নাজাতের প্রথম দিন আজ
মুফতি মাহফুজ আবেদ
প্রকাশ : ১১ মার্চ ২০২৬ ০৮:৫০ এএম
রমজান মাসে মুমিনের জীবন যেমন শৃঙ্খলিত ও সাজানো হয়, তেমনি এর মাঝে বাতিলের বিরুদ্ধে প্রতিবাদী ছাপও ফুটে ওঠে। গ্রাফিক্স: প্রতিদিনের বাংলাদেশ
রোজা ফরজ হওয়ার একটি হেকমত (কৌশল) হলোÑ এটি আত্মনিয়ন্ত্রণের অনুশীলন। মানবজীবনে সৌভাগ্য অর্জন করতে হলে আত্মনিয়ন্ত্রণের কোনো বিকল্প নেই। পবিত্র কুরআনের একাধিক আয়াতে মানুষকে আত্মনিয়ন্ত্রণ অর্জনে উৎসাহিত করা হয়েছে। আল্লাহতায়ালা বলেন, ‘যে স্বীয় প্রতিপালকের সামনে উপস্থিত হওয়ার ভয় রাখে এবং প্রবৃত্তি থেকে নিজেকে বিরত রাখে, জান্নাতই হবে তার আবাস।’ Ñসূরা নাজিয়াত : ৪০-৪১
রমজান ব্যক্তি ও সমাজজীবনকে পরিশুদ্ধ করার মাস। মানবজীবনের প্রতিটি পদক্ষেপে মাহে রমজানের প্রভাব রয়েছে; বিশেষ করে সামাজিক জীবনে। পবিত্র কুরআনে কারিমের সূরা বাকারার ১৮৩ নম্বর আয়াতে আল্লাহতায়ালা বলেছেন, ‘রোজার মাধ্যমে একজন মুমিন-মুত্তাকি তথা আল্লাহভীরু হতে পারে। আর যিনি আল্লাহর ভয়ে সকল পাপাচার থেকে বিরত থাকেন, তিনিই মুত্তাকি।’ অন্যদিকে সূরা বাকারার ১৮৫ নম্বর আয়াতে আরও বলা হয়েছে, ‘রমজান মাস, এ মাসেই নাজিল করা হয়েছে কুরআন, যা মানুষের জন্য সৎপথের নিদর্শন এবং হক ও বাতিলের পার্থক্যকারী।’
নিজের দৈনন্দিন প্রয়োজন খাওয়াদাওয়া, চলাফেরা করতে গিয়ে মানুষের দৈহিক কামনা-বাসনা অনেক সময় মাথাচাড়া দিয়ে ওঠে। এতে অনেকে আত্মনিয়ন্ত্রণ হারিয়ে শৃঙ্খলাকে উপেক্ষা করে বসে। মৌলিক চাহিদাগুলোর লাগামহীন অপব্যবহারের ফলে সমাজে অন্যায়, ব্যভিচার এবং অসৎ কার্যকলাপে লিপ্ত হয় তারা। তাই রমজানে কঠিন ক্ষুধার সময় তার যে কষ্ট অনুভব হয় তা সহ্য করার মাধ্যমে ধৈর্যশীল ব্যক্তিতে পরিণত হয়। এর ফলে অন্য যেকোনো কঠিন পরিস্থিতি ধৈর্যের সঙ্গে মোকাবিলা করতে পারে। আর এ প্রশিক্ষণ পায় সে রমজান মাসে। এজন্য কুরআনে কারিমের নির্দেশনা অনুযায়ী ব্যক্তিগত, সামাজিক ও রাষ্ট্রীয় জীবনের প্রত্যেকটি পদক্ষেপে আল্লাহর হুকুম মেনে চলার ব্যবস্থাপনা করতে হবে। এর জন্য উত্তম সময় হলো মাহে রমজান।
রমজান মাসে মুমিনের জীবন যেমন শৃঙ্খলিত ও সাজানো হয়, তেমনি এর মাঝে বাতিলের বিরুদ্ধে প্রতিবাদী ছাপও ফুটে ওঠে। হক ও বাতিল একসঙ্গে চলতে পারে না। জাতীয় চরিত্র গঠনে রমজান ভূমিকা রাখতে না পারলে তা ইসলামের বিকাশে কাজে আসে না। বর্তমান সমাজব্যবস্থায় পরিবর্তন না আসার কারণÑ রমজানে যে আত্মশুদ্ধি করার কথা তা মুসলিম সমাজের অনেক বড় একটি অংশ ধারণ করেন না বলে মনে হয়। কারণ রমজানকে অনেকে একটি খণ্ডকালীন ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠান হিসেবে গ্রহণ করেছেন। নির্দিষ্ট সময় পর এর শিক্ষা বা অনুশীলনকে আর ধরে রাখা হয় না। এমনকি ফরজ নামাজও ছেড়ে দেন মুসলিমদের বড় একটি অংশ। এর মানে হলো বাতিল ব্যবস্থার কাছে তাদের আত্মসমর্পণ। ফলে অসাধু ব্যবসায়ী ক্রেতাকে ওজনে কম দেওয়া বন্ধ করে না, সমাজে বন্ধ হয় না চুরি-ডাকাতি, ব্যভিচার ও নানারকম অন্যায়-অনাচার। বাতিল ব্যবস্থাপনার মূলোৎপাটন করতে রমজানকে প্রতিবছর আল্লাহ আমাদের নেয়ামত হিসেবে দান করেন।
মনে রাখতে হবে, আল্লাহর নির্দেশ অনুযায়ী একজন মুমিনকে সর্বদা বাতিলকে পরাস্ত করার প্রস্তুতি রাখতে হয়। এজন্য রমজান তাদের জন্য নতুন করে প্রশিক্ষণ গ্রহণের একটি মাসও বটে। কিন্তু বর্তমান মুসলিম সমাজের অনেকেই রমজানকে কেবল নিজের আত্মিক পরিশুদ্ধির জন্য গ্রহণ করছে, যা মোটেও ঠিক নয়। বরং বিপদগ্রস্ত মুসলিম উম্মাহর লাঞ্ছনা, বঞ্চনা এবং নিস্তেজ অস্তিত্বের গ্লানি দূর করতে রমজানের সাধনা থেকে শক্তি সংগ্রহ করতে হবে। তবেই হেরার রশ্মিতে আলোকিত হবে সমাজ, মুমিন গঠন করতে পারবে তার কাঙ্ক্ষিত জীবন।