ডুমুরিয়া উপজেলার নারী উদ্যোক্তাদের অনুপ্রেরণার নাম নন্দিতা ঘোষ
ভোরের আলো ভেদ করে গরুর ডাক আর দুধ দোহনের ছন্দে জেগে ওঠে ডুমুরিয়ার গ্রামগুলো। একসময় যে উঠানগুলো ছিল নিস্তব্ধ, আজ সেখানে ব্যস্ততা গাভি, খামার আর স্বপ্ন নিয়ে। এই বদলে যাওয়া ছবির কেন্দ্রে রয়েছেন একদল সাহসী নারী, যাদের হাত ধরে গ্রামীণ অর্থনীতিতে যুক্ত হয়েছে নতুন সম্ভাবনার দিগন্ত।
তাদেরই একজন নন্দিতা ঘোষ। ডুমুরিয়া উপজেলার এই নারী উদ্যোক্তার গল্প এখন অনুপ্রেরণার নাম। ২০০১ সালে মাত্র ৪৯ হাজার টাকা দিয়ে একটি বকনা বাছুর কিনে শুরু করেছিলেন তার পথচলা। ছিল না বড় পুঁজি, ছিল না কোনো অভিজ্ঞতা ছিল শুধু অদম্য ইচ্ছাশক্তি আর কঠোর পরিশ্রমের মানসিকতা।
সেই ছোট্ট শুরু আজ পরিণত হয়েছে ‘নন্দিতা ডেইরি ফার্ম’-এ। বর্তমানে তার খামারে ছোট-বড় মিলিয়ে রয়েছে ২০টি গরু, যার মধ্যে ১০টি গাভি নিয়মিত দুধ দিচ্ছে। প্রতিদিন প্রায় দেড়শ লিটার দুধ উৎপাদন হয়, যার বাজারমূল্য প্রায় ৯ হাজার টাকা। তবে এই সাফল্যের পেছনে রয়েছে প্রতিদিনের প্রায় ৫ হাজার টাকার খরচ, যা জোগাতে হয় নানা চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করে।
নন্দিতা জানান, শুরুটা সহজ ছিল না। কিন্তু ধৈর্য ধরেছি, হাল ছাড়িনি। এখন খামারটাই আমার শক্তি। তার এই পথচলায় পাশে আছেন স্বামী তপন ঘোষ, যিনি শুরু থেকেই তাকে সহায়তা করে আসছেন।
তবে খামারের এই সাফল্যের পথ সব সময় মসৃণ নয়। তপন ঘোষ বলেন, গবাদিপশুর খাদ্যের দাম অনেক বেড়ে গেছে। এক বস্তা ভুসি এখন ১ হাজার ৮০০ টাকা, কুঁড়া ৭০০ টাকা আর কাউন-খড়ের দাম ৮ হাজার টাকা। প্রাকৃতিক দুর্যোগও সমস্যা বাড়াচ্ছে। তবুও থেমে নেই তাদের স্বপ্নের খামার।
ডুমুরিয়া উপজেলা প্রাণিসম্পদ অফিস সূত্রে জানা যায়, উপজেলার ১৪টি ইউনিয়নে পারিবারিক ও বাণিজ্যিকভাবে ৫ শতাধিক খামার গড়ে উঠেছে। এর মধ্যে ১৮টি খামার বাণিজ্যিকভাবে নিবন্ধিত। এসব খামার শুধু দুধ ও মাংস উৎপাদন বাড়াচ্ছে না, বরং গ্রামীণ এলাকায় কর্মসংস্থান সৃষ্টি করে অর্থনীতিতে নতুন গতি আনছে।
নন্দিতা ঘোষের মতো আরও অনেক নারী এই খাতে সফলতার স্বাক্ষর রাখছেন। মাগুরাঘোনা গ্রামের বন্দনা ঘোষ ২০০৬ সালে ছোট পরিসরে খামার শুরু করে এখন ১৫টি গাভির মালিক। একইভাবে টোলনা গ্রামের নুসরাত সুলতানা রুনা ৬ বিঘা জমির ওপর গড়ে তুলেছেন ‘মেসার্স নুসরাত অ্যান্ড অ্যাগ্রো ফার্ম’- যেখানে গরু, ছাগল, ভেড়া ও মুরগি মিলিয়ে পরিচালিত হচ্ছে একটি বহুমুখী খামার। তার খামারে ৫৬টি গাভি পালনের ব্যবস্থা রয়েছে।
এ ছাড়া চম্পা ঘোষ, সুকেশ সরকার, দেবদাস সরকারসহ অনেকেই গাভি পালনে ঝুঁকছেন, যা ডুমুরিয়ার গ্রামীণ অর্থনীতিকে আরও শক্তিশালী করছে। এই অগ্রযাত্রায় সহায়ক ভূমিকা রাখছে সরকারি উদ্যোগও। উপজেলা সমবায় অফিসার সরদার জাহিদুর রহমান জানান, উন্নত জাতের গাভি পালনের মাধ্যমে ‘সুবিধাবঞ্চিত নারীদের জীবনযাত্রার মান উন্নয়ন’ প্রকল্পের আওতায় নারীদের ঋণ সুবিধা দেওয়া হচ্ছে। গাভি কেনার এক বছর পর থেকে ঋণ পরিশোধের সুযোগ থাকায় অনেক নারী সহজেই এই খাতে যুক্ত হতে পারছেন।