× ই-পেপার প্রচ্ছদ সর্বশেষ বাংলাদেশ রাজনীতি দেশজুড়ে বিশ্বজুড়ে বাণিজ্য খেলা বিনোদন মতামত চাকরি শিক্ষা আজকের কার্টুন ফিচার সকল বিভাগ ছবি ভিডিও লেখক আর্কাইভ কনভার্টার

তৃষিত জলধি

আল মাহমুদ

প্রকাশ : ২৫ মে ২০২৬ ২১:১৪ পিএম

আপডেট : ২৫ মে ২০২৬ ২২:০২ পিএম

কবি আল মাহমুদ। ছবি: ফেসবুক থেকে

কবি আল মাহমুদ। ছবি: ফেসবুক থেকে

বঙ্গোপসাগরে প্রমোদ ভ্রমণে এসে সারা দিনের ক্লান্তিকর ছোটাছুটি আর হৈ-হুল্লোড় ছাড়া আমার জন্য জাহাজটির মধ্যে তেমন পরিতৃপ্তিকর কোনো অবকাশ ছিল না। তা ছাড়া আমি কোনো আনন্দ-উৎসব উদযাপনেও আসিনি। এসেছি বন্ধুত্বের খাতিরে। একটি সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠানের পরিচালক যখন জানালেন তারা দেশের মহামান্য প্রেসিডেন্টের দুদিনব্যাপী সমুদ্র ভ্রমণের সঙ্গী হতে চট্টগ্রাম যাচ্ছেন এবং একজন কবি হিসেবে আমার নামও অন্তর্ভুক্ত করে তারা কর্তৃপক্ষের অনুমোদন নিয়ে নিয়েছেন, তখন একটু অবাকই হয়েছিলাম।

মহামান্য প্রেসিডেন্ট তো আপনার নাম তালিকায় দেখে আনন্দই প্রকাশ করলেন। বললেন, ‘চিনি, মুক্তিযুদ্ধের সময় আলাপ হয়েছিল। আমার শুভেচ্ছা জানাবেন।’

সাংস্কৃতিক সংগঠনটির পরিচালক, আমার বন্ধু রেজা এভাবেই আমাকে আমন্ত্রণ জানালেন । আমি বললাম, ‘কিন্তু হঠাৎ তোমাদের নিয়ে সমুদ্রের দিকে কেন?’

‘ঠিক বুঝতে পারছি না। আমরা অবশ্য গান-বাজনায় সফরটাকে মাতিয়ে রাখতে পারব। মেয়ে আর্টিস্টই অন্তত পঁচিশজন যাবে। শুনেছি দেশের স্কুল-কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ের অত্যন্ত মেধাবী ছাত্র-ছাত্রীদের ডেকে আনা হচ্ছে এই সফরে সঙ্গী হওয়ার জন্য । প্রেসিডেন্ট হয়তো বিদ্যালয়ের প্রথম হওয়া ছেলেমেয়েদের একটু প্রীতি জানাতে চান ।’

আমি বললাম, ‘মহামান্য প্রেসিডেন্ট যে খেয়ালী মানুষ তা আমি জানি।’

আমার কথায় রেজাও মাথা ঝাঁকালো। ব্যাপারটা এখনও তার বোধগম্য নয়।

আমি বললাম, ‘ঠিক আছে। বলো কখন, কীভাবে চাটগাঁ রওনা দিচ্ছ। আমি রেডি হয়ে থাকব।’

রেজা খুশি হয়ে আমার সাথে করমর্দন করল, ‘কালই, রাতের মেইলে। বার্থ রিজার্ভ করা আছে। আপনাকে তুলতে গাড়ি পাঠিয়ে দেব। ট্রেনে চড়ে সমুদ্রের ওপর দুটি গান বানিয়ে দিতে হবে মাত্র।’

আমি হেসে বললাম, ‘হবে।’

আমরা খুব ভোরেই বন্দরে পৌঁছে গেলাম। সংরক্ষিত জেটিতে জাহাজটি নোঙর করা আছে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময়কার অতিকায় জাহাজ। সাম্প্রতিককালের সমুদ্রযাত্রীদের চোখে একটু সেকেলে। বিশাল দুর্গের মতো দেখতে। যত্নআত্তি ও ঘষামাজার ফলে যদিও বহিরাবরণে একটা ঝকঝকে পরিচ্ছন্নতা আছে, তবুও জাহাজের বিপুল আয়তন ও চতুর্দিকে ছড়ানো দড়ির সিঁড়িগুলোর রঙচটা ভাব দেখলেই বোঝা যায় উপযোগিতার চেয়ে এর ব্যয়ভার বেশি। আমরা স্তূপীকৃত করে আমাদের মালপত্র জেটিতে রেখে চারদিকে গোল হয়ে দাঁড়ালাম। শুধু সংগীতযন্ত্রগুলো একটু সাবধানে হাতে হাতে রইল। আমাদের সাথে গায়িকা মেয়েরাই বেশি এসেছে। যারা সাধারণত আদুরে গলায় গাঢ় সম্বোধনে কথা বলতে অভ্যস্ত এবং কোনো অবস্থাতেই দুঃখকষ্টে পড়তে চায় না। এর মধ্যে দুয়েকজন আবার আমার খুবই অনুরক্ত এবং পারিবারিকভাবে আমার চেনাজানা। এদের কেউ কেউ আমাকে একথা জানিয়েছে যে, তারা আমার নাম বলেই বাড়ি থেকে বেরুবার অনুমতি পেয়েছে। অর্থাৎ তাদের অভিভাবকগণ আমি এই দলের সাথে যাচ্ছি একথা জেনেই তাদের জাহাজে আসার ছাড়পত্র দিয়েছে। যদিও আমি জানি তাদের এসব ফালতু কথার কোনোই গুরুত্ব নেই। কারণ এসব আনন্দযাত্রায় এরা কারও অনুমতির তোয়াক্কা করে না। এমনকি পারিবারিক উৎকণ্ঠা থাকলেও এরা যে অভিভাবকদের সমীহ করে এমন মনে হয় না। আমি এদের কথা শুনে আমার সম্বন্ধে এদের অভিভাবকদের ধারণার একটা আভাস পেয়ে বরং আনন্দিত হই। কারণ কবিদের দায়িত্বহীনতা সম্বন্ধে সমাজে প্রচলিত ধারণা যে সাম্প্রতিককালে একটু একটু করে পাল্টে যাচ্ছে, এটা আমাকে প্রফুল্লই করে। আমি একটা কোকাকোলা টানতে টানতে গাঙচিলদের সুন্দর উড়াল দেখছিলাম। আমার এতদিন একটা ধারণা ছিল, এই পাখিগুলো সম্ভবত ক্লান্ত হয় না। নদীবন্দরগুলোতে বিশেষ করে চালনায় এদের ডানার তেজ দেখে আমি কতবা অভিভূত হয়েছি। কিন্তু এখানে এই সকালবেলায় বঙ্গোপসাগরের এই চলাচলপথ ও জেটির ওপরে পাখিগুলোকে অক্লান্ত মনে হলো না। ডানায় নিরানন্দ কর্তব্যের বোঝা কিংবা আহার্যের তাগিদেই এরা উড়ছে। আমি অনেকক্ষণ গাঙচিলদের ওড়াউড়ি দেখলাম। এর মধ্যে জেটির এ অংশটা ছাত্রছাত্রী, তাদের বিদ্যায়তনের শিক্ষক প্রতিনিধি ও রাজনৈতিক যুব সম্প্রদায়ের সদস্যের দ্বারা প্রায় পূর্ণ হয়ে গেল। ক্ষমতার পশ্চাদ্ধাবন করা যাদের অভ্যেস, ক্ষমতাসীন রাজনৈতিক দলের বহুবিধ অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ সংগঠনসমূহের সেইসব নেতাদেরই দেখলাম এখানে একটু বিহ্বল অবস্থা। বহু চেষ্টায় তারা এই সফরের আমন্ত্রণপত্র সংগ্রহ করে এতদূর এসেছে। এখন এই অতিকায় জাহাজ ও সামনে তরঙ্গসঙ্কুল সমুদ্র দেখে তারা ভড়কে গিয়ে সকালের সামান্য রোদের ছোঁয়াতেই ঘামে নেয়ে উঠেছে। চিন্তিত ও ঘর্মাক্ত মুখ দেখেই বোঝা যায় তারা প্রেসিডেন্টের এই অরাজনৈতিক কর্মসূচির জন্য মোটেই প্রস্তুত হয়ে আসেনি।

এদের মধ্যে একজন আমাদের মেয়েগুলোকে খুঁটিয়ে দেখতে দেখতে অকস্মাৎ আমার দিকে তাকাল। প্রথম একটু অপ্রস্তুত হলেও মুহূর্তের মধ্যে হাত নেড়ে এগিয়ে এসে আমার হাত ধরল।

‘আপনিও এর মধ্যে আছেন?’

আমি বললাম, ‘এর মানে কিসের মধ্যে?’

‘এই দরিয়া সফরে।’

‘তা দেখতেই পাচ্ছেন গানবাজনার সাথে যাচ্ছি।’ বললাম আমি।

‘তা তো দেখতেই পাচ্ছি। কিন্তু দরিয়ার মধ্যে গান-বাজনা কেন, আমাদেরই বা ডেকে আনা কেন কিছুই তো বুঝতে পারছি না।’ বলল ভদ্রলোক। বয়স চল্লিশের মতো হবে। মাথায় টাক। পরনের প্যান্টটা বেশ টাইট। বেল্ট কোমর কেটে বসে যাওয়ায় বিসদৃশভাবে তলপেট উঁচু হয়ে উঠেছে। গায়ে সিল্কের ছিটের হাওয়াই শার্ট।

আমি বললাম, ‘আপনাকে কি খুবই জরুরিভাবে আমন্ত্রণ করে আনা হয়েছে?’

‘না, আমি বরং নিমন্ত্রণ জোগাড় করে এসে পড়েছি। ভাবলাম জাহাজে বুঝি কোনো গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক বৈঠক হবে। এখন তো দেখতে পাচ্ছি এসব ছেলেছোকরা আর আপনারা গানবাজনা নিয়ে যাচ্ছেন।’

‘খুব হতাশ হলেন বুঝি!’

‘না না হতাশ হব কেন, জাহাজের মধ্যে প্রেসিডেন্টের সাথে দুয়েকবার কি আর মোলাকাত হবে না। তবে জাহাজের ব্যাপারটা ঠিক ধরতে পারছি না কিনা। এই ধরুন, দরিয়ার মধ্যে কেন?’ হতাশকণ্ঠে বললেন ভদ্রলোক। 

আমি হাসলাম। আমার হাসি দেখে আমাদের আর্টিস্ট মেয়েরাও মুচকি হাসল। তারা এ ধরনের নেতাদের আচরণ সম্বন্ধে মোটামুটিভাবে ওয়াকিবহাল। সভা-সমিতিতে এরাই প্রেসিডেন্টকে ঘিরে রাখে। তার নিকটবর্তী হওয়ার জন্য জনতার পিঠে কনুইয়ের গুঁতা মেরে অসহিষ্ণুভাবে এগিয়ে যেতে থাকে।

মেয়েদের হাসতে দেখে বিব্রত মুখে ভদ্রলোক তাদের দিকে তাকাল। লোকটির দৃষ্টি যৌনকাতর। পুরুষ যেভাবে তাকালে মেয়েরা শরীর সম্বন্ধে সচেতন হয়ে শাড়ি টানাটানি করে, ভদ্রলোকের দৃষ্টি তেমনি বেহায়া।

আমি তাকে কাটাবার জন্য বললাম, ‘প্রেসিডেন্ট সম্ভবত মানুষ দেখতে দেখতে ক্লান্ত হয়ে একদল বালক-বালিকাকে নিয়ে সাগরের ঢেউ গুনতে এসেছেন। এখানেও যখন আপনি আমি সকলেই দাওয়াত জোগাড় করে হাজির হয়ে গেছি তখন আর চিন্তা কী? জাহাজেই কথাবার্তা হবে।’

ভদ্রলোক জোরে হাসলেন।

‘আপনার সাথে জাহাজে জরুরি কথাবার্তা হবে। আপনি তো কবি, কলির কৃষ্ণ। কী বলেন?’

লোকটার ধৃষ্টতা দেখে আমি যখন হতভম্ব ঠিক তখন সে বেনসনের প্যাকেট খুলে এগিয়ে ধরল, ‘নিন।’

আমি সিগ্রেট তুললাম।

‘সাবাস। আসি তাহলে?’

দ্রুত করমর্দন করে সে জাহাজে ওঠার সিঁড়ির দিকে এগিয়ে গেল। আমি দেখলাম ছাত্রদের দলটি লম্বা লাইন করে জাহাজের সিঁড়ির দিকে এগুচ্ছে।

আমাদের অবশ্য কোনো তাড়াহুড়া ছিল না। আমরা ছিলাম এই সমুদ্রসফরের বিনোদনমূলক দিকটির পরিপূরক। আমাদের নিমন্ত্রিত সকল সদস্যই জানতেন জাহাজে আমাদের প্রতি বিশেষ ব্যবস্থাসহ আরাম-আয়েশের সুবিধা থাকবে। যাদের কেবিন পাওয়া দরকার তারা কেবিনই পাবেন। মেয়েরাও তাদের উপযুক্ত সবকিছুই পাবেন। ফলে আমরা জাহাজে উঠলাম সবার শেষে। আমরা যেমন ভেবেছিলাম তেমন সুনির্দিষ্ট আয়োজন না থাকলেও আয়োজকদের সাথে সামান্য তর্কাতর্কির পর মেয়েরা পাশাপাশি কয়েকটি কুঠরি পেল। তাদের সাথে আমি ও রেজা একটা কেবিন যুক্তভাবে দখলের অধিকার পেলাম। সংগীতযন্ত্রগুলো বিশেষ করে গিটার, বেহালা ও চেলোর মতো নমনীয় তারের বাদ্যযন্ত্র আমাদের ঘরেই রইল। মেয়েরা নিয়ে গেল হারমোনিয়াম। হারমোনিয়াম তাদের যখন-তখন দরকার। গলাটা একটু রেওয়াজে রাখতে হয় সবারই। তবলা বাঁয়াগুলো রাখা হলো কেবিনের বাইরে অভ্যন্তরীণ কাউন্টারের পাশে একটা টেবিলে। সেখানে যাত্রী ও নাবিকগণ চা, কফি ইত্যাদির জন্য অহরহ ভিড় জমান।

আমরা যখন কেবিনে বিছানাপত্রের রোল খুলছি ঠিক তখনই প্রেসিডেন্ট জিয়ার আগমনবার্তা ঘোষিত হলো। আমি ও রেজা দ্রুত কেবিনের বাইরে এসে জাহাজে প্রবেশের প্রধান গেটের দিকে ছুটলাম। গেটে পৌঁছে দেখি প্রচণ্ড ভিড়। ছাত্রছাত্রীরা শৃঙ্খলাবদ্ধভাবে লাইন করে দাঁড়ালেও লাইন ঠিক রাখা যাচ্ছে না। করমর্দনলোভী উঠতি পার্টি ক্যাডাররা গেটের প্রবেশপথটা তাদের দখলে রাখার জন্য আর সকলকেই ঠেলে দিচ্ছে লাইনের দিকে। রেজাও ছুটে গেল ধাক্কাধাক্কির মধ্যে। আমি বুঝলাম আমার পক্ষে সেখানে পৌঁছা অসম্ভব ব্যাপার। আমি ঠেলাঠেলির বাইরে একটি কামারার দরজায় ধাক্কা খেয়ে চুপচাপ দাঁড়িয়ে সিগ্রেট ধরালাম। নিরাপত্তা সিগন্যাল আরও নিকটবর্তী হলে মানুষের জমাটবাঁধা ভিড়টা মুহূর্তে সচকিত হয়ে নড়তে লাগলো। হঠাৎ প্রেসিডেন্ট প্রবেশ করেই অগ্রবর্তী ভিড়টাকে মুহূর্তে মাত্র একনজর দেখলেন। তাঁর চেহারার স্বভাবসুলভ গাম্ভীর্য ও গগলস আবৃত বিষাদ মাখা চোখ দুটির উদাসীনতা আমি অনুভব করলাম। তিনি জাহাজ কর্তৃপক্ষের উর্দিপরা অফিসারদের অভিবাদনের জবাব দিয়ে তাদের মৃদুভাবে করমর্দন করে ছাত্রছাত্রীদের দিকে এগিয়ে যেতেই আমর ওপর চোখ পড়ল পলকমাত্র। মৃদু হাসলেন। আমি হাত তুলে তাকে সালাম জানালাম। ততক্ষণে তিনি ছাত্রদের সাথে কথাবার্তা শুরু করেছেন। সম্ভবত কুশল জিজ্ঞাসা কিংবা দেশের দূর প্রান্ত থেকে বন্দরে পৌছতে তাদের যে হয়রানি হয়েছে এ ব্যাপারে খোঁজ নিচ্ছেন। ছাত্রছাত্রীরা তাকে তাদের সামনা-সামনি পেয়ে লাইন ছেড়ে ঘিরে ফেলে আলাপ জুড়ে দিয়েছে।

আবার তাঁর মৃদু হাসিটি আমি দেখতে পাচ্ছি। এর মধ্যে নিরাপত্তারক্ষীরা তাঁর ওপরে যাওয়ার পথ তৈরি করতে ভিড়টাকে ভদ্রভাবে সরিয়ে দিল। তিনি ওপরে যাওয়ার আগে সবার ওপর একবার দৃষ্টি বুলিয়ে নিলেন। আমার ওপরও সম্ভবত চোখ পড়ল। বেশ একটা খুশির ভাব ছড়িয়ে আছে মুখে। অন্যদিকে প্রেসিডেন্টের দৃষ্টি আকর্ষণের কোনো সুবিধা নেই দেখে রেজাও কখন যে আমার পাশে এসে দাঁড়িয়েছে লক্ষ্য করিনি। প্রেসিডেন্ট সিঁড়ি বেয়ে ওপর তলায় উঠে গেলে মুখ ফিরিয়ে দেখি রেজা।

আমি বললাম, 'প্রেসিডেন্ট আমাদের দেখেছেন।'

'হ্যাঁ, আমাদের উপস্থিতিটা তার জানা রইল।'

'চলো তাহলে কেবিনে গিয়ে একটু রেস্ট নিই।'

আমরা কেবিনের দিকে হাঁটা দিলাম।

কেবিনে এসে কাপড় না ছেড়েই আমরা বিছানায় গা এলিয়ে দিলাম। ভাবলাম, একটু পরেইত দুপুরের খাওয়ার ডাক পড়বে। এর ভেতরে ঘন্টাখানেক ঘুমিয়ে নেয়া যাক। বাইরে জাহাজ ছাড়া, নোঙর তোলা ইত্যাদি হাঁক-ডাক শোনা যাচ্ছে। আমাদের মেয়েরাও কলরব তুলে ডেকের দিকে যাচ্ছে বোঝা গেল। জাহাজ ঘন ঘন সিটি বাজিয়ে চলতে শুরু করেছে। দৃশ্যটা ডেকে দাঁড়িয়ে দেখার লোভ আমারও কম নয়। সমুদ্রে ভাসার অভিজ্ঞতা তো আমারও এই প্রথমবারের মত। আমি উঠে বসলাম। রেজা চোখ মুদে শুয়ে আছে। হয়ত তার চোখে ঘুমের আমেজ লেগে থাকবে। আমি তাকে না জাগিয়ে কেবিন থেকে বেরিয়ে এলাম। সবাই রেলিং ধরে ঝুঁকে আছে। জাহাজ জেটি ছেড়ে বেশ একটু দূরে সরে এসে রীতিমত চলতে শুরু করেছে। জাহাজের সামনে পেছনে গাঙচিলদের ওড়াওড়ি। পাখিগুলো ক্যাঁক ক্যাঁক শব্দ তুলে গোত্তা খেয়ে পানির সমান্তরালে এসে আবার দ্রুত বেগে আকাশে উঠে যাচ্ছে। নোঙর ফেলা অনেকগুলো বিদেশি আধুনিক জাহাজের পাশ কাটিয়ে আমরা এগিয়ে যাচ্ছি। আমাদের জাহাজটির নাম হিজবুল বাহার। এই জাহাজটিই সম্ভবত দীর্ঘকাল যাবৎ

বাংলাদেশের হজযাত্রীদের নিয়ে জেদ্দায় পৌঁছত। এখন নৌবাহিনীর তত্ত্বাবধানে আছে। জাহাজটির প্রাচীন আয়তন ও গাম্ভীর্য আমাকে খুবই আকর্ষণ করলো। আমি সিগ্রেট ধরিয়ে

সমুদ্রের দিকে পেছন ফিরে জাহাজের অভ্যন্তরভাগ দেখতে লাগলাম। ভেতরটাও বেশ ঝকেঝকে। অযত্নের ছাপ নেই কোথাও। জীবনবয়াগুলো পরিকল্পিতভাবে সুন্দর করে সাজানো। আমার সামনেই জাহাজের হালকা পানাহারের কাউন্টারে ছেলেমেয়েদের ভিড়। আমাদের শিল্পীরাও চায়ের আশায় চাতকের মত কাউন্টার ঘিরে ফেলছে। মেয়েদের আনন্দ দেখে কয়েকজন নাবিক তাদের কৌতুহলী প্রশ্নমালার জবাব দেবার জন্য সেখানে দাঁড়িয়ে। সবাই জাহাজ জেটি ছেড়ে সমুদ্রের ভিতর কতদূর এগোবে এ নিয়ে নাবিকদের প্রশ্নবানে বিব্রত করছে।

একজন কোরাস গায়িকা নাম বেবী জিজ্ঞেস করলো, 'বে অব বেঙ্গল পুরোটাই ঘুরিয়ে আনা হবে তো?

'পুরোটা না হোক, দু'আড়াই শো মাইল তো ঘুরে বেড়াতে পারবেন। আমরা হিরন পয়েন্ট ছুঁয়ে সোয়াস অব নো ল্যান্ড পর্যন্ত যাব। একটি সামরিক নৌ মহড়া দেখতে পাবেন।'

বললেন একজন কাঁচপাকা দাড়িঅলা প্রাজ্ঞ নাবিক। মেয়েদের উত্তেজনা দেখে তিনি মৃদু মৃদু হাসছিলেন। মেয়েরা চিৎকার করে স-উল্লাসে তাদের আনন্দ ব্যক্ত করলো। একজন ছুটে এলো আমার দিকে, 'এই কবি ভাই। আমাদের আড়াই শো মাইল সামনে নিয়ে যাবে। কি মজাই না হবে।'

আমি বললাম, 'মজা না হোক একটা নতুন অভিজ্ঞতা তো হবে।'

'কেন মজা হবে না। আলবৎ মজা হবে। আপনার তো আরও ভালো হলো, সমুদ্রকে নিয়ে কবিতা লিখতে পারবেন। আজই একটা লিখে ফেলুন না।'

বলল মেয়েটি। সে আমাদের দলে নজরুলের উপনিবেশ ও সাম্রাজ্যবাদ বিরোধী গানগুলোতে গলা মেলায়। বেশ জোরালো গলা। গানের সময় তার অভিব্যক্তি সুন্দর। নাম জাহানারা চৌধুরী। আমি বললাম, 'সমুদ্রকে নিয়ে কিছু লিখলে তোমার কথাও লিখবো।'

'আবার আমাকে নিয়ে কেন?'

তুমিতো নজরুলকে ভালবাসো। আর নজরুলও সমুদ্রকে ভালবাসতেন। বলতেন, ক্ষুধিত বন্ধু

মোর তৃষিত জলধি।

'বাহ কি চমৎকার লাইন।' জাহানারা অবাক হয়ে চোখ বড় করে তাকাল আমার দিকে। আমি বললাম, 'নজরুলকে শুধু গাইলেই চলে না খানিকটা পড়তেও হয়।'

'এখন থেকে পড়বো।' হাসল জাহানারা। বলল, 'চলুন আপনাকে এক কাপ কফি খাওয়াই, খাবেন?'

আমি হেসে সম্মতি জানিয়ে তার পেছনে কাউন্টারে এসে দাঁড়ালাম। কফিতে চুমুক দেবার আগেই সেই রাজনৈতিক ভদ্রলোক এসে সামনে দাঁড়াল, 'এই যে কবি সাহেব।' আমি মুখ তুলে বললাম, 'বলুন, কলির কৃষ্ণ।'

ভদ্রলোক হাসলেন, 'কেবিন-টেবিন পছন্দমত পেয়েছেন তো?' কথা বলতে বলতে তিনি জাহানারাকে এক নজর দেখে নিলেন। জাহানারা তাকে কফি খাওয়ার আমন্ত্রণ জানালে তিনি প্রীত হয়ে আমার দিকে তাকালেন। আমি বললাম, 'খান না এক কাপ।' 'ঠিক আছে, দিন।'

ভদ্রলোক কাউন্টার থেকে কফির পেয়ালা তুলে নিলে আমি জহানারার সাথে তার পরিচয় করিয়ে দিলাম। 'জাহানারা চৌধুরী। নজরুলগীতি শিল্পী, ইকনমিকসের ফাইনাল ইয়ারের ছাত্রী। আর আপনার নামটি যেন কি-'

'আরে আমি তেমন কেউকেটা নই। আমার নাম সফদর আলী, ইনডেন্টিং ব্যবসা করি। বোঝেন তো আজকাল পার্টি-ফার্টি না করলে ব্যবসাপত্র জমেনা। নমিনেশন পেলে আমার এলাকা থেকে এবার দাঁড়াতে চাই। আচ্ছা, আপনার সাথে প্রেসিডেন্টের আলাপ-পরিচয় কেমন?'

এক নিঃশ্বাসে বললেন ভদ্রলোক। কফিতে চুমুক দিয়ে আমার দিকে চাতকের মত তাকালেন। আমি বললাম, তার সাথে রাজনীতি নিয়ে আমার কোন আলাপ নেই। তবে মাঝে মধ্যে দেশের সংস্কৃতি নিয়ে দু'এক কথা হয় বটে।'

সফদর আলী হতাশ হয়ে জাহানারার দিকে তাকালো। দৃষ্টিটা লোভী ও ব্যাকুলতায় ভরা। জাহানারা বেশ মজা পেল। ভ্রুভঙ্গি বাঁকিয়ে মন্তব্য করলো, 'হতাশ হবেন না। লেগে থাকুন। লেগে থাকতে হলে অবশ্য আঠা লাগে। আপনাকে দেখে তো মনে হচ্ছে লেগে থাকার মত গাঢ় আঠা আপনার আছে।'

ঠোঁট বাঁকিয়ে শব্দ করে হাসল জাহানারা। আমি এদের হাসাহাসি দেখে বললাম, 'আপনারা কথাবার্তা বলুন। আমি আমার কেবিনে ফিরছি।'

সফদর আলী সম্ভবত এই অবকাশটি চাইছিলেন। বললেন, আবার তাহলে দুপুরে খাওয়ার টেবিলে দেখা হবে।'

আমি মৃদু হেসে কেবিনের দিকে রওনা দিলাম। মনে মনে হাসলাম। কারণ জাহানারাকে আমি চিনি, দলের মধ্যে সবচেয়ে সপ্রতিভ ও স্মার্ট মেয়ে। সফদর আলীদের কিভাবে ঘোল খাওয়াতে হয় তা জহানারা ভালো করেই জানে।

খাওয়ার টেবিলে মেধাবী ছাত্রছাত্রীদের কলরবে মুখর হয়ে উঠলো। খাদ্যের প্রাচুর্যে সকলেরই নয়ন তৃপ্ত। আমি একটা শাদা ন্যাপকিনের ওপর প্লেট তুলে নিয়ে সোজা হেঁটে বিরিয়ানি ও অন্যান্য গুরুপাক খাদ্যের এলাকা পার হয়ে শাদা ভাতের স্তূপের কাছে এসে দাঁড়ালাম।

সামনেই রুই মাছের বিশাল রেকাবগুলো। আমি ভাত তুলে নিয়ে কয়েক টুকরো রুই মাছের শুকনো ও ঝাল মেশানো ভাজি তুলে নিলাম। সকলেই মাংসের প্রতি আমার নিরাসক্তি আড় চোখ লক্ষ্য করছিল। বিশেষ করে আমার দলের ছেলেমেয়েরা আর ঢাকা ইউনিভার্সিটির ছাত্রছাত্রীরা। সম্ভবত এদের কেউ কেউ আমাকে চেনে। একটি মেয়ে এগিয়ে এসে বলল, 'একি, আপনি এমন মজাদার বিরানী ফেলে মাছ চিবুচ্ছেন?'

আমি বললাম, 'ঢাকায় তো মাছই দুর্লভ। এই মহার্ঘ খাদ্য পেলে কে আর মুরগির রান নিয়ে টানাটানি করে।'

মেয়েটি বলল 'না না। আপনি অন্তত একটা মুরগির রোস্ট নিন।'

সে নিজেই একটা রান তুলে নিয়ে আমার পাতে দিল। আমি আর আপত্তি করলাম না। মেয়েটি আমাকে চেনে বলেই মনে হল। কারণ সে হঠাৎ আমাকে জিজ্ঞেস করলো, 'আপনি কি এখানকার অনুষ্ঠানে আমাদের কবিতা আবৃত্তি করে শোনাবেন?',

আমি বললাম, 'এখানকার প্রোগাম বোধ হচ্ছে গান-বাজনার চেয়ে বেশি দূর এগোবে না। কারণ প্রেসিডেন্ট তোমাদের নিয়ে এসেছেন কোন গুরুত্বপূর্ণ তথ্য জানানোর জন্য। আমি মোটামুটি এ ধরনের আভাস পেয়েই এসেছি। কবিতার ফুরসত হয়তো জোটানো মুশকিলই হবে। তাছাড়া এই সুন্দর সাগরের উদ্দামতা ছেড়ে কে আর আমার সামান্য কবিতা শুনতে উৎসাহ দেখাবে?'

'আমাকে শোনাবেন। আমি শুনবো। আমি আপনার কবিতার কি ভক্ত আপনি তো জানেন না। বলল মেয়েটি। অকপট সারল্যে মুখখানা উদ্ভাসিত।

'যাক, মধ্যসমুদ্রে একজন ভক্ত পাওয়া গেল।' হেসে জবাব দিলাম আমি। জিজ্ঞেস করলাম,

'তুমি বুঝি বাংলার ছাত্রী।'

'না। ইংরেজির। ফার্স্টইয়ার।'

'ঢাকা ইউনিভার্সিটির?'

'না রাজশাহী।'

রানের মাংস দাঁত দিয়ে টেনে খুলতে জবাব দিল মেয়েটি। আমি এতক্ষণে মেয়েটাকে ভালো করে দেখলাম। একেবারেই ছোটখাট দেখতে। গায়ের রং তীব্র ফরসা। এমন কি ঘন ঘন শ্যাম্পুর বদৌলতে তার চুলও যে ঈষৎ বাদামি হয়েছে তা বুঝতে কষ্ট হলোনা। হাতের বাম কবজিতে বড় ডায়ালের ঘড়ি। কান বা গলায় কোনো গহনা নেই। তবে কানে গয়নার ছিদ্র আছে। ধবধবে সেলোয়ার কামিজ পরা। হালকা-পাতলা গড়ন হলেও কনুই উম্মুক্ত থাকায় পুষ্ট বাহুর আভাস স্পষ্ট। মেয়েটিকে আমার স্বাস্থ্যবতী মনে হলো। এ ধরনের স্বাস্থ্যোজ্জ্বল হাসিখুশি মেয়েরা ভিড়ের মধ্যেও সকলের নজরে পড়ে। আমি মেয়েটির সাথে আলাপ করে খুশিই হলাম। বিশেষ করে কবিতার প্রতি এর আকর্ষণ আছে জেনে আমার

বেশ ভালোই লাগলো।

আমি বললাম, 'তুমি কি সত্যিই আমার কবিতা পড়া শুনতে চাও?’

'বারে, আমি তো বললামই। টেলিভিশনে আপনার আবৃত্তি থাকলেই বই রেখে উঠে আসি।’

‘আপনার সব বই আমার কাছে আছে, জানেন?'

'আমি কি খুব ভালো পড়ি?'

'তা অবশ্য পড়েন না। আপনার কবিতা তবুও আপনার মুখে শুনতে ভালো লাগে। আপনারা, কবিদের তো একটা আলাদা স্টাইল আছে।'

হাসল মেয়েটি। দাঁত ছোট হলেও বেশ মজবুত। আমি বললাম, 'তোমার নামতো জানা

হলো না।'

'নঈমা। নঈমা খান।'

জবাব শুনে নঈমার চোখের দিকে তাকালাম। চোখ দুটিতে অস্পষ্ট হলেও একটা পিঙ্গলাভা আছে। ভ্রুজোড়া ঈষৎ বাঁকা হয়ে কপালের দিকে উঠে গেছে। চোখ জোড়া আয়ত না হলেও বুদ্ধির দীপ্তিতে উজ্জ্বল।

'আব্বা কী করেন?'

নঈমা হাসল।

'মাছের চাষ। আদর্শ মৎস্য খামার।'

মুরগির রান কামড়ে ধরে জবাব দিল নঈমা। আমি বলললম, 'এইজন্যেই মাছের চেয়ে মাংসের প্রতি তোমার রুচি বেশি।'

নঈমা হাসল।

'তুমি সত্যি আমার কবিতা শুনতে চাও, একবার সময় করে এসো আমাদের কেবিনে।'

আমিও আগ্রহ দেখালাম। যা সচরাচর কখানো করিনা। মেয়েটির মধ্যে কি যেন একটা আলাদা দীপ্তি আছে। কেন যেন ভাবলাম নঈমাকে কবিতা শোনানো যায়। স্বাভাবিকভাবেই নঈমা আমার আমন্ত্রণ গ্রহণ করলো। বলল, 'নিশ্চয়ই আসব। আপনারা তো সাংস্কৃতিক দল নিয়ে ওপর তলার ডান দিকে থাকেন।'

আমি বললাম, 'হ্যাঁ।'

'ঠিক আছে একবার যাবো। দেখি আগে প্রেসিডেন্ট কি কথা বলেন।'

বলল নঈমা। তারপর প্লেট হাতেই বিশ্ববিদ্যালয় গ্রুপের সাথে মিশে গেল।

আমি খাওয়া সেরে একটা সিগ্রেট ধরিয়ে কেবিনে এসে দেখি রেজা মেয়েদের রিহার্সাল দেখতে পাশের কামরাগুলো দেখে বেড়াচ্ছে। আমি বিছানায় এসে লুঙ্গি পরে স্টান শুয়ে পড়লাম।

ঘুম ভাঙতে সন্ধ্যা পেরিয়ে রাত হয়ে গেল। আমি ধড়মড়িযে বিছানায় উঠে দেখি রেজা নেই। পাশের ঘরেও কারো সাড়াশব্দ বোঝা যায় না। আমাদের দ্বিতীয় তলাটা কেমন নিঃস্তব্ধ। এই প্রথম আমি জাহাজ চলার মৃদু জলভাঙন শব্দ শুনতে পেলাম। যদিও জাহাজটি অত্যন্ত দ্রুত গতিতে মধ্য সমুদ্রের দিকে ধাবিত হচ্ছে। শতাধিক মাইল সামনে এগিয়ে জাহাজটি মোঢ় ঘুরাবে সুন্দরবনের সঙ্গমস্থলের অদূরে অবস্থিত হিরণ পয়েন্টের দিকে।

আমার শ্রান্তিভরা ঘুম দেখে রেজা হয়তো আমাকে জাগায়নি। এদের সকলেরই ওপর তলায় জাহাজের পেছন দিকে জমায়েত হওয়ার কথা। সেখানেই সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান অর্থাৎ গান বাজনা হবে। সেখানেই প্রেসিডেন্ট ছাত্রছাত্রীদের সাক্ষাৎ দেবেন। সম্ভবত গুরুত্বপূর্ণ কিছু কথা বলবেন।

আমি হাতমুখ ধুয়ে কফি কাউন্টারে এসে দাঁড়ালাম। কাউান্টারের সুবেশধারী ছেলেটি বলল, 'আপনি অনুষ্ঠানে যাননি?'

আমি বললাম, 'এই তো যাচ্ছি। একটু ঘুমিয়ে নিলাম। এক কাপ কফি হবে?

'চা-কফি সবই হবে।'

'কফি।'

বলে হাত বাড়িয়ে দিলাম আমি।

এ সময় দেখি জাহানারা আর সফদর আলী পাশের করিডোর পার হয়ে কাউন্টারের দিকে আসছেন। সফদর আলী জাহানারার কানে কানে ফিসফিস করে কি যেন বলছে। আর জাহানারা মুচকি মুচকি হাসছে। কাউন্টারে আমাকে দেখেই উভয়ই থতমত গেয়ে দাঁড়িয়ে পড়লো। 'এই কবি সাহেব'

হাত বাড়িয়ে দিয়ে সফদর আলী আমাকে সম্বোধন করলো। আমি বললাম, 'এখন তো দেখতে পাচ্ছি আপনিই কলির কৃষ্ণ।'

সফদর হাসল। একটা অপরাধী ভাব। এর মধ্যে জাহানারা তার সঙ্গীর অলক্ষ্যে আমার দিকে তাকিয়ে চোখ টিপি দিল। বুঝলাম যে সফদর আলীর মত বেসামাল বোকা বোয়ালকে তার ছলাকলায় একদম গেঁথে ফেলেছে। আমি মনে মনে হাসলাম। জাহানারাকে বললাম, 'তুমি অনুষ্ঠানে কোরাসের দলে যাওনি?'

'গিয়েছিলাম তো। এই নাছোরবান্ধা কফির নাম করে নিয়ে এসেছে।' বলুন তো, রেজা ভাই জানলে রাগ করবে না?'

আমি বললাম, 'রেজার বিরক্ত হওয়ারই কথা। তুমি বরং কফি শেষ করে এখনি চলে এসো।

আমি রেজাকে বলবো।'

জাহানারা কফি হাতে নিয়ে আবার আমার দিকে দ্রুভঙ্গি করে কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করলো। আমি কাপ রেখে জাহাজের পেছন দিকে হাঁটা দিলাম।

অনুষ্ঠান কেন্দ্রে এসে দেখি এলাহি কান্ড। জাহাজের পেছন দিকটা একটা হল ঘরের মত করে সাজানো হয়েছে। মেধাবী ছাত্রছাত্রীরা সিনিয়রিটি অনুযায়ী শ্রেণীবদ্ধ হয়ে আসন গ্রহণ করেছে। আলোকমালায় চতুর্দিকটা একটা অতিকায় ময়ূরের মত পেখম মেলে কাঁপছে। পেছনে বয়ে যাচ্ছে সমুদ্র তরঙ্গের বিপুল গর্জন। শাদা ফেনায়িত জলরাশি ঘূর্ণি তুলে জাহাজ থেকে দ্রুত পেছনে সরে যাচ্ছে। যেন কোনো অকথিত সঙ্গীতধ্বনি শোনার ব্যাকুলতা অপেক্ষমান দর্শক ও শ্রোতাদের বুকে ঢপ ঢপ শব্দ তুলছে। মুহূর্তটির গাম্ভীর্য দেখে আমার কেন জানি রিলকের কবিতায় ভেনাসের জন্মমুহূর্তের কথাটি মনে পড়লো। এমনি তরঙ্গায়িত সমুদ্র থেকে একদিন সদ্যোত্থিতা এক অতিকায় শুশুকমাতার বিদীর্ণ উদর ছেড়ে একটু একটু করে বেরিযে এল এক নগ্ন পূর্ণগঠিতা নারী। কাম ও সৌন্দর্যের দেবী আফ্রোদিতি। যাকে কবিরা তাদের ভেনাস বলে অর্ঘ্যদান করে এসেছে যুগে যুগে। এই প্রথম সমুদ্রের সীমাহীন বিশালতা আমার মনে এক রহস্যময় আবেগ সৃষ্টি করলো। একেই সম্ভবত রবীন্দ্রনাথ 'অকারণ পুলক' বলে আখ্যায়িত করেছেন। আমি আমার রক্তের মধ্যে এক অকারণ পুলক অনুভব করতে লাগলাম।

আমাকে দেখেই রেজা ছুটে এসে বলল, 'তাড়াতাড়ি পাশের কামরায় চলুন। কি কি গান গাওয়া হবে তা ঠিক করে নেই। প্রেসিডেন্ট পনেরো মিনিটের মধ্যে নিচে আসছেন।'

আমি বললাম, 'এত আকুল হওয়ার কি আছে। সবতো তৈরিই আছে। প্রথম মনিরুজ্জামান মনিরের প্রথম বাংলাদেশ আমার। তারপর তার প্রিয় গান কারার ঐ লৌহ কপাট। এরপর প্রেসিডেন্টের বক্তৃতার পর উদ্দীপনামূলক কনসার্ট। মিউজিক শেষ হলে লোকমান ফকিরের একটি আধ্যাত্মিক গান ও এক আধটি লোকসঙ্গীত। এই তো!'

রেজা হেসে বলল, 'অদ্ভুত মানুষ আপনি। আপনার মধ্যে কোন টেনশন কাজ করে না। আমার তো অস্বস্তি আর ভয়ে শরীর কাঁপছে। অনুষ্ঠানটা যদি ফ্লপ হয়?'

আমি হাসলাম। হঠাৎ জাহানারার কথা মনে পড়ায় বললাম, 'জাহানারা এক কাপ কফি খেতে ওপর তলায় গেছে। আমকে বলে গেছে। এক্ষুনি ফিরবে।'

রেজা ক্ষেপে গিয়ে বলল, 'আমি সব জানি। ঐ সফদর আলীটা মেয়েটাকে ভোলাচ্ছে। যদি জাহানারার অভাবে কোরাস ভালো না হয় তবে ব্যাটাকে আমি গভীর রাতে সবার অজান্তে দরিয়ায় ফেলে দিয়ে হাঙর দিয়ে খাওয়াবো। এই অনুমতি আপনার কাছ থেকে আগেই নিয়ে রাখলাম।'

'আমার মনে হয় তোমাকে আর এত কষ্ট পোহাতে হবে না। বঙ্গোপসাগরের হাঙরের হিংস্রতার সুনাম আছে বটে। কিন্তু সফদর এর চেয়েও ভয়াবহ হিংস্রপ্রাণীর পাল্লায় আছে। তোমাকে চিন্তা করতে হবে না।'

আমার কথায় রেজা হো হো করে হেসে উঠলো, 'আসুন আমরা গিয়ে দর্শকদের কাতারে বসে পড়ি। প্রেসিডেন্টের আসার সময় হয়ে গেছে। আমি ও রেজা সবার পেছনের সারিতে গিয়ে বসলাম।

হঠাৎ দেখি নিরাপত্তারক্ষীদের কর্ডন ভেদ করে মহামান্য প্রেসিডেন্ট এগিয়ে আসছেন। দর্শক শ্রোতাদের সাথে আমরাও উঠে দাঁড়ালাম। তিনি হাতের ইঙ্গিতে আমাদের বসতে বললেন। আমরা বসামাত্রই তখনকার ক্ষমতাসীন পার্টির মহাসচিব ডাঃ বদরুদ্দোজা চৌধুরী মাইকটি তার সামনে এগিয়ে দিলেন। মাইকটির দিকে এক পলক তাকিয়েই প্রেসিডেন্ট তার স্বভাবসূলভ সৌজন্য প্রকাশ করে বক্তৃতা শুরু করলেন। সম্ভবত এখন তার চশমা ঢাকা রহস্যময় বিষন্ন চোখ উৎকর্ণ হয়ে থাকা দেশের মেধাবী ছাত্রছাত্রীদের দলটাকে অবলোকন করছে।

শোন ছেলেমেয়েরা, আমি তোমাদের বাংলাদেশের ডাঙা থেকে তুলে উত্তাল বে অব বেঙ্গলের মধ্যখানে নিয়ে এসেছি।'

এইভাবে, বেশ একটু আবেগময় কণ্ঠে প্রেসিডেন্ট তার বক্তব্য শুরু করলেন। ছাত্রছাত্রীদের ফিসফিস মুহূর্তে স্তব্ধ। শুধু সাগরের উত্তাল তরঙ্গের উচ্ছাস ও জাহাজের মেশিনঘর থেকে গা রি রি করা একটা মৃদু ধাতব শব্দ ভেসে আসতে লাগলো।

'সমুদ্র হল অন্তহীন পানির বিস্তার ও উদ্দাম বাতাসের লীলাক্ষেত্র। এখানে এলে মানুষের হৃদয় একই সাথে উদার ও উদ্দাম সাহসী হয়ে উঠে। অন্তত উঠতে বাধ্য। আমি কি ঠিক বলিনি?

আমাদের দিকে দৃষ্টি নিবদ্ধ রেখে সরাসরি প্রশ্ন করলেন প্রেসিডেন্ট জিয়া। কেউ কোনো কথা বলল না। ক্ষণকাল বিরতি দিয়ে তিনি নিজেই তার বক্তব্যকে সমর্থন করলেন, 'আমি ঠিকই বলেছি। তোমার আমার বাংলাদেশের প্রতিটি নাগরিকের সংকীর্ণতা ও কুপমন্ডুকতাকে পরিহার করে সমুদ্রের মত উদার ও ঝড়ো হাওয়ার মতো সাহসী হতে হবে।'

'আমি তোমাদের কাছে এখন যে কথা বলবো তা আমাদের জাতির জন্য এক ঐতিহাসিক তাগিদ। এই তাগিদকে স্মরনীয় করার জন্য আমি একটা পরিবেশ খুঁজছিলাম। হঠাৎ বঙ্গোপসাগরের কথা মনে পড়লো। এই উপসাগরেই রয়েছে দশ কোটি মানুষের উদরপূর্তির জন্য প্রয়োজনেরও অতিরিক্ত আহার্য ও মূল ভূমি ভেঙে আসা বিপুল পলিমাটির বিশাল দ্বীপদেশ যা আগামী দু-তিনটি প্রজন্মের মধ্যেই ভেসে উঠবে। যা বাংলাদেশের মানচিত্রে নতুন বিন্দু সংযোজনের তাগিদ দেবে। মনে রেখো, আমাদের বর্তমান দারিদ্র, ক্ষুধা ও অসহায়তা আমাদের উদ্যমহীনতারই আল্লাপ্রদত্ত শাস্তিমাত্র। এর জন্য অন্যের চেয়ে আমরাই দায়ী বেশি।

আমাদের ভিটা ভাঙা পলি যেখানেই জমুক তা তালপট্টি কিংবা নিঝুম দ্বীপ এই মাটি আমাদের। দশ কোটি মানুষ সাহসী হলে আমাদের মাটি ও সমুদ্র-তরঙ্গে কোন ষড়যন্ত্রকারী নিশান উড়িয়ে পাড়ি জমাতে জাহাজ ভাসাবে না।

মনে রেখো, আমাদের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র চলছে। আমরা দশ কোটি মানুষ যথেষ্ট সাহসী নই বলে শত্রুরা, পররাজ্য লোলুপ রাক্ষসেরা আমাদের পূর্বপুরুষদের এই স্বাধীন জলাধিকারে আনাগোনা শুরু করেছে। তোমরা বাংলাদেশের সবচেয়ে মেধাবী ছেলেমেয়ে, দেশের দরিদ্র পিতামাতার সর্বশেষ আশার প্রাণকণা, যাদের ওপর ভরসা করে আছে সারাদেশ, সারা জাতি। তোমরাই হলে বাংলাদেশের হাজার বছরের পরাধীনতার কলঙ্ক মোচনকারী প্রত্যাশার আনন্দ-নিঃশ্বাস। ইতিহাসের ধারায় দৃষ্টিপাত করলেও তোমরা জানবে এই সমুদ্র ছিল আমাদের আদিতম পূর্বপুরুষদের নৌশক্তির স্বাধীন বিচরণভূমি। এমন কি বৌদ্ধযুগে পাল রাজাদের অদম্য রণপোতগুলো এই জলাধিকারে কাউকেই অনাধিকার প্রবেশ করতে দেননি। সন্দেহ নেই আমাদের সেসব পূর্বপুরুষগণ ছিলেন যথার্থই শৌর্যবীর্যের অধিকারী। আমরা সারাটা উপমহাদেশ, সমুদ্রমেঘলা দ্বীপগুলো আর আসমুদ্র হিমাচল শাসন করেছি।

বলো, করিনি কি?'

প্রেসিডেন্ট তার সামনে উপবিষ্ট একটি ছেলের দিকে আঙ্গুল তুলে আকস্মিকভাবে প্রশ্ন করলেন। এটাই তার কথা বলা অর্থাৎ ভাষণ দেয়ার ভঙ্গী। আমরা সকলেই তার ভাষণের সাথে এ অভ্যেসের ইঙ্গিত ধরতে পারতাম। কিন্তু সামনের ছেলেটি সম্ভবত মহামান্য প্রেসিডেন্টকে আর কখনও এমন কাছে থেকে দেখেনি। সে একটু থতমত খেয়ে উঠে দাঁড়াল কিন্তু জবাব দিল নিষ্কম্পভাবে, হাঁ করেছি।'

'আলবৎ করেছি।'

প্রেসিডেন্ট মহাউল্লাস প্রকাশ করে হাসলেন। তারপর একটু নরম হয়ে বললেন, 'তুমি কি সেই বীরদের কারো নাম জানো?'

'রাজা মহীপাল।'

তড়িত জবাব দিল ছেলেটি। তার চেহারায় ফুঠে উঠলো একটা দিগবিজয়ীর ভাব। এবার

তাকে বেশ চটপটে আর সপ্রতিভ মনে হল।

প্রেসিডেন্ট তার জবাবে চমৎকৃত হলেন। বললেন, 'তুমি ঠিক বলেছো মাই সান। তুমি কি ইতিহাসের ছাত্র?'

'না, মিষ্টার প্রেসিডেন্ট, আমি রসায়নের ছাত্র।'

'বিউটিফুল।'

প্রেসিডেন্ট খুশিতে হাততালি দিলেন। আমরাও তার সাথে ছেলেটিকে অভিনন্দিত করতে হাততালি দিলাম। প্রেসিডেন্ট ছেলেটিকে হাতের ইঙ্গিতে বসতে বললেন। ছেলেটি খুশি হয়ে বসে পড়লো।

ভাষণ আবার শুরু হলো।

'প্রকৃতপক্ষে আমার স্বজাতির মধ্যে মেধারও অভাব নেই। এই ছেলেটির কথাই ধরা যাক না। সে কেমিষ্ট্রির ছাত্র কিন্তু ইতিহাস জ্ঞানও বেশ টনটনে। এরাই জাতির ভবিষ্যৎ নির্মান করবে। 'শোন ছেলেমেয়েরা, আমি তোমাদের সান্নিধ্য পেয়ে খুবই খুশী। তিনটি দিন ও তিনটি রাত আমরা এই দরিয়ার নোনা বাতাসে দম ফেলতে এসেছি। এখন এই জাহাজটিই হল বাংলাদেশ। আর আমি হলাম তোমাদের ক্যাপ্টেন।'

তার কথায় ছেলেমেয়েরা হাততালি দিয়ে আনন্দ প্রকাশ করলো।

'আমি চাই আমাদের দেশের প্রতিভাবান ছেলেমেয়েদের মধ্যে একটা চাক্ষুষ পরিচয় ও বন্ধুত্বের আদান-প্রদান হোক। চেনা-জানা থাকলে পারস্পারিক আতীীয়তা রচিত হয়। হয়না কি?'

'ইয়েস মিস্টার প্রেসিডেন্ট।'

সবাই আমরা একসাথে জবাব দিলাম। ছেলেমেয়েদের সাথে আমি, রেজা, গানের আর্টিস্টগণ ও রাজনৈতিক নেতারা। এমন কি ডাঃ চৌধুরীও। সকলেই আমরা মুহূর্তের জন্যে ছেলেমানুষ বনে গেলাম। যেন মহামান্য প্রেসিডেন্ট আমাদের সুদূর বাল্যের সেই রূপকথার রাজা কিংবা আরব্য উপন্যাসের সিন্ধাবাদের দরিয়ায় ভাসিয়ে দিয়েছেন। বাইরে আকাশের কিনারায় তখন তারা ফুটতে শুরু করেছে। আকাশে সামান্য মেঘের ছিটেফোঁটা আর দরিয়ার লোনা বাতাসের প্রবল দাপাদাপি।

আমাদের জাহাজটির গতিবেগ এখন কত তা না জানলেও, এর দ্রুততা আমরা সকলেই অনায়াসে উপলব্ধি করছিলাম।

আমরা জাহাজের একেবারে পেছনে বলে বাতাসের ধাক্কাটা ঠিকমত উপলব্ধি করতে পারছিলাম না। কিন্তু সমুদ্রের উদ্দামতা বলে দিচ্ছে ঝড়ের সাথে ঢেউয়ের ফণাগুলো উচ্ছ্বসিত হয়ে খেলছে। সারাদিনের লবণগন্ধে আমার নাক ও চোক জ্বালা করছিল।

'আমি তোমাদের কাছে আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ তথ্য ব্যক্ত করতে চাই।'

এই কথা বলে প্রেসিডেন্ট মাইকটা সরিয়ে সামনে উপবিষ্ট বাংলাদেশের মেধাবী তরুন-তরুণীদের আশা ও রোমাঞ্চে শিহরিত মুখগুলো এক নজর দেখে নিলেন। গগলসের জন্য তার বিষন্ন চোখ দুটি কেউই দেখতে পাচ্ছিলনা। আহ, সে সময় যদি তার চোখে ঐ কালো সর্বগ্রাসী চশমাটা না থাকতো, কতই না ভালো হতো! তিনি শেষ পর্যন্ত স্ট্যান্ড থেকে মাইকের মাউথপিসের কালো লম্বা দন্ডটা হাতে নিলেন।

'আমাদের রয়েছে যোজন যোজন উর্বরা জমি। একটু আয়েসের ফলেই যেখানে ফসলে ঘর ভরে যেতে পারে। অর্থের অভাবে শুধু কোনো বৈজ্ঞানিক চাষের উদ্যম নেওয়া যাচ্ছে না। কে আমাদের বিনা স্বার্থে এই উদ্যমে সহায়তা করবে? কেউ করবে না। অথচ যে সম্পদের বিনিময়ে অর্থের প্রাচুর্য ঘটে তা আমাদের দেশের পেটের ভেতরেই জমা আছে। আমরা তুলতে পারছি না।

'কি সেই সম্পদ যা আমরা তুলতে পারছি না? তোমরা কি জানো সেই লুক্কায়িত সাতরাজার ধন কি? কোথায় সেগুলো আছে? সেই সাতরাজার ধন হল তেল, গ্যাস, কয়লা, চুনাপাথর আরও অনেক কিছু।'

কে একটি ছাত্রী প্রশ্ন করলো, 'গ্যাস তো আমরা খানিকটা তুলেছি। আমাদের কি তেলও আছে? পেট্রোল?'

'হাঁ। গ্যাস আমরা খানিকটা তুলেছি বটে। তবে এর বিপুল ভান্ডারে এখনও হাত দিইনি। গ্রামে গ্রামে জ্বালানি সরবরাহের জন্য তিতাস, বাখরাবাদের অসংখ্য গ্যাস কেন্দ্র দরকার। দরকার দেশের কোনো কোনো অঞ্চলের গ্যাসের পরের স্তর থেকে তেল নিংড়ে বের করে আনা।'

বেশ দৃঢ়তা ব্যাঞ্জক এক কণ্ঠস্বর বেরিয়ে এল প্রেসিডেন্টের আবেগহীন উচ্চারণ ভঙ্গী থেকে। এবার অন্য একটি মেয়ে উঠে দাঁড়াল। আমি পেছনে থেকে বুঝতে পারলাম, এই ছোটোখাটো মেয়েটি নঈমা।

'প্রেসিডেন্ট জিজ্ঞেস করলেন, 'তুমি কি কিছু বলবে?'

'আমাদের কি তবে জ্বালানি তেলও আছে?'

বেশ বিনীতভাবে জানতে চাইল নঈমা।

প্রেসিডেন্ট তার প্রশ্নের জবাব না দিয়ে তাকে হাতের ইঙ্গিতে বসতে বললেন। নঈমা বসে পড়লে প্রেসিডেন্ট তার পাশে রক্ষীর হাতে ধরা একটা ছোট্ট ব্যাগের দিকে হাত বাড়িয়ে দিলেন। লোকটি দ্রুত ব্যাগটির চেইন খুলে একটা শিশি বের করে তার হাতে দিল। প্রেসিডেন্ট শিশিটা হাতে নিয়ে একটা ঝাঁকুনি দিলেন। আমি পেছন থেকে হাতের শিশিটা

যতটুকু দেখতে পাচ্ছিলাম তাতে মনে হল এতে ফেনায়িত হলুদ একটা তরল পদার্থ ঝলকাচ্ছে।

'এতে আছে বাংলাদেশের পেটের ভেতরে লুক্কায়িত সাতরাজার ধন, পেট্রোল। বিশুদ্ধ পেট্রোল। যা পুড়িয়ে বিমান, গাড়ি, অসংখ্য ভারী যানবাহন সমুদ্রে জাহাজ অনায়াসে চলাচল করতে পারবে। শক্তির ধাত্রী এই তেল। আল্লাহর সর্বশ্রেষ্ঠ নিয়ামত। তোমরা ভালো করে দেখে রাখো ছেলেমেয়েরা, আমার হাতের মুঠোয় রয়েছে সেই মহার্ঘ নিয়ামত যা বাংলাদেশের সীমানার ভেতরে, মাটির উদরে তোমাদের জন্যে অপেক্ষা করছে। যা ক্রমাগত বাধার ফলে আমি শত চেষ্টা সত্ত্বেও তোমাদের ভাগ্য ফেরাতে তুলে আনতে পারছি না।'

এক নিঃশ্বাসে কথাগুলো বলে প্রেসিডেন্ট যেন একটু ক্লান্ত হয়ে পড়লেন। তিনি আবেগ বিহ্বলের মত একটু পাশ ফিরে ডাঃ চৌধুরীর দিকে তাকালেন। তারপর মুহূর্তের মধ্যে মুখ ফিরিয়ে শ্রোতদের স্তব্ধতা উপলব্ধি করে শান্ত কণ্ঠে বললেন, 'আমার জীবৎকালে সম্ভবপর না হলে তোমরা, আমার ছেলেমেয়েরা, এই তেল তুলবে।'

তার কথায় একটা গভীর স্তব্ধতা নেমে এল। কারো মুখে কোনো কথা নেই। সাহস নেই কোনো সম্পূরক প্রশ্ন উত্থাপনের। স্তব্ধতার মধ্যে জাহাজের গায়ে ক্রমাগত আছড়ে পড়া ঢেউয়ের ফোঁপানি শোনা গেল।

ডাঃ চৌধুরী হাতের ইশারায় আমাকে অনুষ্ঠান শুরুর অনুমতি দিলে আমি রেজার দিকে তাকিয়ে বললাম, 'দলীয় সঙ্গীত দিয়ে এ অনুষ্ঠান শুরু না করে নজরুলের 'কারার ঐ লৌহ কপাট, গেয়ে শুরু করা হোক।'

রেজা আমার ইশারা ও পরিবেশের মমার্থ বুঝতে পেরে সম্মতি জানিয়ে কোরাসদলের কাছে গিয়ে জাহানারাকে কানে কানে কি যেন বলল। জাহানারা যথারীতি ড্রাম বাদকদের নির্দেশ দিয়ে গেয়ে উঠল :

'কারার ঐ লৌহ কপাট

ভেঙে ফেল কররে লোপাট

রক্ত জমাট শিকলপূজার পাষাণবেদীÑ

ড্রাম, তবলা অন্যান্য সঙ্গীত যন্ত্রের সম্মিলিত শব্দে জাহাজ তথা আমাদের অনুষ্ঠান কেন্দ্রের গুরুগম্ভীর ভাবটা মুহূর্তের মধ্যে অন্তনির্হিত হয়ে হঠাৎ জীবন্ত ও উত্তেজনাপূর্ণ হয়ে উঠলো। শ্রোতারা হাততালি দিয়ে কোরাসের মেয়েদের সাথে গলা মেলাতে শুরু করেছে। প্রেসিডেন্ট নিজেও হাততালি দিচ্ছেন। এমন কি তার রক্ষী এবং উপস্থিত নাবিকগণও।

আমি শুধু চুপচাপ বসে প্রেসিডেন্টের মুখের দিকে তাকিয়ে রইলাম। যদিও তিনি তালি বাজিয়ে সকলকে উৎসাহ দিচ্ছেন তবুও তার মুখখানিতে এক ধরনের নিঃসঙ্গ বেদনার ছাপ।

দুরুহ পথের যাত্রীরা যেমন যাত্রার আগে নিজের একাকিত্বের ভার আত্মীয়দের আত্মায় না ছড়িয়ে হাসিমুখে করমর্দন করতে করতে নিজের এলাকা থেকে বেরিয়ে পড়েন। তার মুখও সেইসব অভিযাত্রীর মতই। কয়েকটি গান শুনে সকলকে ধন্যবাদ জানিয়ে তিনি উঠে দাঁড়ালেন। সেন্ট্রি সচকিত হয়ে তার জন্য পথ তৈরি করলো। আমরা উঠে দাঁড়ালাম। সামরিক সৌজন্যসহ তিনি তার কেবিনের দিকে হাঁটতে লাগলেন। তার চলে যাওয়ার পরও অনুষ্ঠান চলতে লাগলো। আমার আর ভালো লাগলো না। আমি ওপর তলায় রেলিং ধরে দাঁড়িয়ে সমুদ্র দেখতে চলে গেলাম।

আমি হাঁটতে হাঁটতে জাহাজের সামনের দিকে যেখানে থেকে উন্মুক্ত দরিয়া দেখা যায় এসে দাঁড়ালাম। প্রকৃতপক্ষে এখান থেকে এই রাতের বেলায় ছায়াচ্ছন্ন সাগরের তরঙ্গোচ্ছাসে কিছুদূর পর্যন্ত দেখা গেলেও বহুদূর পর্যন্ত দৃষ্টি চলে না। এর মধ্যে আকাশের ঈশান কোণে একখন্ড মেঘ স্থির হয়ে আছে। আর তার পাশেই একটু অপূর্ণ গোলকের চাঁদ উঠেছে।

চাঁদের ঈষৎ অপূর্ণতা দেখেই বোঝা যায় আগামীকালই পূর্ণিমা। বাতাসের বেগ একটু স্তিমিত হলেও নিচে ঢেউয়ের লাফানি পুরোদমে চলছে। আমি জাহাজের একেবারে গতিমুখের কাছে এসে দাঁড়ালাম। এখানেও রেলিংয়ের সাথে জীবনবয়া বাঁধা। আমি রেলিংয়ের নলে পেট ঠেকিয়ে দাঁড়ালাম। একটা সিগ্রেট জ্বালিয়ে তাকিয়ে রইলাম অন্তহীন জলধির দিকে।

এভাবে কতক্ষণ দাঁড়িয়েছিলাম জানি না। হঠাৎ সফদর আলীর ডাকে পেছন ফিরে দেখি ভদ্রলোক এগিয়ে আসছেন। আমার পাশে এসে বললেন, 'দরিয়া দেখে কবি সাহেবের বুঝি কবি ভাব জেগে উঠেছে?'

আমি হেসে বললাম, 'ঠিক ধরেছেন। এমন সুন্দর পরিবেশে মনটা একটু উদাস হয়েছে বৈকি! তা আপনি নীচের গান বাজনা ফেলে জাহাজের খোলে ভুতের মত ঘুরে বেড়াচ্ছেন কেন?

আমার কথা শুনে সফদর আলী অদ্ভুদ ভঙ্গী করে তার মুখটা আমার কানের কাছে এগিয়ে আনলো, 'আমাকে জিনে পেয়েছে।'

আম বললাম, 'একটু সাবধানে থাকা ভালো। আপনার ওপর যে জিনের আছর হয়েছে সে কেমন কোরাস গায় দেখেছেন তো! ভীষন তেজী জিনকন্যা। আপনাকে না শেষ পর্যন্ত দরিয়ায় ডুবিয়ে মারে।'

'আমি তো ডুবতেই চাই।'

'তাহলে চেষ্টা চালিয়ে যান। আখেরে ফল ভালোও হতে পারে। তবে আজকালের জিনদের মতি গতির কোন হদিস পাওয়া যায় না। তার ওপর পরীর চেয়ে খুবসুরত এই জিনটা আবার অর্থনীতির ছাত্রী। আপনার মুরদ কত সে ঠিক অংক কষে বের করে ফেলবে।'

আমার কথায় সফদর আলী বোকার মত হাসল।

'প্রেসিডেন্টের ভাষণ কেমন লাগল?'

আমি আবার একটা সিগ্রেট ধরালাম।

'যতসব বাজে কথা! বাংলাদেশে আবার তেল নাকি? এ সব কথা বলার জন্য সমুদ্দুরে আসতে হয় বুঝি। খেয়াল! কোথায় ইলেকশন সম্বন্ধে দুয়েক কথা শুনবো, তা নয় যতসব গালগল্প। এবার নমিনেশন না পেলে পার্টি ছেড়ে বিরোধী দলে নাম লেখাবো।'

'সেখানে সম্ভবত আপনার আরাম হবে না। সেখানে তো আরও দুঃখ-কষ্ট পোহাতে হয়।

জেল-জুলুম, লাইসেন্স-পারমিট বাতিলের আশংকা। আপনি টাকাঅলা লোক আপনার কি বিরোধী দলে পোষাবে?'

'আপনি ঠিকই বলেছেন। অপজিশন আবার মানুষ করে? দেখুন, ঢাকায় আল্লার রহমতে তিনটি বাড়ি আছে। ভালো ব্যবসা আছে, আমার কি অপজিশন পোষায়?'

বেশ চিন্তিত ও হতাশ কণ্ঠে বলল সফদর আলী।

আমি হেসে সিগ্রেটে সুখটান দিলাম, 'না না ঐ সব বাজে কাজে আপনার পোষাবে না। তার চেয়ে জিন চরিয়ে, ইলেকশনের জন্য একটা নমিনেশন জোগাড় করে ফেলুন।'

'আপনি একটু সাহায্য করুন না। আপনার সাথে তো ওপরআলাদের খাতির আছে। ডাঃ চৌধুরীকে একটু ধরুন না। আমার নামটা একবার ঢুকিয়ে দিক। কাজে হাসিল হলে আপনাকে খুশি করে দেব। ঢাকায় কি আপনার বাড়ি আছে?'

নিগুঢ় বিনয় ও চতুরতার সাথে প্রশ্ন করলো সফদর আলী। আম বললাম, 'না।'

'জায়গাজমি?'

'না, তাও নেই।'

'তাহলে কি আছে?'

'এই কয়েকটি কবিতা আর গল্পের বই।'

'আরে সাহেব বই কি কোনো কাজের জিনিস হলো? বই কোনো ভদ্রলোকের সম্পত্তি হতে পারে?'

আমি বললাম, 'ঠিক জানি না। আমি বিল্ডিং বানাতে শিখিনি, বই বানিয়েছে। আপনার বিল্ডিং আছে, আমার আছে বই।'

গোল্লায় যাক আপনার বই। কবিদের দ্বারা কিছু হবে না। কবিরা হলো গিয়ে মজনু পাগল।'

আমি এ কথার কোনো জবাব না দিয়ে হাসলাম। সফদর পকেট থেকে সিগ্রেট বের করে ধরালো। সমুদ্রের দিকে উদাসভাবে তাকিয়ে বলল, 'কেন যে এই দরিয়ায় এলাম। ঢাকা থেকে মজার শহর দুনিয়ায় আছে নাকি?'

তার বিড়বিড় করার দিকে আমার নজর নেই দেখে সে আবার বলল, 'আপনাদের এই

কোরাসফোরাস কখন থামবে?'

'এতক্ষণ শেষ হয়ে গেছে বোধ হয়।'

আমার কথার জবাব না দিয়ে সফদর রওনা দিল। আমি বললাম, জিনের খোঁজে যাচ্ছেন বুঝি?'

সফদর আমার দিকে ফিরে দাঁড়িয়ে বলল, 'আপনার দ্বারা কিছু হবে না সাহেব।'

আমি হাসলাম।

রাতের খাবার খেয়ে আমি ও রেজা কেবিনে এসে শুয়ে পড়লাম। সমুদ্রের দিকের জানালাগুলো আমরা একসাথে খুলে দিলে চাঁদের আলোতে বিছানা ভেসে গেল। রেজা বালিশ ঠিক করতে করতে বলল, 'নজরুলের গান দিয়ে অনুষ্ঠান করতে বলায় আপনাকে ধন্যবাদ জানাচ্ছি।'

'গানটা তার খুবই প্রিয়। পরিবেশের চাহিদা বুঝে আমি এ গান দিয়েই শুরু করতে বলেছিলাম।'

হ্যাঁ। আজ খুব জমেছে।'

'জাহানারার আরম্ভটা খুব নাটকীয় হয়েছে।'

বললাম আমি।

'গানের সময় প্রেসিডেন্ট হাততালি দিয়ে কাঁদছিলেন, আপনার নজরে পড়েনি?'

'না তো!'

'আমি বুঝতে পেরেছি। গগলস ঢাকা না থাকলে পানি গড়িয়ে পড়া দেখা যেত। দেখলেন না

গানের অন্তারাটা শুনেই উঠে দাঁড়ালেন। তিনি তার আবেগকে ধরে রাখতে পারছিলেন না। সমুদ্রের সামনে এলে মানুষ বদলে যায়। দেখলেন তো আজ কি নিয়ে বক্ততা করলেন, এমন না হলে দেশের স্বাধীনতার ঘোষণা দিতে পারতেন না। দেখবেন তিনি একদিন

বাংলাদেশকে সলভেন্ট করে ছাড়বেন।'

আমি বললাম, 'এ বড় শক্ত কাজে রেজা। খুবই বিপদসঙ্কুল।'

'জানি। তিনি তো আজ বললেন। আসুন এখন ঘুমোই সকালে নৌ মহড়া দেখবো।' বলে রেজা পাশ ফিরে ঘুমিয়ে পড়লো।

বাড়ির নির্দিষ্ট ঘর ও বিছানা ছাড়া আমার সহজে ঘুম পায় না। আমি জানালা দিয়ে পূর্ণিমার পূর্বরাতের অপূর্ণাঙ্গ বিশাল চাঁদের দিকে তাকিয়ে রইলাম। পানির গর্জন এখন ঠিকমত বোঝা যাচ্ছে। মেশিন ঘরের শব্দও রি রি করে আমার ইনসমোনিয়াকে বাড়িয়ে দিচ্ছে। কয়েকবার চাঁদের দিকে না তাকিয়ে চোখ বুজে রাখতে চেষ্টা করলাম। কিন্তু বৃথা চেষ্টা। ঘুম নেই। বিছানায় উঠে বসে জানালার দিকে তাকালাম। একটা বাতাসের ঝাপটা লাগলো মুখে। কেবিনের ভেতরে ফ্রেসনারের মৃদু গন্ধ থাকলেও সমুদ্রের বাসি লবন গন্ধ এসে ঘরের কাপড়-চোপড় দোলাচ্ছে। আমি একটা সিগ্রেট ধরিয়ে বসে থাকলাম।

একবার ভাবলাম, ঘুম যখন পালিয়েছে তখন কাউন্টারে গিয়ে এক কাপ চা খেয়ে নিতে পারি। কিন্তু রাত এখন ক'টা হল। ঘাড় উল্টিয়ে নিরাশ হলাম। রাত কাঁটায় কাঁটায় বারোটা। তবুও বিছানা ছেড়ে পোষাক পরে বাইরে এলাম। কেবিনটার অদূরেই কাউন্টার। কাছে গিয়ে দেখি সেখানে কেউ নেই। ক্লোজড্ লেখা একটা প্লেকার্ড খাবার রাখার সাইড শোকেসে ঝুলছে। কাউন্টারের সামনে থেকে একটা টুল টেনে আমি বসে পড়লাম।

হঠাৎ মনে হল এখানে বসে থেকে আর কি হবে? তার চেয়ে বরং জাহাজের ছাদ থেকে একটু ঘুরে আসি। সেখানে এখন হাজার হাজার মাইল সাগরের ঢেউ ছুয়ে মৌসুমী হাওয়া বইছে। ফ্রেস এয়ারে ইনসমোনিয়ার উর্ধ্ব চাপটা নামতে পারে।

সামনেই জাহাজের ছাদে যাওয়ার দু প্রস্থ সিঁড়ি। একটা সিঁড়ি উঠে গেছে বাঁ দিকে। যেখানে প্রেসিডেন্ট ও তার রক্ষীদের কেবিনগুলোর পাশ কাটিয়ে রাস্তা ছাদের দিকে উঠে গেছে। অন্য সিঁড়িগুলো ডাকদিকে বিছানো। যেদিকে প্রথমে পড়বে ক্রুদের কেবিনগুলো। একটু এগুলেই ছাদ ফুঁড়ে সিঁড়ি উঠে গেছে জাহাজের প্রধান চিমনির কাছে। আমি দ্বিতীয় সিঁড়ির দিকে এগোলাম। বাঁ দিকের সিঁড়ি ধরলে প্রেসিডেন্টের সিকিউরিটি গার্ডরা চ্যালেঞ্জ করতে পারে। এত রাতে ছাদে যাওয়ার যুক্তি তারা মানবে কেন?

আমি ডান দিকের সিঁড়ি বেয়ে ক্রু কেবিনের পাশ দিয়ে হেঁটে এসে অন্য একটা ছোট সিঁড়ি দিয়ে সোজা ছাদে এসে দাঁড়ালাম। মুক্ত উদ্দাম বাতাসে আমার শার্ট বেলুনের মত ফুলে উঠলো। এখানে এখন কেউ নেই। তবে জাহাজের মুখের দিকে একটা ছোট ঘর। হয়তো বা কোনো কিছুর নিয়ন্ত্রণ কোঠরি। আমার ডান দিকে বিশাল চিমনি অস্পষ্ট ধোঁয়া উগড়ে তুলে দৈত্যের মত দাঁড়িয়ে আছে। চিমনির ওপাশে কি আছে এখান থেকে বুঝা যাচ্ছে না। যদিও চাঁদের আলো ও দরিয়ার ঢেউয়ের ঝকমকানিতে জাহাজের দ্রুত ধাবমান গতিকে বুঝতে কষ্ট হচ্ছে না। তবুও সবকিছুই এখন এই সামুদ্রিক মধ্যরাতে যেন স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। কোনো দিকেই দিগন্তরেখা দেখা যাচ্ছে না। পানির ওপর চাঁদের আলোর অনবরত ভাঙ্গনের ফলে সমুদ্রের বিস্তার এই গভীর রাতেও বহুদূর পর্যন্ত দেখা যায়। তবে দিগন্ত রেখায় গোলাকার অন্ধকার ছড়ানো।

আমি একটা বসার জায়গা খুঁজছিলাম। হাঁটতে হাঁটতে চলে এলাম চিমনির ওপাশটায়। সেখানে গিয়েই মনে হল চিমনির ছায়ার অন্ধকারে কে একজন ছায়ামূর্তি বসে আছে। আমার পদশব্দে ছায়ামূর্তিও সচকিত হয়ে উঠলো, কে?'

আমি একটু এগিয়ে জবাব দিতে গিয়ে চমকে উঠে দেখলাম মহামান্য প্রেসিডেন্ট স্রেফ সাদা লুঙ্গি পরে একটা টুলের ওপর বসে আছেন। আমি বললাম, 'স্যার এত স্যান্ডো গেঞ্জি ও রাতে আপনি এখানে একা?'

'ও কবি! না ঠিক একা নই ছাদের নিচে তো অনেক মানুষ ঘুমোচ্ছে। শুধু দেখছি আপনি আর আমিই জেগে আছি। বসুন।'

'আপনার নিরাপত্তা রক্ষীরা?'

'তারাও সম্ভবত ঘুমিয়েছে। তা না হলে আমাকে এখানে আসতে দেখে আশেপাশে দাঁড়িয়ে

থাকতো নিশ্চয়।'

'আপনার কি এভাবে একা বেরুনো উচিত?'

'সম্ভবত নয়। সমুদ্রে চাঁদের খেলা দেখবো বলে এসেছি। আমারও ঘুম পাচ্ছে না। আজ কি পূর্ণিমা?'

'আগামীকাল কলা পূর্ণ হবে।'

জবাব দিলাম আমি।

'বসুন কবি।'

মহামান্য প্রেসিডেন্ট দ্বিতীয়বার আমাকে বসার হুকুম দিলেন। আমি আশেপাশে তার সান্নিধ্যে বসার একটা টুল খুঁজছিলাম। একটি মাত্র টুলে তিনি নিজেই বসে আছেন। আমি একটু ইতস্তত করে তার টুলটার পাশে ছাদেই বসে পড়লাম। তিনি আপত্তি করলেন না।

'আপনার কি ঘুমের অসুখ?'

'ইনসমোনিয়া।'

জবাব দিলাম আমি।

'কবিদের, ভাবুকদের একটু অনিদ্রা রোগ থাকা মন্দ নয়। এই চাঁদ, এই সমুদ্র আর সীমাহীন

ঢেউয়ের ছলৎকার শোনার জন্য এক ধরনের মানুষ দরকার। কি বলেন?'

আমি বললাম, 'মহামান্য প্রেসিডেন্টেরও কি ঢেউ গোনার বাতিক আছে?'

'না আমার কোন অনিদ্রা রোগ নেই। আমার ঘুম খুব সাউন্ড। আজই শুধু ঘুম পাচ্ছেনা। শারীরিক শ্রমের কমতি পড়লেই আমার ঘুমের ব্যাঘাত হয়।'

বললেন তিনি।

আমরা উভয়ই কতক্ষণ চুপচাপ বসে রইলাম।

আকাশে তখন মেঘের স্তম্ভটা অন্তর্হিত হয়ে আকাশ-সমুদ্রব্যাপী জ্যোছনার একটা দীপ্তি ফুঠে

উঠছে।

'আপনি সাগরকে নিয়ে কয়টা কবিতা লিখেছেন?'

অকস্মাৎ নীরবতা ভেঙে তিনি প্রশ্ন করলেন।

আমি চুপ করে রইলাম। মনে মনে ভাবলাম, আমার সমুদ্রের ওপর একটাও রচনা নেই, আশ্চর্য!

'একটাও লেখেননি।'

আমি লা-জবাব হয়ে থাকলাম।

'অথচ সমুদ্রই হল অর্ধেকটা বাংলাদেশ। সমুদ্র না থাকলে আমাদের জীবন অর্থহীন হতো।

এই সাগরের অভিজ্ঞত নেই আমাদের এ কালের কবিদের। কি বেদনাদায়ক।'

আমি তাড়াতাড়ি বললাম, 'কাজী সাহেব লিখেছেন। 'হে সিন্ধু বন্ধু মোর....।

'নজরুল সমুদ্রকে বুঝতেন বলেই তার জীবন ছিল উত্তাল। নির্ভীকতা ছাড়া বড় হওয়া যায় না। আপনি নদীর ওপর অজস্র লিখেছেন। আমি পড়েছি। চমৎকার অন্তরদৃষ্টি আপনার। এখন সমুদ্রের দিকে তাকাতে হবে। সমুদ্রই মানবহৃদয়ে স্বাধীনতার আকাঙ্ক্ষাকে বাড়িয়ে দেয়।'

বেশ উদ্দীপিতভাবে প্রেসিডেন্ট কথা বলছেন দেখে আমি বললাম, 'কিন্তু আমার তো সমুদ্রের কোনো অভিজ্ঞতা কিংবা সমুদ্রের সাথে জীবনযাপনের কোনো সম্পর্ক নেই মিস্টার প্রেসিডেন্ট।'

'থাকা উচিত ছিল না?'

এ প্রশ্নের কোনো জবাব খুঁজে না পেয়ে চুপ করেই থাকলাম।

'অথচ উপকূলবাসী অসংখ্য মানুষ, নাবিক, জেলেদের রয়েছে রূপকথার চেয়েও চাঞ্চল্যকর জীবনধারা যা সমুদ্রের সাথে সম্পর্কিত। আপনি তো এদেশেরই কবি।'

'সমুদ্র সম্বন্ধে এখন থেকে আমার অভিজ্ঞতা সঞ্চয় করতে হবে। আপনার কথাগুলো আমার খুবই ভালো লেগেছে মিঃ প্রেসিডেন্ট।'

বেশ গাঢ়স্বরে কথাগুলো বললাম আমি। তিনি হাসলেন কিংবা প্রীত হলেন কিছুই বোঝা গেল না। বাইরে বহুদূরে একটা দূরাগত জাহাজের আলো দরিয়ার ঢেউয়ে হাতড়ে বেড়াতে লাগলো। প্রেসিডেন্ট সেদিকে তাকিয়ে চুপচাপ বসে রইলেন। মনে হল আমার উপস্থিতি তিনি সম্পূর্ণ বিস্মৃত হয়েছেন। আমি সাহস করে বললাম, এখন আপনার ঘুমোতে যাওয়া উচিত।'

'আপনি যান। আমি আরও ক্ষাণিকক্ষণ বসবো। যান ঘুমোন গিয়ে। কাল সকালে নৌ-মহড়া দেখবেন।'

আমি উঠে দাঁড়ালাম। তাকে সালাম জানিয়ে সিঁড়ির কাছে এসে চুপচাপ দাঁড়িয়ে তাকে আবার দেখার জন্য পেছন ফিরলাম। এখান থেকে তার চেহারাটা পরিষ্কার দেখা না গেলেও চাঁদের স্পষ্ট আলোয় নিঃসঙ্গ অবস্থানটি বুঝা যায়। বসে আছেন তিনি বঙ্গোপসাগরের উত্তাল তরঙ্গের দিকে মুখ করে। নিঃসঙ্গ একজন মানুষ। এখন তার চোখে কালো চশমাজোড়া থাকার কথা নয় তবুও আমার মনে হলো তার ভিন্ন চোখ দুটি বুঝি এখনও কোনো কালো আবরণের ভেতর থেকে সন্ধানী দৃষ্টি ফেলে জলের ভেতর জেগে ওঠা বাংলাদেশের নতুন মাটিকে দেখছে। নতুন পলির মানচিত্র তৈরি হচ্ছে তার হৃদয়ে।


লেখক: বাংলাদেশের প্রধান কবি

শেয়ার করুন-

মন্তব্য করুন

Protidiner Bangladesh

সম্পাদক : মারুফ কামাল খান

প্রকাশক : কাউসার আহমেদ অপু

রংধনু কর্পোরেট, ক- ২৭১ (১০ম তলা) ব্লক-সি, প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড) ঢাকা -১২২৯

যোগাযোগ

প্রধান কার্যালয়: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৬৯৬ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (প্রিন্ট): +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮১০, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০ | ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (অনলাইন): +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০, +৮৮০১৭৯৯৪৪৯৫৫৯ । ই-মেইল: [email protected]

সার্কুলেশন: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮০৭, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৩৩২ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন মূল্য তালিকা