রম শেষ হওয়ার কথা থাকলেও ৩০ শতাংশ কাজও এখনও শেষ হয়নি। দুটি স্কুলের কাজ এখনও শুরুই হয়নি। এতে কবে নাগাদ শিক্ষার্থীরা নতুন ভবনে ফিরতে পারবে তা নিয়ে শিক্ষক ও অভিভাবকদের দুশ্চিন্তার শেষ নেই।
উপজেলা এলজিইডি সূত্র জানায়, বিশ্বব্যাংকের অর্থায়নে ২০১৫ সালে বহুমুখী দুর্যোগ আশ্রয়কেন্দ্র প্রকল্প (MDSP) শুরু হয়। এর আওতায় ছয়টি স্কুল কাম আশ্রয়কেন্দ্র নির্মাণের কাজ শুরু করে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান ওয়াহেদ গ্রুপ। প্রতিটি ভবনের পরিকল্পনায় ছিল চারতলা ভবন, নিচে খালি জায়গা, দ্বিতীয় তলায় গবাদিপশু রাখার ব্যবস্থা, ওপরের তলায় দুর্যোগকবলিত মানুষের আশ্রয় ও খাবারের ব্যবস্থা। ছাদে থাকবে সোলার সিস্টেম, অন্যান্য ফার্নিচারের সুবিধাও রাখা হবে এসব ভবনে।
ভবনগুলোর নির্মাণের দায়িত্ব পেয়েছে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান ওয়াহেদ গ্রুপ। ২০২০ সালের শুরুর দিকে মধ্যেরধারী সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় কাম আশ্রয়ণ কেন্দ্রসহ ছয়টি ভবন নির্মাণের কাজ শুরু হয়। প্রকল্পের আওতায় অন্য ভবনগুলো হলোÑ উপজেলার পশ্চিম বহরপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, পূর্ব লালানগর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, এসএম পাইলট সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, দক্ষিণ বাঁশবাড়িয়া রহমতের পাড়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় ও কেশবপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়।
কিন্তু এরই মধ্যে চারটি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের কাজ শুরু হলেও দক্ষিণ বাঁশবাড়িয়া রহমতের পাড়া ও কেশবপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের কাজ আজও শুরু হয়নি। অন্য চারটি ভবনের কেবল ফাউন্ডেশন স্তরের কাজ শেষ হয়েছে। বাকি কাজও চলছে কচ্ছপ গতিতে।
মধ্যেরধারী সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় পরিচালনা কমিটির সভাপতি মো. আলাউদ্দিন বলেন, তিন শিক্ষকের মধ্যে একজন চলে যাচ্ছেন। দুই শিক্ষক দিয়ে সাড়ে ৩০০ শিক্ষার্থীকে সামাল দেওয়া কঠিন। আজ তিন বছর পেরিয়ে গেলেও ভবন পেলাম না।
উপজেলা শিক্ষা কর্মকর্তা মোহাম্মদ নুরুচ্ছাফা বলেন, ‘কাজের গতি একেবারে মন্থর, আমরা এ বিষয়ে এলজিইডিকে বলেছি। কোথাও একবার কাজ শুরু হলে আবার বন্ধ হয়ে যায়। কোথাও কোথাও রডে মরিচা ধরে গেছে, অন্য মালামালও নষ্ট হচ্ছে।’
তিনি বলেন, ‘মূল ঠিকাদার উপ-ঠিকাদার দিয়ে কাজ করিয়ে নিচ্ছেন। ছয়টি স্কুলের পাঠদান চলছে অস্থায়ী ভবনে। ওই ভবনের ভূমির মালিকের সঙ্গে চুক্তিও শেষ হয়ে গেছে। এখন জটিলতা বাড়ছে।’
অভিযোগ স্বীকার করে দায়িত্বপ্রাপ্ত ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান ওয়াহেদ গ্রুপের জিএম মিনহাজ হোসাইন বলেন, ‘আমাদের প্রতিষ্ঠানের কিছু অসাধু কর্মকর্তার কারণে কয়েকটি প্রকল্পের কাজ বন্ধ ছিল। এখন ফের শুরু করেছি। আশা করি, আগামী বছরের জুনের মধ্যে কাজ শেষ করতে পারব।’
সীতাকুণ্ড উপজেলা প্রকৌশলী মো. মনির হায়দার বলেন, ‘কাজের অগ্রগতি বাড়াতে ঠিকাদারকে তাগাদা দেওয়া হয়েছে। এখন কাজ চলছে। নির্মাণসামগ্রীর দাম বেড়ে যাওয়ায় দীর্ঘদিন কাজ খুব ধীরে হয়েছিল, কখনও শ্রমিক সংকট ছিল।’
এ বিষয়ে চট্টগ্রাম এলজিআরডি কার্যালয়ের নির্বাহী প্রকৌশলী মোহাম্মদ হাসান আলী বলেন, কাজ দ্রুত শেষ করার জন্য বলা হয়েছে। এ বিষয়ে আমরা তৎপর রয়েছি।