পশুর হাট ও ঈদুল আজহা
রাহাত হুসাইন
প্রকাশ : ২৪ মে ২০২৬ ১২:১০ পিএম
ঈদুল আজহাকে সামনে রেখে রাজধানী ঢাকা উত্তর ও ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনে বসছে স্থায়ী ও অস্থায়ী মোট ২৩টি পশুর হাট। কোরবানির পশুর স্বাস্থ্যসুরক্ষা এবং ক্রেতা-বিক্রেতাদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে দুই সিটিই তাদের মাঠ পর্যায়ের জনবল ও যান-যন্ত্রপাতি প্রস্তুত রেখেছে। হাটগুলোতে সিসি ক্যামেরা বসানো হচ্ছে। পশুর সুরক্ষায় থাকছে ভেটেরিনারি টিম। কোরবানির পর নির্ধারিত সময়ের মধ্যেই ঢাকাকে সম্পূর্ণ বর্জ্যমুক্ত ও জীবাণুমুক্ত করার একটি মহাপরিকল্পনা নিয়েও কাজ করছে উভয় সিটি করপোরেশন।
ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন (ডিএনসিসি) এরই মধ্যে ঐতিহ্যবাহী গাবতলী স্থায়ী গবাদিপশুর হাট ছাড়াও ১০টি অস্থায়ী পশুর হাটের ইজারা চূড়ান্ত করেছে। সেগুলোতে নিরাপত্তা জোরদার করতে বসানো হয়েছে সিসি ক্যামেরা। ডিএনসিসির নিজস্ব নিরাপত্তা কর্মীর পাশাপাশি আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় সেখানে নিয়োজিত থাকবে ডিএমপির অতিরিক্ত পুলিশ ফোর্স। হাটের ইজারার শর্তাবলি শতভাগ প্রতিপালন নিশ্চিত করতে নিয়মিত মাঠে থাকবে বিশেষ মনিটরিং টিম। কোনো হাটে অনিয়ম বা শর্তভঙ্গ দেখা গেলে তখনই নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটের মাধ্যমে মোবাইল কোর্ট বা ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা করে আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
অন্যদিকে, সারুলিয়া স্থায়ী পশুর হাটসহ ১২টি অস্থায়ী পশুর হাটের কার্যাদেশ দিয়েছে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন (ডিএসসিসি)। হাটগুলোর নিরাপত্তার বিষয়ে কঠোর অবস্থানের কথা জানিয়েছেন ডিএসসিসির প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) মো. জহিরুল ইসলাম। প্রতিদিনের বাংলাদেশকে তিনি বলেন, ‘জনস্বার্থ রক্ষা এবং যানজট এড়াতে এবার কোনো পশুর হাটই রাস্তায় বসতে দেওয়া হবে না। প্রতিটি হাটে ইজারার শর্ত প্রতিপালিত হচ্ছে কি নাÑ তা তদারকির জন্য সংশ্লিষ্ট আঞ্চলিক নির্বাহী কর্মকর্তারা ম্যাজিস্ট্রেট হিসেবে দায়িত্ব পালন করবেন। এ ছাড়া হাটগুলোতে সার্বক্ষণিক মনিটরিং এবং আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় পুলিশের পাশাপাশি সিটি করপোরেশনের নিজস্ব মোবাইল টিম কাজ করবে।
হাটে আসা কোরবানির পশুর স্বাস্থ্যসেবা ও পরীক্ষা-নিরীক্ষার জন্য ব্যাপক প্রস্তুতি নিয়েছে ডিএনসিসির স্বাস্থ্য বিভাগ। প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের সহযোগিতায় প্রতিটি অস্থায়ী হাটে একটি করে এবং গাবতলী স্থায়ী হাটে দুটি বিশেষ ভেটেরিনারি মেডিকেল টিম সার্বক্ষণিক নিয়োজিত থাকছে। এ ছাড়া সামগ্রিক হাট তদারকি ও পশু পরীক্ষার দায়িত্ব পালন করবেন ডিএনসিসি ভেটেরিনারি শাখার ১০ জন ভেটেরিনারি কর্মকর্তা, দুজন জবাইখানা পরিদর্শক এবং ১৮ জন মোল্লা ছাড়াও সিলম্যান ও ক্লিনারসহ মোট ৩০ জন বিশেষজ্ঞ কর্মী।
এ প্রসঙ্গে ডিএনসিসির স্বাস্থ্য বিভাগের পক্ষ থেকে উপপ্রধান স্বাস্থ্য কর্মকর্তা ডা. মো. ইমদাদুল হক প্রতিদিনের বাংলাদেশকে বলেন, ‘প্রতিটি হাটে ভেটেরিনারি মেডিকেল টিম নিয়োজিত থাকবে। পশুর স্বাস্থ্য পরীক্ষা ও অসুস্থ পশু শনাক্তে নিয়মিত কার্যক্রম পরিচালনার পাশাপাশি ব্যাপারীদের প্রয়োজনীয় কাউন্সেলিংও করা হবে।’
পশুর স্বাস্থ্য সুরক্ষায় ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের হাটগুলোতেও প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের সহযোগিতায় বিশেষ মেডিকেল টিম নিয়োজিত থাকবে। এ ছাড়া হাটগুলোর জন্য তিনটি ভেটেরিনারি মোবাইল টিম সার্বক্ষণিক মাঠে থাকবে বলে জানিয়েছেন ডিএসসিসির ভেটেরিনারি কর্মকর্তা শরণ কুমার সাহা।
ঈদ পরবর্তী কোরবানির বর্জ্য দ্রুত সরিয়ে নিতে ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন এলাকায় গত বছরের পরিসংখ্যান অনুযায়ী বিশেষ ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। গত বছর উত্তর সিটিতে ঈদের দিন ১০ হাজার ৬১৬ টন, দ্বিতীয় দিনে ৭ হাজার ৩৫৩ টন এবং তৃতীয় দিনে ২ হাজার ৯২২ টনসহ সর্বমোট ২০ হাজার ৮৮৯ টন বর্জ্য উৎপাদিত হয়েছিল। এবারও সমপরিমাণ বর্জ্য উৎপন্ন হতে পারে ধরে নিয়ে শতভাগ বর্জ্য দ্রুত অপসারণের কর্মপরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে।
বর্জ্য দ্রুত আমিনবাজার ল্যান্ডফিলে নিতে এবার ডিএনসিসির নিজস্ব পরিবহনের ২৬১টি, ভাড়ায়চালিত ৪০৫টি এবং বেসরকারি ব্যবস্থাপনায় ৮৬টিসহ সর্বমোট ৭৫২টি যান-যন্ত্রপাতি যেমনÑ ট্রাক, পে-লোডার, ডাম্পার ও পানির গাড়ি ব্যবহার করা হবে। নাগরিকদের সুবিধার্থে ডিএনসিসির পক্ষ থেকে ১৬ লাখ ৩০ হাজার পিস পলিব্যাগ বিতরণ করা হবে। পশুর রক্ত ও ময়লা পরিষ্কারের পর জীবাণু ও দুর্গন্ধমুক্ত করতে ২৫ কেজি ওজনের ৩৬০০ বস্তা বা মোট ৯০ হাজার কেজি ব্লিচিং পাউডার বিতরণের কাজ শুরু হয়েছে। কোরবানির এক দিন আগেই ল্যান্ডফিলগুলো শহরের বর্জ্য গ্রহণের জন্য সম্পূর্ণ প্রস্তুত থাকবে।
এ দিকে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের আওতাধীন এলাকাগুলোর বর্জ্য মাতুয়াইল ল্যান্ডফিলে অপসারণের জন্য বিশেষ প্রস্তুতি নেওয়া হচ্ছে। দক্ষিণ সিটির বর্জ্য ব্যবস্থাপনা কার্যক্রম সম্পর্কে সিইও মো. জহিরুল ইসলাম বলেন, ‘দ্রুত বর্জ্য অপসারণ নিশ্চিত করতে ডিএসসিসি নিয়মিত পরিচ্ছন্নতা কর্মীর পাশাপাশি অতিরিক্ত কর্মী নিয়োগ দিয়েছে। সব মিলিয়ে প্রায় ৬ হাজার পরিচ্ছন্নতা কর্মী এই ঈদ মৌসুমে মাঠে সক্রিয় থাকবেন। বর্জ্য পরিবহনের জন্যও পর্যাপ্ত যানবাহনের সুব্যবস্থা রাখা হয়েছে।
দক্ষিণ সিটির বর্জ্য সরানোর গাড়ি, ব্যাগ এবং ব্লিচিং পাউডার বিতরণের লক্ষ্যমাত্রা অনুযায়ী, ডিএসসিসির ৭৫টি ওয়ার্ডের জন্য ১ লাখ ৪০ হাজার চটের ব্যাগ, প্রতিটি ওয়ার্ডে পরিচ্ছন্নতা কর্মীদের জন্য ৮টি করে হাতগাড়ি এবং ৫ লিটার করে স্যাভলন দেওয়া হচ্ছে। ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন সর্বোচ্চ ৮ ঘণ্টার মধ্যে নগরীর বর্জ্য পরিষ্কার করার লক্ষ্যমাত্রা নিয়ে কাজ করছে।
সচেতনতা বৃদ্ধিতেও দুই সিটি একযোগে কাজ করছে। পরিচ্ছন্ন উপায়ে কোরবানি নিশ্চিত করতে ডিএনসিসির ৫৪টি ওয়ার্ডের ১ হাজার জন মাংস প্রস্তুতকারী ও ব্যবসায়ীকে (কসাই) বিশেষ প্রশিক্ষণ দেওয়ার ব্যবস্থা করা হয়েছে। সাধারণ মানুষকে সচেতন করতে মসজিদের ইমামদের মাধ্যমে জুমা ও ঈদের খুতবায় আলোচনার জন্য পত্র পাঠানো হয়েছে। এ ছাড়া জনসচেতনতামূলক র্যালি, টেলিভিশন, রেডিও, সংবাদপত্র ও প্রতিটি পাড়া-মহল্লায় মাইকিংয়ের মাধ্যমে সচেতনতা কার্যক্রম চালানো হচ্ছে। ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের পক্ষ থেকেও নাগরিকদের সচেতন করতে বিশেষ উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।
সার্বিক বর্জ্য অপসারণ কার্যক্রম কঠোরভাবে তদারকির জন্য ডিএনসিসিকে ১০টি জোনে ভাগ করে ১০টি মনিটরিং টিম গঠন করা হয়েছে। প্রধান কার্যালয়ে একটি কেন্দ্রীয় কন্ট্রোল রুম স্থাপন করা হচ্ছে, যার ফলে নাগরিকরা যেকোনো সমস্যা দ্রুত কর্তৃপক্ষকে জানাতে পারবেন। একইভাবে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের পক্ষ থেকেও বর্জ্য অপসারণ কার্যক্রম সরাসরি তদারকি ও নাগরিকদের অভিযোগ নেওয়ার জন্য বিশেষ ব্যবস্থা থাকছে। দক্ষিণ সিটির এই মনিটরিং ও কন্ট্রোল রুমের প্রস্তুতি সম্পর্কে জানা গেছে, বর্জ্য অপসারণে প্রতিটি ওয়ার্ডে একটি করে মনিটরিং টিম থাকবে। তাদের মনিটরিং করার জন্য একটি কেন্দ্রীয় মনিটরিং টিম সার্বক্ষণিক দায়িত্ব পালন করবে সংস্থাটির জরুরি পরিচালন কেন্দ্রে (কন্ট্রোল রুম)।