সাক্ষাৎকার: ফয়সাল রহমান মোহাম্মদ এমদাদ উল্লাহ
প্রবা প্রতিবেদক
প্রকাশ : ১৩ ঘণ্টা আগে
প্রাইম ব্যাংক পিএলসির প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা ফয়সাল রহমান মোহাম্মদ এমদাদ উল্লাহ
বাংলাদেশের টেকসই উন্নয়ন, অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা ও অন্তর্ভুক্তিমূলক প্রবৃদ্ধির অন্যতম প্রধান চালিকাশক্তি হলো এমএসএমই খাত। প্রতিদিনের বাংলাদেশকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে এমএসএমইর বিভিন্ন দিক নিয়ে কথা বলেছেন প্রাইম ব্যাংক পিএলসির প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা ফয়সাল রহমান মোহাম্মদ এমদাদ উল্লাহ
প্রশ্ন : বাংলাদেশের অর্থনীতি, কর্মসংস্থান ও উদ্যোক্তা উন্নয়নে এমএসএমই খাতের গুরুত্ব সম্পর্কে আপনার মূল্যায়ন জানতে চাই।
উত্তর : বাংলাদেশের অর্থনীতির অন্যতম চালিকাশক্তি হলো এমএসএমই (ক্ষুদ্র, ছোট ও মাঝারি উদ্যোগ) খাত। স্বল্প মূলধন ও সহজ প্রযুক্তি-নির্ভর হওয়ায় এই খাত নতুন উদ্যোক্তা তৈরির পাশাপাশি ব্যাপক কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি করছে। বিশেষ করে নারী উদ্যোক্তা উন্নয়ন, দারিদ্র্য হ্রাস এবং আর্থিক অন্তর্ভুক্তিতে এর ভূমিকা উল্লেখযোগ্য। স্থানীয় সম্পদের ব্যবহার বৃদ্ধি, দেশীয় উৎপাদন সম্প্রসারণ এবং রপ্তানি আয় বৃদ্ধির মাধ্যমেও এমএসএমই খাত অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখছে। পাশাপাশি জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে ব্যবসা-বাণিজ্যের প্রসার ঘটিয়ে আঞ্চলিক অর্থনৈতিক ভারসাম্য রক্ষায়ও সহায়তা করছে। ফলে টেকসই ও অন্তর্ভুক্তিমূলক অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি অর্জনে এমএসএমই খাতের গুরুত্ব দিন দিন আরও বাড়ছে। সার্বিকভাবে বলা যায়, বাংলাদেশের টেকসই উন্নয়ন, অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা ও অন্তর্ভুক্তিমূলক প্রবৃদ্ধির অন্যতম প্রধান চালিকাশক্তি হলো এমএসএমই খাত।
প্রশ্ন : আপনার ব্যাংক/আর্থিক প্রতিষ্ঠান এসএমই খাতের জন্য কী করছে?
উত্তর : প্রাইম ব্যাংক পিএলসি দেশের এসএমই খাতের উন্নয়ন ও সম্প্রসারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে। ব্যাংকটি কুটির, মাইক্রো, ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তাদের জন্য সহজ, দ্রুত ও গ্রাহকবান্ধব ঋণসুবিধা নিশ্চিত করতে নিরবচ্ছিন্নভাবে কাজ করছে। বিশেষ করে জামানতবিহীন ঋণপণ্য চালুর মাধ্যমে নতুন উদ্যোক্তা ও প্রান্তিক ব্যবসায়ীদের অর্থায়নের সুযোগ বাড়ানো হয়েছে। এসএমই খাতে নারী উদ্যোক্তাদের অংশগ্রহণ বাড়াতে প্রাইম ব্যাংক বিশেষায়িত নারী উদ্যোক্তা ঋণ কর্মসূচি ও প্রশিক্ষণ সহায়তা প্রদান করছে। পাশাপাশি ব্যাংকটি ডিজিটাল ব্যাংকিং ও প্রযুক্তি-নির্ভর সেবা চালুর মাধ্যমে ঋণ প্রক্রিয়াকে আরও দ্রুত ও স্বচ্ছ করার উদ্যোগ নিয়েছে। এতে গ্রাহকরা সহজে তথ্য ও সেবা গ্রহণ করতে পারছে। প্রাইম ব্যাংক নিয়মিতভাবে এসএমই উদ্যোক্তাদের জন্য প্রশিক্ষণ, সচেতনতা কার্যক্রম ও আর্থিক সাক্ষরতা কর্মসূচি আয়োজন করছে, যা উদ্যোক্তা দক্ষতা বৃদ্ধিতে সহায়তা করছে। এ ছাড়া সাপ্লাই চেইন ফাইন্যান্স, ইনভয়েস ফাইন্যান্সিং এবং ওয়ার্কিং ক্যাপিটাল সহায়তার মাধ্যমে ব্যবসার নগদ প্রবাহ সচল রাখতে সহায়তা দেওয়া হচ্ছে। গ্রাম ও শহরাঞ্চলে শাখা ও এজেন্ট নেটওয়ার্ক সম্প্রসারণের মাধ্যমে ব্যাংকটি আর্থিক অন্তর্ভুক্তি বাড়াচ্ছে, যাতে প্রান্তিক উদ্যোক্তারা সহজে ব্যাংকিং সুবিধা পেতে পারে। একই সঙ্গে ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা ও ক্রেডিট মূল্যায়ন ব্যবস্থাকে আধুনিকায়নের মাধ্যমে এসএমই ঋণ প্রবাহ আরও কার্যকর করা হচ্ছে। সার্বিকভাবে, প্রাইম ব্যাংক এসএমই খাতের টেকসই উন্নয়ন, উদ্যোক্তা সৃষ্টি ও অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ত্বরান্বিত করতে বহুমুখী ও আধুনিক ব্যাংকিং সেবা প্রদান করে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখছে।
প্রশ্ন : বর্তমান অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জে এসএমই উদ্যোক্তাদের সহায়তায় ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর কী ভূমিকা রাখা উচিত?
উত্তর : বর্তমান অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জের সময়ে কটেজ, মাইক্রো, ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তাদের টিকিয়ে রাখতে ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর আরও সক্রিয় ও অন্তর্ভুক্তিমূলক ভূমিকা প্রয়োজন। ঋণপ্রাপ্তি সহজ ও ডিজিটাল করা, জামানতের পরিবর্তে ব্যবসার সক্ষমতার ভিত্তিতে অর্থায়ন এবং নমনীয় পরিশোধ সুবিধা নিশ্চিত করা জরুরি। পাশাপাশি নারী ও তরুণ উদ্যোক্তাদের জন্য বিশেষ সহায়তা, আর্থিক সাক্ষরতা বৃদ্ধি এবং আধুনিক অর্থায়ন পদ্ধতির সম্প্রসারণ এসএমই খাতকে আরও শক্তিশালী করবে। অর্থায়নের পাশাপাশি উদ্যোক্তাদের উন্নয়ন অংশীদার হিসেবে কাজ করেই ব্যাংকগুলো দেশের টেকসই অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিতে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখতে পারে।
প্রশ্ন : নারী উদ্যোক্তা ও তরুণ উদ্যোক্তাদের জন্য আপনার প্রতিষ্ঠানের বিশেষ কোনো অর্থায়ন বা সক্ষমতা উন্নয়ন কর্মসূচি রয়েছে কি?
উত্তর : প্রাইম ব্যাংক একটি সুপরিকল্পিত ও অন্তর্ভুক্তিমূলক সিএমএসএমই অর্থায়ন কৌশল গ্রহণ করেছে, যা বিশেষভাবে নারী উদ্যোক্তা ও তরুণ উদ্যোক্তাদের অর্থায়নের চাহিদা পূরণে কেন্দ্রিত। প্রাইম ব্যাংক বিশ্বাস করে এই দুটি খাত বাংলাদেশের অন্তর্ভুক্তিমূলক অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির অন্যতম প্রধান চালিকাশক্তি। প্রাইম ব্যাংকের নারী ও তরুণ উদ্যোক্তাদের জন্য বিশেষ অর্থায়ন কর্মসূচি রয়েছে। নারী উদ্যোক্তাদের জন্য সহজ শর্তে ও অগ্রাধিকারভিত্তিক ঋণ সুবিধা প্রদান করা হয়, যা ব্যবসা শুরু ও সম্প্রসারণে সহায়তা করে। পাশাপাশি তরুণ উদ্যোক্তা ও স্টার্টআপদের জন্য নমনীয় অর্থায়ন, পরামর্শ এবং সক্ষমতা উন্নয়নমূলক সহায়তা দেওয়া হয়। এসব উদ্যোগের মাধ্যমে অন্তর্ভুক্তিমূলক উদ্যোক্তা উন্নয়ন, কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং টেকসই অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিকে উৎসাহিত করা হচ্ছে।
প্রশ্ন : আধুনিক প্রযুক্তি ও ডিজিটাল ব্যাংকিং সেবা এসএমই খাতের অর্থায়ন ও ব্যবসা পরিচালনায় আরও কীভাবে কাজে লাগানো যায়?
উত্তর : আধুনিক প্রযুক্তি ও ডিজিটাল ব্যাংকিং সেবা এসএমই খাতের অর্থায়নকে আরও দ্রুত, সহজ ও স্বচ্ছ করতে পারে। ডিজিটাল প্লাটফর্মের মাধ্যমে ঋণ আবেদন ও অনুমোদন প্রক্রিয়া সহজ হওয়ায় উদ্যোক্তারা দ্রুত অর্থায়ন পেতে পারেন। পাশাপাশি মোবাইল ও অনলাইন ব্যাংকিং, ডিজিটাল পেমেন্ট, ডেটা অ্যানালিটিক্স এবং এআইভিত্তিক ক্রেডিট স্কোরিং ব্যবহারের মাধ্যমে আর্থিক সেবা আরও অন্তর্ভুক্তিমূলক ও কার্যকর করা সম্ভব। এ ছাড়া ই-কমার্স ও ডিজিটাল মার্কেটপ্লেসের সঙ্গে ব্যাংকিং সেবার সংযোগ উদ্যোক্তাদের নতুন বাজারে প্রবেশ ও ব্যবসা সম্প্রসারণে সহায়তা করবে।
প্রশ্ন : বাংলাদেশ ব্যাংক এসএমই খাতের জন্য পুনঃঅর্থায়ন তহবিল ও প্রণোদনা প্যাকেজ ঘোষণা করেছে। এসব উদ্যোগ বাস্তবায়নে আপনারা কী ধরনের পদক্ষেপ নিচ্ছেন?
উত্তর : বাংলাদেশ ব্যাংক কর্তৃক ঘোষিত সিএমএসএমই খাতের পুনঃঅর্থায়ন ও প্রণোদনা তহবিল প্যাকেজ বাস্তবায়নে প্রাইম ব্যাংক সক্রিয় ও সমন্বিত উদ্যোগ গ্রহণ করছে। ইতোমধ্যেই আমরা প্রাইম ব্যাংক বাংলাদেশ ব্যাংকের এই প্যাকেজে অংশগ্রহণ করার জন্যে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নির্দিষ্ট ডিপার্টমেন্টে আবেদন করেছে। এই উদ্যোগের আওতায় ব্যাংকটি সিএমএসএমই উদ্যোক্তাদের জন্য দ্রুত ও সহজ ঋণ বিতরণ নিশ্চিত করতে প্রক্রিয়াগত সরলীকরণের ওপর গুরুত্ব দিচ্ছে, যাতে পুনঃঅর্থায়নের সুবিধা সময়মতো উদ্যোক্তাদের কাছে পৌঁছায়। আমরা বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্দেশনা অনুযায়ী জামানতভিত্তিক ও জামানতবিহীন উভয় ধরনের অর্থায়ন চ্যানেল ব্যবহার করে ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তাদের প্রয়োজন অনুযায়ী ঋণ প্রদানের লক্ষ্য প্রস্তুতি নিচ্ছি। বিশেষ করে নারী, তরুণ এবং প্রান্তিক উদ্যোক্তাদের অগ্রাধিকার দিয়ে অন্তর্ভুক্তিমূলক অর্থায়ন নিশ্চিত করার অভিপ্রায় নিয়ে প্রণোদনা প্যাকেজের সুফল সর্বস্তরে পৌঁছে দেওয়ার লক্ষ্যে কাজ করছি। এ ছাড়া উদ্যোক্তাদের সচেতনতা বৃদ্ধি, আর্থিক সাক্ষরতা উন্নয়ন এবং প্রণোদনা প্যাকেজ সম্পর্কে তথ্য পৌঁছে দিতে নিয়মিত প্রচারণা ও প্রশিক্ষণ কার্যক্রম পরিচালনা করা হবে।
প্রশ্ন : এমএসএমই খাতের অর্থায়ন ও বাজার সংক্রান্ত চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় কী ধরনের নীতিগত উদ্যোগ প্রয়োজন?
উত্তর : এমএসএমই খাতের টেকসই উন্নয়নে সহজ ও স্বল্প ব্যয়ের অর্থায়ন, পুনঃঅর্থায়ন সুবিধার সম্প্রসারণ এবং ডিজিটাল ঋণ প্রক্রিয়া চালু করা প্রয়োজন। পাশাপাশি আধুনিক ক্রেডিট স্কোরিং, নারী ও তরুণ উদ্যোক্তাদের জন্য বিশেষ সহায়তা, দক্ষতা উন্নয়ন এবং ডিজিটাল মার্কেটপ্লেসে প্রবেশের সুযোগ বাড়াতে হবে। অর্থায়ন, প্রযুক্তি ও বাজার সংযোগের সমন্বিত নীতিগত সহায়তাই এমএসএমই খাতকে আরও শক্তিশালী ও প্রতিযোগিতামূলক করে তুলতে পারে।