× ই-পেপার প্রচ্ছদ সর্বশেষ বাংলাদেশ রাজনীতি দেশজুড়ে বিশ্বজুড়ে বাণিজ্য খেলা বিনোদন মতামত চাকরি শিক্ষা আজকের কার্টুন ফিচার সকল বিভাগ ছবি ভিডিও লেখক আর্কাইভ কনভার্টার

প্রকল্প বড়, অনিয়মও বড়

আরমান হেকিম

প্রকাশ : ২২ আগস্ট ২০২৫ ১০:০৮ এএম

প্রকল্প বড়, অনিয়মও বড়

সাশ্রয়ী, আরামদায়ক, পরিবেশবান্ধব হওয়ায় বিশ্বজুড়ে গণপরিবহনের অবিচ্ছেদ‍্য অংশ হয়ে উঠেছে রেল। কিন্তু বাংলাদেশ রেলওয়ে হাঁটছে এর ঠিক উল্টো পথে। নানা অনিয়ম, দুর্নীতি ও অব্যবস্থাপনায় রেলে পরিচালন ব্যয় বাড়ার পাশাপাশি লোকসানও বেড়েছে। পাশাপাশি কমেছে রেলওয়ের প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতাও। আয়ের চেয়ে কয়েকগুণ বেড়েছে রেলের ব্যয়। ফলে সরকারের বিনিয়োগ করা অর্থ ফেরত আসা তো দূরের, ট্রেনের পরিচালন খরচের অর্ধেকও তুলতে পারছে না সংস্থাটি। অভিযোগ রয়েছে, রেলের প্রকল্পের সময়সীমা বাড়িয়ে এবং ব্যয় ফুলিয়ে-ফাঁপিয়ে অর্থ লুটপাট করা হয়। আর এটি হয়ে থাকে প্রভাবশালী রাজনীতিবিদ, প্রকল্প প্রণয়ন ও বাস্তবায়নের দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তাদের একটি অংশ এবং ঠিকাদারদের যোগসাজশে। 

বাংলাদেশ পাবলিক প্রকিউরমেন্ট অথরিটি (বিপিপিএ) রেলের ৯ হাজার ২২ কোটি টাকার ৩০টি দরপত্র বিশ্লেষণ করে সরকারি ক্রয়বিধি (পিপিআর) লঙ্ঘনের ব্যাপকতা শনাক্ত করেছে।

বিপিপিএর প্রতিবেদনে বলা হয়, বাংলাদেশ রেলওয়ের পাঁচটি বড় প্রকল্পে মোট দরপত্রের ৪৩ দশমিক ৩৩ শতাংশ কাজ নির্ধারিত সময়সীমার মধ্যে শেষ না হওয়ায় ২১১ দিন থেকে শুরু করে সর্বোচ্চ ১ হাজার ৫৯৮ দিন পর্যন্ত মেয়াদ বাড়াতে হয়েছে।

সরকারি ক্রয়-সংক্রান্ত পর্যালোচনায় দেখা গেছে, নির্ধারিত সময়সীমার মধ্যে কাজ শেষ করতে না পারার জন্য কোনো ঠিকাদারকে জরিমানা তো করা হয়ইনি বরং কিছু ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ ১২ বার পর্যন্ত সময় বাড়ানো হয়েছে। এটি পিপিআরের সুস্পষ্ট লঙ্ঘন। বিপিপিএর প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, ১৯টি চুক্তিতে দরপত্র মূল্যায়নের সময় আইন অনুযায়ী নির্ধারিত সময়সীমা অতিক্রম করেছে। অনেক ক্ষেত্রে বিজ্ঞাপন প্রকাশের প্রমাণ, ব্যয় নির্ধারণ কমিটি গঠনের আদেশ এবং প্রক্রিয়াগত চেকলিস্টের মতো গুরুত্বপূর্ণ নথিও পাওয়া যায়নি।

এ ছাড়া রেলওয়ে কর্তৃপক্ষ নিয়মিতভাবে বার্ষিক ক্রয় পরিকল্পনা হালনাগাদ করেনি এবং অভ্যন্তরীণ পোস্ট-প্রকিউরমেন্ট পর্যালোচনা করেনি, যা বিধি অনুযায়ী বাধ্যতামূলক। তৃতীয় পক্ষের পরামর্শকসহ প্রস্তুতকৃত এই প্রতিবেদন ইতোমধ্যে রেল মন্ত্রণালয়, বাংলাদেশ রেলওয়ে ও সংশ্লিষ্ট সরকারি সংস্থাগুলোতে জমা দেওয়া হয়েছে। জানা যায়, প্রতিবেদনে সময়সীমা কঠোরভাবে মেনে চলা, অযৌক্তিক দেরিতে জরিমানা আরোপ করা এবং অনুমোদনবিহীন বারবার সময় বাড়ানো বন্ধ করার বিষয়ে সুপারিশ করা হয়েছে। এ ছাড়া নিয়মিত বার্ষিক ক্রয় পরিকল্পনা হালনাগাদ, সব চুক্তিতে ই-জিপি (ইলেকট্রনিক গভর্নমেন্ট প্রকিউরমেন্ট) পুরোপুরি বাস্তবায়ন, সঠিক নথি সংরক্ষণ ও বাধ্যতামূলক অভ্যন্তরীণ পর্যালোচনার মাধ্যমে নজরদারি জোরদার করার আহ্বান জানানো হয়েছে।

ফুলে-ফেঁপে পাঁচ প্রকল্প

বিপিপিএর যাচাই করা প্রকল্পগুলোর মধ্যে অন‍্যতম ঢাকা-টঙ্গী তৃতীয় ও চতুর্থ ডুয়েল-গেজ লাইন এবং ঢাকা-জয়দেবপুর ডাবল লাইন প্রকল্প। এই প্রকল্পগুলোর বিষয়ে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০১৭ সালের শেষে ঢাকার কমলাপুর থেকে জয়দেবপুর পর্যন্ত তৃতীয় ও চতুর্থ ডুয়েল গেজ লাইন নির্মাণে ভারতীয় প্রতিষ্ঠান এএফকনস-কেরালা পিডব্লিউডি জয়েন্ট ভেঞ্চারের সঙ্গে এক হাজার ৩৯৪ কোটি টাকার চুক্তি হয়। যা সরকারি প্রক্ষেপণের চেয়ে ৩ দশমিক ২৯ শতাংশ বেশি। পরিকল্পনা ছিল তিন বছরের মধ্যে, অর্থাৎ ২০২১ সালের জুনে কাজ শেষ হবে। কিন্তু সময়সীমা পেরিয়েছে চার বছর আগে। এর মধ্যে চার দফায় প্রকল্পের মেয়াদ বেড়েছে সাড়ে চার বছর। তারপরও কাজের অগ্রগতি মাত্র ৫৮ শতাংশ। 

এ ক্ষেত্রে সবচেয়ে আশ্চর্যের বিষয় ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান থেকে এক টাকাও ক্ষতিপূরণ বা জরিমানা আদায় হয়নি। বরং বারবার সময় বাড়ানো হয়েছে। ফলে প্রকল্প ব্যয়ও বেড়েছে।

রেল কর্মকর্তারা স্বীকার করেছেন, আগামী জুনে সংশোধিত সময়সীমার মধ্যেও প্রকল্প শেষ হওয়ার সম্ভাবনা নেই। দেশের অন্যতম বৃহৎ রেল প্রকল্পে এটি দেরি ও দুর্বল চুক্তি বাস্তবায়নের স্পষ্ট উদাহরণ হিসেবে ইতোমধ্যে চিহ্নিত হয়েছে।

এ ছাড়া একই প্রকল্পের এসডি-১ প্যাকেজে ১ হাজার ৩৮৬ দিনের সময়সীমা বাড়ানো হয়েছে। ২০১২ সালে অনুমোদিত এই প্রকল্পে ঢাকা-টঙ্গী লাইনে দুটি নতুন ট্র্যাক এবং টঙ্গী-জয়দেবপুর লাইনে একটি ট্র্যাক যোগ করার পরিকল্পনা ছিল। ২০১৫ সালের জুনে শেষ হওয়ার কথা থাকলেও সময়সীমা বাড়তে বাড়তে এখন ২০২৭ সালের জুনে গিয়ে ঠেকেছে। এভাবে মেয়াদ বাড়ায় ব্যয় বেড়েছে চারগুণেরও বেশি। ৮৪৯ কোটি টাকার প্রকল্প থেকে এখন এটি প্রায় ৩ হাজার ৩৪৩ কোটি টাকার প্রকল্পে দাঁড়িয়েছে।

একইভাবে দোহাজারী থেকে কক্সবাজার পর্যন্ত রেললাইন প্রকল্পের লট-১ অংশ শুরু হয় ২০১৭ সালে, শেষ হওয়ার কথা ছিল ২০২১ সালের মধ্যে। কিন্তু ১২ বার সময় বাড়িয়ে নতুন সময়সীমা ধরা হয় ২০২৪ সালের ডিসেম্বর; তাতেও কাজ শেষ হয়নি, অগ্রগতি মাত্র ৯০ শতাংশ। একই প্রকল্পের লট-২ অনুমোদন পায় ২০১০ সালে, তিন বছরের মধ্যে শেষ হওয়ার কথা ছিল। ৯ বার সময় বাড়িয়ে চলতি বছরের ডিসেম্বর পর্যন্ত নেওয়া হয়েছে, ব্যয় বেড়েছে প্রায় ১০ গুণÑ এক হাজার ৮৫২ কোটি টাকা থেকে বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১১ হাজার ৩৩৬ কোটিতে। 

রেলওয়ের প্রতিটি প্রকল্পে এভাবে সময় ও ব্যয় বাড়া প্রসঙ্গে টিআইবির নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান বলেন, ‘লুটপাটের ফলে বাংলাদেশে অবকাঠামো নির্মাণের প্রতি কিলোমিটার ব্যয় প্রতিবেশী দক্ষিণ এশীয় দেশগুলোর তুলনায় কয়েকগুণ বেশি এবং কিছু ক্ষেত্রে ইউরোপের তুলনায় দ্বিগুণ। ব্যয়ের এই বাড়তি বোঝা পড়ছে করদাতা ও প্রকল্প ব্যবহারকারীদের ওপর।’ নিয়ম ভঙ্গ ও অর্থ অপচয়ের সঙ্গে জড়িতদের জবাবদিহিতার আওতায় আনা উচিত বলেও তিনি মন্তব্য করেন।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে রেলপথ মন্ত্রণালয়ের সচিব মো. ফাহিমুল ইসলাম বলেন, ‘আমি এখনও বিপিপিএর রিপোর্টটি হাতে পাইনি। সেটা পেলে দেখে বলতে পারব।’

শেয়ার করুন-

মন্তব্য করুন

Protidiner Bangladesh

সম্পাদক : মারুফ কামাল খান

প্রকাশক : কাউসার আহমেদ অপু

রংধনু কর্পোরেট, ক- ২৭১ (১০ম তলা) ব্লক-সি, প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড) ঢাকা -১২২৯

যোগাযোগ

প্রধান কার্যালয়: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৬৯৬ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (প্রিন্ট): +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮১০, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০ | ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (অনলাইন): +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০, +৮৮০১৭৯৯৪৪৯৫৫৯ । ই-মেইল: [email protected]

সার্কুলেশন: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮০৭, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৩৩২ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন মূল্য তালিকা