সানি মহারথী
প্রকাশ : ২৫ মে ২০২৬ ১৯:২৪ পিএম
আপডেট : ২৫ মে ২০২৬ ২২:০৩ পিএম
ফাইল ছবি
এক.
মে, ১৯৮১ (ঢাকা ক্লাবের টেনিস কোর্ট)
বিকেলের আলোটা ঢাকা ক্লাবের টেনিস কোর্টের লাল সুরকির ওপর মরে আসছিল।
দুটো সেটে হেরে মেজর জেনারেল আবুল মঞ্জুর র্যাকেটটা নামিয়ে ঘাম মুছতে মুছতে বিশ্রামের জন্য বসলেন। তার ঠিক উল্টোদিকের চেয়ারে বসলেন ডেভিড কার্টিস। তিনি একজন ব্রিটিশ জুট-ট্রেডার, পাট ক্রয়ের সম্ভাবনা দেখতে বাংলাদেশে এসেছেন। কিন্তু কার্টিসের বসার ভঙ্গি, চায়ের কাপ ধরার স্টাইল আর অতি-পরিমিত কথা বলার ধরন বলে দিচ্ছিল লন্ডনের সাউথ কেনসিংটনের এই ব্যবসায়ী আসলে কোনো ব্যবসায়ী নন, ছদ্মবেশী এক সামরিক এজেন্ট।
কার্টিস একটা সিগারেট ধরালেন। ধোঁয়াটা মঞ্জুরের চশমার কাঁচে এসে ধাক্কা খেল।
‘জেনারেল,’ কার্টিস খুব নিচু স্বরে বললেন, যেন আবহাওয়ার সতর্কতার কথা বলছেন, ‘আপনার প্রেসিডেন্ট বড্ড বেশি দ্রুত দৌড়াচ্ছেন। লিবিয়ার সাথে এই যে নতুন সামরিক চুক্তিটা উনি করেছেন, কিংবা ওআইসির আল-কুদস কমিটিতে ওনার যে খসড়া প্রস্তাব... ওটা বাগদাদ বা রিয়াদের জন্য ঠিক আছে। কিন্তু ভূমধ্যসাগরের ওপারের কিছু মানুষের জন্য ওটা রেড লাইন’।
মঞ্জুর চুপ করে রইলেন। তিনি ঢাকার রাজনীতি বোঝেন, কিন্তু বৈশ্বিক ভূরাজনীতির এই অদৃশ্য চোরাস্রোত তাকে অস্বস্তিতে ফেলে।
কার্টিস ঝুঁকে এলেন। ‘সাউথ ব্লকের বন্ধুরা কিন্তু আপনার এই জাতীয়তাবাদী প্রেসিডেন্টের ওপর আস্থা হারাচ্ছে। ফারাক্কা বা দক্ষিণ তালপট্টি নিয়ে ওনার অবস্থান বড্ড অনমনীয়। ঢাকার ক্ষমতাকাঠামোয় আসলে এমন একজন থাকা দরকার যে একটু নমনীয় হবে। যে আমাদের স্পেস দেবে’।
‘কিন্তু আমি তো জিওসি। ঢাকা থেকে দূরে,’ মঞ্জুর বলতে চাইলেন।
‘দূরত্ব একটা ইলিউশন, জেনারেল,’ কার্টিস হাসলেন। ‘ইতিহাসে কর্নেল থেকে সোজা রাষ্ট্রপতি হবার নজির আছে। আপনি কেন নন? আপনি যদি চালটা এখন না চালেন, তবে ঢাকা সেনানিবাসে পরে অন্য কেউ চেলে দেবে। আপনার অবস্থান তখন কোথায় থাকবে? ছাঁটাইয়ের তালিকায়?’
মঞ্জুর সেদিন বাড়ি ফিরেছিলেন একটা খাম পকেটে নিয়ে। খামে কোনো টাকা ছিল না, ছিল না কোনো গোপন নির্দেশ। শুধু ছিল ঢাকার এক শীর্ষ সেনা কর্মকর্তার ব্যক্তিগত ডায়েরির কিছু ফটোকপি, যা দিল্লিতে এক ‘র’ অফিসারের টেবিল ঘুরে কার্টিসের হাত হয়ে এ পর্যন্ত পৌঁছেছে। মঞ্জুর বুঝলেন, ফাঁদ পাতা হয়ে গেছে। তিনি পা না দিলেও অন্য কেউ দেবে।
দুই.
৩০ মে, ১৯৮১ (চট্টগ্রাম সার্কিট হাউস)
বৃষ্টির শব্দে কোনো ছন্দ নেই। পাহাড়ঘেরা চট্টগ্রামের আকাশ ভেঙে যেন একটা কালো চাদর নেমে এসেছে।
ভোর চারটেয় যখন ট্রিপল সেভেন স্কোয়াডের তরুণ অফিসাররা দরজার লক ভাঙছিল, প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান হয়তো শেষ সেকেন্ডেও ভেবেছিলেন এটা তারই তৈরি অনুগত বাহিনী, তাকে কোনোদিন মারবে না। কিন্তু না, ঘাতকদল থামেনি। তাদের ভেতর থেকে লেফটেন্যান্ট কর্নেল মতিন প্রথম এসএমজি উঁচিয়ে ফায়ার করেন। মুহূর্তেই ঘাতকের নির্মম বুলেট ঝাঁঝরা করে দেয় প্রেসিডেন্টের বুক। রক্তে ভিজে ওঠা দেহ লুটিয়ে পড়ে মেঝেতে।
রক্তের দাগগুলো যখন কাঠের মেঝেতে ছড়িয়ে পড়ছে, ততক্ষণে মঞ্জুর সার্কিট হাউসের ড্রয়িংরুমে পৌঁছে গিয়ে একটা ট্রানজিস্টর রেডিওর টিউনিং নব ঘোরাচ্ছিলেন। ঘড়ির কাঁটা গড়িয়ে সময় সাড়ে চারটা।
শুধু স্ট্যাটিক শব্দ। কোনো সিগন্যাল নেই।
ঠিক তখনই মঞ্জুর টের পেলেন শাঁইশাঁই ধেয়ে আসা একটা ঠান্ডা বাতাস তার পিঠে এসে লাগছে, ক্রমশ ছিদ্র হয়ে উঠছে শরীরের লোমকূপ। ঢাকা থেকে যে লজিস্টিক সাপোর্ট, যে ট্রুপস মুভমেন্টের গ্রিন সিগন্যাল পাওয়ার কথা ছিল তা সম্পূর্ণ স্তব্ধ। রেডিওতে তার দেওয়া বিপ্লবী পরিষদের স্বাধীনতা ঘোষণা বা বিদ্রোহের ব্যাখ্যাসহ বার্তা প্রচার হতে দেওয়া হচ্ছে না।
মঞ্জুর বুঝলেন, কার্টিসের আসল মাস্টারপ্ল্যানে তিনি ছিলেনই না। মোসাদের সেই অদৃশ্য টিম ‘র’-এর নেটওয়ার্ক ব্যবহার করে মঞ্জুরকে শুধু একটা ট্রিগার হিসেবে ব্যবহার করেছে। আসল খেলাটা খেলেছে ঢাকা সেনানিবাস। মঞ্জুরকে বন্দি করার পর যখন কোনো আদালতের মুখোমুখি করার আগেই অতি সাবধানে স্তব্ধ করে দেওয়া হলো, তখন সেই রহস্যের শেষ সুতোটাও কেটে গেল। ধসে গেল রহস্যের পরের ধাপে পৌঁছানোর সিঁড়িটাও।
তিন.
৪ জুন, ১৯৮১ (সেনা সদর)
চট্টগ্রামের অধ্যায় শেষ। কিন্তু ঢাকা সেনানিবাসের মূল চালচিত্র তখনও থমথমে। জিয়া হত্যার পর জুনিয়র অফিসারদের একটা বড় অংশ ক্ষোভে ফুঁসছিল। তারা তাদের প্রিয় ‘চিফ’-এর হত্যার বিচার চায়।
লেফটেন্যান্ট জেনারেল এইচ এম এরশাদ তার দপ্তরে বসে প্রথম যে চালটি চাললেন সেটা কোনো অস্ত্রের ছিল না, সেটা ছিল কৌশলের। তিনি জানতেন শুধু ভয় দেখিয়ে সেনাবাহিনী চালানো যায় না, বিশেষ করে জিয়ার মতো ক্যারিশম্যাটিক নেতার মৃত্যুর পর সেটা একটু কঠিন।
এরশাদ এক গোপন বৈঠক ডাকলেন সামরিক আমলাতন্ত্রের সবচেয়ে প্রভাবশালী এবং অসন্তুষ্ট অংশটিকে নিয়ে। জিয়াউর রহমানের আমলে যে সমস্ত সিনিয়র অফিসার পদোন্নতি পাননি বা অপেক্ষাকৃত কম গুরুত্বপূর্ণ ডেস্কে পড়েছিলেন, তাদের তালিকা এরশাদের টেবিলে আগে থেকেই তৈরি ছিল।
‘আপনাদের ক্ষোভ আমি বুঝি,’ এরশাদ চুরুটের ছাই ঝেড়ে অত্যন্ত নরম গলায় বললেন। ‘জিয়া সাহেব দেশকে অনেক কিছু দিয়েছেন, কিন্তু আপনাদের মতো যোগ্য মানুষদের অবমূল্যায়ন করেছেন। এবার সময় এসেছে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনার’।
এক সপ্তাহের মধ্যে ডজনখানেক অফিসারের ফাইল নড়েচড়ে বসল। রাতারাতি প্রমোশন, ঢাকার লোভনীয় ডিরেক্টরেটগুলোর দায়িত্ব এবং স্টক, ব্যাংকসহ বিভিন্ন লাভজনক খাতের নিয়ন্ত্রণ চলে গেল সেই অফিসারদের হাতে। যারা সকাল পর্যন্ত জিয়ার জন্য শোক পালন করছিল, বিকেল গড়াতেই তারা এরশাদের বিশ্বস্ত প্রাচীর হয়ে উঠল। সুবিধা আর অগ্রাধিকারের এই ইনজেকশন সেনাবাহিনীর ক্ষোভকে এক লহমায় ঠান্ডা করে দিল।
কিন্তু শুধু সেনাবাহিনী সামলানোই যথেষ্ট ছিল না। দরকার ছিল বেসামরিক প্রশাসন এবং তৎকালীন ক্ষমতাসীন দল বিএনপির ভেতরের ভাঙনটাকে ত্বরিত করা। মনে মনে বিড়বিড় করে একটা অদ্ভুত দ্বিমুখী নীতি ঠিক করলেন তিনি।
একদিকে এরশাদ বিচারপতি আবদুস সাত্তারকে সামনে রেখে বোঝাতে চাইলেন যে, তিনি সম্পূর্ণ গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার পক্ষে। অন্যদিকে পর্দার আড়ালে বিএনপির ভেতরের সুবিধাবাদী এবং উচ্চাভিলাষী অংশটির সাথে শুরু করলেন লিয়াজোঁ।
একটি নির্দিষ্ট প্রভাবশালী গোয়েন্দা সংস্থার মারফতে বেসামরিক প্রশাসনের শীর্ষ আমলাদেরও ডেকে পাঠানো হলো। তাদের আশ্বস্ত করা হলো রাষ্ট্রপতি যেই থাকুন না কেন, তাদের চাকরি, প্রাইজ পোস্টিং এবং করপোরেট লাইসেন্সের সুবিধা অক্ষুণ্ন থাকবে, যদি তারা ‘সঠিক জায়গায়’ আনুগত্য দেখান।
ক্ষমতার এই নীরব হাতবদল এতটাই নিখুঁত ছিল যে, সাত্তার সাহেব যখন রাষ্ট্রপতির চেয়ারে বসে ফাইলের পর ফাইলে সই করছিলেন, তিনি টেরও পাননি তার নিচের পুরো কার্পেটটা ততক্ষণে এরশাদ নিজের দিকে টেনে নিয়েছেন।
চার.
১২ জুন, ১৯৮১ (মইনুল রোড, ৬ নম্বর বাড়ি)
ঢাকা সেনানিবাসের মইনুল রোডের ৬ নম্বর বাড়িটি তখন গভীর এক বিষাদের প্রতীক। সদ্য বিধবা বেগম খালেদা জিয়া তার দুই সন্তানকে নিয়ে এক চরম অনিশ্চয়তার মুখোমুখি। জিয়াউর রহমান ব্যক্তিগতভাবে সৎ লোক ছিলেন, ফলে মৃত্যুর পর তার পরিবারের জন্য কোনো বড় ব্যাংক ব্যালেন্স বা অট্টালিকা ছিল না।
এরশাদ এই দৃশ্যপটটিকে তার নিজের রাজনৈতিক ঢাল হিসেবে ব্যবহার করার সিদ্ধান্ত নিলেন। তিনি জানতেন, জিয়ার প্রতি জনগণের যে সহানুভূতি, যে আবেগ, তার কেন্দ্রবিন্দু এখন এই মইনুল রোডের বাড়ি। বেগম জিয়াকে যদি এই বাড়ি থেকে উচ্ছেদ করা হয়, তবে সাধারণ মানুষ এবং সেনাবাহিনীর একাংশ এরশাদকে খলনায়ক বানিয়ে দেবে। তাই তিনি রাষ্ট্রপতি সাত্তারের মাধ্যমে শহীদ প্রেসিডেন্টের পরিবারকে রাষ্ট্রীয়ভাবে বাড়িটি ইজারা দেওয়ার বন্দোবস্ত নিলেন।
জুনের শেষ সপ্তাহের দিকে কুয়াশাচ্ছন্ন এক সন্ধ্যায় গণপূর্ত দপ্তরের বিশেষ দূত মইনুল রোডের বাসায় এসে প্রেসিডেন্ট জিয়ার স্মৃতিবিজড়িত বাড়িটির কাগজাদি বেগম জিয়ার হাতে পৌঁছে দেয়।
পাঁচ.
২৪ মার্চ, ১৯৮২ (বঙ্গভবন)
সকালের সূর্যটা বঙ্গভবনের ভেতরে পিচঢালা রাস্তাটার ওপর এসে পড়েছে। খুবই চিকচিকে রোদ ঝলমলে আলো গলে পড়ছে।
লেফটেন্যান্ট জেনারেল এইচ এম এরশাদ তার সুসজ্জিত দপ্তরে বসে আয়নার সামনে নিজের ইউনিফর্মের বোতাম লাগাচ্ছিলেন। ভদ্রলোকের ঠোঁটের কোণে একটা নিশ্চিত, শীতল প্রশান্তির হাসি।
বিচারপতি আবদুস সাত্তার তার ইস্তফাপত্রে সই করে এইমাত্র বঙ্গভবন থেকে বেরিয়ে গেছেন। তিনি এখন শুধুই ইতিহাসের একটা ফুটনোট। এরশাদ টেবিলের ড্রয়ার থেকে একটা কাঁচের শিশি বের করলেন বিদেশি পারফিউমের অভিজাত সুগন্ধি গায়ে মেখে নিশ্বাস নিলেন। ‘গন্ধাচ্ছন্ন’ সুখের গভীর এক নিঃশ্বাস।
ঠিক একটু পরেই তার বিশেষ সহকারী ঘরে ঢুকে দুইটা নতুন ফাইল টেবিলের ওপর রাখলেন। একটা ফাইল ঢাকার এক নতুন ব্যাংকিং লাইসেন্স এবং কিছু বড় ইম্পোর্ট পারমিটের। অন্য ফাইলে চোখ বোলাতেই এরশাদের ঠোঁটে হাসি ফুটে উঠল। যেসব আমলা, ব্যবসায়ী এবং সেনা অফিসারকে গত কয়েক মাস ধরে তিনি একটু একটু করে কিনেছিলেন, তাদের সবার নাম সেখানে নিখুঁতভাবে সাজানো। তারা সবাই এখন ক্ষমতার নতুন বৃত্তে বাঁধা পড়ে গেছেন।
কিন্তু টুইস্টটা অন্য জায়গায়। ফাইলের একদম নিচে একটা ছোট চিরকুট পিন দিয়ে আটকানো ছিল। চিরকুটে কোনো নাম ছিল না, শুধু টাইপ করা একটা লাইন, ‘Everything is settled. The board is yours. — C.’
এরশাদ চুরুটটা ধরালেন। শুধু ‘C’ আছে। ‘মোসাদ’, ‘র’ কারও কোনো অফিসিয়াল সিলমোহর কোথাও নেই। তারা কোনো চুক্তি সই করেনি, কিন্তু তারা যেভাবে চেয়েছিল, ঢাকার ক্ষমতার চালচিত্র ঠিক সেভাবেই পুনর্বিন্যাস হয়েছে। মঞ্জুর ভেবেছিলেন তিনি জিওসি থেকে শাসক হবেন, সাত্তার ভেবেছিলেন তিনি শেষ পর্যন্ত রাষ্ট্রপতি থাকবেন। কিন্তু না, কেউ জানল না, প্রতিটা চালের পেছনের সুতোটা আসলে কার হাতে ছিল। এরশাদ জানালার ভারী পর্দাটা সরিয়ে বাইরে তাকালেন। ক্ষমতার এই দীর্ঘমেয়াদি খেলায় আজ তিনি দৃশ্যত রাজা।
(*কোনো সাধারণ সৈনিক জিয়া হত্যার কাজে নিজেদের জড়াতে চায়নি, তাই এই অপারেশনের সবাই কমিশন্ড অফিসার ছিলেন। তিনটা বলয়ে ভাগ হয়ে মোট ষোলজন পথভ্রষ্ট অফিসার ছিলেন অপারেশনে।)
[একটি সংবিধিবদ্ধ সতর্কীকরণ : পলিটিক্যাল ফিকশনের বাইরে অন্য কিছু ভাবার সুযোগ নেই।]