× ই-পেপার প্রচ্ছদ সর্বশেষ বাংলাদেশ রাজনীতি দেশজুড়ে বিশ্বজুড়ে বাণিজ্য খেলা বিনোদন মতামত চাকরি শিক্ষা আজকের কার্টুন ফিচার সকল বিভাগ ছবি ভিডিও লেখক আর্কাইভ কনভার্টার

জিয়ার বাংলাদেশ: বাংলাদেশের জিয়া

মারুফ কামাল খান

প্রকাশ : ২৫ মে ২০২৬ ১৮:৪৪ পিএম

আপডেট : ২৫ মে ২০২৬ ২২:০১ পিএম

ফাইল ছবি

ফাইল ছবি

এমন মানুষ বছরে বছরে গন্ডায় গন্ডায় জন্মায় না। শতাব্দীর পর শতাব্দী অপেক্ষা করতে হয় জাতির এমন একজন মহানায়কের জন্য। সমকালের গড়পড়তা সাধারণ মানুষের মতো নন; এঁরা সময়ের সন্তান; শতাব্দীর বিস্ময়। ইতিহাস তাঁদেরকে কুর্নিশ করে; কৃতজ্ঞতায় নত হয় দেশ, বিশ্ব জানায় অভিবাদন।

ক্ষুদ্র ও কৃতঘ্ন নরাধমেরা তাঁদের নামে যত বেশি কুৎসা রটায়, মানুষের হৃদয়ে ততই উজ্জ্বল, ভাস্বর ও দেদীপ্যমান হয়ে ওঠে তাঁদের অম্লান স্মৃতি।

আমাদের জাতির তেমন একজন দিশারীর কথাই বলছি। এটা কোনো বীরপূজা বা ব্যক্তিবন্দনা নয়। জন্মভূমির যোগ্য সন্তানের, দুঃসময়ের এক দুঃসাহসী ত্রাতার সত্যিকারের মূল্যায়ন।

তিনি আমেরিকায় জন্মালে হতেন জর্জ ওয়াশিংটন, গ্রেট ব্রিটেনে জন্মালে চার্চিল, ফ্রান্সে জন্মালে দ্য গল, রাশিয়ায় জন্মালে মার্শাল জুকভ, চীনে জন্ম নিলে মার্শাল চু তে। কুর্দি হলে তিনি হতেন গাজী সালাহ্উদ্দীন, তুরস্কে জন্মালে মোস্তফা কামাল, প্রাচীন পারস্যে জন্মালে সাইরাস দ্য গ্রেট, আলজিরিয়ান হলে হতেন তারেক ইবনে জিয়াদ, মহিসুরে জন্মালে হতেন হায়দার আলী, মিসরে জন্মালে জামাল নাসের, মুঘল হলে তিনি হতেন বাবর আর আফগান হলে শের শাহ্ সুরি। 

বিংশ শতাব্দীতে বাংলাদেশে তিনি হয়েছেন জিয়াউর রহমান। তিনি আমাদের জাতীয় পরিচয় ও আদর্শের পতাকা। আমাদের রাষ্ট্রীয় জীবনের পথপ্রদর্শক।

টেকনাফ থেকে তেঁতুলিয়া। ছাপ্পান্ন হাজার বর্গমাইলের এই গাঙ্গেয় ব-দ্বীপে কর্মচঞ্চল জনস্রোতে মিশে জনপদ থেকে জনপদে ক্ষিপ্রগতি চারণের বেশে ছুটে চলা সেই কর্মী রাষ্ট্রনায়কের ছবি বাংলাদেশের স্মৃতিপটে হয়ে আছে অক্ষয়।

নদীমেখলা শস্যশ্যামলা এই বাংলাদেশকে তিনি ধ্যানে-জ্ঞানে তাঁর প্রথম ও শেষ তীর্থভূমি বলে নির্ধারণ করেছিলেন। জীবনে এবং মরণেও বাংলাদেশকেই তিনি বেছে নিয়েছিলেন একমাত্র আশ্রয়স্থল হিসেবে। এই মৃত্তিকা পবিত্রতর হয়েছে তাঁরই শহীদি রক্তে। অবিনাশী আপন কীর্ত্তিরাজি পশ্চাতে ফেলে তাঁর জীবনের রথ দিগন্তে পৌঁছে গেলে এখানেই রচিত হয়েছে তাঁর অন্তিম শয়ান। সামান্য সমাধিতলে নশ্বর দেহ রেখে সেই অসামান্য মহাপ্রাণ জাতিকে এখনও দেন পথের নির্দেশ।

বিস্ময়কর ঐন্দ্রজালিক এক সহজাত ক্ষমতা নিয়ে ক্ষণজন্মা জিয়া জাতির প্রয়োজনের মুহূর্তে বারবার দৃশ্যপটে আবির্ভূত হয়েছেন। জীবন বাজি রেখে ইতিহাস-নির্ধারিত দুঃসাহসী ভূমিকা পালন করে আবার তিনি নিজেই সরে গেছেন যবনিকার অন্তরালে। 

১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ মধ্যরাতে ইতিহাসের পৈশাচিক গণহত্যার ভয়াবহতায় দেশবাসী যখন কিংকর্তব্যবিমূঢ়, সেই সময় ইথার কম্পনে ভেসে এলো একটি নাম, একটি কণ্ঠস্বর। কালুরঘাটের বেতার-তরঙ্গ মারফত ছড়িয়ে পড়ল সেই বরাভয় : ‘আমি মেজর জিয়া বলছি’।

বঙ্গশার্দুল জিয়া ছাপ্পান্ন হাজার বর্গমাইলের এই দুর্জেয় ভূখণ্ডে পাকিস্তানি শাসন-কর্তৃত্বের অবসান ঘটিয়ে ঘোষণা করলেন বাংলাদেশের স্বাধীনতা।

প্রিয় স্বদেশভূমি যখন আক্রান্ত, দেশবাসী বিপন্ন; সেই ঘোর দুঃসময়ে দেশরক্ষার সৈনিককে কোনো পিছুটান ফিরিয়ে রাখতে পারেনি সুকঠিন কর্তব্য পালন থেকে। প্রিয়তম পত্নীর সকাতর চাহনি, প্রাণপ্রতিম সন্তানদের মায়াডোর উপেক্ষা করে জীবন বাজি রেখে সদর্পে, স্বকণ্ঠে তিনি স্বাধীনতার যুগান্তকারী দুঃসাহসী ঘোষণা দেন। 

কিন্তু কেবল বেতার সম্প্রচার কেন্দ্রের ঘোষণার মধ্যেই জিয়া তাঁর দায়িত্ব ও কর্তব্যকে সীমিত করে রাখেননি। প্রতিরোধের লড়াইকে স্বাধীনতার যুদ্ধে উন্নীত করা এবং সেই যুদ্ধে প্রথমে সেক্টর ও পরে ব্রিগেড অধিনায়ক হিসেবে তিনি রণাঙ্গনে বীরত্বপূর্ণ যুদ্ধ পরিচালনার মাধ্যমে স্বাধীনতাকে ত্বরান্বিত করেছিলেন।

১৯৭৫ সালের নভেম্বরে আবার দেশবাসী শুনল সেই একই কণ্ঠস্বর। সেও আরেক অনিশ্চিত সময়। একদল অভ্যুত্থানকারী সেনাপ্রধান জিয়াকে বন্দি রেখে তাঁকে পদচ্যুত বলে ঘোষণা দিয়েছিল। তবে এ অভ্যুত্থান শেষ অব্দি শোচনীয়ভাবে ব্যর্থ হয়।

৭ নভেম্বরের প্রথম প্রহর থেকেই সারা দেশের সেনা ছাউনিগুলোর চেহারা বদলে যায়। সাধারণ সৈনিকরা অস্ত্র হাতে গুলি ছুড়তে ছুড়তে বেরিয়ে আসে ব্যারাক থেকে। বন্দি সেনাপ্রধান জিয়াকে মুক্ত করে কাঁধে তুলে তারা নেমে আসে রাজপথে। বাংলাদেশ জিন্দাবাদ, কুচক্রীরা নিপাত যাক, জিয়াউর রহমান জিন্দাবাদ ধ্বনি দিয়ে সৈনিকরা ৭ নভেম্বর সুবেহ্ সাদেকের সময় রাস্তায় নামলে তাদের প্রতি স্বতঃস্ফূর্ত সমর্থন জানাতে সারা দেশের সাধারণ মানুষও বেরিয়ে আসে ঘর থেকে। শ্রেণি-পেশা নির্বিশেষে আবালবৃদ্ধবনিতা দেশরক্ষায় সৈনিকদের কণ্ঠে কণ্ঠ মিলিয়ে স্লোগান তোলে। সেনাদলগুলোকে বিপুল করতালি দিয়ে অভিনন্দিত করতে থাকে রাজপথের দুই পাশে অপেক্ষমাণ লাখো জনতা। জনসমুদ্র থেকে বর্ষিত পুষ্পবৃষ্টিতে ছেয়ে যায় ট্যাংক, সাঁজোয়া যান। কামানের নলে মালা পরায় সাধারণ মানুষ। সে এক অভূতপূর্ব দৃশ্য! ১৯৭১ সালের ডিসেম্বরে স্বাধীনতা যুদ্ধে বিজয়ের পর আর কখনও এমন দৃশ্যের অবতারণা হয়নি।

৭ নভেম্বরের সৈনিক-জনতার জাগৃতি ছিল ইতিহাসের এক মাইলফলক। এই বিপ্লবী অভ্যুত্থানের নায়ক কোনো জাঁদরেল সেনাপতি নন, সাধারণ সিপাহিরা। আর তাদের সাথে যোগ দিয়েছিল সর্বস্তরের দেশপ্রেমিক জনতা। তারাই সেদিন বন্দি জিয়াকে মুক্ত করে এনে এক অরাজক ও নেতৃত্বশূন্য পরিস্থিতিতে তাঁর হাতে তুলে দিয়েছিল দেশ পরিচলনার দায়িত্ব। প্রকাশ্য রাজপথে সৈনিক-জনতার মহাসমুদ্রে অবিরত পুষ্পবর্ষণের মাধ্যমে অভিষেক ঘটে তাঁর রাষ্ট্রক্ষমতার।

৭ নভেম্বরের বিপ্লবের মধ্য দিয়ে বাংলাদেশে ফিরে আসে রাজনীতি, গঠিত হয় রাজনৈতিক দল, পুনঃপ্রতিষ্ঠিত হয় জনগণের নির্বাসিত মৌলিক অধিকার, নির্বাচনী প্রক্রিয়া ও বহুদলীয় গণতন্ত্রের ধারা। এই বিপ্লবের মধ্য দিয়ে চক্রান্ত মুক্ত হয়ে সশস্ত্র বাহিনীতে শৃঙ্খলা ও ঐক্য প্রতিষ্ঠিত হয়। বাংলাদেশ নামের জাতিরাষ্ট্র বা নেশনস্টেটটি অর্জন করে রাষ্ট্রীয় সার্বভৌমত্ব। এই রাষ্ট্রের নাগরিকরা রাষ্ট্রভিত্তিক, আধুনিক ও বাস্তবসম্মত এক জাতীয় পরিচয় অর্জন করে। আর আত্মপরিচয় লাভের মাধ্যমে নবোদ্দীপ্ত এবং আত্মোপলব্ধির মাধ্যমে নবোত্থিত এই বাংলাদেশি জাতিসত্তাকে স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট্য, স্বকীয়তা, মর্যাদা, নিজস্ব সংস্কৃতি, স্বাধীন অর্থনীতি ও গৌরব নিয়ে সম্মুখপানে এগিয়ে চলার প্রশস্ত নতুন মহাসড়ক গড়ে দেন জিয়াউর রহমান। 

১৯৭৫ সালের ৭ নভেম্বর থেকে ১৯৮১ সালের ৩০ মে। মাত্র সাড়ে পাঁচ বছর রাষ্ট্র পরিচালনার সাথে তিনি যুক্ত ছিলেন। এই সময়ের মধ্যেই বাংলাদেশকে বদলে ফেলেছিলেন জিয়াউর রহমান। পশ্চাদমুখী ও সংকীর্ণ সামন্তচিন্তার অর্গল ভেঙে তিনি বাংলাদেশকে স্থাপন করেছেন সম্মুখপ্রসারী, উদার ও আধুনিক ধারায়। আজ এদেশের যেখানেই উৎপাদন, উন্নয়ন ও নির্মাণের স্বাক্ষর রয়েছে, সেখানেই মিলবে তাঁর গণমুখী ও কল্যাণকর পরিকল্পনার ছোঁয়া। কেবল তাঁর সমকালেই নয়, জিয়াউর রহমানের আদর্শ ও দর্শন কালোত্তীর্ণ হয়ে আজ এদেশের জাতীয় আদর্শে পরিণত হয়েছে।

স্বল্পতম সময়ের মধ্যে ইতিহাস নির্ধারিত যুগান্তকারী দায়িত্ব পালন শেষে তিনি আবার ফিরে গেছেন যবনিকার অন্তরালে। তবে তাঁর এবারকার যাত্রা অন্তিম এবং আর কখানও তিনি সশরীরে আমাদের মাঝে ফিরে আসবেন না। কেবল তাঁর কালজয়ী আদর্শ এ জাতিকে পথ দেখাবে।

শেয়ার করুন-

মন্তব্য করুন

Protidiner Bangladesh

সম্পাদক : মারুফ কামাল খান

প্রকাশক : কাউসার আহমেদ অপু

রংধনু কর্পোরেট, ক- ২৭১ (১০ম তলা) ব্লক-সি, প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড) ঢাকা -১২২৯

যোগাযোগ

প্রধান কার্যালয়: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৬৯৬ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (প্রিন্ট): +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮১০, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০ | ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (অনলাইন): +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০, +৮৮০১৭৯৯৪৪৯৫৫৯ । ই-মেইল: [email protected]

সার্কুলেশন: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮০৭, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৩৩২ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন মূল্য তালিকা