মুফতি মাহফুজ আবেদ
প্রকাশ : ০৫ মার্চ ২০২৬ ০৮:৩৭ এএম
আপডেট : ০৫ মার্চ ২০২৬ ০৯:২৬ এএম
হাদিসে এসেছে, ‘যে দয়া করে না, সে দয়া পায় না।’ তাই অন্যান্য ইবাদতের মতো দান-সদকা করে মানুষের পাশে দাঁড়ানোর সেরা সময় পবিত্র রমজান। গ্রাফিক্স: প্রতিদিনের বাংলাদেশ
বান্দার কৃতজ্ঞতা আদায় আল্লাহতায়ালার বড় পছন্দ। তিনি চান বান্দা প্রতিটি ক্ষেত্রে তার শোকর (কৃতজ্ঞতা) আদায় করুক, যাতে তিনি নেয়ামত-অনুগ্রহে তাকে ভরিয়ে দিতে পারেন এবং যা দিয়েছেন, বাড়তি দান দ্বারা তাকে পরিপূর্ণ করে তুলতে পারেন। তিনি এর নিশ্চয়তা দিয়ে বলেছেন, ‘তুমি যদি শোকর আদায় করো, আমি তোমাকে আরও বেশি দেব।’ এ বিষয়ে নবী করিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের হাদিসও আছে প্রচুর। যেখানে বান্দাকে কৃতজ্ঞ হওয়ার সবক দেওয়া হয়েছে। আমরা জানি, রোজার অপর নাম সবর তথা ধৈর্য। রোজায় সবরের প্রশিক্ষণ হয় সরাসরি এবং তা অতি স্পষ্ট। কিন্তু এতে যে শোকরেরও সবকে এবং প্রশিক্ষণ রয়েছে, সেদিকে আমাদের নজর কমই যায়।
রোজা পালনের মাধ্যমে উপলব্ধি করা যায় খাদ্য-পানি কত দরকারি জিনিস। পেটে ক্ষুধা, বুকে তৃষ্ণা অথচ পানাহার দ্বারা তা নিবারণ করা যাচ্ছে না। দীর্ঘ সময় এ কষ্ট সহ্য করতে হচ্ছে আর ক্রমেই কষ্ট তীব্রতর হচ্ছে। অন্য সময় হলে তো খোদ পিপাসা আঁচ করামাত্র তা নিবারণের চেষ্টা করা হতো, কিন্তু এ সময় প্রবৃত্তির যতই চাহিদা হোক এবং শারীরিক যত কষ্টই হোক পানাহার বারণ। ফলে বান্দা চাহিদা দমন করে কষ্ট সয়েই যায়। এভাবেই সময় বয়ে যেতে থাকে। পরিশেষে সূর্যাস্তকালে যখন ইফতারসামগ্রী নিয়ে বসা হয়, তখন দিনমানের দমিত সেই চাহিদার উচ্ছ্বসিত স্ফুরণে অকিঞ্চিতকর খাবারও অমৃতসম মনে হয়। তখন সামনে যা-ই থাকে, পরম সমাদরে তা গ্রহণ করা হয়। অনুভব-উপলব্ধির উন্মেষে তখন বুঝে আসে পানির কদর আর খাদ্যের মূল্য। এ ছাড়া যে জীবন বাঁচে না, এর সাময়িক অভাবেও যে দেহমন চলচ্ছক্তি হারায়।
কত দয়াময় মহান আল্লাহ, যিনি আমাদের জীবন রক্ষার ও দেহমনে শক্তি জোগানোর জন্য অফুরান নিয়ামত বিশ্ব চরাচরে ছড়িয়ে দিয়েছেন! সুতরাং শোকর মহান আল্লাহর! অশেষ কৃতজ্ঞতা তার।
রোজা আমাদের অন্তরে এ উপলব্ধিকে জাগ্রত করে। অন্যভাবে বলা যায়, রোজা আমাদের কৃতজ্ঞ হওয়ার প্রশিক্ষণ দেয়। রোজা রেখেই আমরা বুঝতে পারি পানির মূল্য। উপলব্ধি করতে পারি খাদ্যের কদর। এ উপলব্ধির সত্যিকার স্ফুরণ ঘটে ইফতারকালে। তাই ইফতারের সময়টা কৃতজ্ঞতায় আনত হওয়ার সময়। এ সময় প্রাণ খোলে শোকর আদায় করা চাই। ভক্তি-রসে স্নাত কণ্ঠে বলে ওঠা চাই, ‘হে আল্লাহ! তোমারই সব প্রশংসা। তোমাকেই জানাই সব কৃতজ্ঞতা।’ ‘হে আল্লাহ! তোমারই জন্য রোজা রেখেছি, তোমারই ওপর নির্ভর করেছি এবং তোমারই দেওয়া রিজিক দ্বারা ইফতার করেছি। তোমার দেওয়া নিয়ামতে ঘুচে গেছে সারা দিনের সব ক্লান্তি। নিবারণ হয়েছে ক্ষুধা-পিপাসা। দেহমনে ছেয়ে গেছে শান্তি ও প্রশান্তি।’
এভাবে টানা এক মাস চলে নিয়ামতের মূল্য বোঝা ও শোকর আদায়ের প্রশিক্ষণ। সেই প্রশিক্ষণকে মনেপ্রাণে ধারণ করে, কৃতজ্ঞতা প্রকাশের অংশ হিসেবে আমাদের উচিত আল্লাহর অসহায় বান্দাদের প্রতি যথাসম্ভব সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দেওয়া; তাদের ক্ষুধা, দারিদ্র্য ও দুঃখ লাঘবের চেষ্টা করা। বলা হয়, রমজানের মৌলিক উদ্দেশ্যগুলোর মধ্যে অন্যতমÑ সারা দিন বা সারা বছর যেসব গরিব-দুঃখী না খেয়ে থাকে, তাদের দুঃখ-কষ্ট উপলব্ধি করে নিজেকে সংযমী হিসেবে গড়ে তোলা।
হাদিসে এসেছে, ‘যে দয়া করে না, সে দয়া পায় না।’ তাই অন্যান্য ইবাদতের মতো দান-সদকা করে মানুষের পাশে দাঁড়ানোর সেরা সময় পবিত্র রমজান। তাই এ মাসে গরিব-দুঃখী মানুষের সেবায় নিজেকে নিয়োজিত করি। তাহলে আল্লাহতায়ালার সন্তুষ্টি অর্জন সহজ হবে। তার পুরস্কারে ধন্য হবে আমাদের জীবন।