সাক্ষাৎকার : ডা. শামা পারভীন
আরফাতুন নাবিলা
প্রকাশ : ১২ জানুয়ারি ২০২৬ ১৬:১৭ পিএম
ডা. শামা পারভীন , নর্দার্ন সিডনি লোকাল হেলথ ডিস্ট্রিক্ট এর কনসালট্যান্ট সাইকিয়াট্রিস্ট
নিজের যত্ন না নিলে আসলে অন্যকে যত্ন করা সম্ভব না। স্বাস্থ্য সুরক্ষার গুরুত্বপূর্ণ একটি দিক হচ্ছে মানসিক স্বাস্থ্য সুরক্ষা। নারীর মানসিক স্বাস্থ্য নিয়ে প্রতিদিনের বাংলাদেশের সঙ্গে কথা বলেছেন নর্দার্ন সিডনি লোকাল হেলথ ডিস্ট্রিক্ট এর কনসালট্যান্ট সাইকিয়াট্রিস্ট ডা. শামা পারভীন
প্রশ্ন : নারীরা সাধারণত নিজের স্বাস্থ্যের চেয়ে পরিবারের সবার যত্ন নিতে বেশি অভ্যস্ত। এই 'সেলফকেয়ার'-এর অভাব তাদের দীর্ঘমেয়াদি মানসিক স্বাস্থ্যে কী প্রভাব ফেলছে?
উত্তর : নিজের যত্ন না নিলে আসলে অন্যকে যত্ন করা সম্ভব নাÑ এই কথাটা আমাদের দেশের নারীরা কেন যেন খুব একটা মানতে চান না। ওনাদের কাছে সবার আগে পরিবার। আমাদের এই আর্থ-সামাজিক প্রেক্ষাপটে নারীরা সেলফকেয়ার ব্যাপারটা সেভাবে মেনে চলেন না। এতে শেষ পর্যন্ত মানসিক স্বাস্থ্যের ওপর দীর্ঘ একটি প্রভাব পড়ে। সেলফকেয়ারের মধ্যে রয়েছেÑ শারীরিক পরিশ্রম, মানসিক স্বাস্থ্যের যত্ন, যে কাজ করতে ভালো লাগে সেগুলো করা, দুশ্চিন্তামুক্ত থাকা ইত্যাদি। এগুলো নিয়মিত না করলে পরিবারের সবার দেখাশোনা করার সময় কোনো না কোনো কারণে মানসিক সমস্যা জটিল আকার ধারণ করতে করতে এক সময় বার্নআউট হতে পারে। এক্ষেত্রে দেখা দিতে পারে দীর্ঘমেয়াদি শারীরিক নানা সমস্যা। ঘুম না হওয়া, মানসিক বিপর্যস্ততা, সারাক্ষণ ক্লান্ত লাগাÑ এগুলো সবই বার্নআউট হওয়ার সংকেত। মানসিক স্বাস্থ্য ভালো রাখার জন্য নিজের যত্ন অবশ্যই নিতে হবে।
প্রশ্ন : কর্মজীবী নারীদের ক্ষেত্রে ‘মাল্টিটাস্কিং’ এবং ঘরের কাজের চাপের ফলে যে বার্নআউট তৈরি হয়, তা থেকে মুক্তির উপায় কী?
উত্তর : নারীরা ঘরে ও বাইরে যত কাজেই ব্যস্ত থাকুন না কেন, নিজের জন্য অবশ্যই সময় বের করতে হবে। এজন্য নিয়মিত হাঁটাহাঁটি করা, গ্রুপ অ্যাক্টিভিটিস করাও জরুরি। বার্নআউট প্রিভেন্টের জন্য ঘরে বা বাইরে যেখানে যে কাজই করা হোক না কেন, সেগুলো আনন্দের সাথে করতে হবে। যদি আমরা কাজে আনন্দ না পাই, তাহলে দ্রুত সেটা এফেক্ট করে এবং বার্ন আউট হয়ে যায়। তবে অতিরিক্ত চাপ যেন না পড়ে সেদিকেও খেয়াল রাখতে হবে। অনেক কর্মজীবী মহিলা পার্টটাইম কাজও করেন, সেগুলো যেন অতিরিক্ত স্ট্রেস না দেয় সেদিকে নজর দিতে হবে। সাইকিয়াট্রিস্টরা এখন মানসিক ও শারীরিক কাজও যেন করা হয় সেভাবেই প্রেসক্রাইব করছেন। এতে আমাদের শরীর থেকে হ্যাপি হরমোন, এন্ডোফিনসারটনিন রিলিজ হচ্ছে। এতে কিন্তু সেন্স অব এচিভমেন্ট আসে, সামাজিকতার সুযোগ বাড়ে। ছবি আঁকা, গান গাওয়া, বাদ্যযন্ত্র বাজানো, নতুন ভাষা শেখা সবই সেলফকেয়ার। এক কথায় বার্নআউট প্রিভেন্ট করার জন্য যা কিছু ইতিবাচক ভূমিকা রাখে সেটাই সেলফকেয়ার।
প্রশ্ন : নারীদের মানসিক সমস্যাকে অনেক সময় ‘হিস্টেরিয়া’ বা কেবল ‘অজুহাত’ বলে উড়িয়ে দেওয়া হয়। একজন রোগীর সুস্থ হওয়ার পথে এটি কত বড় বাধা?
উত্তর : আমাদের দেশেই হোক আর যেকোনো থার্ড কান্ট্রিতেই হোক, এটা একেবারেই এক্সেপটেবল না। মানসিক সমস্যা ঠিক ততটাই গুরুত্বপূর্ণ যতটুকু শারীরিক সমস্যা। কারও যদি হাত ভেঙে যায় সেটা যদি ক্রনিক হয়ে ওঠে তাহলে সে কিন্তু অসুস্থই থাকে। ঠিক একইভাবে মানসিকভাবে অসুস্থ হলে মানসিক স্বাস্থ্যও ভঙ্গুর হয়ে যায়। মেন্টাল হেলথকে ইগনোর করা বা মেন্টাল অজুহাত বলে উড়িয়ে দিলে পরবর্তীতে ইম্প্রুভ করা কঠিন হয়। যেকোনো অসুখ হলে সেগুলোকে অ্যাড্রেস করা খুবই জরুরি। শুরুতেই যদি পরিবার থেকে বলে দেওয়া হয় যে ‘কোনো অসুখই হয়নি, সবই অজুহাত’ তাহলে সেটার চিকিৎসা কীভাবে করা হবে? এমন হলে পরবর্তীতে ওই নারীই কখনও নিজের সমস্যা শেয়ার করবেন না। এক্ষেত্রে নারীর পারিপার্শ্বিক সোশ্যাল সাপোর্ট জরুরি।
প্রশ্ন : নারী যখন বুঝতে পারেন তিনি মানসিকভাবে ভেঙে পড়ছেন, কিন্তু সমাজ বা পরিবারের ভয়ে মুখ খুলতে পারছেন না— তখন আপনার পরামর্শ কেমন হয়?
উত্তর : যদিও এ ধরনের পরিস্থিতিগুলো খুবই দুঃখজনক। তবু আমরা পরামর্শ দেই এমন পরিস্থিতিতে আপনি যাকে সবচেয়ে বেশি বিশ্বাস করেন তার কাছেই যান। বন্ধু, পরিবার, কলিগ যেই হোক তার সাথে মন খারাপের বিষয়টি শেয়ার করুন। অনেক সময় পরিবারের সদস্যরা সমস্যা বুঝতে চায় না, সেক্ষেত্রে অন্য কাউকে বললে তারা হয়তো সমাধানে সাহায্য করতে পারেন, পরিবারকেও বোঝাতে পারেন। এরপরও যদি কোনো উপকার না পাওয়া যায় তাহলে প্রফেশনাল হেল্প অবশ্যই নিতে হবে।
প্রশ্ন : মানসিক উদ্বেগের কারণে নারীদের পিরিয়ড বা রিপ্রোডাক্টিভ হেলথে কোনো দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব পড়ে কি?
উত্তর : নানাভাবে প্রভাব ফেলতে পারে। শুরুটা হতে পারে অনিয়মিত মেন্সট্রুয়াল সাইকেল দিয়ে। এটা যেকোনোভাবে হতে পারে, যেমনÑ হেভি পিরিয়ড, লাইট পিরিয়ড, সাইকেল ইরেগুলার হয়ে যেতে পারে। হয়তো খুব কাছাকাছি হচ্ছে সাইকেলটা। আবার অনেকদিন পর পর মেনস্ট্রুশন হচ্ছে। কোনো একিউট বা সিভিয়ার স্ট্রেস থাকলে এমিনোরিয়া হয়ে যেতে পারে বা মেনস্ট্রুশন বন্ধ হয়ে যেতে পারে। বেশি স্ট্রেসে থাকলে কনসিভ করারও অসুবিধা হতে পারে। আবার স্ট্রেস, ডিপ্রেশন বা অন্যান্য মানসিক সমস্যা কিন্তু মহিলাদের শারীরিক মিলনের ইচ্ছা কমিয়ে দিতে পারে। একে লিবিডো বলা হয়। অনেক মানসিক স্বাস্থ্যের জন্য যেসব মেডিকেশন খাওয়া হয় সেগুলো লিবিডোতে প্রভাব ফেলতে পারে। আমাদের মস্তিষ্কে যে এরিয়া স্ট্রেস রেগুলেট করে সেটার খুব কাছেই আরেকটা ব্রেন এরিয়া আছে যেখান থেকে পিটুইটারি হরমোনগুলো সিক্রেশন হয়, যেগুলো মেন্সট্রুয়াল সাইকেলটাকে রেগুলেট করে। এজন্য মেন্টাল হেলথের সাথে পিরিয়ড বা রিপ্রোডাক্টিভ হেলথ খুবই কানেক্টেড।