সাক্ষাৎকার : ড. তৌফিকুল হাসান সিদ্দিক
আরফাতুন নাবিলা
প্রকাশ : ১২ জানুয়ারি ২০২৬ ১৬:৩৪ পিএম
হেড, হেলথকেয়ার এন্টারপ্রাইজ, ব্র্যাক এন্টারপ্রাইজের ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (রিটায়ার্ড) ড. তৌফিকুল হাসান সিদ্দিক
নারীর স্বাস্থ্যসেবায় ডিজিটাল প্রযুক্তি ও টেলিমেডিসিন ব্যবহারে কাজ করছে ব্র্যাক। নারীদের জন্য স্বাস্থ্যসেবা সহজলভ্য করতে ব্র্যাক হেলথকেয়ার কীভাবে ভূমিকা রাখছে তা নিয়ে কথা প্রতিদিনের বাংলাদেশের সঙ্গে কথা বলেছেন হেড, হেলথকেয়ার এন্টারপ্রাইজ, ব্র্যাক এন্টারপ্রাইজের ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (রিটায়ার্ড) ড. তৌফিকুল হাসান সিদ্দিক
প্রশ্ন : ব্র্যাক হেলথকেয়ার বাংলাদেশের সাধারণ মানুষের কাছে পৌঁছানোর জন্য দীর্ঘমেয়াদি কী ধরনের পরিকল্পনা করছে?
উত্তর : বর্তমানে শুধু স্বাস্থ্যসেবার সুযোগ বাড়ালেই মৃত্যুহার কমানো সম্ভব নয়Ñ সেবার মান এখন আরও বড় চ্যালেঞ্জ। গবেষণায় দেখা গেছে, নিম্ন ও মধ্যম আয়ের দেশগুলোতে শুধু সেবার মান উন্নত করা গেলে প্রায় ৮০ লাখ মানুষের জীবন রক্ষা করা সম্ভব। স্বাস্থ্যসেবার ব্যবহার বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে এবং রোগের জটিলতা বৃদ্ধি পাওয়ায় ভবিষ্যতে মানসম্মত সেবাই হবে স্বাস্থ্য খাতের সবচেয়ে বড় চালিকাশক্তি। এই বাস্তবতাকে সামনে রেখেই ব্র্যাক হেলথকেয়ার এমন একটি স্বাস্থ্যব্যবস্থা গড়ে তুলতে কাজ করছে, যেখানে রোগীই সব কার্যক্রমের কেন্দ্রবিন্দু। আমাদের কাছে কোয়ালিটি শুধু ক্লিনিক্যাল প্রটোকলের বিষয় নয়- এটি একটি মানসিকতা, একটি সংস্কৃতি। ব্র্যাক হেলথকেয়ারের হৃদয়ে রয়েছে ভালোবাসা, সম্মান ও মানবিকতার দর্শন, যা প্রতিফলিত হয়েছে আমাদের লোগোতে- পাঁচ পাপড়ির Forget-me-not ফুলে। এই ফুল আমাদের অঙ্গীকারের প্রতীক- আমরা যেন কখনোই আমাদের রোগীদের কথা ভুলে না যাই। প্রতিটি পাপড়ি আমাদের প্রতিশ্রুতি বহন করে- নিরাপত্তা, মর্যাদা, সহমর্মিতা, আস্থা ও উৎকর্ষের।
এই দর্শনের ভিত্তিতেই ব্র্যাক হেলথকেয়ারের দীর্ঘমেয়াদি লক্ষ্য হলো, বাংলাদেশের সাধারণ মানুষের জন্য মানসম্মত ও সাশ্রয়ী স্বাস্থ্যসেবা সহজলভ্য করা। আমরা দেশব্যাপী কমিউনিটিভিত্তিক প্রাইমারি ও সেকেন্ডারি কেয়ার সেন্টার সম্প্রসারণ করছি, পাশাপাশি ডিজিটাল হেলথ, টেলিমেডিসিন ও মোবাইল হেলথ সার্ভিস চালুর মাধ্যমে প্রত্যন্ত জনগোষ্ঠীকেও সেবার আওতায় আনছি।
দীর্ঘমেয়াদে আমাদের অন্যতম প্রধান উদ্যোগ হলো, বাংলাদেশে একটি টারশিয়ারি লেভেল হাসপাতাল প্রতিষ্ঠা করা- যেখানে আন্তর্জাতিক মানের আধুনিক ডায়াগনস্টিক ও চিকিৎসাসেবা সুলভ মূল্যে পাওয়া যাবে। এতে করে জটিল রোগের চিকিৎসায় বিদেশমুখী হওয়ার প্রবণতা কমবে এবং দেশেই উন্নত চিকিৎসা নিশ্চিত করা সম্ভব হবে।
বর্তমানে রাজধানীর কাজীপাড়া, উত্তরা, সিদ্ধেশ্বরী ও বাড্ডা এলাকায় আমাদের সেন্টারগুলো কার্যক্রম চালাচ্ছে। নোয়াখালী ও রংপুরে নতুন শাখার কাজ চলমান রয়েছে এবং শিগগিরই দেশজুড়ে ২০টিরও বেশি শাখা চালুর পরিকল্পনা রয়েছে। সব মিলিয়ে একটি টেকসই, মানবিক ও রোগীকেন্দ্রিক জাতীয় স্বাস্থ্যসেবা নেটওয়ার্ক গড়ে তোলাই ব্র্যাক হেলথকেয়ারের অঙ্গীকার।
প্রশ্ন : নারীর স্বাস্থ্যসেবায় ডিজিটাল প্রযুক্তি ও টেলিমেডিসিন ব্যবহারে বর্তমান অগ্রগতি সম্পর্কে জানতে চাই।
উত্তর : নারীর স্বাস্থ্যসেবাকে আরও সহজ ও অন্তর্ভুক্তিমূলক করতে ব্র্যাক হেলথকেয়ার ডিজিটাল প্রযুক্তি ও টেলিমেডিসিন ব্যবহারে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি করেছে। অনলাইনে চিকিৎসকের পরামর্শ, ডিজিটাল প্রেসক্রিপশন, রিপোর্ট সংরক্ষণ ও ফলোআপ সেবার মাধ্যমে গর্ভবতী নারী, কর্মজীবী নারী এবং দূরবর্তী এলাকার নারীরা ঘরে বসেই নিরাপদ ও মানসম্মত স্বাস্থ্যসেবা পাচ্ছেন। ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম নারীদের গোপনীয়তা ও সম্মান বজায় রেখে ধারাবাহিক চিকিৎসা নিশ্চিত করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে।
প্রশ্ন : নারীর স্বাস্থ্য সুরক্ষা নিয়ে উল্লেখযোগ্য কাজগুলো কী কী?
উত্তর : নারীর স্বাস্থ্য সুরক্ষায় ব্র্যাক হেলথকেয়ার একটি জীবনচক্রভিত্তিক ও সমন্বিত উদ্যোগ গ্রহণ করেছে। ব্র্যাক হেলথকেয়ার মাতৃত্বকালীন সেবা, নিরাপদ প্রসবপূর্ব ও পরবর্তী চিকিৎসা, পুষ্টি পরামর্শ, পরিবার পরিকল্পনা এবং সার্ভিক্যাল ক্যানসার স্ক্রিনিং কার্যক্রম পরিচালনা করছে। পাশাপাশি মানসিক স্বাস্থ্য ও হরমোনজনিত সমস্যায় বিশেষ গুরুত্ব দিয়ে নারীদের জন্য একটি সমন্বিত ও মানবিক স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করা হচ্ছে।
প্রশ্ন : নারীদের জন্য স্বাস্থ্যসেবা সহজলভ্য করতে ব্র্যাক হেলথকেয়ার কীভাবে ভূমিকা রাখছে?
উত্তর : নারীদের জন্য স্বাস্থ্যসেবা সহজলভ্য ও নিরাপদ করতে ব্র্যাক হেলথকেয়ার একটি নারীবান্ধব, সম্মানজনক ও অন্তর্ভুক্তিমূলক পরিবেশ নিশ্চিত করছে। সাশ্রয়ী মূল্যের স্বাস্থ্যসেবা প্যাকেজ, অভিজ্ঞ নারী চিকিৎসক ও কাউন্সেলরদের মাধ্যমে সেবা প্রদান এবং ব্যক্তিগত গোপনীয়তা রক্ষাকে আমরা বিশেষ গুরুত্ব দিচ্ছি- যাতে নারীরা আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে চিকিৎসা নিতে পারেন।
নারীদের সময় ও বাস্তবতার কথা বিবেচনায় রেখে আমরা সাত দিনের মধ্যে ফ্রি ফলোআপ সেবা চালু করেছি এবং ডিজিটাল অ্যাপের মাধ্যমে সহজ অ্যাপয়েন্টমেন্ট বুকিং সুবিধা দিয়েছি। এর ফলে কর্মজীবী নারী, গৃহিণী কিংবা দূরবর্তী এলাকার নারীরা কম সময় ও কম ঝামেলায় স্বাস্থ্যসেবায় প্রবেশ করতে পারছেন। এখানে একটি বিষয় বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্যÑ ব্র্যাক হেলথকেয়ারের রোগীদের মধ্যে নারী-পুরুষের অংশগ্রহণ প্রায় সমান, এবং নারীরা একটি উল্লেখযোগ্য অংশজুড়ে আছেন। এটি আমাদের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ বার্তা বহন করেÑ নারীরা ব্র্যাক হেলথকেয়ারে এসে নিজেদের নিরাপদ, সম্মানিত ও স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করেন। এই আস্থাই আমাদের নারীকেন্দ্রিক স্বাস্থ্যসেবা কার্যক্রমের সবচেয়ে বড় সাফল্য।
প্রশ্ন : নারীর স্বাস্থ্য সুরক্ষায় সচেতনতা তৈরিতে ব্র্যাক হেলথকেয়ারের বিশেষ কোনো উদ্যোগ আছে কি?
উত্তর : নারীর স্বাস্থ্য সুরক্ষায় সচেতনতা বৃদ্ধি করতে ব্র্যাক হেলথকেয়ার নিয়মিতভাবে কমিউনিটি অ্যাওয়ারনেস প্রোগ্রাম, স্বাস্থ্যশিক্ষা সেশন, ক্যাম্পেইন এবং ডিজিটাল কনটেন্ট ব্যবহার করছে। আমাদের উদ্যোগের লক্ষ্য হলো, সঠিক স্বাস্থ্যজ্ঞান নারীর কাছে পৌঁছে দেওয়া, স্বাস্থ্য সম্পর্কিত ভুল ধারণা দূর করা এবং সচেতনতা তৈরি করা। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, কমিউনিটি এনগেজমেন্ট, স্থানীয় নেতৃবৃন্দ এবং অংশীদার প্রতিষ্ঠানগুলোর সহযোগিতার মাধ্যমে আমরা বিশেষ করে গর্ভবতী নারী, কিশোরী এবং কর্মজীবী নারীদের কাছে জরুরি স্বাস্থ্য তথ্য সহজলভ্য ও গ্রহণযোগ্যভাবে পৌঁছে দিচ্ছি। ব্র্যাক হেলথকেয়ার বিশ্বাস করে, ‘সুস্থ নারী মানেই সুস্থ পরিবার, আর সুস্থ পরিবার মানেই সুস্থ বাংলাদেশ।’ এই দর্শন আমাদের সকল সচেতনতা এবং নারীকেন্দ্রিক উদ্যোগের মূল ভিত্তি।