বাসন্তি সাহা
প্রকাশ : ০৮ মার্চ ২০২৬ ১৫:১৫ পিএম
আপডেট : ১১ মার্চ ২০২৬ ১৫:০১ পিএম
ছবি: টিন্নাকর্ন/ইমাগো
বাংলাদেশে পারিবারিক সহিংসতা বর্তমানে এক ভয়াবহ রূপ ধারণ করেছে। ২০২৫ সালের প্রথম ৭ মাসেই এই সহিংসতায় ৩২২ জনের মৃত্যু হয়েছে, যার মধ্যে ১৩৩ জনই স্বামীর হাতে খুন হয়েছেন। সম্প্রতি স্বামীর পরকীয়ার জেরে ‘ইকরা’ নামের এক নারীর আত্মহত্যা কিংবা মাছ কাটতে রাজি না হওয়ায় স্ত্রীকে হত্যার মতো ঘটনাগুলো সমাজের এই নিষ্ঠুরতার চরম প্রমাণ।
আরো পড়ুন: মরণোত্তর ‘শ্রেষ্ঠ অদম্য নারী’ পুরস্কার পেলেন খালেদা জিয়া
সহিংসতার কারণ ও ধরন
মনোবিদ ও বিশেষজ্ঞদের মতে, এই সহিংসতার মূল শেকড় আমাদের সমাজকাঠামো ও দৃষ্টিভঙ্গির গভীরে প্রোথিত। ছোটবেলা থেকেই ছেলে ও মেয়ের মাঝে বৈষম্য, বিয়ের পর সব মেনে নেওয়ার চাপ এবং নির্যাতনের শিকার হওয়ার পর নিজের পরিবারের সমর্থন না পাওয়ায় নারীরা বাধ্য হয়ে আত্মহত্যার মতো পথ বেছে নেন। দরিদ্র থেকে উচ্চবিত্ত সব স্তরেই শারীরিক, মানসিক, যৌন ও অর্থনৈতিক নির্যাতন বিদ্যমান। পিতৃতান্ত্রিক ব্যবস্থায় আধিপত্য বিস্তারের সবচেয়ে সহজ শিকার হন পরিবারের নারী ও শিশুরা। এর পাশাপাশি অর্থনৈতিক সংকট, বাল্যবিয়ে এবং নৈতিক শিক্ষার অভাবও এই সহিংসতা বাড়াচ্ছে। তবে পার্বত্য অঞ্চলে নারীদের অর্থনৈতিক অবদান স্বীকৃত হওয়ায় সেখানে এই সহিংসতা তুলনামূলক কম।
সহিংসতা প্রতিরোধে ‘পারিবারিক-সহিংসতা (প্রতিরোধ ও সুরক্ষা) আইন-২০১০’ থাকলেও এর যথাযথ প্রয়োগ নেই। আইনটির মূল লক্ষ্য তাৎক্ষণিক শাস্তির চেয়ে সুরক্ষা প্রদান। এ ছাড়া মাঠপর্যায়ে বাজেট ও লোকবলের অভাবে এটি সাধারণ মানুষের কাছে খুব একটা পরিচিত হতে পারেনি। ফলে ভুক্তভোগীরা দীর্ঘসূত্রিতার কারণে ন্যায়বিচার থেকে বঞ্চিত হন। তবে সরকার সম্প্রতি আইনটির কিছু সংশোধনী আনার উদ্যোগ নিয়েছে এবং ভুক্তভোগীদের সহায়তায় ১০৯ হেল্পলাইন সক্রিয় রয়েছে।
মাঠপর্যায়ে কাজ করা সংস্থাগুলো মনে করে, আইনি ব্যবস্থার পাশাপাশি স্থানীয় উদ্যোগ খুব জরুরি। ‘নাগরিক উদ্যোগ’-এর মতো প্রতিষ্ঠানগুলো ওয়ার্ড পর্যায়ে নারী নেতৃত্ব তৈরি এবং স্থানীয় ‘সালিশ’ ব্যবস্থার মাধ্যমে বিরোধ মীমাংসার কাজ করছে। কারণ বেশিরভাগ নারী আইনি জটিলতায় না গিয়ে সংসার টিকিয়ে রেখে কেবল নির্যাতন বন্ধ করতে চান। দলিত সম্প্রদায়েও সচেতনতা বাড়াতে কাজ চলছে।
পারিবারিক সহিংসতা রোধে কেবল আইন দিয়ে শতভাগ সফলতা সম্ভব নয়; প্রয়োজন সমাজের মনস্তাত্ত্বিক পরিবর্তন। নারীর অর্থনৈতিক ক্ষমতায়ন, রাষ্ট্রের রাজনৈতিক সদিচ্ছা, গণমাধ্যমে নারীর ইতিবাচক উপস্থাপন এবং নীতি-নির্ধারণী পর্যায়ে নারীদের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা ছাড়া এই নির্মমতা বন্ধ করা সম্ভব নয়।
বাসন্তি সাহা
কান্ট্রি ফোকাল পয়েন্ট-বাংলাদেশ, এশিয়া দলিত রাইটস ফোরাম-এডিআরএফ