× ই-পেপার প্রচ্ছদ সর্বশেষ বাংলাদেশ রাজনীতি দেশজুড়ে বিশ্বজুড়ে বাণিজ্য খেলা বিনোদন মতামত চাকরি শিক্ষা আজকের কার্টুন ফিচার সকল বিভাগ ছবি ভিডিও লেখক আর্কাইভ কনভার্টার

সমন্বয়হীন খোঁড়াখুঁড়িতে দুর্ভোগে নগরবাসী

রাহাত হুসাইন

প্রকাশ : ০৯ ফেব্রুয়ারি ২০২৫ ০৯:২১ এএম

রাজধানীর বিভিন্ন সড়কে দীর্ঘদিন ধরে চলছে উন্নয়নকাজ। এর ফলে দুর্ভোগ পোহাতে হচ্ছে নগরবাসীকে। বনানী থেকে তোলা। প্রবা ফটো

রাজধানীর বিভিন্ন সড়কে দীর্ঘদিন ধরে চলছে উন্নয়নকাজ। এর ফলে দুর্ভোগ পোহাতে হচ্ছে নগরবাসীকে। বনানী থেকে তোলা। প্রবা ফটো

ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের রাস্তা খোঁড়াখুঁড়ি বরাবরের চিত্র হয়ে দাঁড়িয়েছে। বিভিন্ন সংস্থার কার্যক্রমে সমন্বয়হীনতায় বছরজুড়েই রাজপথ থেকে অলিগলিতে পড়ছে গাঁইতি-শাবলের কোপ। কখনও পয়ঃনিষ্কাশনের পাইপ বসানোর জন্য, কখনওবা বিদ্যুতের লাইন বসানোর জন্য কাটা হচ্ছে সড়ক। আর উন্নয়নের নামে এসব খোঁড়াখুঁড়ি নগরবাসীর বড় ভোগান্তির কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

সংস্থাগুলোর পারস্পরিক সমন্বয়হীনতার বলি হচ্ছে নগরজীবন। দেখা যাচ্ছে, কোনো একটি সংস্থার খোঁড়াখুঁড়ি শেষে সংস্কার করে সড়কটি সুন্দরভাবে পিচ ঢালাই করার পরই আরেক প্রতিষ্ঠান হাজির হচ্ছে। তারা নতুন করে সংস্কার সড়কটি পুনরায় কাটতে শুরু করেছে। আবার নির্ধারিত সময়ে তারা কাজ শেষ করছে না। জননিরাপত্তায় যথাযথ ব্যবস্থাও নেওয়া হচ্ছে না। কাটাকুটিতে ক্ষতবিক্ষত অনেক সড়কের চিত্র দেখে আপাতভাবে বুঝে ওঠা কঠিন যে এটি সড়ক, নাকি ভরাট হয়ে যাওয়া খাল।

ফলে বছরজুড়েই নগরীর সড়কগুলোতে লেগে থাকছে যানজট। নষ্ট হচ্ছে কর্মঘণ্টা। ঘটছে দুর্ঘটনা। কাটাছেঁড়া ও মেরামতের ধুলাবালি দূষণের মাত্রা বাড়াচ্ছে ঢাকার বাতাসে। আর নগরবাসীকে বাধ্য হয়েই এসব মেনে নিয়ে পথ চলতে হচ্ছে। সড়কে খোঁড়াখুঁড়ি নিয়ে এই ভোগান্তির অবসান চান তারা।

রাজধানীর মুগদা বিশ্বরোড থেকে মাণ্ডা ব্রিজ পর্যন্ত আধ কিলোমিটার সড়ক খুঁড়ে ড্রেনেজ ব্যবস্থার সংস্কার কাজ করা হচ্ছে তিন মাসের বেশি সময় ধরে। সড়কে উন্নয়ন কাজ চলমান থাকায় ভোগান্তিতে পড়ছেন স্থানীয় বাসিন্দারা। এই পথে চলাচল করতে গিয়ে ঘটছে ছোট-বড় দুর্ঘটনাও।

দেখা গেছে, খোঁড়া সড়কের পাশেই রাখা হয়েছে মাটি, পাইপ, মাটি খোঁড়ার এক্সকাভেটরসহ ছোট-বড় নির্মাণসামগ্রী। কোনো ধরনের যানবাহন চলার সুযোগ নেই। এতে স্থানীয় বাসিন্দাদের দীর্ঘ পথ হেঁটে পাড়ি দিয়ে রিকশা, সিএনজিচালিত অটোরিকশা বা লেগুনায় চড়তে হচ্ছে। 

উন্নয়নের নামে দীর্ঘ সময় ধরে এই খোঁড়াখুঁড়ি এবং কাজের ধীরগতি নিয়ে ক্ষুব্ধ স্থানীয় বাসিন্দারা। তাদের একজন ওবায়দুল্লাহ ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, ‘কয়েক মাস ধরে মাণ্ডা-মুগদা সড়কটি কেটে পাইপ বসানো হচ্ছে। এ কারণে আমাদের চলাফেরা করতে ভোগান্তি পোহাতে হচ্ছে। সড়ক কাটার সময় ধুলাবালি এসে বাড়িঘর ভরে যায়। কোনো যানবাহন চলাচলেরও সুযোগ নেই। বাচ্চাদের স্কুলে নিয়ে যেতেও ভীষণ কষ্ট হয়। সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলো যাতে দ্রুত কাজ শেষ করে সেদিকে সরকারের নজর দেওয়া উচিত।’ 

মাণ্ডা-মুগদা সড়কের মতো খোঁড়াখুঁড়ির চিত্র রাজধানীর অনেক স্থানেই। মালিবাগ থেকে মগবাজার পর্যন্ত সড়কটি সার্বক্ষণিক ব্যস্ত থাকে। সাম্প্রতিক সময়ে মৌচাক থেকে মগবাজার যাওয়ার পথে সড়কের বাম পাশে খোঁড়াখুঁড়ি শুরু হয়েছে। ফলে সড়কের এই অংশে যানবাহন চলাচল করতে পারছে না। স্যুয়ারেজ লাইন বসানোর জন্য চলমান এই খোঁড়াখুঁড়ির কারণে পুরো এলাকা যানজটে স্থবির হয়ে থাকছে। আবার রাস্তা খুঁড়ে গভীর গর্ত করে পথচারীদের নিরাপত্তার বিষয়টি বিবেচনায় নিয়ে কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি।

পুরান ঢাকার দয়াগঞ্জের বাসিন্দা হাকিম আনোয়ার হেসেন। দয়াগঞ্জ সিটি করপোরেশন মার্কেট থেকে সায়েদাবাদ জনপথ মোড় বাস স্টপ পর্যন্ত সড়ক খোঁড়াখুঁড়ি নিয়ে বিরক্ত তিনি। বললেন, ‘একই সড়ক কয়েক দিন পরপর বিভিন্ন সংস্থা কাটে। এতে চলাফেরা করতে সমস্যা হয় আমাদের। সরকারের কাজে কোনো সমন্বয় নেই।’

জানা গেছে, দয়াগঞ্জ সিটি করপোরেশন মার্কেট থেকে জনপথ মোড় বাস স্টপ পর্যন্ত ভায়া ঢাকা-সিলেট হাইওয়ে সড়কে এইচডিডি পদ্ধতিতে অপটিক্যাল ফাইবার ক্যাবল স্থাপনের জন্য সম্প্রতি এই সড়ক কাটে বাহন লিমিটেড নামে একটি সংস্থা। 

একই সড়ক কয়েক দফা খোঁড়াখুঁড়ি নিয়ে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের এক প্রকৌশলী নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, ‘বিশ্বের বিভিন্ন দেশে আমাদের মতো এত ঘন ঘন সড়ক খোঁড়াখুঁড়ি করা হয় না। সেসব দেশে শহরাঞ্চলে মাটির নিচে ইউটিলিটি ডাক্ট রয়েছে। ইউটিলিটি ডাক্ট হলে সড়ক খুঁড়তে হবে না। এতে বায়ুদূষণও কিছুটা কম হবে। কিন্তু আমাদের এখানে ইউটিলিটি ডাক্ট নেই। রাজনৈতিক বিবেচনায় ইউটিলিটি ডাক্ট করা হচ্ছে না। কেননা উন্নয়নের নামে সড়ক খোঁড়াখুঁড়ির কাজগুলো যারা করেন তারা বিভিন্ন রাজনৈতিক সংগঠনের সঙ্গে জড়িত। এখানে কমিশন বাণিজ্যের একটি ব্যাপারও আছে।’

জানা গেছে, ড্রেনেজ ব্যবস্থার সংস্কার ও স্যুয়ারেজ লাইন মেরামতসহ বিভিন্ন কাজের জন্য আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে গত বছরের মার্চে ৪০টি সংস্থাকে সড়ক খননের অনুমতি দেয় ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন (ডিএসসিসি)। বিভিন্ন কারণে ১৮টি সড়ক খোঁড়া হয়নি। তবে ২২টি সড়কে কাটাকাটি করা হয়। তার মধ্যে পাঁচটি সড়কের কাজ সম্পন্ন হয়েছে। বাকি ১৭টি সড়ক এখনও সম্পূর্ণ মেরামত হয়নি। মেরামতের জন্য কয়েকটি সড়ক পুনরায় খোঁড়া হচ্ছে। 

এদিকে ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের (ডিএনসিসি) আওতাধীন দক্ষিণখান, উত্তরখান, মিরপুর, মোহাম্মদপুর এলাকায় ড্রেনেজ ব্যবস্থার সংস্কার এবং স্যুয়ারেজ লাইন ও সড়ক মেরামতের কাজ চলছে।

ঢাকার দুই সিটি করপোরেশনের বাইরেও মেট্রারেল প্রকল্পের জন্য খোঁড়া হচ্ছে নগরের প্রধান প্রধান সড়ক। এই প্রকল্পের আওতায় এমআরটি লাইন-১ এর রুটের জন্য সড়কের নিচ থেকে ইউটিলিটি সার্ভিস শনাক্ত ও অপসারণের কাজ চলছে। ফলে নতুন বাজার, বাড্ডা, নর্দা, বসুন্ধরা, কুড়িল, জোয়ারসাহারা, খিলক্ষেত হয়ে বিমানবন্দর পর্যন্ত সড়কের দুপাশে খোঁড়া হয়েছে। এতে করে প্রতিনিয়ত এই সড়কে যানজটে পড়তে হচ্ছে যাত্রীদের।

রাজধানীর বাড্ডা থেকে বিমানবন্দর যাবেন আব্দুল্লাহ মারুফ। কিছুদূর এসেই যানজটে পড়েছেন বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের এই চাকুরে। বাসে দীর্ঘ সময় বসে থেকে বিরক্ত হয়ে ওঠেন তিনি। 

প্রতিবেদকের সঙ্গে কথা হলে মারুফ বলেন, ‘৬ বছর পর বড় ভাই মালয়েশিয়া থেকে দেশে আসছেন। তাকে রিসিভ করতে এয়ারপোর্টে যাব। কিন্তু এভাবে যানজটে বসে থাকলে সময়মতো যেতে পারব না। আমার প্রশ্ন, উন্নয়নের নামে দেশের মানুষের এই ভোগান্তি শেষ হবে কবে?’

সড়কে খোঁড়াখুঁড়ির বিষয়টি নিয়ে কথা হয় ঢাকা ম্যাস র‌্যাপিড ট্রানজিট ডেভেলপমেন্ট প্রজেক্ট (লাইন-১)-এর উপ-প্রকল্প পরিচালক (টিপি, সিএস, আইডি অ্যান্ড ইউটিলিটি) ফয়েজ আহম্মদের সঙ্গে। তিনি প্রতিদিনের বাংলাদেশকে বলেন, ‘বিমানবন্দর থেকে কমলাপুর পর্যন্ত ইউটিলিটি ভেরিফিকেশন চলছে। সেগুলো পরে রি-লোকেট করা হবে। প্যাকেজ কন্ট্রাক্টে প্রায়োরিটি অনুয়াযী আমরা কাজ এগিয়ে নিচ্ছি। একটি এলাকার কাজ শেষ করে অন্য এলাকায় কাজ ধরতে হবে বিষয়টি এমন নয়। জনভোগান্তির বিষয়টি আমাদের মাথায় রয়েছে।’ 

এ ছাড়া পাতাল ও উড়াল সমন্বয়ে এমআরটি লাইন-৫ নর্দান রুটের কাজও এরই মধ্যে শুরু হয়েছে। এজন্য গুলশান-২ (গোল চত্বর) মেট্রো স্টেশন এলাকা এড়িয়ে চলার পরামর্শ দিয়েছে ঢাকা ম্যাস ট্রানজিট কোম্পানি লিমিটেড (ডিএমটিসিএল)। গত ২৬ জানুয়ারি এই নির্দেশনা দেন নর্দান রুটের অতিরিক্ত প্রকল্প পরিচালক (সিভিল, আন্ডারগ্রাউন্ড) ড. মো. মশিউর রহমান। তিনি বলেন, ‘প্রজেক্টের খোঁড়াখুঁড়ির কাজের জন্য গুলশান-২ এলাকায় যানজট হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। এজন্য আমরা এই পথে চলাচলকারী যাত্রীদের অনুরোধ জানিয়েছি, যেন তারা গুলশান-২ এলাকা এড়িয়ে চলেন। আগামী তিন মাসের মতো এই এলাকায় কাজ চলবে। ফলে এই সময়টুকু এই জায়গা এড়িয়ে চলার অনুরোধ করা হয়েছে।’

মেট্রোরেল প্রকল্পের কাজের জন্য নগরবাসী যাতে ভোগান্তিতে না পড়েন সেজন্য বিভিন্ন মাধ্যমে আগাম তথ্য জানিয়ে দেওয়া হবে বলে জানান ঢাকা ম্যাস র‌্যাপিড ট্রানজিট ডেভেলপমেন্ট প্রজেক্ট (লাইন-৬) উপ-প্রকল্প পরিচালক (গণসংযোগ) মো. আহসান উল্লাহ শরিফী।

প্রশাসক না থাকায় ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনে নতুন করে কোনো সড়ক খোঁড়াখুঁড়ির সিদ্ধান্ত হয়নি বলে জানিয়েছেন সংস্থাটির পরিকল্পনা ও নকশা বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী মফিজুর রহমান খান। তিনি বলেন, যেগুলো খোঁড়া হয়েছে সেগুলো দ্রুত সংস্কার করার নির্দেশ রয়েছে। 

সড়কে খোঁড়াখুঁড়ি প্রসঙ্গে ইনস্টিটিউট ফর প্ল্যানিং অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট (আইপিডি) পরিচালক নগর পরিকল্পনাবিদ অধ্যাপক ড. আদিল মুহাম্মদ খান প্রতিদিনের বাংলাদেশকে বলেন, ‘অন্তহীন সড়ক খোঁড়াখঁড়ি চলছে। ফলে পরিবেশেরও মারাত্মক ক্ষতি হচ্ছে। খোঁড়াখুঁড়ির ধুলাবালি ঢাকার বাতাসের মান আরও নষ্ট করছে। সড়ক খোঁড়াখুঁড়ি নিয়ে আন্তঃসংস্থাগুলোর মধ্যে সমন্বয় নেই। যে যার মতো করে খুঁড়ে চলেছে। সমন্বিতভাবে সড়ক খোঁড়া হলে ব্যয় ও ভোগান্তি উভয়ই কম হবে।

শেয়ার করুন-

মন্তব্য করুন

Protidiner Bangladesh

সম্পাদক : মারুফ কামাল খান

প্রকাশক : কাউসার আহমেদ অপু

রংধনু কর্পোরেট, ক- ২৭১ (১০ম তলা) ব্লক-সি, প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড) ঢাকা -১২২৯

যোগাযোগ

প্রধান কার্যালয়: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৬৯৬ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (প্রিন্ট): +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮১০, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০ | ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (অনলাইন): +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০, +৮৮০১৭৯৯৪৪৯৫৫৯ । ই-মেইল: [email protected]

সার্কুলেশন: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮০৭, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৩৩২ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন মূল্য তালিকা