সাক্ষাৎকার : মো. ওমর ফারুক খাঁন
আহমেদ ফেরদাউস খান
প্রকাশ : ২৭ নভেম্বর ২০২৫ ১৪:৩৪ পিএম
প্রচলিত ব্যাংকিং সেবার পাশাপাশি মোবাইল ব্যাংকিংয়েও সুনাম অর্জন করেছে ইসলামী ব্যাংক। কীভাবে ব্যাংকটি এ খাতে সফল হলো এবং কী ধরনের চ্যালেঞ্জ প্রতিনিয়ত মোকাবিলা করতে হচ্ছে তা নিয়ে প্রতিদিনের বাংলাদেশের সঙ্গে কথা বলেছেন ইসলামী ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. ওমর ফারুক খাঁন। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন আহমেদ ফেরদাউস খান
প্রশ্ন : মোবাইল ব্যাংকিং কীভাবে আর্থিক অন্তর্ভুক্তি বাড়িয়েছে?
উত্তর : মোবাইল ব্যাংকিং আর্থিক অন্তর্ভুক্তি বাড়াতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে, এ কথা এখন সর্বজনস্বীকৃত। আগে যেখানে ব্যাংকিং সেবা কেবল শহরকেন্দ্রিক ছিল, সেখানে এখন একটি মোবাইল ফোনই ব্যাংকের বিকল্প হয়ে দাঁড়িয়েছে। গ্রামের মানুষ, দিনমজুর, কৃষক কিংবা গার্মেন্টসকর্মী যাদের জন্য ব্যাংকে যাওয়া সময়সাপেক্ষ ও জটিল ছিল তারা এখন ঘরে বসেই লেনদেন করতে পারছেন। এতে যেমন সময় ও খরচ দুটোই কমেছে, তেমনি আর্থিক সেবার পরিধিও বহুগুণে বেড়েছে। উদাহরণস্বরূপ, আমাদের ১৩ লাখ এমক্যাশ ব্যবহারকারী ব্যাংক শাখার বাইরে আর্থিক সেবা গ্রহণ করছেন। ওয়েব-বেজড রেমিট্যান্স পিন ব্যবহার করে আমরা এমক্যাশে রেমিট্যান্স সংগ্রহের ব্যবস্থা করেছি। ফলে প্রবাসীরা এখন সরাসরি পরিবারের মোবাইল ওয়ালেটে টাকা পাঠাতে পারছেন।
প্রশ্ন : গ্রামাঞ্চলের অর্থনীতিতে মোবাইল ব্যাংকিংয়ের প্রভাবকে কীভাবে দেখছেন?
উত্তর : গ্রামাঞ্চলে মোবাইল ব্যাংকিংয়ের প্রভাবকে আমি অত্যন্ত ইতিবাচক হিসেবে দেখি। এটি শুধু টাকা পাঠানো বা তোলার মাধ্যম নয়, বরং গ্রামীণ অর্থনীতির গতি বাড়ানোর শক্তিশালী হাতিয়ার হয়ে উঠেছে। একসময় ব্যাংক গ্রামের মানুষের নাগালের বাইরে ছিল। এখন তারা মোবাইল ফোন দিয়েই সহজে লেনদেন করতে পারছেন। আমাদের সেলফিন অ্যাপে মোবাইল ব্যাংকিং সার্ভিস সংযুক্ত থাকায় ব্যবহারকারীরা বহুমুখী আর্থিক সেবা পাচ্ছেন। বর্তমানে ৫৭ লাখ ব্যবহারকারী দৈনিক ৪০০ কোটি টাকা লেনদেন করছেন। আমাদের ধারণা, কৃষক ও ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীরা মোবাইল ব্যাংকিং থেকে সবচেয়ে বেশি উপকৃত হচ্ছেন। ফসল বিক্রির টাকা তারা সরাসরি মোবাইল ওয়ালেটে পাচ্ছেন। ফলে নগদ অর্থ বহনের ঝুঁকি কমেছে। আবার নারী উদ্যোক্তারাও নিজের মোবাইল অ্যাকাউন্টের মাধ্যমে সঞ্চয় ও ব্যবসার লেনদেন পরিচালনা করতে পারছেন। এতে তাদের অর্থনৈতিক স্বাধীনতা বেড়েছে। সবচেয়ে বড় বিষয় হলো, গ্রামের মানুষ এখন ধীরে ধীরে ডিজিটাল লেনদেনের অভ্যাস গড়ে তুলছে। এতে গ্রামীণ অর্থনীতি শুধু সক্রিয়ই হয়নি, বরং জাতীয় অর্থনীতির সঙ্গে আরও ঘনিষ্ঠভাবে যুক্ত হচ্ছে। তাই মোবাইল ব্যাংকিংকে আমি গ্রামীণ উন্নয়ন ও আর্থিক অন্তর্ভুক্তির অন্যতম প্রধান চালিকাশক্তি হিসেবে দেখি।
প্রশ্ন : ডিজিটাল ব্যাংক চালু হলে প্রচলিত ব্যাংকিং খাতের ওপর এর প্রভাব কী হতে পারে?
উত্তর : ডিজিটাল ব্যাংক হলো এমন এক ধরনের ব্যাংক, যার সব সেবাই সম্পন্ন হয় সম্পূর্ণভাবে অনলাইনে বা মোবাইল অ্যাপের মাধ্যমে। এ ধরনের ব্যাংকের কোনো শাখা কিংবা নিজস্ব এটিএম-সিআরএম থাকে না। গ্রাহককে ব্যাংকে গিয়ে লেনদেন করতে হয় না। ডিজিটাল ব্যাংক মূলত অ্যাপভিত্তিক, ব্যয় সাশ্রয়ী এবং দ্রুত সেবার। এর ফলে প্রচলিত ব্যাংকগুলোও তাদের সেবা, প্রযুক্তি ব্যবহার এবং গ্রাহকসেবার মান উন্নত করতে বাধ্য হবে। শাখাভিত্তিক ব্যাংকিংয়ের ওপর নির্ভরতা কমবে, কারণ গ্রাহকরা ঘরে বসেই অ্যাকাউন্ট খোলা, ঋণ আবেদন, বিল পরিশোধ বা সঞ্চয় সবকিছু করতে পারবে। এর ফলে প্রচলিত ব্যাংকের খরচ কাঠামো ও কর্মসংস্থানের ধরনেও পরিবর্তন আসবে। নতুন গ্রাহক শ্রেণি তৈরি হবে, যারা আগে ব্যাংকিং সেবার বাইরে ছিল, বিশেষ করে তরুণ ও গ্রামীণ জনগোষ্ঠী। এতে সামগ্রিক আর্থিক অন্তর্ভুক্তি বাড়বে। অবশ্য এতে ঝুঁকিও আছে। কারণ এই প্রক্রিয়ায় সাইবার নিরাপত্তা, তথ্য সুরক্ষা এবং ডিজিটাল জালিয়াতি প্রতিরোধে যথেষ্ট প্রস্তুতি না থাকলে সমস্যা দেখা দিতে পারে।
প্রশ্ন : ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের জন্য এই সেবার সুবিধা কতটা বাস্তব?
উত্তর : ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের জন্য মোবাইল ও ডিজিটাল ব্যাংকিংয়ের সুবিধাগুলো একেবারেই বাস্তব ও কার্যকর। আগে যেসব ব্যবসায়ী ব্যাংকের আনুষ্ঠানিক সেবার বাইরে ছিলেন, এখন তারা সহজেই মোবাইল ফোনের মাধ্যমে লেনদেন, সঞ্চয় এবং এমনকি ১৫-২০ হাজার টাকা পর্যন্ত ক্ষুদ্র ঋণের সুবিধা পাচ্ছেন। দোকানদার বা হকাররা দোকানে বসেই গ্রাহকের কাছ থেকে ডিজিটাল পেমেন্ট নিতে পারেন। এতে যেমন সময় বাঁচছে, তেমনি নগদ অর্থ বহনের ঝুঁকিও কমেছে। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, এখন তাদের লেনদেনের একটি নিয়মিত রেকর্ড তৈরি হচ্ছে, যা ভবিষ্যতে ব্যাংক বা এনজিও থেকে ঋণ পাওয়ার ক্ষেত্রে সহায়ক হিসেবে কাজ করছে। পাশাপাশি মোবাইল ব্যাংকিংয়ের মাধ্যমে তারা বিভিন্ন বিল, এমপ্লয়িদের বেতন এবং সরবরাহকারীদের অর্থ পরিশোধ করতে পারছেন, যা ব্যবসাকে আরও সংগঠিত ও স্বচ্ছ করে তুলেছে।
প্রশ্ন : নারীদের মধ্যে মোবাইল ব্যাংকিংয়ে অংশগ্রহণ কতটা বেড়েছে?
উত্তর : নারীদের মধ্যে মোবাইল ব্যাংকিং ব্যবহারকারীর সংখ্যা দৃশ্যমানভাবে বেড়েছে। নারীরা এখন ঘরে বসেই অনলাইনে ব্যবসা পরিচালনা করছেন। যার বেশিরভাগ লেনদেনই হচ্ছে মোবাইল ব্যাংকিংয়ের মাধ্যমে। এটি তাদের আত্মনির্ভরতা ও অর্থ পরিচালনা শক্তিশালী করেছে। এতে শুধু তাদের অর্থনৈতিক ক্ষমতা বাড়েনি, বরং পরিবার ও কমিউনিটিতে তাদের সক্রিয় ভূমিকা ও সিদ্ধান্তগ্রহণের সুযোগও বেড়েছে। বর্তমানে উল্লেখযোগ্য সংখ্যক নারী মোবাইল ব্যাংকিং ব্যবহার করছেন। যার মধ্যে ৩ লাখের বেশি নারী আমাদের এমক্যাশ ব্যবহার করছেন। সত্যি বলতে, মোবাইল ব্যাংকিং নারীদের জন্য আর্থিক অন্তর্ভুক্তির পথ অনেক সহজ ও গ্রহণযোগ্য করে তুলেছে।
প্রশ্ন : গ্রাহকের আস্থা তৈরিতে কী ধরনের উদ্যোগ জরুরি বলে মনে করেন?
উত্তর : বিশ্বের অষ্টম জনবহুল দেশ হিসেবে এ খাতের জন্য এটি একটি বিশাল সুযোগ। এই জনগোষ্ঠীর বড় অংশকে ডিজিটাল লেনদেনে সংযুক্ত করে গ্রাহক আস্থা তৈরি করতে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো সেবার স্বচ্ছতা ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করা। গ্রাহকরা চাইবেন যে তাদের অর্থ, লেনদেনের তথ্য এবং ব্যক্তিগত তথ্য সম্পূর্ণভাবে সুরক্ষিত থাকুক। তাই ব্যাংক বা ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মগুলোকে নিয়মিত নিরাপত্তা আপডেট, সাইবার সিকিউরিটি ব্যবস্থা এবং সহজ ও স্বচ্ছ লেনদেনের প্রক্রিয়া বজায় রাখতে হবে। একই সঙ্গে গ্রাহক শিক্ষার ওপরও গুরুত্ব দেওয়া জরুরি। তাদের কীভাবে নিরাপদে সেবা ব্যবহার করতে হবে, কোন ঝুঁকি এড়িয়ে চলা উচিত, তা বোঝানো দরকার। কারণ দ্রুত ও কার্যকর গ্রাহক সহায়তা, অভিযোগ বা সমস্যার সমাধান এবং নিয়মিত যোগাযোগ ও সচেতনতা বৃদ্ধির উদ্যোগ গ্রাহকের আস্থা আরও দৃঢ় করতে সাহায্য করে।