× ই-পেপার প্রচ্ছদ সর্বশেষ বাংলাদেশ রাজনীতি দেশজুড়ে বিশ্বজুড়ে বাণিজ্য খেলা বিনোদন মতামত চাকরি শিক্ষা আজকের কার্টুন ফিচার সকল বিভাগ ছবি ভিডিও লেখক আর্কাইভ কনভার্টার

ঈদুল আজহা

রেমিট্যান্সে চাঙ্গা অর্থনীতি

আহমেদ তোফায়েল

প্রকাশ : ২৪ মে ২০২৬ ১৩:১২ পিএম

আপডেট : ২৪ মে ২০২৬ ১৩:২২ পিএম

গ্রাফিক্স : প্রবা

গ্রাফিক্স : প্রবা

আসন্ন পবিত্র ঈদুল আজহাকে কেন্দ্র করে দেশের সামষ্টিক অর্থনীতিতে বড় ধরনের ইতিবাচক পরিবর্তন আসছে। ডলার সংকট নিয়ে বাজারে চলমান নানামুখী আলোচনার মধ্যেই দেশের অর্থনীতির অন্যতম প্রধান চালিকাশক্তি রেমিট্যান্স বা প্রবাসী আয়ে বড় ধরনের গতি লক্ষ্য করা যাচ্ছে। প্রবাসীদের পাঠানো এই বাড়তি অর্থের ওপর ভর করে দেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভে বড় ধরনের সুসংবাদ এসেছে, যা বর্তমান বাজার পরিস্থিতিতে বেশ স্বস্তিদায়ক।

বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ প্রতিবেদন অনুযায়ী, চলতি মে মাসের প্রথম ২০ দিনেই দেশে রেকর্ড পরিমাণ রেমিট্যান্স পাঠিয়েছেন প্রবাসীরা। এই ২০ দিনে দেশে ২৬২ কোটি ২০ লাখ ডলার রেমিট্যান্স এসেছে, যা দেশীয় মুদ্রায় প্রায় ৩০ হাজার ৯৩৯ কোটি ৬০ লাখ টাকা। তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, এই সময়ে প্রতিদিন গড়ে দেশে প্রবাসী আয় এসেছে ১৩ কোটি ১১ লাখ ডলার বা ১ হাজার ৫৪৬ কোটি ৯৮ লাখ টাকা। 

কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, মে মাসের প্রথম ২০ দিনে আসা এই রেমিট্যান্স গত বছরের একই সময়ের তুলনায় ৩৮ দশমিক ৩ শতাংশ বেশি। ২০২৫ সালের মে মাসের প্রথম ২০ দিনে দেশে রেমিট্যান্স এসেছিল ১৮৯ কোটি ৭০ লাখ ডলার। সেই হিসাবে চলতি বছরের একই সময়ে রেমিট্যান্স বেড়েছে ৭২ কোটি ৫০ লাখ ডলার বা ৮ হাজার ৫৫৫ কোটি টাকা। এর মধ্যে গত ২০ মে একদিনেই দেশে এসেছে ১৩ কোটি ৯০ লাখ ডলার, যা টাকার অঙ্কে ১ হাজার ৬৪০ কোটি ২০ লাখ টাকার সমান।

অন্যদিকে, চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরের ১ জুলাই থেকে ২০ মে পর্যন্ত দেশের সামগ্রিক রেমিট্যান্সের চিত্রও বেশ আশাব্যঞ্জক। এই ১১ মাসেরও কম সময়ে দেশে মোট রেমিট্যান্স এসেছে ৩ হাজার ১৯৫ কোটি ৫০ লাখ ডলার। আগের অর্থবছরের একই সময়ে যার পরিমাণ ছিল ২ হাজার ৬৪৩ কোটি ৪০ লাখ ডলার। অর্থাৎ চলতি অর্থবছরের প্রথম ১১ মাসে রেমিট্যান্সের প্রবৃদ্ধি হয়েছে ২০ দশমিক ৯ শতাংশ।

রেমিট্যান্সের এই প্রবাহের সরাসরি ইতিবাচক প্রভাব পড়েছে দেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভে। আন্তর্জাতিক মানদণ্ড ও কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সর্বশেষ হিসাব অনুযায়ী, গত ২১ মে পর্যন্ত দেশের গ্রস বা মোট বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ উল্লেখযোগ্য পরিমাণে বৃদ্ধি পেয়ে দাঁড়িয়েছে ৩ হাজার ৪৫৩ কোটি ৯০ লাখ ডলারে। বাংলাদেশি মুদ্রায় এই গ্রস রিজার্ভের পরিমাণ প্রায় ৪ লাখ ৭ হাজার ৫৫৬ কোটি ২০ লাখ টাকা। তবে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল বা আইএমএফের নির্দেশিত ‘বিপিএম-৬’ হিসাব পদ্ধতি অনুযায়ী, বর্তমানে দেশের প্রকৃত রিজার্ভের পরিমাণ ২ হাজার ৯৮৭ কোটি ৯০ লাখ ডলার, যা বাংলাদেশি টাকায় প্রায় ৩ লাখ ৫২ হাজার ৫৭২ কোটি ২০ লাখ টাকা।

খাত সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা মনে করেন, আন্তর্জাতিক মানদণ্ড বজায় রেখে এই দুই পদ্ধতির হিসাব প্রকাশ করায় দেশের প্রকৃত আর্থিক সক্ষমতা বিশ্বমঞ্চে অনেক বেশি স্বচ্ছভাবে ফুটে উঠছে। বর্তমান বৈশ্বিক বাজারের মুদ্রাস্ফীতি এবং আমদানি ব্যয় মেটানোর চাপের মুখে রিজার্ভের এই মজবুত অবস্থান দেশের সামগ্রিক বাণিজ্যে বড় ভূমিকা রাখবে।

ব্যাংকভিত্তিক রেমিট্যান্স প্রবাহের তথ্য বিশ্লেষণ করলে বেসরকারি ব্যাংকগুলোর একচ্ছত্র আধিপত্য দেখা যায়। মে মাসের প্রথম ১৬ দিনে দেশে মোট ১৯৭ কোটি ৩৪ লাখ ডলার (২৩ হাজার ২৮৬ কোটি ১২ লাখ টাকা) রেমিট্যান্স এসেছে। এর মধ্যে বেসরকারি বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোর মাধ্যমে এসেছে ১৩৯ কোটি ৬৩ লাখ ডলার। বিপরীতে রাষ্ট্রায়ত্ত বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোর মাধ্যমে এসেছে ৩৪ কোটি ৯ লাখ ডলার এবং বিশেষায়িত বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকের মাধ্যমে এসেছে ২৩ কোটি ২৭ লাখ ডলার। অন্যদিকে বিদেশি বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোর মাধ্যমে এসেছে মাত্র ৩৪ লাখ ডলার।

একক ব্যাংক হিসেবে বেসরকারি খাতের ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ পিএলসি রেমিট্যান্স আহরণে শীর্ষস্থান ধরে রেখেছে। মে মাসের প্রথম ১৬ দিনে এই ব্যাংকটির মাধ্যমে দেশে এসেছে ৩৫ কোটি ৬২ লাখ ডলার। দ্বিতীয় সর্বোচ্চ ২৩ কোটি ৮১ লাখ ডলার এসেছে ব্র্যাক ব্যাংক পিএলসির মাধ্যমে। এ ছাড়া ট্রাস্ট ব্যাংক পিএলসির মাধ্যমে ১৮ কোটি ৫৩ লাখ ডলার এসেছে।

রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলোর মধ্যে অগ্রণী ব্যাংক পিএলসি সর্বোচ্চ ১৬ কোটি ৩৪ লাখ ডলার এবং জনতা ব্যাংক পিএলসি ১২ কোটি ২৮ লাখ ডলার এনেছে। তবে সোনালী ব্যাংক পিএলসির মাধ্যমে এসেছে মাত্র ২৯ লাখ ডলার।

বিগত কয়েক বছরের তুলনায় এবারের রেমিট্যান্সের গতিকে ঈর্ষণীয় বলা চলে। চলতি অর্থবছরের প্রথম ১০ মাসে (জুলাই থেকে এপ্রিল) দেশে মোট রেমিট্যান্স এসেছে ২ হাজার ৯৩৩ কোটি ১৭ লাখ ডলার। যেখানে গত ২০২৪-২৫ অর্থবছরের পুরো ১২ মাসে মোট রেমিট্যান্স এসেছিল ৩ হাজার ৩২ কোটি ৮৮ লাখ ডলার। এই প্রবণতা নির্দেশ করে, প্রবাসীরা বৈধ পথে টাকা পাঠাতে আগের চেয়ে অনেক বেশি উৎসাহিত হচ্ছেন। 

মাসভিত্তিক প্রবাহে গত মার্চ মাসে সর্বোচ্চ ৩৭৫ কোটি ২২ লাখ ডলার এবং এপ্রিলে ৩১২ কোটি ৭৩ লাখ ডলার এসেছিল। মে মাসের বর্তমান গতি বজায় থাকলে মাস শেষে তা ৩৫০ কোটি ডলার ছাড়িয়ে যাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে, যা হবে চলতি অর্থবছরের দ্বিতীয় সর্বোচ্চ প্রাপ্তি।

তবে কিছু ব্যাংক রেমিট্যান্স আহরণে সক্রিয় হলেও বেশকিছু প্রতিষ্ঠান এক্ষেত্রে সম্পূর্ণ ব্যর্থ হয়েছে। মে মাসের প্রথম ১৬ দিনে বাংলাদেশ ডেভেলপমেন্ট ব্যাংক পিএলসি, বিশেষায়িত রাজশাহী কৃষি উন্নয়ন ব্যাংক (রাকাব), বেসরকারি খাতের আইসিবি ইসলামিক ব্যাংক এবং পদ্মা ব্যাংক পিএলসির মাধ্যমে কোনো রেমিট্যান্স আসেনি। বিদেশি ব্যাংকগুলোর মধ্যে ব্যাংক আল-ফালাহ, হাবিব ব্যাংক লিমিটেড, ন্যাশনাল ব্যাংক অব পাকিস্তান এবং স্টেট ব্যাংক অব ইন্ডিয়াও কোনো রেমিট্যান্স আনতে পারেনি।

অর্থনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, অর্থবছরের শেষ দিকে এসে রেমিট্যান্সের এই চাঙ্গা ভাব দেশের সামষ্টিক অর্থনীতির জন্য ইতিবাচক বার্তা। বৈধ চ্যানেলে রেমিট্যান্স পাঠানোর প্রক্রিয়া সহজ করা এবং ব্যাংকগুলোর নিজস্ব সেবামূলক উদ্যোগের কারণেই এই জোয়ার তৈরি হয়েছে। 

মে ও জুন এই দুই মাসের প্রবাসী আয়ের ওপর ভর করে চলতি অর্থবছর শেষে মোট রেমিট্যান্স এক নতুন উচ্চতায় পৌঁছাবে, যা ডলারের বিনিময় হার স্থিতিশীল রাখতে এবং আগামী দিনে দেশের বৈদেশিক লেনদেনের ভারসাম্য ও অর্থনৈতিক ভিত্তিকে আরও বেশি সুসংহত করতে শক্তিশালী ভূমিকা পালন করবে।

জানতে চাইলে বিশ্বব্যাংকের ঢাকা অফিসের সাবেক প্রধান অর্থনীতিবিদ ড. জাহিদ হোসেন প্রতিদিনের বাংলাদেশকে বলেন, ঈদের সময় রেমিট্যান্স বাড়ে এটি স্বাভাবিক। তবে রেমিট্যান্সের এই প্রবাহ দেশের রিজার্ভ সংকট কাটাতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে। এর ফলে আগে ডলার সংকটের কারণে ব্যাংকগুলো ঋণপত্র বা এলসি খুলতে যে সমস্যায় পড়ত, তা ইতোমধ্যে অনেকটাই স্বাভাবিক হয়ে এসেছে। 

বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্বাহী পরিচালক ও মুখপাত্র আরিফ হোসেন খান জানিয়েছেন, রেমিট্যান্সের এই ধারাবাহিক বৃদ্ধির ফলে বৈদেশিক মুদ্রাবাজার আগের চেয়ে অনেক স্থিতিশীল। বাজারে ডলারের সরবরাহ এতটাই বেড়েছে, প্রবাসীরা যাতে দাম কমে যাওয়ার কারণে অনুৎসাহী না হন, সেজন্য বাংলাদেশ ব্যাংক নিজেই ব্যাংকগুলো থেকে ডলার কিনে বাজার নিয়ন্ত্রণ করছে।

তবে অর্থনীতিবিদরা একটি বড় সতর্কবার্তাও দিয়েছেন। যেহেতু বাংলাদেশ মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোর ওপর ব্যাপকভাবে নির্ভরশীল এবং বর্তমানে সেখানে এক ধরনের ভূ-রাজনৈতিক উত্তেজনা কাজ করছে, তাই যেকোনো সময় এই প্রবাহ ব্যাহত হতে পারে। ঝুঁকি এড়াতে তারা সরকারকে জরুরি ভিত্তিতে নতুন শ্রমবাজার অনুসন্ধান এবং কর্মীদের দক্ষতা উন্নয়নের পরামর্শ দিয়েছেন।

শেয়ার করুন-

মন্তব্য করুন

Protidiner Bangladesh

সম্পাদক : মারুফ কামাল খান

প্রকাশক : কাউসার আহমেদ অপু

রংধনু কর্পোরেট, ক- ২৭১ (১০ম তলা) ব্লক-সি, প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড) ঢাকা -১২২৯

যোগাযোগ

প্রধান কার্যালয়: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৬৯৬ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (প্রিন্ট): +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮১০, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০ | ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (অনলাইন): +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০, +৮৮০১৭৯৯৪৪৯৫৫৯ । ই-মেইল: [email protected]

সার্কুলেশন: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮০৭, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৩৩২ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন মূল্য তালিকা