কাউসার আহমেদ
প্রকাশ : ১৯ আগস্ট ২০২৫ ১১:৪৩ এএম
ছবি : সংগৃহীত
সকাল ৯টার ক্লাস। শিক্ষক বোর্ডে সমীকরণ লিখে বুঝিয়ে দিচ্ছেন। শ্রেণিকক্ষে সামনের সারিতেই কয়েকজন শিক্ষার্থী বারবার মোবাইলের দিকে তাকাচ্ছে। কেউ ফেসবুকের নোটিফিকেশন চেক করছে, কেউ হোয়াটসঅ্যাপে রিপ্লাই দিচ্ছে, আবার কেউ টিকটক স্ক্রল করতে করতে হাসি চেপে রাখছে। শিক্ষক বুঝতে পারছেন, তিনি যা পড়াচ্ছেন তা অধিকাংশ শিক্ষার্থীর মস্তিষ্কে ঢুকছে না। শেখার পরিবেশের জায়গা দখল করে নিচ্ছে মোবাইলের স্ক্রিন বা ‘পর্দার ফাঁদ’।
এ দৃশ্য দেশের বেশিরভাগ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের প্রতিদিনের চিত্র। করোনাভাইরাস মহামারির পর অনলাইন শিক্ষার প্রসার ঘটলেও শিক্ষার্থীদের মনোযোগ হারানোর প্রবণতা বেড়েছে ভয়াবহভাবে। এখন ক্লাসে শিক্ষক পাঠদান করলেও শিক্ষার্থীদের বড় একটি অংশ মনোযোগ ধরে রাখতে পারছে না। বরং তারা বেশি সময় ব্যয় করছে সোশ্যাল মিডিয়া কিংবা বিনোদনজগতে। গবেষণা বলছে, এই অভ্যাস শিক্ষার্থীদের ফলাফলে বিরূপ প্রভাব ফেলছে, সিজিপিএ কমছে এবং শেখার গুণগত মান ধ্বংস করছে।
শিক্ষার্থীদের মধ্যে এ সমস্যাটি কতটা ভয়াবহ আকার নিয়েছে, তা বোঝা যায় তাদের অভিজ্ঞতা শুনলেই। আরিফুল ইসলাম এক বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী। তিনি বলেন, ক্লাসে যোগ দিলেও অনেকেই আসলে শোনে না। মোবাইল হাতে নিলেই সোশ্যাল মিডিয়া টানতে থাকে। তখন ভিডিও দেখি বা বন্ধুদের সঙ্গে চ্যাট করি। ফলে পড়ায় মন বসে না। নারায়ণগঞ্জের অষ্টম শ্রেণির রাইসা বিনতে মুক্ত বলেন, আমি যখন পড়তে বসি, মোবাইল ছাড়া থাকতে পারি না। অনলাইনে ক্লাস হলে ক্যামেরা বন্ধ করে ফেসবুক চালাই। রাজধানীর বাড্ডার বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী রিমা আক্তার বলেন, সকাল ৯টার ক্লাসে ঢুকি, ১০ মিনিট পর বন্ধুদের মেসেজ আসে। একবার মোবাইল খুললে পড়ায় মন বসে না।
এ নিয়ে অভিভাবকরাও হতাশ। রাজধানীর রাশেদা নামের এক গৃহিণী বলেন, একদিন দেখি আমার মেয়ে ক্লাসে বসে মোবাইলে গান শুনছে। জিজ্ঞেস করলাম, কেন পড়াশোনার সময় এ কাজ করছ? সে বলল, ক্লাস ভালো লাগছে না, তাই ফেসবুক স্ক্রল করছি। নারায়ণগঞ্জের আড়াইহাজার উপজেলার শামীমা আক্তার জানান, করোনার সময় তার ছেলে রাশেদুল অনলাইনে ক্লাসে যোগ দিত। প্রথমে ঠিক থাকলেও পরে তিনি সরে গেলে ছেলে ক্লাস বাদ দিয়ে ভিডিও দেখত আর গেমস খেলত।
গবেষণায় যা উঠে এসেছে
শুধু অভিজ্ঞতাই নয়, গবেষণার ফলাফলও এ সমস্যার গভীরতা দেখাচ্ছে। ইস্ট ওয়েস্ট বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষক মসিয়াথ মুবারসিরা ও অমিত কুমার দাস ২০১৯ সালে দি ইমপ্যাক্ট অব ইউনিভার্সিটি স্টুডেন্টস’ স্মার্টফোন ইউজ অ্যান্ড একাডেমিক পারফরম্যান্স ইন বাংলাদেশ : আ কোয়ান্টিটেটিভ স্টাডিÑ শীর্ষক একটি গবেষণা পরিচালনা করেন। এ গবেষণায় ২৩৭ শিক্ষার্থীর মোবাইল ব্যবহার দুই মাস পর্যবেক্ষণ করা হয়। দেখা যায়, অতিরিক্ত মোবাইল ব্যবহারের কারণে শিক্ষার্থীদের সিজিপিএতে বিরূপ প্রভাব পড়ছে। গবেষকরা পরামর্শ দিয়েছেন, মোবাইল ব্যবহারের সময় কমাতে বিশেষ ধরনের অ্যাপ ব্যবহার বা প্রযুক্তিগত নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা নেওয়া জরুরি।
কোভিড-১৯ মহামারির সময়ে অনলাইন শিক্ষা নিয়ে বাংলাদেশে একাধিক গবেষণা হয়েছে। এর মধ্যে সিলেট অ্যাগ্রিকালচারাল ইউনিভার্সিটির গবেষক আসিফ মাহমুদ, আদিত্য দাশগুপ্ত, আঁখি দাশগুপ্ত ও মো. কামরুল হাসান ২০২১ সালে কারেন্ট স্ট্যাটাস অ্যাবাউট কোভিড-১৯ ইমপ্যাক্টস অন অনলাইন এডুকেশন সিস্টেম : আ রিভিউ ইন বাংলাদেশ শীর্ষক গবেষণা প্রকাশ করেন। গবেষণায় দেখানো হয়, প্রায় ২০ দশমিক ৯ শতাংশ শিক্ষার্থী অনলাইন ক্লাসে মনোযোগ দিতে পারে না। ১৫ দশমিক ৪ শতাংশ অনলাইন ক্লাস উপভোগ করতে পারে না এবং ৪৪ দশমিক ৪ শতাংশ শিক্ষার্থী মনে করে অফলাইন ক্লাস অনলাইনের চেয়ে কার্যকর।
আন্তর্জাতিক পর্যায়ের গবেষণাতেও একই তথ্য উঠে এসেছে। ২০২২ সালে ওইসিডির (অর্থনৈতিক সহযোগিতা ও উন্নয়ন সংস্থা) প্রতিবেদনে দেখা গেছে, গণিত ক্লাসে ডিজিটাল ডিভাইস ব্যবহার করা শিক্ষার্থীদের মনোযোগ ৬৫ শতাংশ ক্ষেত্রে বিচ্যুত হয়। এর ফলে তারা গড়ে ১৫ পয়েন্ট কম স্কোর করে।
বিশেষজ্ঞদের মতামত ও পরামর্শ
বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, শিক্ষার্থীদের মধ্যে ইন্টারনেট আসক্তি শিক্ষাব্যবস্থার জন্য একটি বড় হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে। কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের সহকারী অধ্যাপক ও বিভাগীয় প্রধান (ভারপ্রাপ্ত) মাহমুদুল হাসান বলেন, শিক্ষার্থীরা এখন ক্লাস চলাকালীনও সোশ্যাল মিডিয়ায় ব্যস্ত থাকে। এতে শিক্ষকরা বিভ্রান্ত হন, পরিবেশ ব্যাহত হয়, আবার শিক্ষার্থীর নিজেরও ক্ষতি হয়।
ড. মো. মাহমুদুল হাছান বলেন, ইন্টারনেটের প্রতি অস্বাভাবিক নির্ভরশীলতা শিক্ষার্থীদের মানসিক স্বাস্থ্যের জন্য বিপজ্জনক। এতে তাদের উদ্বেগ, একাকিত্ব ও হতাশা বাড়ছে। একই সঙ্গে সৃজনশীলতা ও উৎপাদনশীলতাও কমে যাচ্ছে।
মনোরোগ বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ডা. সালাহউদ্দিন কাউসার বিপ্লব বলেন, অতিরিক্ত মোবাইল ব্যবহার নিয়ন্ত্রণে পরিবার ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানকে কার্যকর ভূমিকা নিতে হবে। কেবল নিয়ন্ত্রণ নয়, বরং অভিভাবক ও শিক্ষকদের সচেতনতা ও নিয়মিত কাউন্সেলিং জরুরি। শিশুদের সঠিক দিকনির্দেশনা না দিলে তারা আরও গভীর আসক্তিতে জড়িয়ে পড়বে।
সমাধানের জন্য বিশেষজ্ঞরা কয়েকটি পদক্ষেপের কথা বলেছেন। প্রথমত, অভিভাবককে সন্তানের মোবাইল ব্যবহারের সময়সীমা নির্ধারণ করতে হবে এবং পড়াশোনার সময় ফোন দূরে রাখতে উৎসাহ দিতে হবে। দ্বিতীয়ত, শিক্ষকদের শ্রেণিকক্ষে মোবাইল ব্যবহারের ওপর নীতি তৈরি করতে হবে এবং লেকচারকে আরও আকর্ষণীয় করে তুলতে হবে। তৃতীয়ত, প্রযুক্তিগত সহায়তা যেমন সময় ট্র্যাকিং অ্যাপ ব্যবহার করা যেতে পারে। চতুর্থত, শিক্ষার্থীদের খেলাধুলা, সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড ও সামাজিক যোগাযোগে উৎসাহ দিতে হবে, যাতে তারা মোবাইল-নির্ভরতা থেকে বেরিয়ে আসতে পারে। পঞ্চমত, আসক্ত শিক্ষার্থীদের নিয়মিত কাউন্সেলিং ও মানসিক স্বাস্থ্য সহায়তা দিতে হবে। এ ছাড়া শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকেও অনলাইন শিক্ষার জন্য একটি স্পষ্ট নীতিমালা প্রণয়ন করা দরকার, যাতে মোবাইল ব্যবহারের সীমা, নিরাপদ ইন্টারনেট চর্চা ও ডিজিটাল ডিটক্স-সংক্রান্ত নির্দেশনা থাকবে।
সব মিলিয়ে বলা যায়, পড়াশোনার ছলে মোবাইলের পর্দায় হারিয়ে যাওয়া শিক্ষার্থীদের সংখ্যা প্রতিদিনই বাড়ছে। এই আসক্তি শুধু শিক্ষার মানকেই ক্ষতিগ্রস্ত করছে না, বরং ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে ঝুঁকির মুখে ফেলছে। পরিবার-শিক্ষক-প্রতিষ্ঠানের যৌথ উদ্যোগ এবং জীবনধারার ইতিবাচক পরিবর্তনের মাধ্যমে এ সংকট মোকাবিলা করাটা এখন সময়ের দাবি।