সিলভিয়া নাজনীন
প্রকাশ : ০৮ মার্চ ২০২৬ ০৯:৫৯ এএম
আপডেট : ১১ মার্চ ২০২৬ ১৫:০২ পিএম
নারীর প্রতি সহিংসতা একটি ব্যক্তিগত ট্র্যাজেডি হলেও তার শিকড় গভীরভাবে রাজনৈতিক।
আন্তর্জাতিক নারী দিবসকে আমরা প্রায়ই একটি উদযাপনের দিন হিসেবে দেখি। ফুল, শুভেচ্ছা, সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে পোস্ট, প্রতিষ্ঠানের আনুষ্ঠানিকতা, সব মিলিয়ে দিনটি এক ধরনের নৈতিক স্বস্তি তৈরি করে। মনে হয়, নারীর প্রশ্নটি আমরা অন্তত এক দিনের জন্য হলেও স্মরণ করছি। কিন্তু ইতিহাস অন্য কথা বলে। আন্তর্জাতিক নারী দিবসের জন্মই হয়েছে অস্বস্তি থেকে। শ্রমক্ষেত্রে শোষণ, রাজনৈতিক বঞ্চনা, ভোটাধিকারহীনতা এবং নারীদেহ ও নারীশ্রমকে নিয়ন্ত্রণের বিরুদ্ধে সংগ্রাম থেকে। ১৯১১ সালে প্রথম আন্তর্জাতিক নারী দিবস পালিত হলেও এর বীজ রোপিত হয়েছিল আরও আগে, শ্রমজীবী নারীদের প্রতিবাদ, সংগঠন ও অধিকারচর্চার ভেতর দিয়ে। ২০২৬ সালে এসে দিবসটি তার ১১৫তম বছরে দাঁড়িয়েছে। কিন্তু প্রশ্ন হলো, এই দীর্ঘ ইতিহাস আমাদের কী শিখিয়েছে?
এবারের প্রতিপাদ্য ‘Give To Gain’। এর ভাবার্থ আমরা বলতে পারি, নারীকে এগোতে দাও, পৃথিবীও এগোবে। কিন্তু এই বাক্যটিকে যদি কেবল একটি অনুপ্রেরণামূলক স্লোগান হিসেবে নেওয়া হয়, তা হলে এর রাজনৈতিক ধার ভোঁতা হয়ে যায়। কারণ নারীকে ‘এগোতে দেওয়া’ মানে কী? কে দেবে? কোন কাঠামোর ভেতর দেবে? কী ধরনের অগ্রগতি? আর সেই অগ্রগতির সুফল আদৌ সব নারী সমানভাবে পাবেন কি?
এই জায়গাতেই আমাদের নারীপ্রশ্নটিকে একটু গভীরভাবে ভাবা দরকার। জুডিথ বাটলার আমাদের শিখিয়েছেন, নারী বা পুরুষ হওয়া কেবল জৈবিক পরিচয়ের প্রশ্ন নয়, এটি সামাজিকভাবে নির্মিত, পুনরাবৃত্ত আচরণ, ভাষা, বিধি ও প্রত্যাশার ভেতর দিয়ে তৈরি হওয়া এক পরিচয়। অর্থাৎ সমাজ শুধু নারীকে অবদমিত করে না, সমাজ নারী কাকে বলবে সেটিও নির্ধারণ করতে চায়। বাংলাদেশে নারীকে ঘিরে প্রচলিত ‘ভালো মেয়ে’, ‘ভদ্র নারী’, ‘সংসারী মা’, ‘সহনশীলা স্ত্রী’Ñ এসব ধারণা নিছক সাংস্কৃতিক অলংকার নয়, এগুলো ক্ষমতার ভাষা।
এখানে নারীকে একই সঙ্গে দৃশ্যমানও রাখা হয়, আবার নিয়ন্ত্রিতও রাখা হয়। ফলে নারীর অগ্রগতি নিয়ে যে কথাবার্তা চলে, তার ভেতরেও অনেক সময় শর্ত জুড়ে থাকে– এগোবে, তবে ‘সীমার মধ্যে’, কাজ করবে, তবে ‘সংসার সামলে’, নেতৃত্ব দেবে, তবে ‘অতিরিক্ত উচ্চকণ্ঠ’ হবে না।
ফলে বাংলাদেশের নারীপ্রশ্নকে বুঝতে গেলে শুধু অগ্রগতির পরিসংখ্যান যথেষ্ট নয়। অবশ্যই আমরা দেখব, নারীর শিক্ষায় অংশগ্রহণ বেড়েছে, উচ্চশিক্ষায় প্রবেশ বেড়েছে, প্রশাসন ও রাজনীতিতে নারীর উপস্থিতি আগের চেয়ে বেশি। কিন্তু অ্যাঞ্জেলা ডেভিসের ভাবনা আমাদের সতর্ক করে, নারীর প্রশ্নকে কখনোই একক, সমতল, অভিন্ন বাস্তবতা হিসেবে দেখা যায় না। শ্রেণি, শ্রম, দারিদ্র্য, রাষ্ট্রীয় সহিংসতা, জাতিগত প্রান্তিকতা, এসবের সঙ্গে নারীপ্রশ্ন জড়িয়ে থাকে। ফলে শহুরে মধ্যবিত্ত নারীর স্বাধীনতার ভাষা আর গার্মেন্টসকর্মী নারীর বেঁচে থাকার ভাষা এক নয়। দুজনই নারী, কিন্তু তাদের সামাজিক ঝুঁকি, দরকষাকষির ক্ষমতা, নিরাপত্তা, এমনকি ‘স্বাধীনতা’ শব্দটির অর্থও ভিন্ন।
বাংলাদেশে এই শ্রেণি-বিভাজন বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ। কারণ এখানে নারীশ্রমের একটি বড় অংশ অনানুষ্ঠানিক খাতে, আর নিম্নবিত্ত নারীদের একটি বিরাট অংশ এমন শ্রমে যুক্ত, যা অর্থনীতিকে টিকিয়ে রাখে কিন্তু সামাজিক মর্যাদা পায় না। পোশাকশিল্প তার সবচেয়ে দৃশ্যমান উদাহরণ। এই খাতে নারীরা শুধু শ্রমিক নন, তারা বাংলাদেশের রপ্তানি অর্থনীতির কেন্দ্রীয় শক্তি। কিন্তু জাতীয় উন্নয়নের ভাষ্যে তাদের উপস্থিতি প্রায়ই সংখ্যায় সীমাবদ্ধ। কত লাখ কর্মী, কত বিলিয়ন ডলারের রপ্তানি, ইত্যাদি। সেখানে তাদের ক্লান্ত শরীর, কম মজুরি, যাতায়াতের নিরাপত্তাহীনতা, মাতৃত্বকালীন ঝুঁকি, ভাড়াবাড়ির অনিশ্চয়তা, কিংবা কারখানার ভেতরের নীরব অপমান, এসব খুব কমই আলোচনায় আসে। উন্নয়নের সাফল্য তাই অনেক সময় নারীশ্রমের ওপর দাঁড়ায়, কিন্তু সেই শ্রম মানবিক ও রাজনৈতিক স্বীকৃতি পায় না।
এখানে অরুন্ধতী রায়ের রাষ্ট্র ও উন্নয়নবিষয়ক সমালোচনা আমাদের কাজে লাগে। তিনি বারবার দেখিয়েছেন, উন্নয়নের মহাকাব্যিক ভাষা অনেক সময় প্রান্তিক মানুষের ক্ষত, উচ্ছেদ, বঞ্চনা ও নীরবতাকে আড়াল করে। বাংলাদেশের ক্ষেত্রেও প্রশ্ন তোলা জরুরি : আমরা যখন বলিÑ নারীরা অর্থনীতিকে এগিয়ে নিচ্ছেন, তখন কি আমরা তাদের কণ্ঠও শুনছি? নাকি শুধু তাদের শ্রম নিচ্ছি? নারীকে ‘অর্থনীতির চালিকাশক্তি’ বলা সহজ, কিন্তু সেই শক্তির জন্য নিরাপদ শ্রমপরিবেশ, জীবিকা-উপযোগী মজুরি, স্বাস্থ্যসুরক্ষা, যৌন হয়রানি থেকে সুরক্ষা, শিশুযত্নের অবকাঠামো, বাসস্থান ও সামাজিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করা অনেক কঠিন। ‘Give To Gain’ যদি সত্যিই অর্থবহ হতে চায়, তবে এই দেওয়া কেবল প্রশংসা বা আনুষ্ঠানিক সমর্থন হতে পারে না। এটি হতে হবে নীতিগত, প্রাতিষ্ঠানিক এবং বস্তুগত।
আইনের ক্ষেত্রেও একই দ্বৈততা দেখা যায়। বাংলাদেশে নারীর সুরক্ষার জন্য বিভিন্ন আইন আছে এবং এগুলো নিঃসন্দেহে গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু আইন থাকা আর ন্যায়বিচার পাওয়া এক জিনিস নয়। নারীর বিরুদ্ধে সহিংসতা শুধু অপরাধতাত্ত্বিক ঘটনা নয়, এটি ক্ষমতার একটি সামাজিক বিন্যাস। পরিবার, সমাজ, আইনশৃঙ্খলা, আদালত, এমনকি প্রতিবেশী নৈতিকতাও অনেক সময় ভুক্তভোগী নারীর বিরুদ্ধে কাজ করে। ফলে সহিংসতা একটি ব্যক্তিগত ট্র্যাজেডি হলেও তার শিকড় গভীরভাবে রাজনৈতিক। একজন নারী কেন অভিযোগ করতে পারেন না, কেন পরিবার চুপ থাকতে বলে, কেন বিচারপ্রক্রিয়া তাকে দ্বিতীয়বার আঘাত করে, এসব প্রশ্নের উত্তর আইনের বইয়ে নয়, সমাজের ক্ষমতাবিন্যাসে লুকিয়ে আছে।
বাংলাদেশে সংসদ ও ক্ষমতাকাঠামোতে নারীর উপস্থিতি নিয়ে আমরা প্রায়ই গর্ব করি এবং সেই গর্বের যথেষ্ট কারণও আছে। কিন্তু উপস্থিতি ও ক্ষমতা এক নয়। প্রতিনিধিত্ব কখনও কখনও অন্তর্ভুক্তির অনুভূতি দেয়, কিন্তু প্রকৃত সিদ্ধান্তগ্রহণের জায়গায় নারীর কণ্ঠ কতটা কার্যকর, সেই প্রশ্ন আরও কঠিন। নারীর দৃশ্যমানতা বাড়া অবশ্যই গুরুত্বপূর্ণ, কিন্তু সে দৃশ্যমানতা যদি পুরুষতান্ত্রিক কাঠামোর ভাষা বদলাতে না পারে, তবে তা প্রতীকী অর্জন হয়ে থাকার ঝুঁকি রাখে। অর্থাৎ নারীরা ক্ষমতায় আছেন, এটি যেমন সত্য, তেমনি এই ক্ষমতার ভাষা, নিয়ম ও সীমা এখনও কতটা পুরুষতান্ত্রিক, সেটিও সত্য।
শিক্ষাক্ষেত্রের অগ্রগতি নিয়েও তাই একইভাবে দ্বৈত দৃষ্টিতে তাকাতে হবে। মেয়েরা স্কুলে যাচ্ছে, বিশ্ববিদ্যালয়ে যাচ্ছে, এটি নিঃসন্দেহে সামাজিক রূপান্তরের বড় লক্ষণ। কিন্তু শিক্ষায় প্রবেশ মানেই কি স্বাধীন চিন্তা, সমান পেশাগত সুযোগ, নিরাপদ ক্যাম্পাস বা সিদ্ধান্ত নেওয়ার সক্ষমতা? অনেক সময় শিক্ষা নারীর জন্য নতুন দরজা খুলে দেয়, আবার একই সঙ্গে পুরনো সামাজিক নিয়মও অক্ষত রাখে। একজন মেয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়তে পারে কিন্তু বিয়ে, চলাফেরা, পেশা বা পোশাক নিয়ে তার নিজের সিদ্ধান্তের অধিকার কতখানি, সেখানেই আসল প্রশ্ন।
এ কারণেই আন্তর্জাতিক নারী দিবসকে কেবল সাফল্যের তালিকা বা ভুক্তভোগিতার পরিসংখ্যানের দিন বানালে চলবে না। এটি হওয়া উচিত আত্মসমালোচনার দিন। আমরা কি নারীর প্রতি সমর্থনকে এখনও দয়া হিসেবে কল্পনা করি, নাকি অধিকার হিসেবে? আমরা কি নারীর অগ্রগতিকে পারিবারিক সম্মান ও জাতীয় উন্নয়নের উপকরণ হিসেবে দেখি, নাকি তাকে নিজস্ব রাজনৈতিক সত্তা হিসেবে স্বীকার করি? আমরা কি শুধু ‘নারীকে নিরাপদ’ রাখতে চাই, নাকি তাকে স্বাধীনও দেখতে চাই?
‘Give To Gain’ আমাদের মনে করিয়ে দেয়, সমতা কোনো দয়া নয়, এটি ক্ষমতার সম্পর্ক পুনর্গঠনের রাজনৈতিক প্রক্রিয়া। ফলে নারীর অগ্রগতির কথা বলতে গেলে প্রতীকী সমর্থনের চেয়ে বেশি কিছু প্রয়োজন। সামাজিক স্বীকৃতি, ন্যায্য মজুরি, নিরাপত্তা, আইনি সুরক্ষা, শরীরের ওপর নিজের অধিকার এবং নিজের ভাষায় কথা বলার অবকাশ। এই কারণে আন্তর্জাতিক নারী দিবস উদযাপনের দিন যতটা, ততটাই আত্মসমালোচনার দিন। বাংলাদেশের বাস্তবতা আমাদের সেই আত্মসমালোচনার সামনে দাঁড় করায়– নারী এগোলে পৃথিবী এগোবে কিন্তু আমরা কি প্রস্তুত সেই পৃথিবীর ক্ষমতার মানচিত্রটিও বদলাতে?
সিলভিয়া নাজনীন
চিত্রশিল্পী, শিক্ষক, গবেষক