মহিউদ্দিন খান মোহন
প্রকাশ : ২৫ মে ২০২৬ ২০:০৩ পিএম
আপডেট : ২৫ মে ২০২৬ ২২:০৪ পিএম
মুম্বাইয়ের অন্যতম হিট সিনেমা ‘নায়ক’ অনেকেই দেখে থাকবেন। শংকর পরিচালিত সে ছবিতে নায়কের নাম ভূমিকায় অভিনয় করেছেন বলিউডের শক্তিমান অভিনেতা অনিল কাপুর। অমরেশ পুরি, পরেশ রাওয়াল, রানী মুখার্জি অভিনীত সিনেমাটি শুধু ভারত নয়, বাংলাদেশেও সমানভাবে দর্শকনন্দিত হয়েছে। মুখ্যমন্ত্রী বলরাজ চৌহানের (অমরেশ পুরি) সাক্ষাৎকার নিতে গিয়ে টিভি রিপোর্টার শিবাজী রাও (অনিল কাপুর) কীভাবে রাতারাতি বিখ্যাত হয়ে মহারাষ্ট্রের মুখ্যমন্ত্রী পদে আধিষ্ঠিত হন, সিনেমার গল্প গড়ে উঠেছে সেসব ঘটনাকে কেন্দ্র করেই। মুখ্যমন্ত্রী হওয়ার আগে অমরেশ পুরির চ্যালেঞ্জ গ্রহণ করে এক দিনের মুখ্যমন্ত্রী হয়ে শিবাজী রাও যে প্রত্যুৎপন্নমতিত্ব দেখান এবং বলরাজ চৌহান সরকারের দুর্নীতির চিত্র তুলে ধরেন, তাতে চৌহান সরকারের পতন ঘটে। শেষ পর্যন্ত জনগণের বিপুল সমর্থনে মুখ্যমন্ত্রী হন শিবাজী রাও। এক দিনের মুখ্যমন্ত্রী থাকা অবস্থায় শিবাজী রাও সন্ত্রাস ও দুর্নীতি দমন, দারিদ্র্যবিমোচন, রাজস্ব আয় বৃদ্ধিসহ রাষ্ট্রের প্রায় সবগুলো খাতেই বিস্ময়কর সাফল্য দেখান। এক দিন পার হওয়ার পর বিদায় মুহূর্তে শিবাজী রাও বলরাজ চৌহানকে বলেন, ‘আমি বিশেষ কিছুই করিনি। একজন মুখ্যমন্ত্রীর যা করার কথা, আমি তা-ই করে দেখিয়েছি। আপনি যদি এ কাজগুলো করতেন, তাহলে আমাকে কিছুই করতে হতো না।’
বস্তুত একজন দায়িত্বশীল মানুষ যদি তার দায়িত্ব সঠিকভাবে পালন করেন, তাহলে একটি সমাজ বা রাষ্ট্রে কল্যাণকর অনেক কিছুই সম্ভব। পরিচালক শংকর অভিনেতা অনিল কাপুরের মাধ্যমে এটাই বোঝাতে চেয়েছেন, মুখ্যমন্ত্রীকে গদি আলোকিত করে বসে থাকলেই চলে না, তাকে কাজ করতে হয়। আর সেসব কাজ হতে হবে রাষ্ট্র ও জনগণের কল্যাণে। তবে গল্প বা সিনেমায় যেটা বলা বা দেখানো সম্ভব বাস্তবে তা হুবহু সম্ভব নয়। তবে বাস্তবকে উপজীব্য করেই যেহেতু সিনেমা-নাটকের কাহিনী গড়ে ওঠে, তাই শতভাগ না হলে অনুরূপ কাজ সম্পাদন একেবারে অসম্ভব নয়। আর সেটা যে সম্ভব, তা করে দেখিয়েছেন আরেকজন ‘নায়ক’। তবে সিনেমায় নয়, বাস্তবে। তার নায়কোচিত পদচারণা বাংলাদেশের চিত্র পাল্টে দিয়েছিল অনেকখানি। কিন্তু তিনি তার জার্নি শেষ করে যেতে পারেননি। ঘাতকের বুলেট তার পদযাত্রাকে থামিয়ে দিয়েছিল।
হ্যাঁ, আমি বাংলাদেশের রাখাল রাজা হিসেবে খ্যাত প্রেসিডেন্ট শহীদ জিয়াউর রহমানের কথাই বলছি। আগামী ৩০ মে তার ৪৫তম শাহাদতবার্ষিকী। দিনটি ঘনিয়ে এলে বাংলাদেশের দেশপ্রেমিক নাগরিকরা বিমর্ষ হয়ে পড়েন। কারণ এদিনে তারা হারিয়েছেন এমন একজন রাষ্ট্রনায়ককে, যিনি প্রকৃতার্থেই ছিলেন নায়ক ‘দ্য রিয়েল হিরো’। জানি না, মুম্বাই ফিল্মের পরিচালক শংকর শহীদ জিয়াউর রহমানের রাষ্ট্র পরিচালনার কর্মধারাকে পর্যবেক্ষণ করেই শিবাজী রাও চরিত্রটি নির্মাণ করেছিলেন কি না। তবে এই দুই চরিত্রের মধ্যে অদ্ভূত সাযুজ্য রয়েছে। শিবাজী রাষ্ট্রকে সুষ্ঠুভাবে পরিচালনার জন্য যেভাবে ছুটে বেরিয়েছেন, শহীদ জিয়াও তেমনি ছুটে বেরিয়েছেন বাংলাদেশের মাঠে-ঘাটে, পথে-প্রান্তরে। দুর্নীতি দূর করে সুশাসন প্রতিষ্ঠা ও জনগণের অধিকারকে তিনি দিয়েছিলেন সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার। নিশ্চয়তা সৃষ্টি করতে চেয়েছিলেন মানুষের অধিকারের। মানুষের অন্ন, বস্ত্র, বাসস্থান, শিক্ষা ও চিকিৎসাসহ মৌলিক অধিকার নিশ্চিত করতে চেয়েছিলেন তিনি। ফিরিয়ে দিয়েছিলেন এদেশের মানুষের গণতান্ত্রিক অধিকার।
জিয়াউর রহমানের রাজনৈতিক জীবন ছিল খুবই সংক্ষিপ্ত। কিন্তু এই সংক্ষিপ্ত সময়ের মধ্যেই তিনি রাষ্ট্রকে গণমুখী ও জনবান্ধব করার যুগান্তকারী নির্দেশনা রেখে গেছেন। তার একটি উক্তি নিয়ে সমালোচনায় মুখর হন বিরুদ্ধবাদীরা। উক্তিটি ছিল ‘আই উইল মেক পলিটিক্স ডিফিকাল্ট ফর দ্য পলিটিশিয়ান্স’। অর্থাৎ ‘রাজনীতিকে আমি রাজনীতিকদের জন্য কঠিন করে দেব’। বিরুদ্ধবাদীরা এ উক্তিকে অপব্যাখ্যা করে বলার চেষ্টা করেন, জিয়া রাজনীতিবিদদের রাজনীতি থেকে বিদায় করে ক্ষমতাকে পাকাপোক্ত করতে চেয়েছিলেন। বস্তুত তারা জিয়াউর রহমানের উক্তির মর্মার্থ অনুধাবন করতে পারেননি। কাউকে রাজনীতি থেকে মাইনাস নয়, বরং ইতিবাচক রাজনীতিতে সম্পৃক্ত করতে চেয়েছিলেন তিনি। যারা তার উক্তির মর্মার্থ অনুধাবন করতে পারেননি, তারাই বিকৃত ব্যাখ্যা দিয়ে জনগণকে বিভ্রান্ত করার অপচেষ্টা করেন। জিয়াউর রহমান গতানুগতিক রাজনীতির ধারাকে পাল্টে দিয়ে নতুন এক রাজনীতি চালু করতে চেয়েছিলেন। শুরুও করেছিলেন। তিনি মনে করতেন, রাজনীতি হবে মানুষের জন্য। তার চিন্তাভাবনা ছিল মানুষ রাজনীতির কাছে যাবে না, রাজনীতিকেই যেতে হবে মানুষের কাছে। যেহেতু রাজনীতির পা নেই, তাই তাকে নিয়ে যেতে হবে রাজনীতিকদেরই। তার অভিপ্রায় ছিল, যেহেতু মানুষের কথা বলেই রাজনীতি চলে, তাই রাজনীতি আক্ষরিক অর্থেই হতে হবে মানুষের জন্য। আর এটা যে একটি চ্যালেঞ্জ, সেটা তিনি উপলব্ধি করতে পেরেছিলেন। আর সে কঠিন চ্যালেঞ্জকেই ব্রত হিসেবে নিয়েছিলেন তিনি।
প্রকৃতপক্ষে জিয়াউর রহমান সেসব রাজনীতিকের জন্য রাজনীতি কঠিন করে তোলার কথা বলেছিলেন, যারা জনগণের কাছে পাঁচ বছরে একবার যান শুধু ভোটের আগে। জিয়া বোঝাতে চেয়েছিলেন যারা সব সময়, মানে সুখে-দুঃখে, বিপদে-আপদে জনগণের পাশে থাকে না, তাদের রাজনীতি করা কঠিন করে দেবেন তিনি। লক্ষ করলে দেখা যাবে, জিয়া তার কথা রেখেছিলেন। তিনি দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলে সফর করে পৌঁছে যান জনগণের গৃহপ্রাঙ্গণে। তিনি এটাও বোঝাতে চেয়েছেন, জনগণের আর্থ-সামাজিক উন্নয়নে অবদান না রেখে শুধু বক্তৃতা-বিবৃতিতে কথার খই ফুটিয়ে বাজিমাত করার মওকা আর থাকবে না। জনগণের সমর্থন পেতে হলে জনগণের সঙ্গে নিবিড় যোগাযোগ রাখতে হবে। জিয়া শুধু তা মুখে বলেননি, করে দেখিয়েছেন।
রাজনীতি সম্পর্কে এদেশের প্রান্তিক মানুষের ধারণাটাই পাল্টে দিয়েছিলেন জিয়াউর রহমান। তারা চিরকাল জেনে এসেছে রাজনীতি ওপরতলার মানুষের কাজ কারবার। সেখানে সাধারণ মানুষের প্রবেশ নিষিদ্ধ। তারা শুধু ভোট দেওয়ার অধিকারী। এ ছাড়া আর কোনো ভূমিকা তাদের নেই। কিন্তু জিয়া তাদের চোখের সামনে থাকা ভ্রান্তির পর্দাটি সরিয়ে দিয়েছিলেন। রাজনীতি যে সাধারণ মানুষের জন্যই, এ সম্বন্ধে সবাইকে সচেতন করে তুলেছিলেন তিনি। জিয়াউর রহমান তার ঘোষিত ১৯ দফা কর্মসূচির মাধ্যমে যে রাজনীতির প্রবর্তন করেছিলেন, সেটাই ছিল এদেশের প্রথম বৈপ্লবিক রাজনৈতিক দর্শন। তিনি বলেছিলেন, রাজনীতি আর শুধু বক্তৃতা বা স্লোগানে আবদ্ধ থাকবে না। রাজনীতিকে নিয়ে যেতে হবে উৎপাদন ও উন্নয়ন প্রক্রিয়ার কাছে। স্লোগান উঠেছিল ‘এবারের রাজনীতি, উৎপাদনের রাজনীতি’, ‘এবারের রাজনীতি, উন্নয়নের রাজনীতি’। জনগণ বিস্মিত হয়েছিল। রাজনীতির সঙ্গে উৎপাদন ও উন্নয়নের সম্পৃক্তির কথা তারা কখনও শোনেনি। জিয়াই প্রথম তাদের সে সম্পর্কে জানিয়েছিলেন।
সময়ের বিবেচনায় শহীদ জিয়াউর রহমানের রাজনৈতিক জীবন ছিল অত্যন্ত সংক্ষিপ্ত। কমবেশি পাঁচ বছর। এই সংক্ষিপ্ত সময়ের মধ্যে তিনি যে বিশাল কর্মযজ্ঞের সূচনা করেছিলেন, তা ছিল যুগান্তকারী। তার ১৯ দফা কর্মসূচি পর্যালোচনা করলে এটা প্রতিভাত হয়ে ওঠে যে, রাষ্ট্র ও জনগণের সামাজিক ও অর্থনৈতিক এমন কোনো বিষয় নেই, যার দিকনির্দেশনা তিনি দিয়ে যাননি। বিপুল জনসংখ্যা অধ্যুষিত বাংলাদেশকে নিয়ে যখন অনেকে হতাশা ব্যক্ত করত, জিয়া তখন শোনালেন নতুন কথা। বললেন, জনসংখ্যা বোঝা নয়, সম্পদ। আমাদের ৯ কোটি মানুষের (তৎকালীন জনসংখ্যা) আঠারো কোটি হাত হবে কর্মীর হাতিয়ার। এ জাতি আর কখনও ভিক্ষার জন্য কারও কাছে হাত পাতবে না। আঠারো কোটি হাতকে কর্মীর হাতিয়ারে পরিণত করার সংকল্প বাস্তবায়নে জিয়া নতুন নতুন পন্থা উদঘাটন করলেন। কৃষিতে সক্ষম ব্যক্তিদের সম্পৃক্ত করে খাদ্য উৎপাদনের কাজে তাদের সম্পৃক্ত করলেন। কর্মক্ষম কিছু মানুষকে বিদেশে পাঠানোর বন্দোবস্ত করলেন। তারা সেখান থেকে পাঠাতে শুরু করল বৈদেশিক মুদ্রা। আজ সেই জনশক্তি রপ্তানি খাত থেকে আসছে আমাদের রেমিট্যান্সের প্রায় অর্ধাংশ।
দেশের অর্থনীতির ভিতকে শক্তিশালী করতে তিনি মনোযোগ দিয়েছিলেন বহির্বিশ্বের উৎসের দিকে। তাই জনশক্তি রপ্তানির পাশাপাশি তৈরি পোশাক রপ্তানিরও উদ্যোগ নিয়েছিলেন। আজ বিশ্বজুড়ে বাংলাদেশি তৈরি পোশাকের যে রমরমা বাজার তার সূচনা করেছিলেন জিয়াউর রহমান। তৈরি পোশাক রপ্তানি করেও যে বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন করা যায় এ ধারণাই আগে কারও ছিল না। সবচেয়ে বড় কথা এই একটি উদ্যোগ বাংলাদেশে একটি বিপ্লবের সূচনা করেছে। সে বিপ্লবকে আমরা শিল্প বিপ্লবও বলতে পারি। একই সঙ্গে এই খাতে কর্মসংস্থান হয়েছে লাখ লাখ মানুষের। আসলে একটি দেশকে গঠন বা পুনর্গঠন করতে এর নেতৃত্বের যে প্রজ্ঞা ও দূরদর্শিতা থাকা দরকার, জিয়াউর রহমানের তা ছিল পুরো মাত্রায়। আর ছিল বলেই তিনি এসব অর্থনৈতিক কর্মসূচি শুরু করতে পেরেছিলেন।
জিয়া ছিলেন আপাদমস্তক একজন দেশপ্রেমিক সৎ মানুষ। তিনি তার দেশপ্রেমের পরীক্ষা দিয়েছিলেন ১৯৭১-এর মার্চের উত্তাল সময়ে। মানুষের জীবনে অনেক পরীক্ষা আসে। অন্যসব পরীক্ষায় ‘পাস মার্ক’ পেলেই চলে। কিন্তু দেশপ্রেমের পরীক্ষায় একশতে একশ পেয়ে উত্তীর্ণ হতে হয়। জিয়া সে পরীক্ষায় শতভাগ নম্বর পেয়ে উত্তীর্ণ হয়েছেন। একজন সৈনিকের দেশপ্রেমের চরম পরীক্ষা হয় তার মাতৃভূমি যখন বিপন্ন হয়ে পড়ে শত্রুসৈন্যের আক্রমণে, তখন। একাত্তরের পঁচিশে মার্চ পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর আগ্রাসনের মুখে ‘উই রিভোল্ট’ বলে রুখে দাঁড়িয়েছিলেন তিনি। তারপর ২৭ মার্চ এদেশের স্বাধীনতার ঘোষণা ইথারে ছড়িয়ে দিয়ে সবাইকে যেমন যুদ্ধে যেতে উদ্দীপ্ত করেছিলেন, তেমনি নিজেও অধিষ্ঠিত হয়েছেন ‘নায়কে’র আসনে।
স্বল্প দৈর্ঘ্যের রাজনৈতিক জীবনে জিয়াউর রহমান তার কর্মকাণ্ডের যে বিশাল অধ্যায় সৃষ্টি করে গেছেন, একটি-দুটি নিবন্ধে তার বিস্তারিত বর্ণনা সম্ভব নয়। বলাটা নিশ্চয়ই অত্যুক্তি হবে না, তার সূচিত কর্মধারায় আজও চলছে বাংলাদেশ, আগামীতেও চলবে। তিনি ছিলেন প্রকৃতই একজন নায়ক, মহানায়ক। মুম্বাইয়ের চিত্র পরিচালক শংকর সেলুলয়েডের ফিতায় তার কল্পনার নায়ককে দেখিয়েছেন, আর আমরা দেখেছি একজন সত্যিকার নায়ককে। তাই জিয়াউর রহমানকে নিয়ে আমরা গর্ব করে বলতে পারি আমাদেরও একজন নায়ক ছিলেন। কল্পনায় নয়, বাস্তবে। যাকে বুকে ধারণ করে ধন্য হয়েছে বাংলাদেশ।