হাট থেকে বাড়ি
ডা. ওমাইয়া আজম ঐশী
প্রকাশ : ২৪ মে ২০২৬ ১৩:০৪ পিএম
ডা. ওমাইয়া আজম ঐশী, টেরিটোরি এক্সিকিউটিভ, এসিআই গোদরেজ অ্যাগ্রোভেট প্রাইভেট লিমিটেড
পবিত্র ঈদুল আজহা সমাগত। ধর্মপ্রাণ মুসলমানরা ইতোমধ্যেই প্রিয় পশুটি সংগ্রহের জন্য হাটে ভিড় করছেন। তবে দূর-দূরান্তের হাট থেকে পশু বাড়িতে আনার পর অনেক সময় পশুটি অসুস্থ হয়ে পড়ে। পরিবহনের ধকল এবং আবহাওয়া পরিবর্তনের কারণে পশুর কিছু সাধারণ ও জটিল রোগ দেখা দিতে পারে, যা সঠিক সময়ে প্রতিকার না করলে কোরবানিদাতার জন্য দুশ্চিন্তার কারণ হয়ে দাঁড়ায়।
প্রথমত, পশুকে কোরবানির হাট থেকে বাড়িতে আনার সময় সুবিধাজনক পরিবহনে আনতে হবে যেন তার কোনো ধরনের কষ্ট না হয়। বাড়িতে আনার পর তাকে অবশ্যই একটি শুকনো, বাতাস চলাচলের সুবিধাযুক্ত, ছায়াযুক্ত এবং পরিষ্কার জায়গায় রাখতে হবে এবং অন্তত ৫-৬ ঘণ্টা বিশ্রাম দিতে হবে ও সাথে সাথে খাবার দেওয়া যাবে না। পর্যাপ্ত বিশুদ্ধ পানি দিতে হবে। বাড়িতে যদি অন্য কোনো পশু আগে থেকেই পালিত থাকে তবে নতুন পশুটিকে আলাদা রাখতে হবে। পশুর মলমূত্র সর্বদা পরিষ্কার রাখতে হবে।
এ ছাড়াও হঠাৎ খাদ্যাভ্যাস পরিবর্তন হওয়ায় পশুর খাবারের আগ্রহ কমে যেতে পারে, এমনকি গ্যাসের সমস্যায় পেট ফাঁপা দেখা যেতে পারে। পেট ফেঁপে গেলে আদা, কালোজিরা ও বিট লবণের মিশ্রণ অথবা বাজারজাত অ্যান্টি-ব্লোট লিকুইড খাওয়ানো যেতে পারে। সমস্যা গুরুতর হলে পশুকে বাম কাতে শুইয়ে দিন এবং চিকিৎসকের পরামর্শ নিন। পশুকে হঠাৎ বেশি খাবার না দিয়ে ধীরে ধীরে অভ্যস্ত করতে হবে। কাঁচা ঘাস ও খড় পশুর জন্য সবচেয়ে নিরাপদ খাদ্য।
যে সমস্যাটি অধিকাংশ পশুতে দেখা যায় তা হলোÑ পরিবহনজনিত ধকল। দীর্ঘ পথ যাতায়াতের ক্লান্তিতে পশুর জ্বর বা শ্বাসকষ্ট হতে পারে। এ অবস্থায় তাকে জোর না করে পর্যাপ্ত পানি এবং বিশ্রামের ব্যবস্থা করে দিতে হবে। এ ছাড়াও পানির সাথে স্যালাইন দিলে তা পশুর জন্য আরামদায়ক হয়ে থাকে। আর জ্বর হলে চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী প্যারাসিটামল জাতীয় ওষুধ খাওয়াতে হবে এবং শরীর ভেজা কাপড় দিয়ে বারবার মুছে দিতে হবে।
তীব্র গরম এবং আর্দ্রতার কারণে পশুর শরীরের তাপমাত্রা স্বাভাবিকের চেয়ে অনেক বেড়ে যেতে পারে। ফলে পশু ঘন ঘন হাঁপাতে থাকে, মুখ দিয়ে প্রচুর লালা পড়ে এবং একপর্যায়ে পশু জ্ঞান হারিয়ে লুটিয়ে পড়ে। এ অবস্থায় দ্রুত পশুকে ছায়াযুক্ত ও শীতল স্থানে নিয়ে যেতে হবে। মাথায় ও শরীরে বারবার ঠান্ডা পানি ঢালতে হবে।
এ ছাড়াও পর্যাপ্ত পানি পান না করলে বা দীর্ঘক্ষণ এক জায়গায় বেঁধে রাখলে অনেক সময় পশুর প্রস্রাবে সমস্যা হতে পারে।পশু প্রস্রাব করার জন্য বারবার চেষ্টা করে কিন্তু করতে পারে না এবং পেটে ব্যথার কারণে ছটফট করে। তাই প্রথম থেকেই পশুকে পর্যাপ্ত পানি দিতে হবে।
অনেক সময় ট্রাক থেকে নামতে গিয়ে বা অন্য কোনো কারণে শরীরের কোনো স্থানে কেটে বা ছিলে যায়। সেক্ষেত্রে ক্ষতর গভীরতা অনুযায়ী প্রতিকার করতে হবে। হালকা ক্ষত হলে ভায়োডিন এবং গভীর ক্ষত হলে চিকিৎসকের পরামর্শ নিতে হবে। পশুর রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়াতে ভিটামিন সি বা বাজারে প্রচলিত সিভিট খুব ভালো কাজ করে।
কোরবানি কেবল একটি পশু জবাইয়ের উৎসব নয়; এটি আমাদের ধৈর্য, দায়িত্বশীলতা এবং ত্যাগের পরীক্ষা। হাট থেকে একটি পশু পছন্দ করে বাড়িতে আনার পর তার সঠিক পরিচর্যা ও স্বাস্থ্যের খেয়াল রাখা আমাদের নৈতিক দায়িত্বের অংশ। পশুর সামান্য অসুস্থতা বা অবহেলা যেমন উৎসবের আনন্দকে ম্লান করে দিতে পারে, তেমনি অপরিকল্পিত বর্জ্য ব্যবস্থাপনা জনস্বাস্থ্যের জন্য ঝুঁকি তৈরি করতে পারে। তাই রোগবালাই সম্পর্কে সচেতন থাকা, দ্রুত প্রতিকার নিশ্চিত করা এবং জবাই-পরবর্তী পরিচ্ছন্নতা বজায় রাখার মাধ্যমেই একটি সার্থক কোরবানি সম্পন্ন করা সম্ভব। আসুন, যথাযথ নিয়ম ও স্বাস্থ্যবিধি মেনে পশু কোরবানির মাধ্যমে আমরা ত্যাগের প্রকৃত শিক্ষাকে ধারণ করি এবং একটি সুন্দর, স্বাস্থ্যকর ও দূষণমুক্ত পরিবেশ নিশ্চিত করে ঈদুল আজহার আনন্দ সবার মাঝে ছড়িয়ে দিই।
লেখক: টেরিটোরি এক্সিকিউটিভ, এসিআই গোদরেজ অ্যাগ্রোভেট প্রাইভেট লিমিটেড