× ই-পেপার প্রচ্ছদ সর্বশেষ বাংলাদেশ রাজনীতি দেশজুড়ে বিশ্বজুড়ে বাণিজ্য খেলা বিনোদন মতামত চাকরি শিক্ষা আজকের কার্টুন ফিচার সকল বিভাগ ছবি ভিডিও লেখক আর্কাইভ কনভার্টার

দিবস আসে কিন্তু মুক্তি মেলে না

লাবণী মণ্ডল

প্রকাশ : ০৮ মার্চ ২০২৬ ১৫:২৬ পিএম

আপডেট : ১১ মার্চ ২০২৬ ১৫:০০ পিএম

ছবি: বিউসিস ডট কম

ছবি: বিউসিস ডট কম

ক্যালেন্ডারের পাতা ঘুরে প্রতি বছরই ৮ মার্চ আসে। বেগুনি রঙের ছোঁয়ায়, নানা স্লোগান আর প্রতিপাদ্যে মুখর হয়ে ওঠে চারপাশ। ২০২৬ সালেও জাতিসংঘ নির্ধারিত প্রতিপাদ্য 'Rights, Justice, Action for all Women and Girls' (সব নারী ও মেয়েশিশুর জন্য অধিকার, ন্যায়বিচার ও কার্যকর উদ্যোগ) নিয়ে বিশ্বব্যাপী দিবসটি পালিত হচ্ছে। এর মূল বার্তাই হলো, ন্যায়বিচার পাওয়ার সুযোগ না থাকলে নারী অধিকার থেকে বঞ্চিত হয়। কিন্তু বাস্তবে কী দেখি আমরা? সেমিনার আর ক্রোড়পত্রে নারীর জয়গান গাওয়ার পর ৯ মার্চের সকালে যখন খবরের কাগজ খুলি, তখন চেনা বাস্তবতাই যেন আমাদের উপহাস করে। পত্রিকার পাতাজুড়ে থাকে ধর্ষণ, হত্যা আর নির্যাতনের লোমহর্ষক খবর। আপাতদৃষ্টিতে রাষ্ট্র ও সমাজ সোচ্চার মনে হলেও, গভীরে তাকালে স্পষ্ট হয়- নারী দিবস আসে যায়, কিন্তু নারীর জীবনে আমূল পরিবর্তন আসে না।

উন্নয়নের পরিসংখ্যান বনাম বেঁচে থাকার নিরাপত্তাহীনতা: আজকের দিনে বাংলাদেশের নারীরা শিক্ষা থেকে শুরু করে হিমালয় জয়- সবখানেই নিজেদের প্রমাণ করছেন। প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষায় তাদের সাফল্য এখন ধারাবাহিক। ২০২৪ সালের 'জেন্ডার ইক্যুয়ালিটি ব্রিফ'-এর তথ্য বলছে, শিক্ষায় জেন্ডার প্যারিটি সূচক এখন ৯৩.৬%, আর স্বাস্থ্য ও বেঁচে থাকার ক্ষেত্রে তা ৯৬.২%। শ্রমবাজারেও তাদের অংশগ্রহণ বেড়ে দাঁড়িয়েছে প্রায় ৪২.৭%-এ। কিন্তু এই পরিসংখ্যানগুলো নারীর জীবনের পূর্ণাঙ্গ চিত্র নয়। যে দেশে একজন নারী অর্থনীতি কাঁধে নিয়ে চলছেন, সেই দেশেই নিজঘরে নিরাপদ নন নারী। সমাজপতিরা প্রায়ই বলেন, 'মেয়েরা বাইরে যায় বলেই ধর্ষণের শিকার হয়'। কিন্তু দাদির পাশে ঘুমিয়ে থাকা ১৫ বছরের কিশোরী জামিলা কিংবা আমিনার পৈশাচিক হত্যাকাণ্ড এই পুরুষতান্ত্রিক যুক্তিকে অন্তঃসারশূন্য প্রমাণ করে। অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সময়েও এ ধরনের জঘন্য অপরাধ কমানো সম্ভব হয়নি।

সবচেয়ে মর্মান্তিক উদাহরণ ২০২৫ সালের মাগুরার শ্রীপুরের ৮ বছর বয়সী শিশু আছিয়ার ঘটনা। বোনের বাড়িতে বেড়াতে গিয়ে নিজের ভগ্নিপতির লালসার শিকার হয় সে। ধর্ষণের পর তার গলায় ধারালো বস্তু দিয়ে আঘাত করা হয়। ৫ মার্চ মুমূর্ষু অবস্থায় তাকে ঢাকার সিএমএইচে আনা হয় এবং ১৩ মার্চ সে মারা যায়। অর্থাৎ ২০২৫ সালের ৮ মার্চ ছিল শিশু আছিয়ার রক্তে রঞ্জিত। অপরাধীর মৃত্যুদণ্ড হলেও তা এখনও কার্যকর হয়নি। বর্তমানে ধর্ষণের ঘটনাগুলো কেবল ধর্ষণেই সীমাবদ্ধ থাকছে না, তা রূপ নিচ্ছে নৃশংস হত্যাকাণ্ডে। আর অপরাধীদের গ্রেপ্তার করার পর তাদের চেহারায় যে নির্লিপ্ততা দেখা যায়, তা প্রমাণ করে তাদের মাঝে বিন্দুমাত্র অপরাধবোধ নেই।

: বিচারহীনতার সংস্কৃতি ও ক্ষমতার দাপট অপরাধীদের এই নির্লিপ্ততার মূল কারণ বিচারহীনতার

সংস্কৃতি। ২০২০ সালে 'মানুষের জন্য ফাউন্ডেশন' (এমজেএফ) যৌন সহিংসতার ২০টি মামলা নিয়ে একটি গবেষণা করে। সেখানে দেখা যায়, জামিন অযোগ্য অপরাধে অভিযুক্ত অনেকেই জামিনে মুক্ত ছিলেন। টাকা, ক্ষমতা ও রাজনৈতিক প্রভাবের অপব্যবহার করেই তারা আইনের আওতা থেকে রক্ষা পাচ্ছিলেন। প্রভাবশালীদের এই দাপটের কারণে ভুক্তভোগীরা সমাজের ভয়ে গুটিয়ে যান।

নারীর সুরক্ষার নামে সমাজে প্রায়ই কিছু লোকদেখানো ব্যবস্থা নেওয়া হয়। আলাদা বাস বা আসনের ব্যবস্থা পরোক্ষভাবে পুরুষতান্ত্রিক মানসিকতাকেই বৈধতা দেয়। অন্যদিকে নারীর প্রকৃত ক্ষমতায়নের সবচেয়ে বড় জায়গা রাজনীতি আজও চরম বৈষম্যমূলক।

মানবাধিকার নেত্রী খুশী কবিরের মতে, 'বাংলাদেশের রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে নারীর অবস্থান অত্যন্ত প্রান্তিক। জাতীয় সংসদে ৩০০টি আসনের মধ্যে মাত্র ৭ জন নারী সরাসরি নির্বাচিত হয়েছেন, যা আমাদের জন্য লজ্জাজনক। এটি প্রমাণ করে রাজনৈতিক দলগুলো নারী নেতৃত্বের প্রতি আস্থা রাখতে পারেনি।' তিনি আরও জানান, সংসদে নারীদের জন্য যে ৫০টি সংরক্ষিত আসন রয়েছে, তা মূলত তাদের মূলধারার রাজনীতি থেকে পিছিয়ে রাখারই একটি কৌশল। তাদের অনেকটা 'অতিরিক্ত' বা 'দয়া করে দেওয়া' পদ হিসেবে বিবেচনা করা হয়, যা নারীর রাজনৈতিক অধিকারের স্পষ্ট লঙ্ঘন। এছাড়া অবৈতনিক পরিচর্যার পুরো দায়ভার নারীর কাঁধে থাকায় ক্যারিয়ারে বিরতি নিতে বাধ্য হওয়া নারীদের পুনরায় কাজে ফেরা অত্যন্ত কঠিন হয়ে পড়ে।

ভোগবাদী বিশ্বব্যবস্থা ও যুদ্ধবাজদের সমীকরণ: নারীর প্রতি এই বঞ্চনা কেবল বাংলাদেশের নয়, এটি বৈশ্বিক। পৃথিবীতে সবচেয়ে বেশি ধর্ষণের ঘটনা ঘটে ব্রাজিলে, বছরে ৮১,৬০৩টি। ইউনিসেফের তথ্য অনুযায়ী, বিশ্বে ৩৭ কোটি নারী ও মেয়ে ধর্ষণ বা যৌন হয়রানির শিকার। আর সাইবার স্পেসের অনলাইন হয়রানি, ব্ল‍্যাকমেল ও ভিডিও ফাঁসের মতো ডিজিটাল সহিংসতা যুক্ত করলে এই সংখ্যা দাঁড়ায় ৬৫ কোটিতে (৬৫০ মিলিয়ন), যা অনেক মেয়ের আত্মহত্যার কারণ।

এর পাশাপাশি বিশ্বব্যাপী চলা সাম্রাজ্যবাদী যুদ্ধ নারীদের জীবনকে আরও দুর্বিষহ করে তুলেছে। আধিপত্য বিস্তারের লড়াইয়ে নারীরা পরিণত হচ্ছেন দাবার ঘুঁটিতে।

আইন প্রণয়ন বা কিছু প্রাতিষ্ঠানিক সুবিধা দিয়ে নারীর প্রকৃত মুক্তি আসবে না। যে সমাজ নারীকে কেবল লিঙ্গের মাপকাঠিতে বিচার করে বা ভোগের বস্তু ভাবে, সেখানে জেন্ডারসমতা অলীক স্বপ্ন। মানবমুক্তির সঙ্গেই নারীমুক্তি অঙ্গাঙ্গিভাবে জড়িত। পুরুষতন্ত্র ও ভোগবাদের শিকল ভাঙতে হলে পরিবার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, কর্মক্ষেত্র ও রাজনীতিতে আমূল পরিবর্তন আনতে হবে। পুরুষ ও কিশোরদের শেখাতে হবে সমতা ও মানবিক মর্যাদা।

শেয়ার করুন-

মন্তব্য করুন

Protidiner Bangladesh

সম্পাদক : মারুফ কামাল খান

প্রকাশক : কাউসার আহমেদ অপু

রংধনু কর্পোরেট, ক- ২৭১ (১০ম তলা) ব্লক-সি, প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড) ঢাকা -১২২৯

যোগাযোগ

প্রধান কার্যালয়: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৬৯৬ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (প্রিন্ট): +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮১০, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০ | ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (অনলাইন): +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০, +৮৮০১৭৯৯৪৪৯৫৫৯ । ই-মেইল: [email protected]

সার্কুলেশন: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮০৭, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৩৩২ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন মূল্য তালিকা