মুফতি মাহফুজ আবেদ
প্রকাশ : ১৩ মার্চ ২০২৬ ০৯:৪৬ এএম
গ্রাফিক্স: প্রতিদিনের বাংলাদেশ
মুমিন জীবনে মিথ্যা, পরনিন্দা, ধোঁকাবাজি, প্রতারণা, হিংসা-বিদ্বেষ, অশ্লীল কথা ও কাজের কোনো লেশমাত্র থাকতে পারে না। পবিত্র রমজান মাসে সিয়াম সাধনার মাধ্যমে আল্লাহভীতি অর্জন করে এসব খারাপ অভ্যাস থেকে নিজেকে মুক্ত রাখার সর্বোত্তম সময়। রমজান মাসকে বলা হয় সংযমের, আত্মনিয়ন্ত্রণের ও ধৈর্যের মাস। এ মাসে যারা ধৈর্যধারণ করে নিজেকে গঠন করতে পারবেন তাদের বিনিময় হিসেবে আল্লাহ জান্নাত দান করবেন। হজরত রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘যে ব্যক্তি ঈমানের সঙ্গে সওয়াবের আশায় রমজান মাসে রোজা রাখবে, তার আগের সব গুনাহ ক্ষমা করে দেওয়া হবে।’Ñ সহিহ বোখারি : ১৯১০।
বস্তুত রমজানের সিয়াম সাধনা শুধু আখেরাতের জীবনকে সমৃদ্ধ করে না, বরং দুনিয়ায় সামাজিক ব্যবস্থাপনার শিক্ষা দেয়। সামাজিক কাঠামো, সংস্কৃতি, অনাচার, শ্রেণি-বৈষম্যকে মানুষের উপলব্ধিতে এনে তা সমাধানে মানবজাতিকে পথনির্দেশ করে, বিবেককে জাগ্রত করে। রমজান মাসে সুবহে সাদিক থেকে সূর্যাস্ত পর্যন্ত একই নিয়মে সব রোজাদারকে পানাহার ও যৌনকর্ম থেকে বিরত থাকতে হয়। এতে করে সমাজের দরিদ্র শ্রেণির মানুষ অনাহারে থেকে যে কষ্ট পায়, অনাহারীর সে ক্ষুধার কষ্ট রোজার মাধ্যমে উপলব্ধি করতে পারে সচ্ছল মানুষ। এতে করে ক্ষুধার্তদের প্রতি অনুকম্পা ও সহমর্মিতার অনুভূতি জাগ্রত করে দেওয়া হয় তাদের অন্তরে। যাতে করে সমব্যথিত হয়ে তাদের প্রতি অনেকের সাহায্যের হাত প্রসারিত হয়। ধনীদের মধ্যে সমাজের দারিদ্র্য বিমোচনে ভূমিকা পালন করার অনুভূতি জাগ্রত হয়। জাকাত, ফিতরা ও দানের মাধ্যমে সম্পদের নৈতিক পুনর্বণ্টনের প্রেরণা দেয় পবিত্র মাহে রমজান। ইসলামী অর্থনীতির ভাষায়, এটি বৈষম্য কমানোর একটি কার্যকর নৈতিক কাঠামো। সামাজিক নিরাপত্তা ও কল্যাণমূলক অর্থনীতির যে নীতিগুলো আমরা তাত্ত্বিকভাবে আলোচনা করে থাকি, রমজান সেগুলোকে বাস্তব জীবনে অনুশীলনের সুযোগ করে দেয়।
মাহে রমজানের সিয়াম সাধনা একজন ব্যক্তির ওপর অনেকগুলো আচরণগত নিয়ন্ত্রণ আরোপ করে। আর যদি সিয়াম সাধনার পরও কারও মনে ন্যূনতম অনুভূতির উদ্রেক না হয়, তাহলে রোজা রাখা কেবল দুনিয়ার আচার হিসেবে পালন হবে, আত্মিক উন্নতি সাধনে কোনো কাজে আসবে না। ক্ষমাশীলতা ও সহানুভূতি রমজানের রহমতের শিক্ষা। কোনো ব্যক্তি যখন নিজের ভুল স্বীকার করে মহান রবের দিকে ফিরে আসে, তখন তার আচরণেও ইতিবাচক পরিবর্তন হয়, যা তার কর্মে ফুটে ওঠে। পরিবারে, কর্মক্ষেত্রে এবং সমাজে তিনি হয়ে ওঠেন সহনশীল ও মানবিক এক সত্তা হিসেবে। অসহিষ্ণুতা, বিদ্বেষ এবং প্রতিহিংসার রাজনীতি আজ যখন আমাদের সমাজকে বিভক্ত করছে, তখন পবিত্র রমজানের রহমতের এই শিক্ষা অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। রাষ্ট্র ও বিশ্বের স্থিতিশীল উন্নয়ন ও সামাজিক শান্তির ভিত্তি গড়তে পারে কেবল একটি দয়াপূর্ণ সমাজ ব্যবস্থা।
তবে রোজার শিক্ষা শুধু মাহে রমজানের খণ্ডকালীন সময়ের জন্য নয়, বরং বাকি ১১ মাসের জন্য একটি পথনির্দেশিকা। যেসব বর্জনের চর্চা ও অর্জন হয় পবিত্র রমজানে, তা পরবর্তী এগারোটি মাস পালন করা হলে সুন্দর, সুশৃঙ্খল ও পরিচ্ছন্ন সমাজ গড়ে তোলা সহজেই সম্ভব। আর এ কাজটি সম্ভব হলে মুমিনের আকাঙ্ক্ষিত জান্নাত আল্লাহ দেবেন তাতে কোনো সন্দেহ নেই।