পায়ুপথের রোগ : নীরব যন্ত্রণা
ডা. সিফাত ই রব্বানী
প্রকাশ : ১২ জানুয়ারি ২০২৬ ১৩:৪৮ পিএম
ডা. সিফাত ই রব্বানী, এমবিবিএস, বিসিএস, এফসিপিএস (সার্জারি), এমএস (সিভিঅ্যান্ডটিএস), জুনিয়র কনসালট্যান্ট (সার্জারি) ডিএনসিসি হাসপাতাল
নারীদের পায়ুপথের সমস্যাগুলো সাধারণ থেকে জটিল পর্যন্ত হতে পারে। কোষ্ঠকাঠিন্য, এনাল ফিসার, পাইলস ইত্যাদি নারীদের পায়ুপথের বিভিন্ন সমস্যা। পায়ুপথ ও মলদ্বার সংক্রান্ত রোগ আমাদের সমাজে অত্যন্ত সাধারণ হলেও অধিকাংশ মানুষ লজ্জা, ভয় কিংবা অজ্ঞতার কারণে দীর্ঘদিন চিকিৎসা গ্রহণ করেন না।
পায়ুপথে ব্যথা, রক্তপাত, চুলকানি বা মলত্যাগের সময় অস্বস্তি- এসব উপসর্গকে অনেকেই তুচ্ছ মনে করেন বা নিজের মতো করে চিকিৎসা নেন। অথচ এসব লক্ষণ কখনও কখনও গুরুতর রোগ যেমন রেক্টাল ক্যানসারেরও ইঙ্গিত হতে পারে। সময়মতো সঠিক চিকিৎসা গ্রহণ করলে অধিকাংশ ক্ষেত্রেই রোগ সম্পূর্ণ আরোগ্য লাভ করে।
এনাল ফিসার : ছোট ক্ষত, কিন্তু যন্ত্রণাদায়ক
এনাল ফিসার হলো পায়ুপথের ভেতরের আবরণে সৃষ্ট একটি ছোট ফাটল বা ক্ষত। সাধারণত শক্ত মল, দীর্ঘদিনের কোষ্ঠকাঠিন্য বা অতিরিক্ত চাপ দিয়ে মলত্যাগ করার ফলে এটি হয়ে থাকে।
লক্ষণসমূহ :
প্রাথমিক পর্যায়ে ফিসার সাধারণত পানি বেশি পান, আঁশযুক্ত খাবার, মল নরমকারী ওষুধ এবং নির্দিষ্ট মলম ব্যবহারে সেরে যায়। তবে দীর্ঘদিন অবহেলা করলে এটি দীর্ঘস্থায়ী ফিসারে পরিণত হয়, যা কখনও কখনও অস্ত্রোপচারের প্রয়োজন তৈরি করে।
হেমোরয়েড বা পাইলস : খুব সাধারণ কিন্তু ভুলভাবে চিকিৎসা হতে পারে
পাইলস বা হেমোরয়েড হলো পায়ুপথের শিরা ফুলে যাওয়া। কোষ্ঠকাঠিন্য, দীর্ঘ সময় বসে থাকা, গর্ভাবস্থা, স্থূলতা ও অনিয়মিত জীবনযাপনের কারণে এটি বেশি দেখা যায়।
সাধারণ লক্ষণ :
সব পাইলসের জন্য অস্ত্রোপচার প্রয়োজন হয় না। খাদ্যাভ্যাস পরিবর্তন ও জীবনযাপনের উন্নতির মাধ্যমেই অনেক রোগী ভালো হয়ে যান। কিন্তু মলদ্বার দিয়ে রক্ত পড়া মানেই পাইলস- এই ধারণা অত্যন্ত বিপজ্জনক।
পায়ুপথের ফিস্টুলা : দীর্ঘস্থায়ী ও যন্ত্রণাদায়ক সমস্যা
এনাল ফিস্টুলা হলো পায়ুপথের ভেতরের অংশ ও বাইরের চামড়ার মধ্যে তৈরি হওয়া একটি অস্বাভাবিক নালি। সাধারণত আগে হওয়া পুঁজভরা ফোড়া (অ্যাবসেস) থেকে এটি তৈরি হয়।
লক্ষণসমূহ :
ফিস্টুলা নিজে নিজে সারে না। এর একমাত্র কার্যকর চিকিৎসা হলো সঠিক অস্ত্রোপচার। ভুল বা অপূর্ণ চিকিৎসায় ফিস্টুলা জটিল হয়ে উঠতে পারে।
রেক্টাল প্রোলাপ্স : যখন মলদ্বার বাইরে চলে আসে
রেক্টাল প্রোলাপ্সে মলদ্বারের অংশ পায়ুপথ দিয়ে বাইরে বের হয়ে আসে। এটি বয়স্ক মানুষ, বহু সন্তান প্রসবকারী নারী এবং দীর্ঘদিনের কোষ্ঠকাঠিন্যে ভোগা রোগীদের মধ্যে বেশি দেখা যায়। এটি কখনোই নিজে নিজে ভালো হয় না এবং সাধারণত অস্ত্রোপচার প্রয়োজন হয়।
রেক্টাল ক্যানসার : সবচেয়ে ভয়ংকর কিন্তু প্রাথমিক পর্যায়ে নিরাময়যোগ্য
রেক্টাল ক্যানসার একটি মারাত্মক রোগ হলেও প্রাথমিক পর্যায়ে ধরা পড়লে এটি সম্পূর্ণ নিরাময়যোগ্য। দুঃখজনকভাবে অনেক রোগী একে পাইলস ভেবে দীর্ঘদিন ভুল চিকিৎসা নেন।
সতর্ক সংকেত :
৪০ বছরের পর ঝুঁকি বাড়লেও কমবয়সিদের মধ্যেও এ রোগ দেখা যায়।
‘অপ্রশিক্ষিত চিকিৎসক’ চিকিৎসা বন্ধ করুন
বছরের পর বছর ধরে মানুষ গ্রামাঞ্চলের অননুমোদিত ও অপ্রশিক্ষিত চিকিৎসকদের দ্বারা চিকিৎসা নিচ্ছেন। অনেকে কোয়াক করোসিভ ইনজেকশন ব্যবহার করে পাইলসের চিকিৎসা করে থাকেন। এর ফলে রোগীর পায়ুপথ সংকুচিত হয়ে যায় (এনাল স্টেনোসিস)। গুরুতর এনাল স্টেনোসিসে অনেক সময় চিকিৎসা এতটাই জটিল হয় যে সাময়িকভাবে পেটের ওপর কৃত্রিম মলদ্বার (অ্যাবডোমিনাল স্টোমা) তৈরি করতে হয়। আরও ভয়ংকর বিষয় হলো- অনেক ক্ষেত্রে রেক্টাল ক্যানসারকে পাইলস ভেবে কোয়াক চিকিৎসা করা হয়, ফলে রোগ নিরাময়ের সুযোগ হারিয়ে যায়।
কখন অবশ্যই ডাক্তারের শরণাপন্ন হবেন
মলদ্বার দিয়ে রক্তপাত হলে, দীর্ঘস্থায়ী ব্যথা বা পুঁজ হলে, পিণ্ড বা কিছু বের হয়ে এলে, ওজন অকারণে কমে গেলে। লজ্জা নয়, দেরি নয়- সঠিক চিকিৎসাই জীবন বাঁচায়। রক্তপাত অবহেলা নয়, পরীক্ষাই নিরাপত্তা। ভুল চিকিৎসা রোগ বাড়ায়, সঠিক চিকিৎসা জীবন বাঁচায়।
লেখক : এমবিবিএস, বিসিএস, এফসিপিএস (সার্জারি), এমএস (সিভিঅ্যান্ডটিএস), জুনিয়র কনসালট্যান্ট (সার্জারি) ডিএনসিসি হাসপাতাল