× ই-পেপার প্রচ্ছদ সর্বশেষ বাংলাদেশ রাজনীতি দেশজুড়ে বিশ্বজুড়ে বাণিজ্য খেলা বিনোদন মতামত চাকরি শিক্ষা আজকের কার্টুন ফিচার সকল বিভাগ ছবি ভিডিও লেখক আর্কাইভ কনভার্টার

এলো বহু প্রতীক্ষিত বিজয়

হাফিজ উদ্দিন আহমদ

প্রকাশ : ১৬ ডিসেম্বর ২০২৫ ১৪:৪০ পিএম

এলো বহু প্রতীক্ষিত বিজয়

১৫ ডিসেম্বর দুপুরের দিকে ক্যাপ্টেন অলির কাছে খবর পেলাম, পাকিস্তানি বাহিনী পরাজয় স্বীকার করে পরদিন আত্মসমর্পণ করতে যাচ্ছে। আনন্দে আত্মহারা হলাম। বহু প্রতীক্ষিত বিজয় অবশেষে হাতের মুঠোয় এলো। সৈনিকদের জানাতেই তাদের মুখ আনন্দে উদ্ভাসিত হলো। নির্ধারিত সময়ে পুরো কোম্পানি শূন্যে ফায়ার করে বিজয় উদযাপন করলাম। গুলির শব্দ শুনে জিয়াউর রহমান বেতার সেটে কল দিয়ে বললেন, ‘গুলির শব্দ শুনছি, সিচুয়েশন কী?’

‘বিজয় সেলিব্রেট করছি,’ আমার সংক্ষিপ্ত উত্তর।

১৬ ডিসেম্বর। টিলা থেকে নেমে সারিবদ্ধভাবে দাঁড়ালাম এমসি কলেজের অধ্যক্ষের বাড়ির পার্শ্ববর্তী রাস্তায়। প্রায় ১ হাজার ১০০ সৈনিক মার্চ করে যাচ্ছে সিলেট রেলস্টেশনের দিকে। রাস্তার দুই পাশে নীরবে দাঁড়িয়ে রয়েছে সিলেট শহরবাসী। তাদের হয়তো বিশ্বাস হচ্ছে না বাঙালিদের নিজস্ব বাহিনী মুক্তিবাহিনী বীরদর্পে তাদের চোখের সামনে দিয়ে মার্চ করে যাচ্ছে। এই দৃশ্য গতকালও ছিল অকল্পনীয়। সেনাদলের অগ্রভাগে হেঁটে চলেছি। মানসপটে ভেসে আসছে যশোরের বিদ্রোহ, বেনাপোল, কামালপুর, গৌরীপুরের যুদ্ধ। ৬০০ যুবককে ভর্তি করেছিলাম আমার পল্টনে, এদের ১০০ জনই চিরতরে হারিয়ে গেছে যুদ্ধক্ষেত্রে। বিদায় নিয়েছে বন্ধুরা-আনোয়ার, সালাহউদ্দিন, মাহবুব। কামান, মেশিনগানের মরণছোবল উপেক্ষা করে বেঁচে আছি। স্বপ্ন দেখছি না তো! স্বদেশের মাটিতে সেনাদলসহ স্বাধীনতার মিষ্টি রোদে অবগাহন করে আপনজনের মধ্যে ফিরে এসেছি। নিজেকে রুপালি পর্দার নায়কের মতো মনে হচ্ছিল। স্বাধীনতা যে এত আনন্দের উৎস, আগে কখনও অনুভব করিনি!

দুপুরে সার্কিট হাউসে যাত্রাবিরতি হলো। দুই দিন আগে পাকিস্তানি সেনারা এক্সপ্লোসিভ লাগিয়ে ঐতিহাসিক কিন ব্রিজ উড়িয়ে দিয়েছে। ফেরির সাহায্যে যানবাহন পারাপার হচ্ছে। সার্কিট হাউসের গদি আঁটা সোফায় বসে দীর্ঘদিন পর পরিষ্কার কাপে চা খাচ্ছি। বিকালের দিকে কর্নেল ওসমানী এলেন। জিজ্ঞাসা করলাম, ‘আজ পাকিস্তানি বাহিনী সারেন্ডার করবে, আপনি এখানে কেন?’

‘এখানে আসতে পেরেছি, এটাই সৌভাগ্য। কিছুক্ষণ আগেই আমার হেলিকপ্টারে পাকিস্তানি সেনারা গুলি ছুড়েছে, সঙ্গী কর্নেল রব আহত হয়েছেন,’ জানালেন ওসমানী। কিছুক্ষণ আমাদের সঙ্গে গল্প করে তার বাড়ির উদ্দেশে চলে গেলেন প্রধান সেনাপতি।

বিকাল সাড়ে ৪টায় ঢাকার রেসকোর্সে পাকিস্তানি কমান্ডার লে. জেনারেল আমির আবদুল্লাহ খান নিয়াজি ভারতীয় ইস্টার্ন কমান্ডের অধিনায়ক লে. জেনারেল জগজিৎ সিং অরোরার কাছে আনুষ্ঠানিকভাবে দলিলে স্বাক্ষর করে আত্মসমর্পণ করেন। স্বাধীন বাংলাদেশ কোটি জনতার আনন্দ-উল্লাসে উদ্ভাসিত হয়ে ওঠে।

১৭ ডিসেম্বর সিলেট শহর থেকে আমাদের পল্টন ট্রেনযোগে শায়েস্তাগঞ্জ পৌঁছায়। স্থানীয় খেলার মাঠে তাঁবু গেড়ে অবস্থান করে সৈনিকেরা। আমরা কয়েকজন পিডিবি রেস্টহাউসে আনন্দমুখর সময় কাটাই। ‘৭২-এর ৫ জানুয়ারি সেনা সদর থেকে প্রথম ইস্ট বেঙ্গলে মেসেজ আসে ঢাকা ক্যান্টনমেন্টে স্থায়ী আবাসে অবস্থান গ্রহণের জন্য। সিও আমাকে একটি প্লাটুন সঙ্গে নিয়ে ঢাকার উদ্দেশে অ্যাডভান্স পার্টি হিসেবে যাত্রা করার নির্দেশ দিলেন। একটি জিপ ও তিন টন ক্যাপাসিটির গাড়ি নিয়ে ঢাকার উদ্দেশে যাত্রা করলাম। সেনাদলের সঙ্গে রয়েছে ফ্লাইট লে. লিয়াকত ও সুবেদার মেজর আবদুল মজিদ। শায়েস্তাগঞ্জ থেকে ঢাকা পর্যন্ত সড়কপথে যাত্রা খুবই সমস্যাসংকুল ছিল। ব্রিজ-কালভার্ট ইত্যাদি অধিকাংশই ভাঙা, পথজুড়ে যুদ্ধের ধ্বংসলীলা ছড়িয়ে-ছিটিয়ে রয়েছে। ভারতীয় বাহিনীর বহু যানবাহন বিভিন্ন ফেরিতে অপেক্ষমাণ। মিত্রবাহিনী ফেরি ও সড়ক পারাপার নিয়ন্ত্রণ করছে। সেনা সদরের চিঠি দেখিয়ে আমরা পারাপারে অগ্রাধিকার পাচ্ছি কিন্তু সড়কের ভগ্নদশার কারণে ডেমরা পৌঁছাতেই দুই দিন লেগে গেল। ডেমরার একটি পরিত্যক্ত জুট মিলে রাত কাটালাম।

৮ জানুয়ারি। সকাল ১০টায় আমরা ঢাকা শহরে ঢুকে স্টেডিয়াম হয়ে রেসকোর্সের উদ্দেশে অগ্রসর হলাম। সবকিছুই স্বাভাবিক মনে হলো। নিত্যদিনের কর্মচাঞ্চল্য দেখে মনে হচ্ছে না যে তিন সপ্তাহ আগেও সাধারণ মানুষ আতঙ্কের মধ্যে দিন কাটিয়েছে। একপর্যায়ে সুবেদার মেজর মজিদ আমাকে জিজ্ঞাসা করে বসল, ‘স্যার, রাজধানীতে এলাম। আমাদের কেউ খায়ের মকদম জানাবে না?’

দীর্ঘদিন পাকিস্তানি বাহিনীতে কাটিয়ে অনেক উর্দু শব্দ ইচ্ছায়-অনিচ্ছায় তার ভোকাবুলারিতে অন্তর্ভুক্ত হয়ে গেছে। ‘খায়ের মকদম’ মানে স্বাগত জানানো। নয় মাস বনে-জঙ্গলে আমাদের সঙ্গেই কাটিয়েছে মজিদ। আমরাই ধারণা দিয়েছি মুক্তিবাহিনী বিজয়ী হলে দেশবাসী আমাদের মাথায় করে রাখবে। লাখ লাখ মানুষ রাস্তায় নেমে মুক্তিসেনাদের বুকে জড়িয়ে ধরবে। অভিনন্দন জানাবে। কিন্তু মাত্র তিন সপ্তাহ অতিক্রান্ত হতে না হতেই জনগণের উচ্ছ্বাস-আবেগ যেন হাওয়ায় মিলিয়ে গেছে। ১৬ ডিসেম্বরও সিলেট শহরে জনগণের মধ্যে মুক্তির আনন্দ পরিলক্ষিত হয়নি। তারা ছিল নীরব দর্শকের ভূমিকায়! মিত্রবাহিনীর অধিনায়করূপে সেনাদল নিয়ে প্রথম ঢাকায় প্রবেশ করেন মেজর জেনারেল গন্ধর্ব নাগরা। টেলিভিশনে দেখলাম ঢাকার নাগরিকেরা ফুলের মালা দিয়ে ভারতীয় সেনাদের বরণ করে নিচ্ছে। জড়িয়ে ধরে কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করছে। মজিদেরও ধারণা ছিল, ঢাকার নাগরিকেরা আমাদের দেখলেই দৌড়ে এসে খায়ের মকদম করবে। বললাম, ‘মজিদ সাহেব, তিন সপ্তাহ পার হয়েছে। বাঙালির আবেগ সেভেন আপের বোতল খোলার পর ‘ফস’ শব্দের মতোই ক্ষণস্থায়ী, বুদ্বুদ যেভাবে নিজের হাওয়ায় মিলিয়ে যায়, বাঙালিরও আবেগ-অনুভূতিও সে রকম।’ কিছুটা ক্ষুব্ধ, বিমর্ষ হলেন মজিদ। ওল্ড সোলজার।

রেসকোর্সে ডেরা ফেলেছে দ্বিতীয় ইস্ট বেঙ্গল। দেখা হলো সিও মেজর মইনুল হোসেন চৌধুরী এবং অ্যাডজুট্যান্ট সেকেন্ড লেফটেন্যান্ট সায়ীদের সঙ্গে। সুদর্শন সায়ীদের কাছে কিছুক্ষণ পরপরই তরুণীদের ফোন আসছিল, সে-ও কাউকে নিরাশ করছে না। আমাদের দুজনের সামনে সে মোটেও বিবত হয়নি। লিয়াকত বলে, ‘চালিয়ে যাও, ভায়া।’ মইনের সঙ্গে চা খেয়ে কিছুক্ষণ গল্প করে সেনা সদরের ঠিকানা নিয়ে বের হলাম রাস্তায়। আমাদের প্লাটুনের জন্যও তাঁবুর ব্যবস্থা করা হলো রেসকোর্সে।

প্রধান সেনাপতির দপ্তর স্থাপিত হয়েছে বেইলি রোডে (বর্তমানে ডিএমপি কমিশনারের অফিস) লাল রঙের পুরনো বিল্ডিংয়ে। চিফের দুজন স্টাফ অফিসারের সঙ্গে দেখা হলো, মুক্তিযোদ্ধা মেজর বাহার (সিগন্যাল কোর) এবং অমুক্তিযোদ্ধা লে. কর্নেল ফিরোজ সালাহউদ্দিন। সালাহউদ্দিন ওসমানীর স্নেহভাজন, প্রথম ইস্ট বেঙ্গলে পঞ্চাশের দশকের গোড়ার দিকে তার অধীনে লেফটেন্যান্ট হিসেবে চাকরিরত ছিলেন। পাকিস্তানি আর্মিতে ১৬ ডিসেম্বর পর্যন্ত স্বাচ্ছন্দ্যে চাকরি করেছেন। আবার এক সপ্তাহের মধ্যেই স্বাধীন বাংলাদেশের সেনাবাহিনীতেও পুনর্বাসিত হলেন। একেই বলে ভাগ্য। প্রথম দেখায় আমার টার্ন আউটের খুঁতও খুঁজে পেলেন। আমার কাঁধে ক্যাপ্টেন র‍্যাঙ্কের পিপগুলো পাকিস্তানি আর্মির, যশোর থেকেই ইউনিফর্মের শোল্ডারে লাগানো ছিল। ৯ মাসে ৯ দিনও পরা হয়নি। র‍্যাঙ্ক পরে অপারেশনে যাইনি কখনও। স্বাধীন বাংলাদেশের রাজধানীতে প্রথমবার এলাম, তাই ইউনিফর্ম পরেছি। তিনি আমাকে উপদেশ দিলেন, ‘ইয়ং ম্যান, তুমি পাকিস্তানের চাঁদ-তারাখচিত র‍্যাঙ্ক ব্যাজ পরে আছ। তাড়াতাড়ি এগুলো খুলে ফেলো।’ আমোদিত হলাম। এত অল্প সময়ের মধ্যেই পাকিস্তানের প্রতি বিরাগ এবং বাংলাদেশের প্রতি অনুরাগ জন্মেছে তার। দুই দিনের বৈরাগী ভাতেরে কয় অন্ন! দিন দুয়েক পর তৃতীয় বেঙ্গলের সিও মেজর শাফায়ত জামিল সেনা সদরে গেলে সালাউদ্দিনের সঙ্গে দেখা হয়। শাফায়াত তাকে দেখেই বিরক্ত হলেন, স্যালুটও করেননি। কর্নেল সাহেব প্রধান সেনাপতির কাছে এ নিয়ে নালিশ করলেন এবং চিফ ওসমানী শাফায়াতের কৈফিয়ত তলব করেন। শাফায়াত তেজস্বী, দৃঢ়চেতা অফিসার। জানিয়ে দিলেন, চাকরি চলে গেলেও তিনি কোনো রাজাকার প্রধানকে স্যালুট করবেন না। বিষয়টি অবশ্য সেখানেই শেষ হলো।

৮ জানুয়ারি রাতেই খবর এলো, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান পাকিস্তানের কারাগার থেকে মুক্তি পেয়ে লন্ডনে পৌঁছেছেন। সারা দেশে জনমনে আনন্দের বান ডাকে। দেশবাসী আল্লাহর কাছে শুকরিয়া আদায় করে।

১০ জানুয়ারি দুপুরের কিছু আগে ব্রিটিশ বিমানবাহিনীর একটি জেটবিমান বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে তেজগাঁও বিমানবন্দরে অবতরণ করে। হাজার হাজার হর্ষোৎফুল্ল জনতা তাকে আবেগঘন স্বাগত জানায়। তাদের অনেকের চোখেই ছিল আনন্দের অশ্রু। বিমানের রানওয়ে পর্যন্ত লোকে লোকারণ্য ছিল। বিমান অতি কষ্টে অবতরণ করতে সক্ষম হয়। মেজর মইনের নেতৃত্বে সামরিক বাহিনীর একটি চৌকস দল তাকে গার্ড অব অনার প্রদান করে। বিমানবন্দর থেকে রেসকোর্স পর্যন্ত দু-আড়াই মাইল রাস্তার দুই পাশে দণ্ডায়মান ছিল হাজার হাজার উৎফুল্ল জনতা। এ পথটুকু অতিক্রম করতে তাকে বহনকারী ট্রাকটির প্রায় ৩ ঘণ্টা সময় লাগে। দুই পাশের বাড়িঘরের ছাদেও ভিড় করেছে অসংখ্য মানুষ তাকে একনজর দেখার জন্য। আমার ধারণা, এটা ছিল তার জীবনের সবচেয়ে আনন্দমুখর, গৌরবদীপ্ত মুহূর্ত। একজন রাজনৈতিক নেতার পরম আকাঙ্ক্ষিত পুরস্কার জনগণের নিখাদ ভালোবাসা, যা তিনি সেদিন পেয়েছিলেন। তার স্বদেশ প্রত্যাবর্তনের মাধ্যমে দেশের স্বাধীনতা যেন পূর্ণতা পেল। রেসকোর্স ময়দানে তিনি একটি আবেগঘন ভাষণ দিলেন, কিন্তু ‘মুক্তিবাহিনী শব্দটি সেখানে উচ্চারিত হয়নি।


হাফিজ উদ্দিন আহমদ, বীরবিক্রম

শেয়ার করুন-

মন্তব্য করুন

Protidiner Bangladesh

সম্পাদক : মারুফ কামাল খান

প্রকাশক : কাউসার আহমেদ অপু

রংধনু কর্পোরেট, ক- ২৭১ (১০ম তলা) ব্লক-সি, প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড) ঢাকা -১২২৯

যোগাযোগ

প্রধান কার্যালয়: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৬৯৬ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (প্রিন্ট): +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮১০, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০ | ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (অনলাইন): +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০, +৮৮০১৭৯৯৪৪৯৫৫৯ । ই-মেইল: [email protected]

সার্কুলেশন: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮০৭, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৩৩২ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন মূল্য তালিকা