মুফতি মাহফুজ আবেদ
প্রকাশ : ২৭ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ ০৮:৪৮ এএম
কুরআনে কারিমে ইরশাদ হয়েছে, ‘হে ঈমানদাররা! তোমাদের প্রতি রোজা ফরজ করা হয়েছে, যেমন তোমাদের আগের লোকেদের প্রতি ফরজ করা হয়েছিল, যাতে তোমরা মুত্তাকি হতে পারো।’ Ñসূরা বাকারা : ১৮৩
বর্ণিত আয়াতে আল্লাহতায়ালা স্পষ্ট করে দিয়েছেন রমজানের উদ্দেশ্য সম্পর্কে। আর তা হলো, মানুষকে মুত্তাকি বানানো। পরিভাষায় মুত্তাকি বলা হয় ওই ব্যক্তিকে, যে তাকওয়ার গুণে গুণান্বিত। অর্থাৎ অন্তরে আল্লাহতায়ালার ভয় রেখে তার আদেশসমূহ পালন করেন এবং নিষিদ্ধ বিষয়গুলো থেকে বিরত থাকেন। তারা ঈমানদার, পাপকাজে লিপ্ত হন না এবং গায়েব তথা অদৃশ্য বিষয়ের প্রতি বিশ্বাস স্থাপন করেন। এ শ্রেণির মানুষ ব্যক্তিগত ও সামাজিক জীবনে খোদাভীতি মেনে চলে সৎকর্মশীল জীবনযাপন করেন।
ইসলামী চিন্তাবিদদের মতেÑ তাকওয়া মানে শুধু ভয় নয়। এটি আল্লাহ সচেতনতা, আত্মনিয়ন্ত্রণ এবং নৈতিক দায়িত্ববোধের এক সমন্বিত অবস্থা। রমজান সেই অনুশীলনের মাস, যেখানে মানুষ নিজের প্রবৃত্তির ওপর কর্তৃত্ব স্থাপন করতে শেখে। মানুষের জীবনে বেশিরভাগ ভুল হয় তাৎক্ষণিক আবেগ, আকাঙ্ক্ষা এবং অপ্রতিহত ইচ্ছার কারণে। আধুনিক সমাজ মানুষকে ক্রমাগত ভোগ, তাড়াহুড়া এবং তাৎক্ষণিক সন্তুষ্টির দিকে ঠেলে দেয়। এই প্রবণতা ধীরে ধীরে মানুষের ভেতরের নৈতিক প্রতিরোধক্ষমতাকে দুর্বল করে। রমজান ঠিক এই জায়গায়ই একটি শক্তিশালী নৈতিক প্রশিক্ষণ হিসেবে কাজ করে।
দিনের আলোয় বৈধ খাবার থেকেও বিরত থাকার নির্দেশ মানুষের ভেতরে একটি গভীর বার্তা দেয় যে সবকিছু পারা মানেই করা নয়, আর সংযমই প্রকৃত শক্তি। তাকওয়ার প্রথম ধাপ হলোÑ সচেতনতা। একজন রোজাদার যখন একাকী অবস্থায়ও পানাহার থেকে বিরত থাকে, তখন সে আসলে নিজের ভেতরে এক অদৃশ্য পর্যবেক্ষকের উপস্থিতি অনুভব করে। এই আল্লাহসচেতনতা মানুষের আচরণকে ভেতর থেকে নিয়ন্ত্রণ করে। আইন, শাস্তি বা সামাজিক চাপ নয়; বরং অন্তরের নৈতিক বোধই তখন প্রধান নিয়ামক হয়ে ওঠে।
দ্বিতীয় ধাপ হলোÑ আত্মনিয়ন্ত্রণের অনুশীলন। হাদিস শরিফে ইরশাদ হয়েছে, হজরত আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত, নবী করিম (সা.) বলেন, ‘তোমাদের কেউ রোজা পালন করলে সে যেন পাপাচারে লিপ্ত না হয় এবং মূর্খের ন্যায় আচরণ না করে। কেউ তার সঙ্গে ঝগড়া করলে বা তাকে গালমন্দ করলে সে যেন বলে, আমি রোজাদার, আমি রোজাদার।’ Ñসুনানে আবু দাউদ : ২৩৬৩
রোজার মাধ্যমে ক্ষুধা, তৃষ্ণা, রাগ, অপ্রয়োজনীয় কথা, চোখ ও জিহ্বার অপব্যবহার থেকে বিরত থাকার ধারাবাহিক চর্চা মানুষকে শেখায় কীভাবে ইচ্ছাকে পরিচালনা করতে হয়। এই অভ্যাস শুধু ইবাদতের ক্ষেত্রে নয়, পেশাগত জীবন, পরিবার ও সামাজিক সম্পর্কেও গভীর ইতিবাচক প্রভাব ফেলে। যে ব্যক্তি নিজের আবেগ নিয়ন্ত্রণ করতে পারে, সে সিদ্ধান্ত নিতে পারে অধিক ভারসাম্য ও প্রজ্ঞা দিয়ে।
তৃতীয় ধাপ হলোÑ নৈতিক উৎকর্ষ। তাকওয়া শুধু পাপ এড়িয়ে চলার নাম নয়, এটি সক্রিয় সৎকর্মের সংস্কৃতি গড়ে তোলে। রমজানে দান-সদকা বৃদ্ধি, দরিদ্রের কষ্ট অনুভব, ক্ষমাশীলতা ও সহমর্মিতা চর্চা মানুষের ভেতরে একটি সামাজিক দায়িত্ববোধ তৈরি করে। ফলে তাকওয়া ব্যক্তিগত গুণে সীমাবদ্ধ থাকে না; এটি সমাজে ন্যায়, সহানুভূতি ও আস্থার পরিবেশ সৃষ্টি করে।
রমজান আমাদের আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ সত্য শেখায়। তাকওয়া তাৎক্ষণিক অর্জন নয়, এটি ধারাবাহিক অনুশীলনের ফল। এক মাসের প্রশিক্ষণ সারা বছরের চরিত্র গঠনের ভিত্তি তৈরি করে। যদি রমজানের সংযম, সময়ানুবর্তিতা, কম কথা বলা, কম খাওয়া এবং বেশি চিন্তা করার অভ্যাস বছরজুড়ে ধরে রাখা যায়, তবে তাকওয়া ধীরে ধীরে স্থায়ী চরিত্রে পরিণত হয়।