সাধারণ মানুষের মতামত
কাউসার আহমেদ ও শাহরিয়ার ইমতিয়াজ
প্রকাশ : ০৮ আগস্ট ২০২৫ ০৯:৩৯ এএম
আপডেট : ০৮ আগস্ট ২০২৫ ১১:১৩ এএম
ফাইল ফটো
দিনটি ছিল ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট। ছাত্র-জনতার অভ্যুথানে পতন ঘটে ১৫ বছরের অধিক সময় রাষ্ট্রশাসন করা আওয়ামী লীগ সরকারের। সরকারবিহীন এক রাষ্ট্রে তখন রাজনৈতিক অস্থিরতা, দুর্নীতির অভিযোগ, মানবাধিকার লঙ্ঘন, দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি, তারুণ্যের ক্রমবর্ধমান বিক্ষোভ ও আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির চরম অবনতি। এমনই এক পরিস্থিতিতে গত বছরের ৮ আগস্ট শপথগ্রহণ করেছিল ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তীকালীন সরকার, যা অনেকের কাছেই আশার প্রতীক হয়ে উঠেছিল। জুলাইয়ের গণঅভ্যুত্থানের পর গঠিত এই সরকারের এক বছর পূর্ণ হলো আজ। এক বছর পর ফিরে তাকালে দেখা যায়, এই সরকার বেশ কিছু ইতিবাচক পদক্ষেপ নিয়েছে। তবে সীমাবদ্ধতা ও ব্যর্থতাও ছিল চোখে পড়ার মতো। দেশের নানা শ্রেণি-পেশার মানুষ এ এক বছরকে দেখেছে ভিন্ন ভিন্ন চোখে। তাদের চাওয়া ও মতামতগুলো তুলে ধরা হলো প্রতিদিনের বাংলাদেশের পাতায়।
বেসরকারি একটি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতক সম্পন্ন করা তাওহিদ সিয়াম মনে করেন, ড. ইউনূস একজন সম্মানিত মানুষ হলেও সরকার পরিচালনায় তিনি প্রত্যাশা অনুযায়ী ফল দিতে পারেননি। সিয়াম বলেন, দেশের সংকটকালীন সময়ে সরকার হিসেবে তিনি কিছুটা স্থিতিশীলতা আনতে পেরেছেন, বিশেষ করে দ্রব্যমূল্য ও গুজব রোধে। তবে কাঙ্ক্ষিত সংস্কার বাস্তবায়নে তিনি ব্যর্থ হয়েছেন।
কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী নাজনীন আক্তার জানান, গত সরকারের আমলে বিশ্ববিদ্যালয়ের হলে বসবাস ছিল আতঙ্কের মতো। রাজনৈতিক দলের মিছিল-মিটিংয়ে না গেলে রুমে এসে জোরপূর্বক নিয়ে যাওয়া হতো, প্রতিবাদ করলে মানসিক ও শারীরিকভাবে নির্যাতনের শিকার হতে হতো। এমনকি সিট হারানোর ভয়ও দেখানো হতো। বিশেষ করে নারী শিক্ষার্থীদের জন্য এটি ছিল ভয়ের বিষয়। তবে বর্তমান সরকার ক্ষমতায় আসার পর এসব অনৈতিক চাপ অনেকটাই কমে এসেছে। এখন হলের সিট প্রশাসনের মাধ্যমে যাচাই-বাছাই করে বণ্টন করা হচ্ছে এবং প্রকৃত ছাত্রীরাই সিট পাচ্ছেন।
তিনি বলেন, ক্যাম্পাস এখন অনেকটা নিরাপদ মনে হয়। রাজনীতির নামে কেউ আমাদের হয়রানি করছে না। তবে তিনি এটাও উল্লেখ করেন, কিছু সন্ত্রাসী সংস্কারের পথে বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে, যার ফলে সরকার তার পূর্ণ সম্ভাবনা অনুযায়ী কাজ করতে পারছে না।
গভীর হতাশা প্রকাশ করে আবদুর রহিম নামের এক বিসিএস পরীক্ষার্থী বলেন, নিয়োগের কোনো নির্ধারিত শিডিউল নেই, বিজ্ঞপ্তি আসছে কম, প্রতিযোগিতা বাড়ছে, অথচ ট্রান্সপারেন্সি নাই। ড. ইউনূস সরকার চাকরির ক্ষেত্রে কোনো বাস্তব পদক্ষেপ নেয়নি।
অপরদিকে দিনমজুর হান্নান মিয়া এই সরকারের আমলে নিত্যপণ্যের দামের কিছুটা কমতির প্রশংসা করেন। তিনি বলেন, আমাদের চাওয়া কম, চাল-সবজির দাম যদি কম রাখে তাইলেই শান্তি। আমরা সামান্য টাকা আয় করি। এই টাকার মধ্যেই যেন থাকতে পারি ও চলতে পারি।
ঢাকার খিলক্ষেত এলাকার পাইকারি সবজি বিক্রেতা নজরুল ইসলামের মতে, বর্তমান সরকার বাজারব্যবস্থায় সিন্ডিকেট ভাঙতে কিছুটা সক্ষম হয়েছে। তিনি বলেন, আগে ভারত-মিসর থেকে পেঁয়াজ এলেও দাম থাকত আকাশছোঁয়া। এখন দেশি পেঁয়াজেই বাজার চলছে, তাও দাম আগের চেয়ে অর্ধেক।
ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী আবদুস শাকুরের মতে, সরকারের অনেক উদ্যোগ প্রশংসনীয় হলেও তা এখনও পূর্ণ বাস্তবায়নে পৌঁছেনি। তিনি বলেন, এক সময় যারা আওয়ামী লীগের লোক ছিল তারা উচিত কথা বলতে দিত না। আজ সেই বাকস্বাধীনতা কিছুটা ফিরেছে, আমরা বলার সুযোগ পাচ্ছি। পণ্যের দাম বেশি নিলে আমরা তার প্রতিবাদ করতে পারি।
তবে সব দিকেই যে আলো দেখা যাচ্ছে, তা নয়। পাহাড়ি ছাত্র পরিষদের সভাপতি অমল ত্রিপুরার ভাষ্য অনুযায়ী, ‘নতুন বাংলাদেশ’-এর স্বপ্ন ক্রমেই ম্লান হয়ে যাচ্ছে। রাষ্ট্রীয় বাহিনীর গুলি, নির্যাতন বন্ধ হয়নি। পার্বত্য চট্টগ্রামে এখনও সেনাশাসন চলছে, ভূমি বেদখল, অধিকার হরণ অব্যাহত। সেনা-সেটলার প্রত্যাহার, স্বায়ত্তশাসন এসব বিষয়ে সরকারের কোনো অবস্থান দেখা যাচ্ছে না। তিনি আরও জানান, খাগড়াছড়িতে ৫ আগস্ট শান্তিপূর্ণ মিছিলে গুলি চালানো হয়েছে, যার বিচার আজও হয়নি। নতুন সরকার পুরনো নিপীড়নের ধারা থেকে বের হতে পারেনি।
নবীন উদ্যোক্তা আশরাফুল ইসলাম বলেন, দুর্নীতি রোধে সরকারের কিছু উদ্যোগ ছিল প্রশংসনীয়। কিন্তু সরকারকে আরও কঠোর হতে হবে। বিশেষ করে টেন্ডার ও ব্যাংক দুর্নীতি বন্ধে কার্যকর পদক্ষেপ না নিলে আগের মতোই চলতে থাকবে সব।
রিকশাচালক জসিম উদ্দিন বলেন, আগে চাঁদা দিতে হতো, এখন চাঁদা নাই। এটা ভালো দিক। কিন্তু আয় দিয়ে সংসার চলে না। খরচের সঙ্গে আয় মিলছে না।
রূপগঞ্জের ফকিরা গার্মেন্টসে কাজ করেন শিউলি বেগম। বর্তমান সরকার নিয়ে তিনি বলেন, শুনি সরকার নাকি শ্রমিকদের অধিকার নিয়ে কাজ করছে, কিন্তু আমরা সেই সুবিধা পাই না। ছুটির সময় বেতন কাটা হয়, অসুস্থ হলে ছুটি পাওয়া যায় না। মেয়েদের নিরাপত্তার দিকটাও ঠিকমতো দেখা হয় না। আর একটা কথা, আগে ভয় ছিল কথা বললে চাকরি যাবে, এখন একটু হলেও সাহস পাইছি। তবে এখনও অনেক কিছু বদলানো দরকার।