জুলাই সনদের অঙ্গীকার
দীপক দেব
প্রকাশ : ২০ আগস্ট ২০২৫ ১০:৪৩ এএম
ঐকমত্য কমিশনের পক্ষ থেকে রাজনৈতিক দলগুলোকে পাঠানো জাতীয় জুলাই সনদের পূর্ণাঙ্গ খসড়া নিয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে মতামত দেওয়া শুরু না করলেও এর অসঙ্গতি ও আপত্তির জায়গাগুলো নিয়ে নিজেদের মধ্যে আলোচনা শুরু হয়েছে। জুলাই সনদে উপস্থাপিত পটভূমি, ঐকমত্য হওয়া বিষয় ও এর অঙ্গীকারের কিছু অংশ নিয়ে আপত্তির কথা বলছেন দলগুলোর নেতারা। ইতোমধ্যে জুলাই জাতীয় সনদের চূড়ান্ত খসড়া নিয়ে প্রতিক্রিয়া জানিয়েছে বিএনপি, তাদের সমমনা জোট গণতন্ত্রমঞ্চের শরিক নাগরিক ঐক্য ও বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টি এবং বাম গণতান্ত্রিক জোটের শরিক দল বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টি (সিপিবি) ও বাংলাদেশের সমাজতান্ত্রিক দলের (বাসদ) শীর্ষ নেতৃবৃন্দ।
নেতারা বলছেন, জুলাই জাতীয় সনদ সংবিধানের চেয়ে প্রাধান্য পেলে তা খারাপ নজির তৈরি করবে। পাশাপাশি আপিল বিভাগের ওপর এই আইন ন্যস্ত করা যায় কি নাÑ এমন প্রশ্নও তোলা হয়েছে। তাদের মতে, আদালতে প্রশ্ন তোলা যাবে নাÑ এমন বিধান গণতন্ত্র ও মানবাধিকারের পরিপন্থী। তাই কোনো কিছু চাপিয়ে না দিয়ে সবার মতামতের ভিত্তিতে যেসব বিষয়ে ঐকমত্য হয়েছে, সেগুলোকে প্রাধান্য দিয়ে সনদ চূড়ান্ত করলে ভালো দৃষ্টান্ত সৃষ্টি হবে।
এর পাশাপাশি নোট অব ডিসেন্টসহ ঐকমত্যে উপনীত হওয়া বিষয়গুলোর যে ৮৪টি প্রস্তাব তুলে ধরা হয়েছে, তার সবগুলো বাস্তবায়নের বিষয় নিয়ে সংশয় প্রকাশ করেছে কিছু কিছু দল। কারণ সনদে ৮৪টি বিষয়ের মধ্যে ১৫টিতে ‘নোট অব ডিসেন্ট’ দিয়েছে দলগুলো। এর মধ্যে ১০টি প্রস্তাবে ‘নোট অব ডিসেন্ট’ দিয়েছে বিএনপি। তাই এগুলোর ভবিষ্যৎ কী হবেÑ সেটা এখনও পরিষ্কার নয়। অন্যদিকে জুলাই জাতীয় সনদ বাস্তবায়নের যে আট দফা অঙ্গীকারনামা রয়েছে, তার কিছু কিছু বিষয় নিয়েও ঘোর আপত্তি জানাচ্ছে দলগুলো।
সূত্র জানায়, ঐকমত্য কমিশনের পক্ষ থেকে পাঠানো ‘জুলাই জাতীয় সনদ ২০২৫’-এর চূড়ান্ত খসড়ায় রাষ্ট্রের সংবিধান, নির্বাচন ব্যবস্থা, বিচার বিভাগ, জনপ্রশাসন, পুলিশ প্রশাসন ও দুর্নীতি দমন বিষয়ে যেসব সংস্কারে ঐকমত্য ও নোট অব ডিসেন্টসহ সিদ্ধান্ত হয়েছে, সেগুলো তুলে ধরা হয়েছে। এই খসড়ার ভাষাগত, শব্দ, বাক্য গঠন বা কোনো বিষয়ে সংশোধনী বা যেকোনো মতামত থাকলে তা আজ বুধবার (২০ আগস্ট) বিকাল ৪টার মধ্যে কমিশনের কার্যালয়ে জমা দিতে বলা হয়েছে।
সনদের অঙ্গীকার অংশের দ্বিতীয় দফায় বলা হয়েছেÑ জনগণের অভিপ্রায়ের সুষ্পষ্ট ও সর্বোচ্চ অভিব্যক্তি হিসাবে ‘জুলাই জাতীয় সনদ ২০২৫’ প্রণয়ন করেছি বিধায় এই সনদের সকল বিধান, নীতি ও সিদ্ধান্ত সংবিধানে অন্তর্ভুক্তকরণ নিশ্চিত করব এবং বিদ্যমান সংবিধান বা অন্য কোনো আইনে ভিন্নতর কিছু থাকলে সেই ক্ষেত্রে এই সনদের বিধান/প্রস্তাব/সুপারিশ প্রাধান্য পাবে। বিষয়টিকে ইঙ্গিত করে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য সালাহউদ্দিন আহমদ বলেছেন, সংবিধানের মধ্য থেকে সমঝোতা দলিল (জুলাই সনদ) কীভাবে বাস্তবায়ন করা যায়, সেই চিন্তা করতে হবে। সমঝোতা দলিল সংবিধানের ওপরে প্রাধান্য পেলে তা খারাপ নজির তৈরি হবে।
এদিকে অঙ্গীকারনামা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টির সাধারণ সম্পাদক সাইফুল হক। তিনি প্রতিদিনের বাংলাদেশকে বলেন, প্রথমত অনেকগুলো অঙ্গীকারনামা দেওয়া হয়েছে। এটাকে আরও ছোট করে আনা, আরও সুনির্দিষ্ট করার প্রস্তাব আমরা করব। এছাড়া নাগরিকদের কোনো বিষয়ে প্রশ্ন থাকলে আদালতে যাওয়া যাবে না, কোর্টে চ্যালেঞ্জ করা যাবে নাÑ এরকম বিধান রাখার পক্ষে আমরা থাকব না। এটা নাগরিকদের গণতান্ত্রিক ও সাংবিধানিক অধিকারের পরিপন্থী হবে বলে আমরা মনে করি। বিষয়গুলো নিয়ে জোটের শরিক দলগুলোর সঙ্গে আলোচনা করা হবে।
জুলাই ঘোষণাপত্রের মতো জুলাই জাতীয় সনদেও ইতিহাসকে মাঝে মাঝে ছেড়ে দেওয়া হয়েছে অভিযোগ করে নাগরিক ঐক্যের সভাপতি মাহমুদুর রহমান মান্না প্রতিদিনের বাংলাদেশকে বলেন, সংস্কারের দিকগুলোতেও খব বড় মাত্রায় সফলতা নেই। যেসব প্রস্তাব দেওয়া হয়েছিল তার দশভাগের একভাগে আমরা একমত হতে পেরেছি। সেটাও খুব স্পষ্ট করে না। তার মধ্যে আবার নোট অব ডিসেন্ট আছে। যে বিতর্কটা এখনও হচ্ছেÑ আইনি সুরক্ষা ও এর বাস্তবায়ন নিয়ে। আমরা আইনের বিরোধিতা করছি না। জুলাই সনদে বলা হয়েছেÑ এখানে নেওয়া প্রস্তাব সংবিধানের ওপরে এবং এটা নিয়ে আদালতে প্রশ্ন তোলা যাবে না। এই বিষয়ে আইনি সুরক্ষা কীভাবে দেওয়া যায়, সেটা নিয়ে আরও আলোচনা হতে পারে।
এর আগে দ্বিতীয় পর্বের সংলাপ সমাপ্তির আগে থেকেই জামায়াতে ইসলামী, জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি), ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশসহ বেশকিছু দল এর আইনি ভিত্তি ও বাস্তবায়নের জোর দাবি জানিয়ে আসছিল। যার প্রেক্ষিতেই কমিশন বিশেষজ্ঞদের মতামত নিয়ে খসড়া সনদ চূড়ান্ত করে ফের দলগুলোকে দিয়েছে। মতামত জানার পর ২৫ আগস্ট থেকে তৃতীয় দফায় রাজনৈতিক নেতাদের সঙ্গে সংলাপ শুরুর কথা রয়েছে।
নিজেদের মধ্যে বসছে দল ও সমমনা জোটগুলো : জুলাই সনদের খসড়া নিয়ে বিএনপি এরই মধ্যে স্থায়ী কমিটির বৈঠকে আলোচনা করেছে। গতকাল মঙ্গলবার বৈঠকে বসে গণতন্ত্রমঞ্চের শরিক দলগুলো। পাশাপাশি বিএনপির সঙ্গেও বিষয়টি নিয়ে আলোচনা হবে বলে জানিয়েছেন গণতন্ত্রমঞ্চের এক নেতা। এছাড়া বাম গণতান্ত্রিক জোটও নিজেদের মধ্যে আলোচনা করে তাদের অবস্থান চূড়ান্ত করবে। এরপরই দলগুলো যে যার মতো করে সনদ নিয়ে নিজ নিজ অবস্থান তুলে ধরবে।
এই প্রসঙ্গে বাম গণতান্ত্রিক জোটের অন্যতম শরিক বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টি (সিপিবি) সাধারণ সম্পাদক রুহিন হোসেন প্রিন্স প্রতিদিনের বাংলাদেশকে বলেন, তারা যেভাবে খসড়া চূড়ান্ত করেছে এখানে অনেক জায়গায় অসঙ্গতি রয়েছে। বিশেষ করে যেসব পদ্ধতির কথা বলা হয়েছে, যেভাবে রাইটআপ করা হয়েছে, চার মূলনীতির বিষয় যেভাবে রয়েছেÑ তাতে সনদে স্বাক্ষর করা আমাদের জন্য কঠিন হবে।
এ প্রসঙ্গে একই জোটের আরেক শরিক দল বাংলাদেশের সমাজতান্ত্রিক দলের সাধারণ সম্পাদক বজলুর রশীদ ফিরোজ প্রতিদিনের বাংলাদেশকে বলেন, সনদে অনেকগুলো বিষয় আছে, যেগুলোর সঙ্গে আমরা একমত না। বিশেষ করে অঙ্গীকারের কিছু কিছু বিষয়ে আমাদের আপত্তি রয়েছে। আমরা চাই সবাই মিলে ঐকমত্য হয়ে যেন একটা জুলাই সনদ ঘোষণা করতে পারি।