সাক্ষাৎকার : ডা. মুসতাক হোসেন
প্রবা প্রতিবেদক
প্রকাশ : ০৬ আগস্ট ২০২৫ ১৩:৩৫ পিএম
ডা. মুসতাক হোসেন
গত বছরের জুলাইয়ে সরকারি চাকরিতে কোটা প্রথা বাতিলের দাবিতে আন্দোলন শুরু হয়েছিল বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের ব্যানারে। তা একপর্যায়ে গণঅভ্যুত্থানে রূপ নেয়। শিক্ষার্থীরা আন্দোলন শুরু করলেও পরে এতে যুক্ত হন নানা শ্রেণি-পেশার মানুষ। প্রকৌশলী, আইনজীবী, সাংবাদিক, ব্যবসায়ী, রাজনৈতিক দলের নেতাকর্মীদের পাশাপাশি এ আন্দোলনে যুক্ত হন চিকিৎসকরাও। ফ্যাসিবাদের বিরুদ্ধে বিক্ষোভ, মানববন্ধনসহ নানা কর্মসূচির পাশাপাশি গণঅভ্যুত্থানে আহতদের চিকিৎসায় সক্রিয় ছিল চিকিৎসকদের সংগঠন ‘ডক্টরস প্লাটফর্ম পিপলস হেলথ’সহ বিভিন্ন সংগঠন। এক বছর আগে সেই দিনগুলোতে চিকিৎসকদের ভূমিকা নিয়ে প্রতিদিনের বাংলাদেশের মুখোমুখি হয়েছেন রোগতত্ত্ব, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের (আইইডিসিআর) উপদেষ্টা ও প্রতিষ্ঠানটির সাবেক প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ডাকসুর সাবেক ভিপি চিকিৎসক নেতা ডা. মুশতাক হোসেন। প্রতিদিনের বাংলাদেশের প্রশ্নের জবাবে এ চিকিৎসক নেতা যা বলেছেন, তা তুলে ধরা হলো। সাক্ষাৎকারটি নিয়েছেন প্রতিদিনের বাংলাদেশের স্টাফ রিপোর্টার সাইফ বাবলু
প্রবা : চিকিৎসকরা গণঅভ্যুত্থানে কীভাবে যুক্ত হন?
মুশতাক : শিক্ষার্থীদের আন্দোলন শুরু হলে চিকিৎসকদের ঐক্যবদ্ধ সংগঠন ‘ডক্টরস প্লাটফর্ম ফর পিপলস হেলথ’ এতে নৈতিকভাবে সমর্থন দেয়। গণঅভ্যুত্থানে এ সংগঠনটি দুটি কাজ করেছে। একটি ছিলÑ গণঅভ্যুত্থানের সময় যারা আহত হয়ে হাসপাতালে এসেছিল। তাদের চিকিৎসায় যেন অবহেলা না হয় সেদিকে নজর রাখা। আরেকটি ছিলÑ রাজপথে আন্দোলনে সংহতি প্রকাশ করা। আমি বাংলাদেশ মেডিকেল অ্যাসোসিয়েশনের কার্যনির্বাহী পরিষদের সদস্য। সেই হিসেবে ডক্টর প্লাটফর্ম ফর পিপলস হেলথ সংগঠনের সঙ্গে বিভিন্ন হাসপাতালে যাই। আন্দোলনকারীদের পক্ষে সমর্থন দিয়ে বিভিন্ন ধরনের লেখাও লিখেছেন চিকিৎসকরা। ফ্যাসিবাদবিরোধী বিভিন্ন প্লাটফর্মে বক্তব্য রাখা, টকশোতে সোচ্চার ছিলেন চিকিৎসক নেতারা।
প্রবা : চিকিৎসকরা কীভাবে সক্রিয় ছিল?
মুশতাক : আন্দোলনের সময় চিকিৎসকরা যে কাজটি করেছিল তা হলো আহতদের কার কোন ধরনের চিকিৎসা দরকার, সেটি নিশ্চিত করা। দেখা গেছে একজন রাজনৈতিক নেতা আহত হয়েছেন, কিন্তু হাসপাতালে যেতে ভয় পাচ্ছেন। কারণ তখন বিভিন্ন হাসপাতালে আওয়ামী লীগ সমর্থিত চিকিৎসক ছাড়াও ছাত্রলীগ-যুবলীগসহ সরকারি দলের সমর্থিত ক্যাডাররা হামলা করত। ফলে যেসব রাজনৈতিক নেতাকর্মীরা হাসপাতালে যেতে পারত না, তাদের জন্য চিকিৎসক ব্যবস্থা করে দেয়া। বাসায় গিয়েও আহতদের চিকিৎসাসেবা দিয়েছেন চিকিৎসকরা। অনেক চিকিৎসক চাকরি হারানোর ভয়ে সরাসরি আহতদের চিকিৎসা দিতে না পারলেও টেলিফোন ও হোয়াটঅ্যাপসে চিকিৎসা দিয়েছেন। এভাবেই চিকিৎসকরা আন্দোলনে সক্রিয় ছিল এবং আহতদের পাশে দাঁড়িয়েছিল।
প্রবা : আহতদের চিকিৎসা দেওয়া এবং আন্দোলনে অংশ নেওয়ায় সরকার বা পুলিশের পক্ষ থেকে কোনো হুমকি ছিল কি না?
মুশতাক : সরাসরি হুমকি পায়নি চিকিৎসকরা। তবে পঙ্গু হাতপাতালের একজন চিকিৎসক যিনি কোনো দল করতেন না। আন্দোলনের সময় শিক্ষার্থীদের ঘোষণা অনুযায়ী ফেসবুক প্রোফাইল লাল করেছিলেন। ফলে ওই চিকিৎসককে তৎকালীন স্বাস্থ্যমন্ত্রীর নির্দেশে অন্যত্র বদলি করা হয়। খবর পেয়ে আমরা স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ে গিয়ে প্রতিবাদ করলে তার বদলি অর্ডার বাতিল করা হয়।
প্রবা : চিকিৎসকদের কোন কোন সংগঠন আন্দোলনে সক্রিয় ছিল?
মুশতাক : বাংলাদেশ ডক্টরস প্লাটফর্ম ফর পিপলস হেলথ সংগঠনের সঙ্গে চিকিৎসক সংসদ, ডক্টরস ফর হেলথ অ্যান্ড এনভায়রনমেন্ট, ডক্টরস ফোরামসহ বেশকিছু চিকিৎসক সংগঠন সক্রিয় ছিল এবং আন্দোলনকারীদের পাশে ছিল। এজন্য সরকার সমর্থিত চিকিৎসকরা এ বিষয়ে কোনো চাপ প্রয়োগ করেনি। তবে সরকার সমর্থিত অনেক চিকিৎসক দলীয় কারণে আন্দোলনে আহতদের পাশে দাঁড়াতে না পারলেও গোপনে সহযোগিতা করেছে। আশ্চর্যের বিষয় ছিলÑ সরকার সমর্থিত চিকিৎসক বা স্বাচিপের অনেক সদস্য এ আন্দোলনে সমর্থন দিয়েছেন।
প্রবা : ডক্টরস প্লাটফর্ম কী কারণে সক্রিয় হলো?
ডা. মুশতাক : ডক্টরস প্লাটফর্ম ফর পিপলস হেলথ মূলত চিকিৎসা সেক্টরে অনিয়ম-দুর্নীতিবিরোধী প্লাটফর্ম। করোনাকালে রোগীদের চিকিৎসা নিশ্চিতে সোচ্চার ছিল এই প্লাটফর্ম। করোনার পরও নানা অনিয়ম ও দুর্নীতির বিভিন্ন তথ্য-উপাত্ত তুলে ধরতে সংবাদ সম্মেলন করেছে। সেই তাগাদা থেকেই ডক্টরস প্লাটফর্ম পর পিপলস হেলথের ব্যানারে চিকিৎসরা ফ্যাসিবাদবিরোধী আন্দোলনে যোগ দেয়।
প্রবা : স্বাস্থ্য সেক্টরে গত ১৫ বছরে নানা বৈষম্য অনিয়ম ও দুর্নীতি ছিল। চিকিৎসকরা যে প্রত্যাশা নিয়ে ফ্যাসিবাদবিরোধী আন্দোলনে যুক্ত হয়েছেন ১ বছরে সেই প্রত্যাশা কতটুকু পূরণ হয়েছে?
মুশতাক : স্বাস্থ্য সেক্টরে অনীয়ম-দুর্নীতির বিদায়, চিকিৎসকদের নিরাপত্তা, সর্বজনীন স্বাস্থ্য নীতির বাস্তবায়নের যে প্রত্যাশা নিয়ে চিকিৎসকরা ফ্যাসিবাদবিরোধী আন্দোলনে যুক্ত হয়েছেÑ সেই প্রত্যাশা পূরণ হয়নি। এ বিষয়ে আমরা পুরোপুরি হতাশ। আওয়ামী লীগের আমলে যেভাবে তাদের দলীয় চিকিৎসকদের পদোন্নতি এবং পছন্দের জায়গায় পদায়ন করা হতো, গণঅভ্যুত্থানের পর আমরা ঠিক একই চিত্র দেখছি। যোগ্য চিকিৎসক যারা কোনো রাজনীতির সঙ্গে জড়িত নয়, এমন চিকিৎসকদের হয়রানি করা শুরু হয়। স্বাস্থ্য অধিদপ্তর থেকে শুরু করে বিভিন্ন মেডিকেল কলেজ এবং হাসপাতাল থেকে যোগ্য এবং চিকিৎসকদের বের করে দেওয়া হয়েছে। যে দলীয় দৃষ্টিভঙ্গি থেকে আগে স্বাস্থ্য সেক্টরে চিকিৎসক বদলি-পদোন্নতি হতো, এখনও তা বহাল রয়েছে। এগুলোর অবসান হওয়া দরকার। এসব কর্মকাণ্ডের কারণে সাধারণ চিকিৎসকরা বিরক্ত।