মো. নিজামুল হক
প্রকাশ : ১৮ এপ্রিল ২০২৬ ১০:২২ এএম
আপডেট : ১৮ এপ্রিল ২০২৬ ১০:২৯ এএম
ভয়েজার-১ মহাকাশযানটি ১৯৭৭ সালে পৃথিবী থেকে উৎক্ষেপণ করা হয়েছিল। ছবি: নাসা
মহাকাশ অনুসন্ধানের ইতিহাসে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় যোগ হতে যাচ্ছে। পৃথিবী থেকে ক্রমশ দূরে সরে যেতে থাকা ভয়েজার-১ মহাকাশযান ২০২৬ সালের নভেম্বরে এমন এক দূরত্বে পৌঁছবে, যেখান থেকে পৃথিবীর পাঠানো সংকেত তার কাছে পৌঁছতে পুরো এক দিন সময় লাগবে। এই মাইলফলক শুধু প্রযুক্তিগত সাফল্যই নয়, বরং মানবজাতির দীর্ঘ অভিযাত্রার এক প্রতীক হিসেবেও বিবেচিত হচ্ছে।
১৯৭৭ সালে উৎক্ষেপণের পর থেকে ভয়েজার-১ এখন পর্যন্ত মানুষের তৈরি সবচেয়ে দূরবর্তী মহাকাশযান। বর্তমানে এটি প্রায় ১৫ দশমিক ৮ বিলিয়ন মাইল দূরে আন্তঃনাক্ষত্রিক মহাশূন্যে অবস্থান করছে এবং অজানা মহাজাগতিক পরিবেশ সম্পর্কে তথ্য সংগ্রহ করছে।
‘আলোকদিন’ বলতে বোঝায় এমন একটি দূরত্ব, যেখানে আলোর বেগে কোনো সংকেত যেতে পুরো চব্বিশ ঘণ্টা সময় নেয়। অর্থাৎ ভয়েজার-১ ওই অবস্থানে পৌঁছলে পৃথিবী থেকে পাঠানো কোনো বার্তার উত্তর পেতে অন্তত দুই দিন অপেক্ষা করতে হবেÑ এক দিন বার্তা পৌঁছতে এবং আরেক দিন তার জবাব ফিরে আসতে।
ভয়েজার-১ এবং এর যমজ ভয়েজার-২ বর্তমানে সূর্যের প্রভাববলয়, অর্থাৎ হেলিওস্ফিয়ারের বাইরে কাজ করছে। এই অঞ্চলটি সৌরজগতের সীমানা ছাড়িয়ে আন্তঃনাক্ষত্রিক মহাশূন্যের সূচনা নির্দেশ করে। বহু বছর ধরে মহাকাশে থাকার ফলে তাদের কিছু যন্ত্র বন্ধ করে দিতে হলেও অবশিষ্ট যন্ত্রপাতি দিয়ে তারা এখনও গুরুত্বপূর্ণ বৈজ্ঞানিক তথ্য সংগ্রহ করে চলেছে।
ভয়েজার-১ মূলত বৃহস্পতি ও শনি গ্রহ অনুসন্ধানের জন্য পাঠানো হয়েছিল। ১৯৮০ সালে ভয়েজার-১ শনির পাশ দিয়ে যাওয়ার পর থেকে প্রতি ঘণ্টায় প্রায় ৩৮ হাজার মাইল গতিতে পৃথিবী থেকে দূরে সরে যাচ্ছে। দূরত্ব যত বাড়ছে, সংকেত তত দুর্বল হয়ে পড়ছে। বর্তমানে এটি প্রতি সেকেন্ডে মাত্র ১৬০ বিট ডাটা পাঠাতে পারে, যা অত্যন্ত ধীরগতির।
তবে এই সীমাবদ্ধতার মধ্যেও মহাকাশযানগুলোকে স্বয়ংক্রিয়ভাবে কাজ করার উপযোগী করে তৈরি করা হয়েছে। কোনো ত্রুটি দেখা দিলে তারা নিজেরাই নিরাপদ অবস্থায় চলে যেতে পারে, যতক্ষণ না পৃথিবী থেকে নতুন নির্দেশ পৌঁছে।
কসমিক রে, চৌম্বক ক্ষেত্র এবং প্লাজমা তরঙ্গ পরিমাপক যন্ত্রের মাধ্যমে ভয়েজার মহাশূন্যের অজানা পরিবেশ সম্পর্কে তথ্য সংগ্রহ করছে। বিজ্ঞানীরা বিশেষভাবে আগ্রহী সূর্যের প্রভাববলয় ও আন্তঃনাক্ষত্রিক মহাশূন্যের সীমান্তে কী ধরনের পরিবর্তন ঘটে তা জানার জন্য।
ভবিষ্যৎ নিয়ে বিজ্ঞানীরা সতর্ক আশাবাদী। ধারণা করা হচ্ছে, অন্তত একটি ভয়েজার মহাকাশযান আগামী দুই থেকে পাঁচ বছর পর্যন্ত সচল থাকতে পারে। তবে প্রতি বছরই এই প্রচেষ্টা আরও কঠিন হয়ে উঠছে।
ভয়েজার মিশন শুধু প্রযুক্তির নয়, মানুষের অধ্যবসায় ও সম্মিলিত প্রচেষ্টারও এক উজ্জ্বল উদাহরণ। বিভিন্ন প্রজন্মের বিজ্ঞানীরা একসঙ্গে কাজ করে এই প্রকল্পকে জীবিত রেখেছেন। তাদের কাছে ভয়েজার কেবল একটি যন্ত্র নয়, এটি মহাবিশ্বে মানুষের অস্তিত্বের এক নীরব বার্তাবাহক।