× ই-পেপার প্রচ্ছদ সর্বশেষ বাংলাদেশ রাজনীতি দেশজুড়ে বিশ্বজুড়ে বাণিজ্য খেলা বিনোদন মতামত চাকরি শিক্ষা আজকের কার্টুন ফিচার সকল বিভাগ ছবি ভিডিও লেখক আর্কাইভ কনভার্টার

মুক্তিযুদ্ধ মন্ত্রণালয়ের প্রায় সব প্রকল্পে ফুলস্টপ

সেলিম আহমেদ

প্রকাশ : ১৮ অক্টোবর ২০২৪ ১০:২০ এএম

ফাইল ফটো

ফাইল ফটো

মুক্তিযুদ্ধ মন্ত্রণালয় পরিকল্পিত সবগুলো উন্নয়ন প্রকল্পে ফুলস্টপ দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে অন্তর্বর্তীকালীন বর্তমান সরকার। অর্থাৎ যে প্রকল্পের যতটুকু বাস্তবায়ন ঘটেছে, সেখানেই সেটির ইতি ঘটবে। নতুন করে এসব প্রকল্পের কোনো কাজ হবে না। কেবলমাত্র কাজ শেষের পথে থাকা দুটি প্রকল্পের নির্মাণকাজ পুরোপুরি শেষ করা হবে। এ ছাড়া বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচিতে (এডিপি) অনুমোদিত কয়েক হাজার কোটি টাকার ৬টি প্রকল্পও আলোর মুখ দেখছে না সহসাই। মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক উপদেষ্টা ফারুক ই আজম বীরপ্রতীকের সাম্প্রতিক এক বৈঠকে এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা। নতুন করে আর কোনো উন্নয়ন প্রকল্প হাতে না নেওয়ার সিদ্ধান্তও হয়েছে এ বৈঠকে। 

মন্ত্রণালয় সূত্র জানায়, ২০২৪-২৫ অর্থবছরে এডিপির অধীনে ৯টি প্রকল্পের বরাদ্দ ছিল ১ হাজার ৪২৩ কোটি ৬৪ লাখ টাকা। এর মধ্যে গত আগস্ট পর্যন্ত ব্যয় হয়েছে ৫ কোটি ৩৩ লাখ টাকা। যা মোট ব্যয়ের শতকরা শূন্য দশমিক ৩৭ শতাংশ। প্রকল্প ব্যয় অনুযায়ী আগস্ট পর্যন্ত ক্রমপুঞ্জিত ব্যয়ের হার ৫১.৯১ শতাংশ টাকা। 

কাজ শেষ হবে যে দুটি প্রকল্পের

ঐতিহাসিক সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে ১৯৭১ সালের পাকিস্তানি সামরিক বাহিনীর পরাজয় ও আত্মসমপর্ণের দলিল স্বাক্ষরের উজ্জ্বলতম স্মৃতিকে সংরক্ষণ, বাংলাদেশের স্বাধীনতা অর্জনের বিভিন্ন সময়ের আন্দোলন ও ঘটনাপ্রবাহের পাশাপাশি মুক্তিযুদ্ধের প্রকৃত ইতিহাস তরুণ প্রজন্মের কাছে তুলে ধরতে ‘সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে স্বাধীনতা স্তম্ভ নির্মাণ (৩য় পর্যায়)’ নামে একটি প্রকল্প হাতে নেয় মন্ত্রণালয়। ২০১৮ সালে গৃহীত এই প্রকল্পের মেয়াদ বেড়েছে তিনবার। বেড়েছে ব্যয়ও। ৩৯৭ কোটি ৩৪ লাখ টাকার এই প্রকল্পের মেয়াদ শেষ হওয়ার কথা আগামী বছরের জুনে। এই প্রকল্পের ভৌত অগ্রগতি ৮৭ শতাংশ। এর মধ্যে ভূগর্ভস্থ কার পার্কিংয়ের কাজ ৯৮ শতাংশ, মসজিদের কাজ ৯৮ শতাংশ, ৭টি ফুড কিউস্কের কাজ ৯৬ শতাংশ, ওয়াকওয়ের কাজ ৮২ শতাংশ, ওয়াটার ফাউন্টেইনের কাজ ৯৬ শতাংশ শেষ হয়েছে। প্রায় শেষ হওয়ার পথে থাকা এ দুই প্রকল্পের কাজ সরকার পুরোপুরি শেষ করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। 

এদিকে শাহবাগ থানা স্থানান্তরিত না হওয়ার কারণে প্রকল্পটির কাজ শেষ করা কঠিন হয়ে উঠেছে। সর্বশেষ গত ৩ জুন শাহবাগ থানা সোহরাওয়ার্দী উদ্যান এলাকা থেকে সরিয়ে হোটেল ইন্টারকন্টিনেন্টালের পাশে রমনা মৌজার সাকুরা রেস্তোরাঁ এলাকায় নেওয়ার সিদ্ধান্ত নেয় আওয়ামী লীগ সরকার। সিদ্ধান্তটি এখনও বাস্তবায়ন হয়নি। 

মুক্তিযুদ্ধে ভারতীয় মিত্রবাহিনীর আত্মত্যাগ ও এর সদস্যদের জীবন উৎসর্গের বিষয়টি স্মরণীয় করে রাখতে ব্রাহ্মণবাড়িয়ার আশুগঞ্জে ঢাকা-সিলেট মহাসড়কের পাশে একটি স্মৃতিস্তম্ভ নির্মাণের উদ্যোগ নেয় সরকার। ২০১৭ সালে গৃহীত ৭১ কোটি ৬৯ লাখ ৩৫ হাজার টাকা ব্যয়ের এই প্রকল্পটির কাজ ইতোমধ্যেই ৯০ শতাংশ শেষ হয়েছে। এখন শুধুমাত্র টাইলস ও ফিটিংসের কাজ চলছে। তাই এই প্রকল্পটি শেষ করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার।

ফুলস্টপ যে সাত প্রকল্পে

অসচ্ছল বীর মুক্তিযোদ্ধাদের জন্য ২০২১ সালের জুলাইয়ে বীরনিবাস নামে ৩০ হাজার ঘর তৈরির প্রকল্প হাতে নেয় মন্ত্রণালয়। ৬ হাজার ৯৬ কোটি ৫৩ লাখ টাকার এই প্রকল্প চলতি বছরের ডিসেম্বরে শেষ হওয়ার কথা ছিল। চলতি অর্থবছরের আগস্ট পর্যন্ত এই প্রকল্পের আওতায় ১৩ হাজার ১২৯টি বীরনিবাসের নির্মাণ কাজ শেষ হয়েছে আর নির্মাণ কাজ চলমান রয়েছে ৯ হাজার ১০২টি। এই প্রকল্পের আওতায় নির্মাণাধীন কাজ ছাড়া নতুন করে কোনো ঘর নির্মাণ না করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। বাকি ৭ হাজার ৭৬৯টি বীরনিবাসের মধ্যে ৭২২টির টেন্ডার প্রক্রিয়া শেষ হয়েছে, ১ হাজার ৩১৭টি টেন্ডারের অপেক্ষায় এবং ৫ হাজার ৭৩০টি প্রশাসনিক অনুমোদন পাওয়ার অপেক্ষায় ছিল। এ কাজগুলো আপাতত হচ্ছে না। 

সারা দেশের ২৩১ উপজেলার মুক্তিযুদ্ধের ঐতিহাসিক ৩৬২টি স্থান সংরক্ষণ ও স্মৃতি জাদুঘর নির্মাণের জন্য ২০১৭ সালে ২৫২ কোটি ৬৪ লাখ টাকার একটি প্রকল্প হাতে নেওয়া হয়। দুই দফা মেয়াদ বাড়ানো এই প্রকল্পের মেয়াদ শেষ হবে আগামী বছরের ডিসেম্বরে। এই প্রকল্পের আওতায় এখন পর্যন্ত ২৬৯টি স্মৃতিসৌধ, ৭২টি স্মৃতি জাদুঘরসহ ৩৪১টি স্মৃতিস্তম্ভ ও জাদুঘরের নির্মাণকাজ শেষ হয়েছে। যেসব স্মৃতিস্তম্ভের কাজ হয়নি সেগুলো বন্ধ করেছে সরকার। শহীদ ‍মুক্তিযোদ্ধা এবং অন্য মুক্তিযোদ্ধাদের সমাধিস্থল সংরক্ষণ ও নির্মাণ কাজও আপাতত বন্ধ রাখছে সরকার। ২০ হাজার মুক্তিযোদ্ধার সমাধিস্থল সংরক্ষণ করার জন্য ২০১৮ সালে ৪৪৫ কোটি ২৩ লাখ টাকার একটি প্রকল্প নেয় সরকার। এই প্রকল্পের আওতায় গত আগস্ট পর্যন্ত ৪ হাজার ১৯টি সমাধিস্থল নির্মাণ কাজ সম্পন্ন ও ৫০৯টির কাজ চলমান রয়েছে। চলমান কাজ ছাড়া বাকি কোনো সমাধিস্থল আর নির্মাণ করা হচ্ছে না। 

দেশের ৪০টি জেলার ১১০টি বধ্যভূমি সংরক্ষণ ও স্মৃতিস্তম্ভ নির্মাণ করার জন্য ২০২১ সালে ৪৪২ কোটি ৪০ লাখ টাকার একটি প্রকল্পের কাজ শুরু হয়। ২০২৫ সালে এটি শেষ হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু প্রায় চার বছরে মাত্র ৪২টি স্থাপনার কাজ শেষ হয়েছে। চলমান রয়েছে ২টির। কিন্তু নতুন করে কোনো বধ্যভূমি সংরক্ষণ করতে গেলে তা স্থানীয়ভাবে করা হবে বলে জানিয়েছে মন্ত্রণালয়। 

মুক্তিযুদ্ধের গৌরবগাথাসংশ্লিষ্ট গুরুত্বপূর্ণ তথ্যের ডকুমেন্টারি নির্মাণ ও জাতীয়ভাবে আর্কাইভ স্থাপনের জন্য ২০২২ সালে ৪৯ কোটি ৫৭ লাখ টাকার একটি প্রকল্প হাতে নেওয়া হয়। এর আওতায় ৮০ হাজার মুক্তিযোদ্ধার সাক্ষাৎকারভিত্তিক তথ্যচিত্র নির্মাণ ও ইউটিউবে কনটেন্ট আপলোড এবং ১৬টি ডকুমেন্টারি নির্মাণ এবং জাতীয়ভাবে মুক্তিযুদ্ধ ই-আর্কাইভ স্থাপন করার কথা। চলতি বছরের ডিসেম্বরে এই প্রকল্পের কাজ শেষ হওয়ার কথা থাকলেও অগ্রগতি মাত্র ১১ দশমিক ১৩ শতাংশ। আগস্ট পর্যন্ত ২৪ হাজার ৫৩৫ জন মুক্তিযোদ্ধার সাক্ষাৎকার নেওয়া হয়েছে। চারটি ডকুমেন্টারির নির্মাণ কাজ চলছে। এ প্রকল্পেও নতুন কোনো কাজ হবে না। 

৩৫ কোটি ৫৫ লাখ টাকা ব্যয়ে ৪ জন খেতাবপ্রাপ্ত বীর মুক্তিযোদ্ধার সমাধিস্থল উন্নয়ন ও জাদুঘর নির্মাণ, ২টি মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘর অবকাঠামো উন্নয়ন, ৩টি ঐতিহাসিক স্থান ও ৩টি গুরুত্বপূর্ণ স্থানে মুক্তিযুদ্ধ স্মৃতিস্তম্ভ ও জাদুঘর নির্মাণের জন্য গত বছরের জানুয়ারিতে একটি প্রকল্প নেওয়া হয়। এখনও এ প্রকল্পের নকশা প্রণয়ন কাজ শেষ হয়নি। এ প্রকল্পও আর আলোর মুখ দেখছে না। 

এ ছাড়া ২০২২ সালের জানুয়ারিতে বঙ্গবন্ধুর আদর্শ ও মুক্তিযুদ্ধের চেতনা বাস্তবায়নের জন্য সাত কোটি ৩১ লাখ টাকার একটি প্রকল্প নেওয়া হয়। এই প্রকল্পের অগ্রগতি ৫৪ শতাংশ। তবে নতুন করে কোনো কাজ হবে না এ প্রকল্পের। 

আলোর মুখ দেখছে না আরও ৬ প্রকল্প

এডিপিতে আরও ৬টি প্রকল্প অনুমোদন হয়েছে, যেগুলো আপাতত আর আলোর মুখ দেখছে না। এর মধ্যে রয়েছে ১০ কোটি ১ লাখ টাকা ব্যয়ে চট্টগ্রামে বিভাগীয় স্মৃতিসৌধ ও মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘর নির্মাণ, ৫১৭ কোটি ২ লাখ টাকা ব্যয়ে মুজিবনগর মুক্তিযুদ্ধ স্মৃতিকেন্দ্র স্থাপন, ৮০ কোটি ১৪ লাখ টাকা ব্যয়ে নারায়ণগঞ্জে নৌ-জাদুঘর স্থাপন, ৪৯০ কোটি ৮৩ লাখ টাকা ব্যয়ে জেলা-উপজেলায় মুক্তিযোদ্ধা কমপ্লেক্স ভবনে ক্যাপসুল লিফট স্থাপন, ১৫০ কোটি টাকা ব্যয়ে দেশের বিভিন্ন স্থানে মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস সম্পর্কিত অবকাঠামো নির্মাণ এবং ১ হাজার ৬২১ কোটি ৮৭ লাখ টাকা ব্যয়ে মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক প্যানোরমা নির্মাণ। 

যা বলছেন সংশ্লিষ্টরা

এ প্রসঙ্গে ব্রিগেড ’৭১-এর আহ্বায়ক বীর মুক্তিযোদ্ধা রাজ্জাকুল হায়দার চৌধুরী বলেন, ‘এসব প্রকল্পের কাজ বন্ধ রাখলে, তা হবে খুবই দুঃখজনক। কারণ একাত্তরে মুক্তিযোদ্ধাদের প্রাণের বিনিময়েই দেশ স্বাধীন হয়েছিল। আর মুক্তিযুদ্ধে যারা অংশ নিয়েছিলেন, তাদের সিংহভাগই সাধারণ পরিবারের। তাই তাদের বা তাদের পরিবারের জীবন মান-উন্নয়নে সরকারের সহযোগিতা অব্যাহত রাখতে হবে।’

এ বিষয়ে মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের সচিব ইসরাত চৌধুরী বলেন, ‘কিছু প্রকল্পের কাজ চলমান থাকবে। আবার কিছু প্রকল্পের কাজ বন্ধ রাখার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। যে কাজগুলো বন্ধ রাখার সিদ্ধান্ত হয়েছে সেগুলো নিয়ে আরও যাচাই-বাছাই করা হবে। প্রয়োজন মনে হলে সেই কাজগুলো আবার শুরু হবে।’ 

শেয়ার করুন-

মন্তব্য করুন

Protidiner Bangladesh

সম্পাদক : মারুফ কামাল খান

প্রকাশক : কাউসার আহমেদ অপু

রংধনু কর্পোরেট, ক- ২৭১ (১০ম তলা) ব্লক-সি, প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড) ঢাকা -১২২৯

যোগাযোগ

প্রধান কার্যালয়: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৬৯৬ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (প্রিন্ট): +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮১০, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০ | ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (অনলাইন): +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০, +৮৮০১৭৯৯৪৪৯৫৫৯ । ই-মেইল: [email protected]

সার্কুলেশন: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮০৭, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৩৩২ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন মূল্য তালিকা