মুফতি মাহফুজ আবেদ
প্রকাশ : ০৮ মার্চ ২০২৬ ০৮:৩৪ এএম
রোজার আমল মানুষের নৈতিক মূল্যবোধকে শীর্ষস্থানে পৌঁছে দেয়। এর মাধ্যমে মানুষের ভেতরে নৈতিকতা, আদর্শ, স্বচ্ছতা ও নিষ্ঠা প্রোথিত হয়। ফলে মানুষ তার আত্মার ওপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করে, মিথ্যার ওপর সত্য, অন্যায়ের ওপর ন্যায়কে প্রতিষ্ঠা করে এবং পশুত্বকে অতিক্রম করে মনুষ্যত্বকে প্রতিষ্ঠা করে। রমজানে ইমানদারদের বড় অর্জন হলো নিজের কাছে সৎ ও বিশ্বস্ত থাকা। এতে সহায়ক হলো আল্লাহর অস্তিত্বের উপস্থিতির অনুভূতি। এই অনুভূতি জাগ্রত করাই মাহে রমজানের শিক্ষা।
ইসলাম মানুষকে বিশ্বস্ত তথা আমানতদার করতে চায়। বিশ্বস্ততা মানুষের গুরুত্বপূর্ণ গুণ। মানুষের চারিত্রিক পূর্ণতার জন্য, এই গুণ অর্জনে ইসলামে অনেক বেশি গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। পবিত্র কুরআন-হাদিসে এ বিষয়ে জোর তাগিদ দেওয়া হয়েছে। আল্লাহ তায়ালা আমানতদারদের পরকালে সফল হওয়ার ঘোষণা দিয়েছে। ইরশাদ হয়েছে, ‘এরা সেই লোক, যারা আমানতের প্রতি লক্ষ্য রাখে এবং স্বীয় অঙ্গীকার হেফাজত করে।’ -সূরা মুমিনুন : ৮
আমরা যেমন আল্লাহর কাছে সবকিছু আমানত হিসেবে রাখছি, আল্লাহ তায়ালাও আমাদের কাছে আমানত হিসেবে দিয়েছেন অনেক কিছু। ইসলাম ও ইসলামী বিধিবিধানকে তিনি আমানত হিসেবে দিয়েছেন। আমাদের চোখ, কান, নাক, দেহ ও বুদ্ধিমত্তা, স্ত্রী, সন্তান-সন্তুতি, সম্পদÑ সবই আল্লাহর দেওয়া আমানত। এসব আমানতকে পাপ ও হীন স্বার্থে ব্যবহার করা মানে আমানতের খেয়ানত। সূর্য তার দায়িত্ব পালন করে। সাগরের ঢেউও তার দায়িত্ব যথাযথভাবে পালন করে। কিন্তু অনেক মানুষ তার স্বাধীনতার অপব্যবহার করে দায়িত্ব পালনে উদাসীনতা দেখায় তথা বিশ্বাসঘাতকতা করে; যা কোনোভাবেই কাম্য নয়।
সুরা আহজাবে ইরশাদ হয়েছে, ‘আমি আকাশ, পৃথিবী ও পর্বতমালার সামনে এই আমানত (কুরআন) পেশ করেছিলাম, অতঃপর তারা একে বহন করতে অস্বীকার করল এবং এতে ভীত হলো; কিন্তু মানুষ তা বহন করল। নিশ্চয়ই তারা এই আমানত রক্ষা না করায় খুবই জালেম ও এ দায়িত্ব পালনে অবহেলার পরিণতি সম্পর্কে খুবই অজ্ঞ!’
আয়াতে আমানত শব্দের তাফসির প্রসঙ্গে বলা হয়েছে, দ্বীনের যাবতীয় কর্তব্য ও কর্ম এর অন্তর্ভুক্ত। শরিয়তের যাবতীয় আদেশ নিষেধের সমষ্টি আমানত। এর উদ্দেশ্য হচ্ছে, শরিয়তের বিধানাবলি দ্বারা আদিষ্ট হওয়া, যেগুলো পুরোপুরি পালন করলে জান্নাতের চিরস্থায়ী নেয়ামত এবং বিরোধিতা অথবা ত্রুটি করলে জাহান্নামের আজাব প্রতিশ্রুত।
আমানতের অর্থ হলোÑ বিশ্বস্ততা। বিশ্বাসঘাতকতা না করা। প্রসঙ্গত বলা যায়, রোজা একটি আমানত, একটি ইবাদত। এটাকে যথাযথভাবে আদায় করতে হবে। সমাজের কিছু মানুষ আছে, যারা রোজা রাখে কিন্তু মিথ্যাচার, অভিশাপ প্রদান, মারামারি, গিবত, হিংসা, পরশ্রীকাতরতা ইত্যাদি বর্জন করে না। তদ্রূপ সমাজে কিছু মানুষ রয়েছে, যারা প্রতারণা, চুরি, অফিস ফাঁকি দেয়, বিভিন্ন হারাম চুক্তি করে, লটারির টিকিট ক্রয় করে, মদ বিক্রি করে ও ব্যভিচার ইত্যাদিসহ যাবতীয় অননুমোদিত কর্মকাণ্ড বর্জন করে না। এগুলো কাম্য নয়।
রোজা রেখে যাবতীয় পাপাচার থেকে নিজেকে বিরত রাখতে হবে। না হলে ওই রোজা দ্বারা তাকওয়া অর্জন হবে না। এ প্রসঙ্গে হাদিসে হজরত রসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘যে ব্যক্তি মিথ্যা কথা বলা ও এর ওপর আমল করা বর্জন করে না ও মূর্খতা পরিহার করে না, তার পানাহার থেকে বিরত থেকে উপবাস করা আল্লাহর কাছে প্রয়োজন নেই।’ -সহিহ বোখারি।
এই হাদিসের আলোকে প্রতিটি মুমিনের উচিত রোজার আমানতের ব্যাপারে শতভাগ যত্নবান হওয়া। রোজাকে তার দাবি ও চাহিদা মোতাবেক পালন করা। মহান আল্লাহ সবাইকে তওফিক দান করুন। আমিন।