ব্যারিস্টার নাজমুল হুদা
প্রকাশ : ২৫ মে ২০২৬ ১৯:০২ পিএম
আপডেট : ২৫ মে ২০২৬ ২২:০৩ পিএম
ফাইল ছবি
২ মে ১৯৮১। দলের সচিবালয়ে চেয়ারম্যান জিয়ার সভাপতিত্বে জাতীয়তাবাদী দলের স্ট্যান্ডিং কমিটির মিটিং চলছে সন্ধ্যা থেকে। রাজনীতিকে দুর্নীতিমুক্ত করার আন্তরিক অভিপ্রায় পুনরায় ব্যক্ত করলেন চেয়ারম্যান জিয়া : ‘We must drive out the bad elements from the party.’
‘আগামী ২৯ মে স্ট্যান্ডিং কমিটির মিটিং চট্টগ্রামে অনুষ্ঠিত হবে।’ ঘোষণা করলেন চেয়ারম্যান জিয়া। আসন্ন জেদ্দা সফর বাতিল করে স্থায়ী কমিটির সভা আহ্বানটা ছিল দলকে বিশৃঙ্খলমুক্ত করার প্রতি চেয়ারম্যানের দৃঢ় প্রত্যয়ের দৃপ্ত প্রকাশ।
চট্টগ্রামে অনুষ্ঠেয় স্থায়ী কমিটির সভায় যোগদানের উদ্দেশ্যে ২৯ মে সকাল ৯টায় ঢাকা আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে উপস্থিত হলাম। প্রেসিডেন্টের Sepcial flight-এর আনুষ্ঠানিকতা সমাপ্তপ্রায়। রাষ্ট্রপতি বিমানে ওঠার আগে আমাদের সবাইকে বিমানে আরোহণ করতে বলা হলো। স্থায়ী কমিটির সদস্যদের মধ্যে সেদিন আমিসহ আমাদের দলের চেয়ারম্যানের সফরসঙ্গী ছিলেন দলের মহাসচিব বদরুদ্দোজা চৌধুরী, একরামুল হক, আমেনা রহমান, মুহিবুল হাসান ও রাজ্জাক চৌধুরী। ঢাকায় রয়ে গেলেন স্থায়ী কমিটির অপর চারজন সদস্যÑ বিচারপতি আব্দুস সাত্তার, শাহ আজিজুর রহমান, জমিরউদ্দীন সরকার ও শেখ রাজ্জাক আলী। জমিরউদ্দীন সরকার ও শেখ রাজ্জাক আলীকে জাতীয়তাবাদী দলের অঙ্গসংগঠন জাতীয়তাবাদী ছাত্রদলের ৩০ মেতে অনুষ্ঠেয় সম্মেলনের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছিল, তাই তারা যেতে পারেননি। বাংলাদেশ বিমানের রাষ্ট্রপতির Special flight ছাড়তে ছাড়তে সাড়ে ৯টা হয়ে গেল। আনুমানিক ১০-২০ মিনিটে আমরা পৌঁছলাম চট্টগ্রাম বিমানবন্দরে। লক্ষ করলাম, নৌবাহিনী প্রধান এমএ খান আমাদের সাথেই নামলেন বিমান থেকে। বেলা প্রায় পৌনে এগারটায় চট্টগ্রাম সার্কিট হাউসে পৌঁছলাম।
দোতলার সামনে বারান্দায় রাষ্ট্রপতি কয়েকজন দলীয় নেতৃবৃন্দের সঙ্গে আলোচনা করছিলেন। নিচের রাস্তার ওপারের কাবাবের দোকানগুলোর দিকে আঙুল দেখিয়ে তিনি বললেন, ‘যখন চিটাগাং-এ ছিলাম, কত খেয়েছি ঐ দোকানগুলোতে। Chittagong is my city. চিটাগাং-এর লোক আমাকে বড় ভালোবাসে, মাঝে মাঝে ভাবি চিটাগাং-এ কিছু জমি কিনে একটা বাসা বানাব। I love this place.’
প্রাথমিক আনুষঙ্গিকতা সমাপন শেষে দলের স্থানীয় নেতৃবৃন্দকে বিদায় জানিয়ে স্থায়ী কমিটির বৈঠক আনুষ্ঠানিকভাবে শুরু করলেন চেয়ারম্যান জিয়া। এডিসি মাজহারকে ডাকলেন তিনি কিছু কাগজ ও কলম দিয়ে যেতে। সভার Proceedings নোট করার দায়িত্ব দেওয়া হলো আমাকে। বেলা আনুমানিক পৌনে ১টায় কর্নেল মাহফুজ এসে রাষ্ট্রপতিকে স্মরণ করিয়ে দিলেন জুমার নামাজের কথা। ঠিক একটার সময় রাষ্ট্রপতি বেরিয়ে গেলেন জুমার নামাজ আদায় করতে। দুপুর দুটায় যখন ফিরলেন তিনি সভাস্থল ডাইনিং রুমে রূপান্তরিত হয়ে গেছে। বসবার সোফাগুলোকে এক কোনায় ঠেলে দিয়ে একটা ডাইনিং টেবিল ও আটটি চেয়ার লাগিয়ে দেওয়া হয়েছে। আমরা সবাই লাঞ্চে বসে গেলাম। খাবার শুরু করার আগে একটু ইতস্তত করে রাষ্ট্রপতি আমাকে ডাকতে বললেন চট্টগ্রামের এমপি জনাব আরিফ মঈনউদ্দীনকে। চিটাগাং-এর দলের সাংগঠনিক ব্যাপারে কিছু আলোচনা করলেন তিনি আরিফের সঙ্গে, পরে বললেন, ‘Aref, please don't mind that we can't request you to have meal with us.’ ‘Certainly not Sir’ বলে বিদায় নিলেন আরিফ মঈনউদ্দীন।
খাবার শেষ হতে ৩টা বেজে গেল। ‘পাঁচটার সময় আমি চিটাগাং-এর Elites and intellectuals-দের address করব, আপনারা থাকবেন।’ বলে নিজের ঘরে চলে গেলেন। কর্তব্যরত সশস্ত্র প্রহরীদের একজন দরজাটা ভিড়িয়ে দিলেন। আমি আর একরামুল হক চলে এলাম চিটাগাং স্টিল মিল করপোরেশনের রেস্ট হাউসে।
রাজ্জাক চৌধুরী, ড. ইউসুফ চলে গেলেন ড. বদরুদ্দোজা চৌধুরীর সাথে নিউমার্কেটে। সার্কিট হাউসের ৯ নম্বর কক্ষ সুরক্ষিত ছিল ডা. আমেনা রহমানের জন্য। জনাব মহিবুল হাসান জনাব বদরুদ্দোজা চৌধুরীর কক্ষের অপর একটি বিছানায় বিশ্রাম নিতে চলে গেলেন।
স্টিল মিল করপোরেশনের রেস্ট হাউসের যে কক্ষটিতে আমার থাকার বন্দোবস্ত করা হয়েছিল সে কক্ষটি খুব বেশি পরিষ্কার মনে হলো না আমার কাছে। একটা আধময়লা মশারি টাঙানো রয়েছে বিছানার ওপর। বিছানার চাদর দেখে মনে হলো বেশ কয়েক দিন এ ঘরে কেউ থাকেনি। বাথরুমের কল খোলা ভীষণ কষ্টকর আবার একবার খুললে আর বন্ধ হতে চায় না। Flash থেকে পানি আনতে হলে বারবার পাশের কলটিকে ঘোরাতে হয়। আর ওটা বন্ধ না করলে সারাক্ষণই পানি পড়তে থাকে। একটু বিরক্ত হলাম মনে মনে। এই এত বড় রেস্ট হাউসে এরা আর অন্য কোনো কামরা পেল না আমার জন্য!
বিকেল সোয়া পাঁচটায় ফিরলাম সার্কিট হাউসে। সার্কিট হাউসের নিচতলায় পশ্চিম দিকে হলরুমটা লোকজনের কোলাহলে বেশ জমজমাট হয়ে উঠেছে। চট্টগ্রামের বুদ্ধিজীবীদের আর কেউ বোধহয় বাদ ছিল না সেদিন। ঠিক সাড়ে পাঁচটায় রাষ্ট্রপতি নেমে এলেন নিচের তলায়। সরাসরি গিয়ে ঢুকলেন হলরুমে। সভাকক্ষের সবাই উঠে দাঁড়িয়ে রাষ্ট্রপতিকে সম্মান প্রদর্শন করলেন। রাষ্ট্রপতির ডানপাশে বসলেন ডা. বদরুদ্দোজা চৌধুরী, বামদিকে আমি ও ডা. ইউসুফ আসন গ্রহণ করলাম। চট্টগ্রামের বুদ্ধিজীবীদের উদ্দেশে চেয়ারম্যান জিয়া বক্তব্য রাখতে গিয়ে তার বক্তৃতার শেষে আকুলভাবে আবেদন করলেন, ‘আপনারা আসুন, আপনাদের মতো সৎ ও নিষ্ঠাবান ব্যক্তিদের প্রয়োজন আছে আমাদের। আপনাদের আগমন সুগম করার জন্য শুদ্ধি অভিযান শুরু করেছি আমরা আমাদের দলের ভিতরে। আমরা জানি Bad element-দের তাড়িয়ে না দিলে আপনারা আসতে রাজি হবেন না, তাই আমরা বিএনপিকে এখন পরিষ্কার করা আরম্ভ করেছি। দেশ ও জাতির স্বার্থে আপনারা আমাদের দলে যোগ দিয়ে আমাদের হাতকে আরও শক্তিশালী করুন।’ স্বতঃস্ফূর্ত সাড়া পাওয়া গিয়েছিল সেদিন তাদের কাছ থেকে।
সন্ধ্যা প্রায় সাড়ে ছয়টা। ওপরের বারান্দায় চেয়ারম্যান জিয়া গা-টা চেয়ারে এলিয়ে দিয়ে বিশ্রাম করছিলেন। কেউ তখনও এসে পৌঁছায়নি। আমি ঢুকতেই স্যার বলে উঠলেন, ‘How was it Huda?’
‘Fine sir. I think your apeal was well taken, sir.’
‘Don't you think. they responded well?’ স্যার জিজ্ঞেস করলেন আমাকে।
‘আমার মনে হয় এরা সবাই আমাদের দলে যোগদান করবে স্যার’, উত্তর দিলাম আমি।
কিছুক্ষণ নীরব থেকে রাষ্ট্রপতি তার শয়নকক্ষের দিকে গেলেন। মুখ ঘোরাতেই দেখলাম দরজার কাছে কর্নেল মাহফুজ দাঁড়িয়ে আছে, আমার দিকে তাকাতেই বললাম, ‘Colonel I'm really sorry, you gave me one of the rotten rooms in the Steel Mill Rest House.’
‘Is that it? I am really sorry Sir. Let me see what I can do for your. I am contacting the NDC right now.’ বলে কর্নেল মাহফুজ চলে গেলেন।
সন্ধ্যা ঠিক ৭টার সময় স্ট্যান্ডিং কমিটির মিটিং আবার শুরু হলো। একের পর এক দলীয় নেতৃবৃন্দকে ডেকে ডেকে সাংগঠনিক ব্যাপারে বিভিন্ন প্রশ্নোত্তরের পালা চলল কতক্ষণ। রাত নয়টার দিকে চট্টগ্রাম বিভাগের কমিশনার সাহেব আসলেন রাষ্ট্রপতির সাথে দেখা করতে। এরপর স্ট্যান্ডিং কমিটির মিটিং চলল একটানা রাত ১০টা ৪০ মিনিট পর্যন্ত। রাতের খাবারের প্রস্তুতি নিতে চেয়ার-টেবিল সরাতে শুরু করল। রাষ্ট্রপতিকে সবিনয়ে বললাম, স্যার আমি ডিনার এখানে করতে পারছি না, বাইরে দাওয়াত আছে।
‘I know, you have your in-laws here, you should come back by 11.’
‘স্যার, এখান থেকে আসতেই তো বিশ মিনিট চলে যাবে।’
‘ঠিক আছে, Come back by 11.30, আমাদের আবার বসতে হবে।’
নিচে নামতেই কর্নেল মাহফুজের সাথে দেখা হলোÑ ‘Sir, I heve fixed up room no. 1 of the Rest House for you sir. It is an airconditioned room meant for ministers.’
‘Thank you colonel’ বলে বেরিয়ে এলাম আমি। সার্কিট হাউসে রাষ্ট্রপতি জিয়ার জীবনের শেষ Dinner-এ শরিক হওয়ার সৌভাগ্য আমার হয়নি, তবে যারা তার সাথে বসে শেষ খাবার খেয়েছেন তাদের কাছ থেকে শুনেছি মাংসের ডিশটা শূন্য হয়ে যাওয়ার পর আরও কিছু মাংস চেয়ছিলেন উনি। রান্নাটা বড় ভালো হয়েছিল বলে। কিন্তু অপ্রতুল রান্নার জন্য সেই শেষ স্বাদটি নাকি তার পূরণ হয়নি। শুনেছি খাবার টেবিলে বসেই নাকি রাষ্ট্রপতি তার স্ত্রীর সাথে কথা বলছিলেন ফোনে। ‘আল্লাহ চাহেন তো আগামীকাল সকালে ফিরব ঢাকায়’Ñ আশ্বস্ত করেছিলেন রাষ্ট্রপতি বেগম খালেদা জিয়াকে।
রাত ১১টা ২০ মিনিটে ফিরে এলাম সার্কিট হাউসে। রাতের খাবার মাত্র শেষ করেছেন রাষ্ট্রপতি। অন্য সদস্যরা খাবার টেবিল ছেড়ে ড. বদরুদ্দোজা চৌধুরীর রুমে ঢুকলেন হাতমুখ ধোবার জন্য। রাষ্ট্রপতি একা রেলিংয়ের পাশে দাঁড়িয়ে ছিলেন। আমি ঢুকতেই আমাকে জিজ্ঞেস করলেন, ‘কী খাওয়ালো তোমাকে শিরিন?’
‘মাছ আর মুরগি স্যার।’
‘ভালোই তো খাতির করেছে। ওর Husband-এর নাম না-কী?’
‘বিটা স্যার।’
‘What does he do?’
‘He is a naval architect Sir, at present working in American Bureau of Shipping as its surveyor for Bangladesh.’
‘ওর বাচ্চার বয়স কত হলো?’
‘প্রায় পাঁচ মাস স্যার।’
বাইরে টিপ টিপ বৃষ্টি পড়ছে। হঠাৎ একটা দমকা হাওয়া বয়ে গেল। বাইরের আকাশের দিকে তাকিয়ে রাষ্ট্রপতি বললেন, ‘আকাশে অনেক মেঘ, মনে হচ্ছে ঝড় উঠবে।’
‘বেশ বাতাস আছে স্যার, আকাশে মেঘ হয়তো বেশিক্ষণ থাকবে না।’
বারান্দায় রেলিং থেকে সরে গিয়ে স্যার তার চেয়ারে বসলেন। একে একে Standing Committee-র সকল সদস্য যার যার জায়গায় বসে পড়লাম। চট্টগ্রাম শহরের দলীয় কর্মকর্তাদের এক এক করে ডাকা হলো। আশ্বাস দিলেন রাষ্ট্রপতি, ‘সব ঠিক হয়ে যাবে।’
দলের নগর সভাপতি সলিমুল্লাহ হকের উদ্দেশে বললেন, ‘প্রশিক্ষণের প্রস্তুতি নাও, আমি নিজে এসে ক্লাস নেব।’
রাত প্রায় পৌনে ১২টার সময় স্ট্যান্ডিং কমিটির মিটিং আনুষ্ঠানিকভাবে শেষ করে দিয়ে রাষ্ট্রপতি বসে বসে আমাদের সাথে গল্প করার একপর্যায়ে উনি আমাকে সরাসরি জিজ্ঞেস করে বলেন, ‘Huda do you drink?’
‘না স্যার, Not that I have any reasons for it. It is just that I don't enjoy drinks.’ উত্তর দিলাম আমি।
‘How senior is Moudud to you?’
‘তিন বছর স্যার।’
রাত প্রায় সোয়া ১২টার দিকে আমাদের বিদায় জানিয়ে রাষ্ট্রপতি তার শয়নকক্ষের দিকে চলে গেলেন। শয়নকক্ষের দরজার সামনে দাঁড়িয়ে ডা. ইউসুফের পিঠে হাত রেখে কী যেন বললেন তিনি। আমি, রাজ্জাক চৌধুরী, একরামুল হক ও ডা. ইউসুফ নিচে নেমে এলাম। ভীষণ জোরে বৃষ্টি পড়ছিল তখন। পোর্টিকোর নিচে রাষ্ট্রপতির Lancer-টা পার্ক করা ছিল। কোন গাড়িটা আমাদের নিয়ে যাবে ঠিক ছিল না। কর্নেল মাহফুজ রাষ্ট্রপতির দ্বিতীয় গাড়িটা পোর্টিকোর নিচে লাগাতে বললেন। আমরা তিনজন উঠে পড়লাম। ডা. ইউসুফ ড্রাইভারকে অদূরে অপেক্ষমাণ তার গাড়ির কাছে তাকে নামিয়ে দেওয়ার নির্দেশ দিয়ে সামনে গিয়ে বসলেন। রেস্ট হাউসে যখন পৌঁছলাম রাত প্রায় পৌনে ১টা বাজে। Aircondition-টা চালু করার সঙ্গে সঙ্গে Compressor-টা গর্জে উঠল। বাইরের কোলাহল থেকে সম্পূর্ণভাবে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়লাম আমি। সাইড টেবিলে রাখা ঠান্ডা পানির বোতল থেকে পানি ঢেলে বিছানার কাছে নিয়ে রাখলাম। কাপড়টা ছেড়ে মুখ-হাত ধুয়ে লুটিয়ে পড়লাম বিছানায়। সারা দিনের ঘটনাগুলো গোছাতে লাগলাম। বড় অস্বাভাবিক লাগল রাষ্ট্রপতির আজকের কথোপকথন। বিশেষ করে তার খালাত বোন শিরিন সম্বন্ধে খোঁজ নেওয়াটা আমার কাছে খুবই অস্বাভাবিক লাগল। মনে পড়ল, সিগমার বড় ভাই বিটার সাথে শিরিনের যখন সম্বন্ধ ঠিক হবার কথাবার্তা চলছে, আমরা জানতে পারলাম শিরিন রাষ্ট্রপতি জিয়ার খালাতো বোন। অনেকটা যাচাই করার জন্যই জিজ্ঞাসা করে বসেছিলাম রাষ্ট্রপতিকে, ‘স্যার, শিরিন নামে আপনার কোনো খালাতো বোন আছে?’
ঢাকা আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে চা পান করছিলেন রাষ্ট্রপতি জিয়া। চায়ের পেয়ালায় চুমুক দিতে দিতে পাল্টা প্রশ্ন করলেন তিনি, ‘Why? Why are you asking me?’
‘For social rasons sir.' উত্তর দিলাম আমি।
‘You know I have no relation's. Don't embarrass me over this in future.’ রীতিমতো বিরক্ত হয়েই রাষ্ট্রপতি কথাগুলো বললেন আমাকে।
স্যরি বলে সরে দাঁড়ালাম আমি।
এরপর কোনোদিন কোনো কথা বলিনি এ সম্বন্ধে তার সাথে। অথচ রাষ্ট্রপতি নিজেই আজ এত প্রশ্ন করলেন ওদের সম্বন্ধে।
কখন ঘুমিয়ে পড়েছিলাম জানি না। দরজা ধাক্কার আওয়াজে ঘুম ভেঙে গেল। হকচকিয়ে দরজা খুলে দেখি একরাম ভাই সামনে দাঁড়িয়ে। ‘হুদা সাহেব, নিশ্চয়ই কিছু একটা ঘটেছে। সার্কিট হাউস থেকে মিজান চৌধুরী ফোন করেছিল। বলল, আপনারা তাড়াতাড়ি সার্কিট হাউসে চলে আসেন।’
তখন ভোর ৫টা। ছুটে গেলাম ফোনের কাছে। ফোন নিঃশব্দ। লাইন কেটে দেওয়া হয়েছে। একরাম ভাইকে বললাম, ‘একরাম ভাই, আপনারা তৈরি হয়ে নিন, দেখি আমি গাড়ির কোনো বন্দোবস্ত করতে পারি কি না।’
দুটো বাড়ি পরেই ছিল শিরিনদের বাড়ি। কলিং বেল টিপতে গিয়ে বুঝলাম কারেন্ট নেই। সজোরে ধাক্কাতে লাগলাম। বিটা এসে দরজা খুলল। ‘কী হয়েছে বলো তো? রাতে অনেক গোলাগুলির আওয়াজ আসছিল সার্কিট হাউসের দিক থেকে।’
‘তাই নাকি? আমি তো কিছুই শুনতে পাইনি।’ মনে মনে ভাবলাম কম্প্রেসরের আওয়াজটাই আমাকে বাইরের জগৎ থেকে সম্পূর্ণভাবে বিচ্ছিন্ন করে রেখেছিল।
‘তোমার গাড়িটা বের কর। সার্কিট হাউসে যেতে হবে। আল্লাহই জানেন কী ঘটেছে ওখানে।’ বলে আমি বিটাকে সময় নষ্ট না করতে অনুরোধ করলাম। সকাল প্রায় পৌনে ৬টার দিকে পৌঁছলাম সার্কিট হাউসে। প্রথম গেটে বাধা দিল দুজন পুলিশ, ‘কোথায় যাবেন আপনারা?’
বললাম, ‘রাষ্ট্রপতির সাথে কালকে এসেছি। আজকে তার সাথেই এখান থেকে ফেরত যাওয়ার কথা আছে আমাদের ঢাকায়।’
‘উনি তো বোধহয় যেতে পারবেন না আজ। ঠিক আছে আপনি গাড়িটা চিটাগাং ক্লাবে রেখে হেঁটে যান।’
বিটাকে গাড়িটা চিটাগাং ক্লাবে নিয়ে যেতে বলে নেমে পড়লাম আমি। দ্বিতীয় গেটের সামনে পৌঁছতে দেখা হলো আরিফ মঈনউদ্দীনের সাথে।
‘কী খবর আরিফ?’ জিজ্ঞাসা করলাম আমি।
‘হুদা ভাই, The situation is very grave.’
একটা Wireles হাতে নিয়ে আরিফের সাথে কথা বলছিল একজন Plain clothed security'র লোক। খাকি প্যান্টের ওপরে একটা সাদা শার্ট। চোখে-মুখে ক্লান্তির ছাপ, খালি পা।
জিজ্ঞাসা করলাম, ‘situation grave মানে কী? কী হয়েছে? কী রকম Grave?’
‘Grave মানে Grave. এর চেয়ে খারাপ তো আর কিছু হতে পারে না।’
‘Do you mean he has been killed?’
উত্তরের অপেক্ষা না করেই জিজ্ঞাসা করলাম, ‘ভেতরে যেতে পারি?’
‘I am sorry, আমার মনে হয় আপনাদের এ জায়গাটি ত্যাগ করাটাই উচিত হবে।’ সিকিউরিটির লোকটি জানাল।
বুঝলাম, আরিফও চেষ্টা করছিল অনেকক্ষণ ধরে ঢোকার জন্য। জিজ্ঞেস করলাম, ‘সার্কিট হাউসের ভিতরে কি এখন কেউ নেই?’
‘না।’
দেখলাম একটা নিস্তব্ধ নিঝুম ভৌতিক অট্টালিকার মতো দাঁড়িয়ে রয়েছে সার্কিট হাউস, ভিতরে নিঝুম অন্ধকার, জনপ্রাণীর কোনো সাড়া নেই। বুঝলাম কয়েক ঘণ্টা আগেও যে মহামানবের অবস্থানে সমস্ত সার্কিট হাউসটি একটি কর্মমুখর প্রাণচাঞ্চল্যে ভরপুর ছিল, বিধি ছিনিয়ে নিয়ে গেছে সে মহারথীকে আমাদের কাছ থেকে চিরকালের জন্য। শেষবারের মতো আবেদন করলাম, ‘ভাই শেষবারের মতো দেখারও কোনো সুযোগ পাব না?’
‘আপনাদের মঙ্গলের জন্যই বলছি, এখানে আর একটি মিনিটও থাকা আপনাদের জন্য ঠিক হবে না।’ সিকিউরিটির সেই ভদ্রলোক আমাদের সাবধান করে দিলেন। অশ্রুসজল চোখে আরিফ বলল, ‘চলেন হুদা ভাই, আমার মনে হয় না সার্কিট হাউসে কেউ আছে। পরিষ্কারভাবে কিছু না বুঝে এখানে থাকাটা বোধহয় ঠিক হবে নাÑ বিশেষ করে উনি যখন আমাদের এত করে বলছেন চলে যেতে।’
ফিরে এলাম গাড়ির কাছে।
শিরিন আগেই বুঝতে পেরেছিল। চিৎকার করে কেঁদে উঠল, ‘আমার ভাইয়াকে কারা মেরে ফেলল?’ শিরিনের মাথাটা ঢলে পড়ল বিটার কাঁধের ওপর। গাড়ির ইঞ্জিন গর্জে উঠল, পাহাড়ের গা বেয়ে নেমে এলো যন্ত্রদানবটি।
রাস্তার দোকানগুলো খুলতে শুরু করেছে। পথচারীরা স্বাভাবিকভাবেই পথ চলতে চলতে একটু ঘুরে ঘুরে দেখছে সার্কিট হাউসের দিকে। কী হয়েছে এখনও তারা আঁচ করতে পারছে না। কেউ জটলা পাকাচ্ছে দোকানগুলোর সামনে। কী করব বুঝতে পারলাম না। ফিরে এলাম বিটার বাসায়। রেডিও ছাড়লাম। ৭টা বাজে অথচ চট্টগ্রাম বেতার কেন্দ্রে কোনো সাড়াশব্দ নেই। বুঝলাম চট্টগ্রামের পতন হয়েছে বিদ্রোহীদের হাতে। ঢাকা বেতারে টিউন করলাম, স্বাভাবিকভাবেই অনুষ্ঠানসূচি চলছে। বুঝলাম ঢাকায় এখানকার খবরটা পৌঁছায়নি এবং ঢাকায় কোনো ঘটনা ঘটেনি। বিটাকে বললাম, ‘তোমার গাড়িটা দাও, ঢাকা যাব।’
শিরিন বলল, ‘আমিও যাব।’
প্রায় ৮টার দিকে অভিশপ্ত সার্কিট হাউসকে পাশ কাটিয়ে পাহাড়তলী দিয়ে ঢাকার পথে রওনা হলাম আমরা। ভাবলাম এ-পথ যে কোথায় শেষ হবে জানি না। শুধু এটা জানি, যে সন্তানকে বহন করে এ-পথ হয়েছে প্রশস্ত, সে সন্তানের বোধহয় এ-পথে আর কোনোদিন যাওয়া হবে না।
লেখক : সাবেক মন্ত্রী; সহ-সভাপতি, বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল, জাতীয় নির্বাহী কমিটি। বিএনপির প্রথম স্থায়ী কমিটির সদস্য ছিলেন।