× ই-পেপার প্রচ্ছদ সর্বশেষ বাংলাদেশ রাজনীতি দেশজুড়ে বিশ্বজুড়ে বাণিজ্য খেলা বিনোদন মতামত চাকরি শিক্ষা আজকের কার্টুন ফিচার সকল বিভাগ ছবি ভিডিও লেখক আর্কাইভ কনভার্টার

পৃথিবীর কেন্দ্রের পথে কতটা পৌঁছেছি আমরা

প্রবা প্রতিবেদন

প্রকাশ : ২৮ নভেম্বর ২০২৫ ২২:২১ পিএম

আপডেট : ২৯ নভেম্বর ২০২৫ ০০:৫০ এএম

পৃথিবীর কেন্দ্রের পথে কতটা পৌঁছেছি আমরা

পৃথিবীর ভেতর কী আছে—এই প্রশ্ন আজও এক অপার রহস্য। এটি কেবল বৈজ্ঞানিক কৌতূহল নয়, এটি আমাদের গ্রহের সৃষ্টি, এর গতিশীলতা এবং জীবনের উৎপত্তির সঙ্গে জড়িয়ে থাকা গভীরতম প্রশ্নের উত্তর খোঁজার এক নিরন্তর প্রচেষ্টা। আমরা জানি, পৃথিবীর ব্যাস প্রায় ১২,৭৪২ কিমি এবং কেন্দ্র পর্যন্ত পথ প্রায় ৬,৩৭১ কিমি। কিন্তু মানুষ কতদূর নামতে পেরেছে? উত্তরটা খুবই নগণ্য। মাত্র প্রায় ১২.২৬ কিমি। এই ক্ষুদ্র অনুপ্রবেশই আমাদের সামগ্রিক ভূতাত্ত্বিক ধারণাকে বারবার পরীক্ষা করেছে।

কোলা সুপারডিপ বোরহোল (এসজি-৩)

১৯৭০ সালে সোভিয়েত ইউনিয়ন (বর্তমানে রাশিয়া) যে দুঃসাহসী বৈজ্ঞানিক অভিযান শুরু করেছিল, তার নাম ছিল কোলা সুপারডিপ বোরহোল (এসজি-৩)। তাদের লক্ষ্য ছিল সরাসরি পৃথিবীর ভূত্বকের গভীরতম স্তরগুলো পরীক্ষা করা। দীর্ঘ উনিশ বছর ধরে প্রকৌশলী, ভূবিজ্ঞানী ও শ্রমিকেরা অসামান্য ধৈর্য ও অধ্যবসায়ের সঙ্গে খনন কাজ চালিয়ে যান। ১৯৮৯ সালে তারা শেষ পর্যন্ত ১২,২৬২ মিটার (১২.২৬ কিলোমিটার) গভীরে পৌঁছাতে সক্ষম হন। এটি আজও মানবসৃষ্ট সর্বোচ্চ গভীরতা হিসেবে বিশ্ব রেকর্ড ধরে রেখেছে।

পৃথিবীর সবচেয়ে গভীরতম মানবসৃষ্ট গর্ত বোরহোলটি ১২,২৬২ মিটার (৪০,২৩০ ফুট) গভীর।

এই গভীর খননের পথে বিজ্ঞানীদের সামনে সবচেয়ে বড় বাধা হিসেবে আসে অপ্রত্যাশিতভাবে উচ্চ তাপমাত্রা। কোলা-তে তাপমাত্রা পূর্বানুমানের প্রায় দ্বিগুণে পৌঁছেছিল—প্রায় ১৮০ ডিগ্রি সেলসিয়াস। এমন প্রচণ্ড তাপে ড্রিল-বিট, সেন্সর এবং কেবল অকার্যকর হয়ে যায়। এছাড়াও, শিলাগুলোর আচরণ ছিল অপ্রত্যাশিতভাবে জটিল। নির্দিষ্ট গভীরতার নিচে নেমে যাওয়ার পর শিলাগুলো ফাটলযুক্ত, ছিদ্রযুক্ত এবং উচ্চ তাপমাত্রার কারণে অস্থিতিশীল হয়ে ওঠে। কিছু বর্ণনায় শিলাকে 'প্লাস্টিকের মতো' আচরণের কথা বলা হলেও, এটি এখনো গবেষণায় চূড়ান্তভাবে প্রমাণিত হয়নি।

এসজি-৩ থেকে সংগৃহীত কোর নমুনা ভূত্বকের গঠন সম্পর্কে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য দিয়েছে। পূর্বে ধারণা করা হতো গ্রানাইট স্তরের নিচে ব্যাসাল্ট স্তর থাকবে, কিন্তু কোলা-র তথ্য প্রমাণ করে যে ভূত্বক আসলে আরও বেশি জটিল ও বিষমধর্মী (প্রকৃতি এক রকম নয়)। খনন গর্তটি থেকে জল ও গ্যাস পাওয়া গেছে, যা ভূত্বকের সম্পূর্ণ শুষ্ক না থাকার প্রমাণ দেয়। তবে, কিছু লোকমুখে প্রচলিত গল্পের বিপরীতে, অণুজীবাশ্ম বা জীবাশ্মীয় জীবনের নিদর্শন পাওয়ার কোনো শক্তিশালী বৈজ্ঞানিক প্রমাণ পাওয়া যায়নি।

টারিম বেসিন প্রকল্প 

কোলা-র রেকর্ড বহু বছর অটুট থাকলেও, গভীর ভূত্বক গবেষণায় নতুন প্রতিযোগিতা শুরু করেছে চীন। ২০২৩ সালে তারা শিনজিয়াং-এর 'টারিম বেসিন গভীর খনন প্রকল্প' শুরু করে। এই প্রকল্পের প্রাথমিক লক্ষ্য প্রায় ১১,০০০ মিটার গভীরতা স্পর্শ করা। ২০২৪ সালে সরকারি প্রতিবেদন অনুযায়ী এই রিগ ১০,০০০ মিটার অতিক্রম করে, এবং পরবর্তীতে ২০২৫-এ পৌঁছায় ১০,৯১০ মিটার গভীরে। এই প্রকল্প শুধু বৈজ্ঞানিক অনুসন্ধানের জন্যই নয়; এটি শক্তি এবং গুরুত্বপূর্ণ খনিজ অনুসন্ধানের দিক থেকেও চীনের জন্য কৌশলগতভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

কোলা ও টারিম- উভয় মহাদেশীয় প্রকল্পই প্রমাণ করে যে তাপ ও চাপের ঊর্ধ্বগতিবৃদ্ধি, শিলার জটিল আচরণ এবং প্রযুক্তিগত সীমাবদ্ধতা—গভীর ভূ-অভ্যন্তরে মানুষের অভিযাত্রাকে এখনও কঠিন চ্যালেঞ্জের মুখে ফেলেছে।

সমুদ্র তলদেশ থেকে ম্যান্টলের নমুনা সংগ্রহ

স্থলভাগে চ্যালেঞ্জ যখন চরমে, তখন সমুদ্র গবেষণার জন্য আন্তর্জাতিক সহযোগিতা ভিত্তিক কর্মসূচি ইন্টারন্যাশনাল ওশান ডিসকভারি প্রোগ্রাম (আইওডিপি) ভূ-গভীর গবেষণায় নতুন অগ্রগতি এনেছে। মহাদেশীয় ভূত্বকের চেয়ে মহাসাগরীয় ভূত্বক অনেক পাতলা হওয়ায়, আইওডিপির পক্ষে তুলনামূলকভাবে দ্রুত পৃথিবীর নিচের স্তরগুলোতে পৌঁছানো সম্ভব হয়েছে। আইওডিপির গবেষকরা ২০২৩–২৪ সালে একটি অভূতপূর্ব সাফল্য অর্জন করেন। তারা সমুদ্র তল থেকে ১,২৬৮ মিটার লম্বা ম্যান্টল শিলা উদ্ধার করেন। এটি পৃথিবীর উপরের ম্যান্টল থেকে সরাসরি নেওয়া সবচেয়ে দীর্ঘ অবিচ্ছিন্ন কোর নমুনা।

বিজ্ঞানীরা ম্যান্টেলের শিলাগুলো পরীক্ষা করে দেখছেন—এর মধ্যে কী ধরনের খনিজ আছে এবং এর রাসায়নিক গঠন কেমন। লেসলি অ্যান্ডারসন/হ্যান্ডআউট ভায়া রয়টার্স

এই ম্যান্টল শিলার নমুনাগুলো পরীক্ষা করে বিজ্ঞানীরা পৃথিবীর অভ্যন্তরে ম্যাগমা প্রক্রিয়াকরণ এবং ভূত্বক ও আগ্নেয়গিরির গঠন সম্পর্কে সরাসরি তথ্য পাচ্ছেন, যা ভূত্বকের জটিল ও বৈচিত্র্যময় প্রকৃতির প্রমাণ দেয়। এই সমুদ্র-ভিত্তিক খনন প্রাচীন জীবনের সম্ভাব্য উৎস বোঝার সম্ভাবনাও উন্মোচন করেছে।

গবেষক জোহান লিসেনবার্গ ও ম্যান্টলের রহস্য

আইওডিপির এই যুগান্তকারী অভিযানের সঙ্গে যুক্ত একজন অন্যতম প্রধান গবেষক হলেন অধ্যাপক জোহান লিসেনবার্গ। তিনি কার্ডিফ ইউনিভার্সিটির ভূতত্ত্ব ও ভূ-রসায়নের বিশেষজ্ঞ। তার গবেষণা পৃথিবীর অভ্যন্তরে ম্যাগমা প্রবাহ এবং মহাসাগরীয় ম্যাগমা সিস্টেমের গঠনের দিকে নিবদ্ধ।

এই গুরুত্বপূর্ণ কোর (গভীরতম স্তর) নমুনা পুনরুদ্ধারের তাৎপর্য ব্যাখ্যা করে অধ্যাপক লিসেনবার্গ বলেন, 'এই কোর আমাদের ম্যান্টলের গঠন, রাসায়নিক বৈশিষ্ট্য এবং বিবর্তন বোঝার এক নতুন জানালা খুলেছে।'

মাইক্রোস্কোপে দেখা পৃথিবীর ম্যান্টল থেকে সংগ্রহ করা শিলার একটি নমুনা। জোহান লিসেনবার্গ

এই গবেষণা শুধু পৃথিবীর ভূত্বকের প্লেট টেকটোনিকস বোঝা এবং উন্নত সিসমিক মডেল তৈরির জন্য সহায়ক নয়, বরং এর রাসায়নিক বৈশিষ্ট্য বিশ্লেষণ করে বিজ্ঞানীরা জানতে চান কীভাবে ম্যান্টল শিলা সামুদ্রিক জলের সঙ্গে বিক্রিয়া করে হাইড্রোজেন ও অন্যান্য অণু তৈরি করতে পারে, যা পৃথিবীতে জীবনের জন্ম দিয়ে থাকতে পারে।

চরম পরিবেশে জীবনের সন্ধান: মারিয়ানা ট্রেঞ্চ

গভীর ভূত্বক নিয়ে গবেষণার পাশাপাশি, পৃথিবীর গভীরতম স্থানে প্রাণের অস্তিত্বের সন্ধানও বিজ্ঞানীদের বিস্মিত করেছে। চীনের নেতৃত্বাধীন একটি মিশন ২০২৫ সালে মারিয়ানা ট্রেঞ্চের হ্যাডাল অঞ্চলে জরিপ চালিয়ে প্রমাণ করেছে যে, প্রায় ১০ কিলোমিটার গভীরেও জীবজগৎ সক্রিয় রয়েছে। এই সম্পূর্ণ অন্ধকার এবং চরম চাপের মধ্যেও সেখানে হাজারো টিউবওয়ার্ম, মোলাস্কসহ বিভিন্ন প্রজাতির জীববৈচিত্র্য পাওয়া গেছে। এই গভীর সমুদ্রের প্রাণীরা সালোকসংশ্লেষণের বদলে মিথেন এবং হাইড্রোজেন সালফাইড জাতীয় রাসায়নিক ব্যবহার করে বেঁচে থাকে, যা পৃথিবীতে প্রাণের সহনশীলতার এক চরম প্রমাণ।

২০১২ সালে পরিচালক জেমস ক্যামেরন চ্যালেঞ্জার ডিপ নামের সাবমার্সিবল ব্যবহার করে মারিয়ানা ট্রেঞ্চের সবচেয়ে গভীর জায়গায় পৌঁছেছিলেন।

কোলা থেকে আইওডিপি—মানুষের গভীর ভূত্বক গবেষণা প্রমাণ করে যে পৃথিবীর কেন্দ্রের স্তর ম্যান্টল বা কোরে (গভীরতম ভূ-স্তর) পৌঁছানো এখনও কল্পনার বাইরে। তবে এই প্রকল্পগুলো আমাদের অজানার দরজা খুলে দিয়েছে, যা কেবল ভূ-বিজ্ঞান নয়, বরং জীবন ও পরিবেশ বিজ্ঞানের ক্ষেত্রেও নতুন জ্ঞান অর্জনের ভিত্তি তৈরি করছে।

তথ্যসূত্র: নেচার, সায়েন্স ডেইলি ও সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠান 

শেয়ার করুন-

মন্তব্য করুন

Protidiner Bangladesh

সম্পাদক : মারুফ কামাল খান

প্রকাশক : কাউসার আহমেদ অপু

রংধনু কর্পোরেট, ক- ২৭১ (১০ম তলা) ব্লক-সি, প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড) ঢাকা -১২২৯

যোগাযোগ

প্রধান কার্যালয়: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৬৯৬ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (প্রিন্ট): +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮১০, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০ | ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (অনলাইন): +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০, +৮৮০১৭৯৯৪৪৯৫৫৯ । ই-মেইল: [email protected]

সার্কুলেশন: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮০৭, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৩৩২ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন মূল্য তালিকা