ফসিহ উদ্দীন মাহতাব
প্রকাশ : ২৩ মার্চ ২০২৫ ১০:২৯ এএম
গ্রাফিক্স : প্রবা
অর্থ মন্ত্রণালয়ের ব্যাংকিং ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগের উপসচিব প্রকৌশলী মোহাম্মদ অতুল মন্ডল। বিসিএস (প্রশাসন) ২৪ ব্যাচের এই কর্মকর্তা উত্তরাঞ্চলের একটি জেলার বাসিন্দা। নিরীহ, সৎ ও মেধাবী কর্মকর্তা হিসেবে প্রশাসনে তার খ্যাতি রয়েছে। যদিও আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে রাজনৈতিক ট্যাগ লাগিয়ে তাকে পদোন্নতি বঞ্চিত করা হয়েছিল। বঞ্চনা নিয়েই অধিকতর জুনিয়রের অধীনে বিভিন্ন দপ্তরে তাকে চাকরি করতে হয়েছে। পদোন্নতি পেতে সরকারের বিভিন্ন পর্যায়ে আবেদন-নিবেদন করেও তখন প্রতিকার পাননি তিনি। অবশেষে ৫ আগস্ট ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানে আওয়ামী লীগ শাসনামলের অবসানের পর ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বে গঠিত অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের আমলে এসে বঞ্চিত হিসেবে তার ভাগ্যে উপসচিব পদোন্নতি জুটেছে। অবশ্য নিয়ম মেনে অতীতে তার বঞ্চনার কথা তুলে ধরে পদোন্নতির জন্য তিনি যথাযথ কর্তৃপক্ষের কাছে আবেদন করেছিলেন। এরপর গত আগস্টে সিনিয়র সহকারী সচিব থেকে ভূতাপেক্ষ উপসচিব পদোন্নতি পান। কিন্তু আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে বারবার পদোন্নতি বঞ্চিত হলেও দেখা গেছে গত বৃহস্পতিবার জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের প্রজ্ঞাপনে থাকা ১৯৬ যুগ্ম সচিব পদোন্নতির তালিকায় তার নাম নেই। এ ঘটনায় মানসিকভাবে ভেঙে পড়েছেন তিনি। অথচ বিগত সরকারের আমলে নিয়মিত পদোন্নতি পেয়েছেন, উপদেষ্টা বা মন্ত্রীর একান্ত সচিব ছিলেন, আবার জেলা প্রশাসক (ডিসি) ছিলেন এমন কর্মকর্তারাও এই আমলে এসে যুগ্ম সচিব পদোন্নতি পেয়েছেন। প্রশাসনে পদোন্নতিতে এমন বঞ্চনার ঘটনা এক-দুটি নয়, অনেক।
বিসিএস (প্রশাসন) ২৪ ব্যাচের আরেক কর্মকর্তা রাসেল মনজুর। তিনি বীর মুক্তিযোদ্ধার সন্তান। শিক্ষাজীবনের প্রতিটি স্তরে তার প্রথম স্থান রয়েছে। আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে রাজশাহী বিভাগের একটি উপজেলায় ইউএনও ছিলেন। তখন ওই বিভাগের বিভাগীয় কমিশনার ছিলেন ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ঘনিষ্ঠ আমলা ও সাবেক সিনিয়র সচিব হেলালুদ্দীন আহমেদ (বর্তমানে কারান্তরিন)। ইউএনও থাকাকালে তার অন্যায় আবদার না শোনায় ওই বিভাগীয় কমিশনারের রোষানলে পড়েন তিনি। পরে তাকে শায়েস্তা করতে সাবেক এই সচিব বিএনপি-জামায়াত রাজনৈতিক ট্যাগের পাশাপাশি ‘অসদাচরণ’-এর অভিযোগ জুড়ে দিয়ে তার বার্ষিক গোপনীয় প্রতিবেদনে বিরূপ মন্তব্য লেখেন। শুধু তা-ই নয়, ২০১৬ সালের জুনে তার বিরুদ্ধে বিভাগীয় মামলাও করা হয়। জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের শৃঙ্খলা শাখা দীর্ঘ তদন্ত শেষে তার বিরুদ্ধে আনা অসদাচরণের অভিযোগ সম্পর্কে কোনো প্রমাণ খুঁজে পায়নি। পরে ২০১৭ সালের মে মাসে তৎকালীন জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সচিব ড. মোজাম্মেল হক খান স্বাক্ষরিত প্রজ্ঞাপনে রাসেলকে নির্দোষ সাব্যস্ত করে মামলা থেকে অব্যাহতি দেওয়া হয়। এরপরও বিভিন্ন সময়ে অন্যান্য ব্যাচের (তার জুনিয়র ২৫, ২৭, ২৮ ও ২৯ ব্যাচ) কর্মকর্তাদের উপসচিব পদোন্নতি দেওয়া হলেও তাকে পদোন্নতি বঞ্চিত করা হয়। ৫ আগস্টের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর বঞ্চিত হিসেবে তাকে সিনিয়রিটি দিয়ে উপসচিব পদোন্নতি দেওয়া হয়। পরে ২৪ ব্যাচের উপসচিবদের যুগ্ম সচিব পদোন্নতির জন্য বিবেচনায় আনা হয়। দীর্ঘ প্রক্রিয়া শেষে ২০ মার্চ যুগ্ম সচিব পদোন্নতি দেওয়া হলেও তার ভাগ্যে সে পদোন্নতি জোটেনি। কী কারণে পদোন্নতি পাননি তার কারণও খুঁজে পাচ্ছেন না। বিগত সরকারের আমলে পদোন্নতি বঞ্চিত কর্মকর্তাদের অন্তর্বর্তীকালীন সরকার সর্বাধিক বিচেনায় নিয়েছে, অথচ তাদের অনেকেই পদোন্নতি বঞ্চিত হয়েছেন। শুধু তা-ই নয়, দেখা গেছে আগের আমলের সুবিধাভোগীরা এই আমলেও পদোন্নতি পেয়েছেন। এমন বৈষম্যের ঘটনায় গোটা প্রশাসনে আলোচনা-সমালোচনা চলছে। কেবল এই দুই কর্মকর্তা নয়, বিগত সরকারের আমলে বঞ্চিত আরও বিপুল সংখ্যক কর্মকর্তা পদোন্নতি বঞ্চিত হয়েছেন বলে অভিযোগ উঠেছে। এর পরিপ্রেক্ষিতে বঞ্চিতরা শিগগির অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের প্রধান উপদেষ্টার হস্তক্ষেপ কামনা করে আবেদন করবেন বলে একাধিক সূত্রে জানা গেছে।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, গত ২০ মার্চ প্রশাসনে ১৯৬ উপসচিবকে যুগ্ম সচিব পদোন্নতি দিয়ে পৃথক দুটি প্রজ্ঞাপন জারি করেছে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়। এই পদোন্নতিতে বিসিএস (প্রশাসন) ২৪ ব্যাচকে নিয়মিত হিসেবে বিবেচনায় রেখে প্রাধান্য দেওয়া হয়েছে। পদোন্নতি দিতে মন্ত্রিপরিষদ সচিবের নেতৃত্বে গঠিত সুপিরিয়র সিলেকশন বোর্ড (এসএসবি) দফায় দফায় বৈঠক করেছে। সেখানে পদোন্নতির যোগ্য কর্মকর্তাদের আমলনামা বিশেষভাবে পর্যালোচনা করা হয়েছে। গোয়েন্দা সংস্থার মাধ্যমে তাদের চাকরিজীবন, ব্যক্তিগত ও পারিবারিকসহ অন্যান্য বিষয়ে তথ্য চাওয়া হয়েছে। এ-সংক্রান্ত প্রতিবেদন সভায় পর্যালোচনা করে পদোন্নতি-যোগ্যদের তালিকা চূড়ান্ত করা হয়। এরপরও এসএসবির কোনো কোনো সদস্যের সঙ্গে ব্যক্তিগত সখ্য থাকার সুবাদে অনেকেই পদোন্নতি পেয়েছেন। যে কারণে বিগত সরকারের আমলে উপদেষ্টা ও প্রতিমন্ত্রীদের একান্ত সচিব ছিলেন বা জেলা প্রশাসক (ডিসি) ছিলেনÑ এমন কর্মকর্তারাও পদোন্নতি পেয়েছেন। বিষয়টি নিয়ে অন্তর্বর্তী সরকারের শীর্ষমহলেও বেশ আলোচনা চলছে বলে জানা গেছে।
সংশ্লিষ্টরা জানান, অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের আমলেই পদোন্নতি পাওয়া উপসচিবদের বিবেচনায় আনতে সর্বোচ্চ পর্যায় থেকে নির্দেশনা দেওয়া হয়েছিল। তারা মেধাবী ও যোগ্য হলেও বিগত সরকারের আমলে তাদের নামের আগে বিএনপি-জামায়াত ট্যাগ লাগিয়ে দিয়ে তাদেরকে পদোন্নতি বঞ্চিত করা হয়। এ অবস্থায় অন্তর্বর্তীকালীন সরকার বিসিএস (প্রশাসন) ২৪ ব্যাচের বঞ্চিত সিনিয়র সহকারী সচিব মর্যাদার কর্মকর্তাদের ভূতাপেক্ষ পদোন্নতি দিয়ে উপসচিব করে। পুরোনো কোনো তারিখে তাদের পদোন্নতি কার্যকর ধরে সেই তারিখ থেকেই নতুন পদের বেতন-ভাতা প্রাপ্য হন তারা।
জনপ্রশাসনের প্রজ্ঞাপন খতিয়ে দেখার পর জানা গেছে, ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার প্রভাবশালী উপদেষ্টা সালমান এফ রহমানের একান্ত সচিব (পিএস) ছিলেন উপসচিব (বিসিএস ২৪ ব্যাচ) আবু সালেহ মোহাম্মদ ওবায়দুল্লাহ। তিনি ওই আমলে যেমন নিয়মিত পদোন্নতি ও ভালো পদায়ন পেয়েছিলেন, একইভাবে অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের আমলেও প্রথম দফায় কোনো বাধা ছাড়াই যুগ্ম সচিব পদোন্নতি পেয়েছেন। তার ক্ষমতার উৎস নিয়ে অন্যদের মধ্যে কৌতূহল দেখা দিয়েছে। একইভাবে তৎকালীন নৌপরিবহন প্রতিমন্ত্রী খালিদ মাহমুদ চৌধুরীর একান্ত সচিব (উপসচিব) মোহা. আমিনুর রহমানের পদোন্নতি নিয়েও সমালোচনা চলছে। পতিত সরকারের একজন প্রতিমন্ত্রীর একান্ত সচিব বিনা বাধায় যদি যুগ্ম সচিব পদোন্নতি পেয়ে যান, তাহলে গোয়েন্দা প্রতিবেদন কেন প্রয়োজনÑ এমন প্রশ্নও উঠেছে।
লোক প্রশাসন প্রশিক্ষণ কেন্দ্রের কর্মকর্তা (উপসচিব) ড. চিত্রলেখা নাজনিন ২০২২ সালে আওয়ামী লীগ সরকারের আস্থাভাজন হওয়ার সুবাদে রংপুরের জেলা প্রশাসক (ডিসি) নিয়োগ পান। তিনি সরকারের শীর্ষমহলে ঘনিষ্ঠ হওয়ায় কাউকে পাত্তা দিতেন না। সে সময় রংপুর রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের এক শিক্ষক তাকে ‘স্যার’ সম্বোধন না করায় ওই শিক্ষককে তিনি অপদস্থ করেন। এ ঘটনায় দেশব্যাপী তোলপাড় সৃষ্টি হয়। অবস্থা বেগতিক দেখে সরকারের উচ্চ মহলের পরামর্শে তিনি ক্ষমা চেয়ে পার পান। এই কর্মকর্তাকেই এই আমলে পদোন্নতি দিয়েছে এ-সংক্রান্ত সর্বোচ্চ কমিটি। একই সময়ে জামালপুরের জেলা প্রশাসক ছিলেন নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষের সচিব (উপসচিব) মিজ শ্রাবন্তী রায়। বিগত সরকারের সুবিধাভোগী হলেও তাকেও যুগ্ম সচিব পদোন্নতি দেওয়া হয়েছে। অভিযোগ উঠেছেÑ সুবিধাভোগী এসব কর্মকর্তার পদোন্নতির নেপথ্যে অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের প্রভাবশালী আমলারাই ভূমিকা রেখেছেন। যে কারণে পদোন্নতি পেতে তাদের অসুবিধা হয়নি।
এ বিষয়ে মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের সচিব ড. শেখ আব্দুর রশিদ বলেন, যথাযথ নিয়ম অনুসরণ করেই পদোন্নতি দেওয়া হয়েছে। এখানে কোনো পক্ষপাতিত্ব করা হয়নি। কাউকে অযৌক্তিভাবে পদোন্নতি থেকে বঞ্চিতও করা হয়নি।