বীরেন সোম
প্রকাশ : ১৬ ডিসেম্বর ২০২৫ ১৫:৩৫ পিএম
বাংলাদেশ রাষ্ট্রের অভ্যুদয়ের ঘটনাবহুল চুয়ান্ন বছর অতিক্রম করেছি। এ সময়ে আমাদের অগ্রগতি হয়েছে, আবার রাষ্ট্রীয় জীবনে বেদনাদায়ক বিয়োগান্তক একাধিক ঘটনা আমাদেরকে পেছনে নিয়ে গেছে। তারুণ্যের উদ্ভাবনী শক্তিতে সৃজনের উদ্বোধন ঘটেছে তথ্যপ্রযুক্তিসহ শিল্প-সংস্কৃতির নানা জায়গায়। ঘটেছে অবকাঠামোর অভূতপূর্ব উন্নয়ন! আবার গণতান্ত্রিক চেতনা নিয়ে মানবিক মূল্যবোধসম্পন্ন সমাজ গঠনের কতক ক্ষেত্রে পশ্চাদপসরণের মতো ঘটনাও ঘটেছে। তবে সামগ্রিক অগ্রগামিতার বিচারে আমাদের উল্লেখযোগ্য অর্জনের অন্যতম গর্বের জায়গা হয়েছে বাংলাদেশের মঞ্চনাটক ও এর সমান্তরালে এগিয়ে যাওয়া আমাদের সমকালীন চারুশিল্প।
আমাদের সৃজনশিল্প এশীয় পরিসর ছাড়িয়ে আজ বিশ্বপরিসরে তার আপন মহিমায় নিজের মর্যাদাকে ঊর্ধ্বে তুলে ধরছে। দুনিয়ার দামি দামি চারুকলা প্রদর্শনী, আর্ট প্রজেক্ট, এক্সিবিশনে আমাদের তরুণ ও প্রজ্ঞাবান শিল্পীরা স্বাধীনতার পর থেকে শুরু করে এখন অবধি নিয়মিত অংশ নিচ্ছেন এবং নিজেদের মেধা ও যোগ্যতার পরিচয় বহন করে জাতীয় ও আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি লাভ করে চলেছেন।
বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠার পর অনুকূল পরিস্থিতিতে নানা ক্ষেত্রের ন্যায় শিল্পীদের হাত ধরে চারুশিল্প নতুন পথের দিশার সন্ধানে ব্যাপৃত হয়। পাকিস্তান আমলে ধর্মীয় সীমাবদ্ধতায় ভাস্কর্য নির্মাণের প্রায় অবরুদ্ধ অবস্থা সাময়িকভাবে কেটে যায় এবং মুক্তিযুদ্ধে বাঙালির অসম সাহসিকতায় পরাধীনতার শৃঙ্খল ঘুচে যাওয়ার প্রায় সঙ্গে সঙ্গেই বহিরাঙ্গন ভাস্কর্য নির্মাণযজ্ঞ শুরু হয়।
জাগ্রত চৌরঙ্গী : মুক্তিযুদ্ধের মহান শহীদদের অসামান্য আত্মত্যাগের স্মরণে নির্মিত ভাস্কর্য জাগ্রত চৌরঙ্গী। এটি জয়দেবপুর চার রাস্তার মোড়ে স্থাপিত। ১৯৭৩ সালে ভাস্কর অধ্যাপক আবদুর রাজ্জাক এটি নির্মাণ করেন। ১৯৭১ সালের ১৯ মার্চের আন্দোলন ছিল মুক্তিযুদ্ধের সূচনাপর্বে প্রথম সশস্ত্র প্রতিরোধযুদ্ধ। আর এই প্রতিরোধযুদ্ধে শহীদ হুরমতউল্যাসহ শহীদদের অবদান এবং আত্মত্যাগকে জাতির চেতনায় সমুন্নত রাখতে দৃষ্টিনন্দন এই ভাস্কর্য নির্মাণ করা হয়।
অপরাজেয় বাংলা : ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কলা ভবনের সামনে বন্দুক কাঁধে দাঁড়িয়ে থাকা তিন নারী-পুরুষের ভাস্কর্য ‘অপরাজেয় বাংলা’ স্বাধীনতা সংগ্রামে সর্বস্তরের মানুষের অংশগ্রহণকে তুলে ধরেছে। দুই যুবক ও এক নারী অবয়বের এই ভাস্কর্য নির্মাণ করেন ভাস্কর সৈয়দ আবদুল্লাহ খালিদ। ১৯৭৯ সালের ১৬ ডিসেম্বর সকালে এর উদ্বোধন হয়।
স্বোপার্জিত স্বাধীনতা : ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের টিএসসির পশ্চিম পাশে ডাসের পেছনে অবস্থিত এ ভাস্কর্যে প্রতিফলিত হয়েছে পাকিস্তানি হানাদারের অত্যাচারের খণ্ডচিত্র। নির্মাণকাল ১৯৮৭-৮৮। ভাস্কর- শামীম সিকদার।
সংশপ্তক : জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় গ্রন্থাগারের সামনে। নির্মাণকাল ১৯৯০। যুদ্ধে শত্রুর আঘাতে এক হাত আর এক পা হারিয়েও রাইফেল হাতে লড়ে যাচ্ছেন দেশমাতৃকার বীর সন্তান। ভাস্কর অধ্যাপক হামিদুজ্জামান খান।
সাবাশ বাংলাদেশ : রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় সিনেট ভবনের দক্ষিণে স্থাপিত। একজন মুক্তিযোদ্ধা রাইফেল উঁচু করে দাঁড়িয়ে, অন্যজন রাইফেল হাতে দৌড়ের ভঙ্গিমায়। এ দুজন মুক্তিযোদ্ধার পেছনে ৩৬ ফুট উঁচু দেয়াল। এর ওপরের দিকে রয়েছে সূর্যের মতো শূন্য বৃত্ত। নির্মাণকাল ১৯৯১। ভাস্কর নিতুন কুণ্ডু।
বিজয়-৭১ : ময়মনসিংহ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ে শিল্পাচার্য জয়নুল আবেদিন মিলনায়তনের সামনে ‘বিজয়-৭১’। একজন কৃষক মুক্তিযোদ্ধা বাংলাদেশের পতাকা তুলে ধরেছেন আকাশের দিকে। তার ডান পাশেই শাশ্বত বাংলার সর্বস্বত্যাগী ও সংগ্রামী নারী দৃঢ়চিত্তে মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণের আহ্বান জানাচ্ছেন। যার সঙ্গে আছে রাইফেল। অন্যদিকে একজন ছাত্র মুক্তিযোদ্ধা গ্রেনেড ছোড়ার ভঙ্গিমায় বাম হাতে রাইফেল নিয়ে তেজোদীপ্ত চিত্তে দাঁড়িয়ে। ভাস্কর শ্যামল চৌধুরী। (নির্মাণ সম্পন্ন ২০০০ সালের জুন মাসে।
রাজু স্মৃতি ভাস্কর্য : সন্ত্রাসবিরোধী মিছিলে নেতৃত্ব দেওয়া অবস্থায় সন্ত্রাসীদের গুলিবর্ষণে নিহত ছাত্রনেতা মঈন হোসেন রাজুর স্মরণে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র-শিক্ষক কেন্দ্রের সামনের সড়কদ্বীপে স্থাপিত রাজু স্মৃতি ভাস্কর্য তার আরেকটি উল্লেখযোগ্য সৃষ্টি।
মুজিবনগর স্মৃতিসৌধ : মুজিবনগর স্মৃতিসৌধ মেহেরপুর জেলার মুজিবনগরে অবস্থিত। ১৯৭১ সালের ১৭ এপ্রিল বাংলাদেশ সরকার যে স্থানে শপথ গ্রহণ করে ঠিক সেই স্থানে এটি নির্মিত হয়েছে। মুজিবনগর স্মৃতিসৌধ নির্মাণের মূল কাজ শুরু হয় ১৯৮৭ সালে। এটির স্থপতি তানভীর করিম।
মুজিবনগর স্মৃতিসৌধের ভিতরে শপথ গ্রহণ স্থানে ২৪ ফুট দীর্ঘ ও ১৪ ফুট প্রশস্ত সিরামিকের ইট দিয়ে একটি আয়তাকার লাল মঞ্চ তৈরি করা হয়েছে। মাঝখানে স্মৃতিসৌধটি ২৩টি ত্রিভুজাকৃতি দেয়ালের সমন্বয়ে বৃত্তাকার উপায়ে সারিবদ্ধভাবে সাজানো রয়েছে। ২৩টি দেয়াল (আগস্ট ১৯৪৭ থেকে মার্চ ১৯৭১) এই ২৩ বছরের স্বাধীনতা আন্দোলনের প্রতীক হিসেবে ব্যবহৃত হয়েছে।
প্রথম দেয়ালটির উচ্চতা ৯ ফুট ৯ ইঞ্চি এবং দৈর্ঘ্য ২০ ফুট। পরবর্তী প্রতিটি দেয়ালকে ক্রমান্বয়ে দৈর্ঘ্য ১ ফুট ও উচ্চতা ৯ ইঞ্চি করে বাড়ানো হয়েছেÑ যা দ্বারা বোঝানো হয়েছে বাংলাদেশ তার স্বাধীনতার জন্য ৯ মাস ধরে যুদ্ধ করেছিল। শেষ দেয়ালের উচ্চতা ২৫ ফুট ৬ ইঞ্চি ও দৈর্ঘ্য ৪২ ফুট। প্রতিটি দেয়ালের ফাঁকে অসংখ্য ছিদ্র আছে যেগুলোকে পাকিস্তানি শাসক গোষ্ঠীর অত্যাচারের চিহ্ন হিসেবে প্রদর্শন করা হয়েছে।
স্মৃতিসৌধটির ভূমি থেকে ২ ফুট ৬ ইঞ্চি উঁচু বেদিতে অসংখ্য গোলাকার বৃত্ত রয়েছে, যা শহীদ বুদ্ধিজীবীদের করোটির প্রতীক। স্মৃতিসৌধের ভূমি থেকে ৩ ফুট উচ্চতার বেদিতে অসংখ্য পাথর ৩০ লাখ শহীদ ও ২ লাখ মা-বোনের সম্ভ্রমের প্রতীক। পাথরগুলোর মাঝখানে ১৯টি রেখায় তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের ১৯টি জেলাকে নির্দেশ করা হয়েছে। স্মৃতিসৌধের বেদিতে ওঠার জন্য ১১টি সিঁড়ি মুক্তিযুদ্ধকালীন ১১টি সেক্টরের প্রতীক।
স্বাধীনতা স্তম্ভ : বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের স্মারক হিসেবে নির্মিত একটি স্মৃতিস্তম্ভ। এটি ঢাকা শহরের কেন্দ্রস্থলে অবস্থিত সোহরাওয়ার্দী উদ্যানের অভ্যন্তরভাগে নির্মাণ করা হয়েছে। সোহরাওয়ার্দী উদ্যানের উত্তর পাশে স্থাপিত শিখা চিরন্তনের বরাবর দক্ষিণ দিকে এটির অবস্থান। ভূমি থেকে কিছুটা ওপর ভাগে নির্মিত একটি প্রশস্ত চৌকো কংক্রিটের চাতালের দক্ষিণ পাশে এটির অবস্থান। এই চাতালের পশ্চিম পাশে রয়েছে একটি কৃত্রিম জলাধার এবং পূর্ব পাশে রয়েছে টেরাকোটায় আচ্ছাদিত একটি অনতিউচ্চ দেয়ালÑ যার পেছনেই ভূগর্ভস্থ স্বাধীনতা জাদুঘরে যাওয়ার সিঁড়ি। এর স্থপতি কাশেফ মাহবুব চৌধুরী ও মেরিনা তাবাসসুম। স্বাধীনতা স্তম্ভের পশ্চিম দিকের দেয়ালে মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসকেন্দ্রিক ম্যুরাল স্থাপন করা হয়েছে। এটির নকশা ও নির্মাণে যুক্ত ছিলেনÑ শিল্পী হাশেম খান, মোহাম্মদ ইউনুস, শিশির ভট্টাচার্য, মুকুল মুৎসুদ্দি রানা, ইফতেখার উদ্দিন আহমেদ প্রমুখ। সাম্প্রতিক গণআন্দোলনে এটি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
দুরন্ত : ঢাকার শিশু একাডেমি প্রাঙ্গণে ভাস্কর সুলতানুল ইসলামের (১৯৬০) গড়া ভাস্কর্য ‘দুরন্ত’ আমাদের শৈশবের স্মৃতিকে তুলে ধরেছে। দুঃখজনক হলো ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট এটি ধ্বংসপ্রাপ্ত হয়। পঞ্চাশ বছরে বাংলাদেশের চিত্রকলার প্রতিষ্ঠা ও সুনাম অনেক বিস্তৃত হয়েছে।
বীরেন সোম
চিত্রশিল্পী