× ই-পেপার প্রচ্ছদ সর্বশেষ বাংলাদেশ রাজনীতি দেশজুড়ে বিশ্বজুড়ে বাণিজ্য খেলা বিনোদন মতামত চাকরি শিক্ষা আজকের কার্টুন ফিচার সকল বিভাগ ছবি ভিডিও লেখক আর্কাইভ কনভার্টার

হজযাত্রীদের স্বাস্থ্যসতর্কতা

সাধারণ রোগব্যাধি, প্রতিরোধ ও করণীয়

ডা. সিফাত ই রব্বানী

প্রকাশ : ০৪ মে ২০২৬ ১৪:২০ পিএম

ডা. সিফাত ই রব্বানী, এমবিবিএস, বিসিএস, এফসিপিএস (সার্জারি), এমএস (সিভিঅ্যান্ডটিএস), জুনিয়র কনসালট্যান্ট (সার্জারি), ডিএনসিসি হাসপাতাল

ডা. সিফাত ই রব্বানী, এমবিবিএস, বিসিএস, এফসিপিএস (সার্জারি), এমএস (সিভিঅ্যান্ডটিএস), জুনিয়র কনসালট্যান্ট (সার্জারি), ডিএনসিসি হাসপাতাল

পবিত্র হজ পালনে সুস্বাস্থ্যই নিরাপদ ইবাদতের পূর্বশর্ত। হজ ইসলামের পাঁচটি স্তম্ভের অন্যতম এবং শারীরিক ও মানসিকভাবে পরিশ্রমসাপেক্ষ একটি ইবাদত। প্রতিবছর বিশ্বের বিভিন্ন দেশ থেকে লাখো মুসল্লি সৌদি আরবে সমবেত হন। অতিরিক্ত ভিড়, তীব্র গরম, দীর্ঘ হাঁটা, আবহাওয়ার পরিবর্তন, খাদ্যাভ্যাসের ভিন্নতা, ঘুমের অনিয়ম এবং সংক্রামক রোগের ঝুঁকির কারণে হজযাত্রীরা বিভিন্ন স্বাস্থ্যসমস্যায় আক্রান্ত হতে পারেন।

বিশেষ করে বয়স্ক, ডায়াবেটিস, উচ্চ রক্তচাপ, হৃদরোগ, হাঁপানি বা কিডনি রোগে আক্রান্ত ব্যক্তিদের জন্য পূর্বপ্রস্তুতি অত্যন্ত জরুরি। সঠিক স্বাস্থ্যসচেতনতা, প্রয়োজনীয় টিকা, নিয়মিত ওষুধ গ্রহণ, পরিচ্ছন্নতা এবং দ্রুত চিকিৎসা গ্রহণের মাধ্যমে অধিকাংশ সমস্যা প্রতিরোধ করা সম্ভব।

হিট এক্সেশন, হিট স্ট্রোক ও পানিশূন্যতা

সৌদি আরবের উচ্চ তাপমাত্রা ও দীর্ঘ সময় রোদে অবস্থানের কারণে হজযাত্রীরা হিট এক্সেশন, হিট স্ট্রোক ও ডিহাইড্রেশনে আক্রান্ত হতে পারেন। লক্ষণ হিসেবে অতিরিক্ত ঘাম, মাথা ঘোরা, দুর্বলতা, বমি ভাব, তৃষ্ণা, শরীর গরম হয়ে যাওয়া বা অজ্ঞান হয়ে যাওয়ার মতো সমস্যা দেখা দিতে পারে।

প্রতিরোধ : পর্যাপ্ত পানি ও ওআরএস পান করা, ছাতা ব্যবহার এবং সম্ভব হলে দুপুরের প্রচণ্ড রোদ এড়িয়ে চলা।

চিকিৎসা : আক্রান্ত ব্যক্তিকে দ্রুত ঠান্ডা স্থানে নেওয়া, কাপড় ঢিলা করা, ঠান্ডা পানি বা ভেজা কাপড় ব্যবহার করা, ওআরএস দেওয়া এবং গুরুতর ক্ষেত্রে দ্রুত হাসপাতালে নেওয়া।

শ্বাসতন্ত্রের সংক্রমণ (সর্দি, কাশি, নিউমোনিয়া, ইনফ্লুয়েঞ্জা, কোভিড-১৯)

অতিরিক্ত জনসমাগমের কারণে ভাইরাস ও ব্যাকটেরিয়াজনিত শ্বাসতন্ত্রের রোগ খুব সাধারণ। কাশি, জ্বর, গলাব্যথা, শ্বাসকষ্ট ইত্যাদি দেখা দিতে পারে।

প্রতিরোধ : ইনফ্লুয়েঞ্জা, কোভিড-১৯ ও মেনিনজোকক্কাল ভ্যাকসিন গ্রহণ, মাস্ক ব্যবহার, ঘন ঘন হাত ধোয়া, অসুস্থ ব্যক্তির কাছ থেকে দূরে থাকা।

চিকিৎসা : বিশ্রাম, পর্যাপ্ত পানি, প্যারাসিটামল, চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী অ্যান্টিবায়োটিক বা অ্যান্টিভাইরাল এবং শ্বাসকষ্ট হলে জরুরি চিকিৎসা।

ডায়রিয়া ও খাদ্যবাহিত রোগ

অপরিচ্ছন্ন খাবার বা দূষিত পানির কারণে ডায়রিয়া, বমি, পেটব্যথা হতে পারে।

প্রতিরোধ : বোতলজাত বা নিরাপদ পানি পান করা, ভালোভাবে রান্না করা খাবার খাওয়া, রাস্তার খোলা খাবার পরিহার, বারবার হাত ধোয়া।

চিকিৎসা : ওআরএস, পর্যাপ্ত তরল, জিঙ্ক (প্রয়োজনে) এবং তীব্র সংক্রমণে চিকিৎসকের পরামর্শে ওষুধ।

পায়ের ফোস্কা, মাংসপেশির ব্যথা ও শারীরিক ক্লান্তি

দীর্ঘ হাঁটা, অনুপযুক্ত জুতা এবং অতিরিক্ত পরিশ্রমের কারণে পায়ে ফোস্কা, পেশিতে টান ও জয়েন্টে ব্যথা হতে পারে।

প্রতিরোধ : আরামদায়ক জুতা ব্যবহার, নিয়মিত বিশ্রাম, পায়ে পরিষ্কার মোজা, হালকা ব্যায়াম।

চিকিৎসা : ফোস্কা পরিষ্কার রাখা, অ্যান্টিসেপটিক ব্যবহার, ব্যথানাশক ও পর্যাপ্ত বিশ্রাম।

ডায়াবেটিস রোগীদের সমস্যা

অনিয়মিত খাবার, অতিরিক্ত হাঁটা ও ওষুধের সময়সূচি পরিবর্তনের কারণে রক্তে শর্করার ওঠানামা হতে পারে।

প্রতিরোধ : নিয়মিত ব্লাড সুগার মনিটরিং, খাবারের সময় বজায় রাখা, প্রয়োজনীয় ওষুধ/ইনসুলিন সঙ্গে রাখা।

চিকিৎসা : হাইপোগ্লাইসেমিয়া হলে দ্রুত গ্লুকোজ বা মিষ্টি পানীয় গ্রহণ; গুরুতর অবস্থায় চিকিৎসা নিতে হবে।

উচ্চ রক্তচাপ ও হৃদরোগ

অতিরিক্ত শারীরিক পরিশ্রম ও মানসিক চাপ হৃদরোগীদের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ।

প্রতিরোধ : নিয়মিত ওষুধ গ্রহণ, অতিরিক্ত পরিশ্রম এড়ানো, পর্যাপ্ত বিশ্রাম, চিকিৎসকের ফিটনেস মূল্যায়ন।

চিকিৎসা : বুকব্যথা, শ্বাসকষ্ট বা মাথা ঘোরা হলে দ্রুত চিকিৎসা কেন্দ্রে যোগাযোগ।

কোষ্ঠকাঠিন্য

হজে দীর্ঘ ভ্রমণ, পানি কম খাওয়া, খাদ্যাভ্যাস পরিবর্তন ও কোষ্ঠকাঠিন্যের কারণে পাইলস ও এনাল ফিশার বাড়তে পারে।

করণীয় : প্রতিদিন প্রায় তিন লিটার পানি পান করুন, প্রতিদিন অন্তত এক কাপ শাকসবজি/শাক খান, রাতে দুধ বা টকদই গ্রহণ করুন এবং চিয়া সিড বা অন্যান্য আঁশযুক্ত খাবার খেলে মল নরম থাকে ও কোষ্ঠকাঠিন্য কমে।

চিকিৎসা : স্টুল সফটনার, গরম পানির সিটজ বাথ, স্থানীয় অয়েন্টমেন্ট, ব্যথানাশক; রক্তপাত বা তীব্র ব্যথা হলে দ্রুত চিকিৎসকের পরামর্শ নিতে হবে।

মানসিক চাপ, উদ্বেগ ও বিভ্রান্তি

অতিরিক্ত ভিড়, ভাষাগত সমস্যা, পরিবার থেকে বিচ্ছিন্ন হওয়া বা পথ হারানোর ভয় মানসিক চাপ তৈরি করতে পারে।

প্রতিরোধ : দলনেতার সঙ্গে থাকা, পরিচয়পত্র বহন, পর্যাপ্ত বিশ্রাম, মানসিক প্রস্তুতি।

চিকিৎসা : আতঙ্কিত না হয়ে নিরাপত্তাকর্মী বা মেডিকেল টিমের সহায়তা নেওয়া।

হজের আগে প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি : হজের পূর্বে সম্পূর্ণ স্বাস্থ্য পরীক্ষা, প্রয়োজনীয় টিকা, দীর্ঘমেয়াদি রোগ নিয়ন্ত্রণ, পর্যাপ্ত ওষুধ, প্রেসক্রিপশন, আরামদায়ক জুতা, সানস্ক্রিন, ছাতা, মাস্ক ও ব্যক্তিগত স্বাস্থ্যসামগ্রী সঙ্গে রাখা উচিত।

চোখের সমস্যা

হজে ধুলাবালি, তীব্র রোদ, গরম ও ভিড়ের কারণে চোখে জ্বালা, শুষ্কতা, অ্যালার্জি, লালচে ভাব, কনজাংকটিভাইটিস ও ইনফেকশন হতে পারে।

প্রতিরোধ : সানগ্লাস ব্যবহার, ধুলা এড়ানো, বারবার চোখে হাত না দেওয়া, পরিষ্কার পানি দিয়ে চোখ ধোয়া।

চিকিৎসা : আর্টিফিশিয়াল টিয়ার/লুব্রিকেন্ট ড্রপ, ঠান্ডা সেঁক এবং লালচে ভাব বা পুঁজ হলে দ্রুত ডাক্তার দেখানো।

হজে কনট্যাক্ট লেন্স ব্যবহার করলে ধুলাবালি, শুষ্ক আবহাওয়া ও গরমে চোখে জ্বালা, শুষ্কতা, ইনফেকশন ও কর্নিয়ার ক্ষতের ঝুঁকি বাড়ে।

পরামর্শ : দীর্ঘ সময় লেন্স না পরে সম্ভব হলে চশমা ব্যবহার করুন, পর্যাপ্ত লুব্রিকেটিং আই ড্রপ রাখুন, হাত পরিষ্কার ছাড়া লেন্স স্পর্শ করবেন না এবং ধুলাবালির মধ্যে লেন্স ব্যবহার কমান।

চিকিৎসা : চোখ লাল, ব্যথা, ঝাপসা দেখা বা জ্বালা শুরু হলে সঙ্গে সঙ্গে লেন্স খুলে ফেলুন এবং দ্রুত চক্ষু বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নিন।

নারীদের বিশেষ স্বাস্থ্যসমস্যা

নারী হজযাত্রীদের মাসিক, ইউরিনারি ট্র্যাক্ট ইনফেকশন, পানিশূন্যতা, অ্যানিমিয়া, ব্যক্তিগত পরিচ্ছন্নতা ও গর্ভাবস্থাজনিত ঝুঁকির বিষয়ে বিশেষ সতর্কতা প্রয়োজন।

প্রতিরোধ : পর্যাপ্ত স্যানিটারি সামগ্রী বহন, ব্যক্তিগত পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা বজায় রাখা, পর্যাপ্ত পানি পান, আয়রন ও প্রয়োজনীয় ওষুধ সঙ্গে রাখা, গর্ভবতী হলে পূর্বে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া।

চিকিৎসা : ইউটিআই হলে পর্যাপ্ত পানি ও দ্রুত চিকিৎসা, অতিরিক্ত দুর্বলতা বা রক্তক্ষরণ হলে চিকিৎসা গ্রহণ, মাসিক ব্যবস্থাপনায় নিরাপদ স্বাস্থ্যবিধি অনুসরণ।

ভ্যাকসিন

বাংলাদেশ থেকে হজে যাওয়ার আগে সাধারণত নিম্নের টিকাগুলো গুরুত্বপূর্ণ-

১. মেনিনজোকক্কাল (Meningococcal ACWY) ভ্যাকসিন- বাধ্যতামূলক। সৌদি আরবে প্রবেশের জন্য এটি আবশ্যক। হজের কমপক্ষে ১০ দিন আগে নিতে হয়। সাধারণত ৩-৫ বছর পর্যন্ত কার্যকর (ভ্যাকসিনের ধরন অনুযায়ী)।

২. কোভিড-১৯ ভ্যাকসিন- সুপারিশকৃত/নীতিমালা অনুযায়ী আপডেটেড। পূর্ণ ডোজ ও প্রয়োজন হলে বুস্টার নেওয়া ভালো।

৩. ইনফ্লুয়েঞ্জা (ফ্লু) ভ্যাকসিন- বিশেষভাবে সুপারিশকৃত। বয়স্ক, ডায়াবেটিস, হাঁপানি, হৃদরোগীদের জন্য খুব গুরুত্বপূর্ণ।

৪. নিউমোকক্কাল ভ্যাকসিন- ঝুঁকিপূর্ণদের জন্য। বয়স্ক বা দীর্ঘমেয়াদি রোগীদের ক্ষেত্রে উপকারী।

৫. রুটিন টিকা আপডেট- টিটেনাস, হেপাটাইটিস বি ইত্যাদি প্রয়োজন অনুযায়ী।

পরামর্শ : হজের আগে সরকার অনুমোদিত হজ স্বাস্থ্যকেন্দ্র/চিকিৎসকের কাছ থেকে সর্বশেষ সৌদি নির্দেশনা অনুযায়ী টিকা নিন এবং ভ্যাকসিন সনদ সঙ্গে রাখুন।

হজ একটি মহান ইবাদত, তবে সুস্থ শরীর ছাড়া এটি কষ্টকর হয়ে উঠতে পারে। সচেতনতা, প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা, পরিচ্ছন্নতা, নিয়মিত ওষুধ গ্রহণ এবং প্রয়োজনীয় চিকিৎসা সহায়তার মাধ্যমে অধিকাংশ স্বাস্থ্যঝুঁকি নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব। হজযাত্রীদের উচিত ইবাদতের পাশাপাশি নিজের স্বাস্থ্য সুরক্ষাকেও সমান গুরুত্ব দেওয়া, যাতে তারা নিরাপদে ও সুন্দরভাবে এই পবিত্র দায়িত্ব পালন করতে পারেন।

শেয়ার করুন-

মন্তব্য করুন

Protidiner Bangladesh

সম্পাদক : মারুফ কামাল খান

প্রকাশক : কাউসার আহমেদ অপু

রংধনু কর্পোরেট, ক- ২৭১ (১০ম তলা) ব্লক-সি, প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড) ঢাকা -১২২৯

যোগাযোগ

প্রধান কার্যালয়: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৬৯৬ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (প্রিন্ট): +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮১০, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০ | ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (অনলাইন): +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০, +৮৮০১৭৯৯৪৪৯৫৫৯ । ই-মেইল: [email protected]

সার্কুলেশন: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮০৭, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৩৩২ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন মূল্য তালিকা