শাহীন হাসনাত
প্রকাশ : ২৬ ডিসেম্বর ২০২৫ ১৯:৩৭ পিএম
প্রতীকী ছবি
শুরু হয়েছে ইসলামী বর্ষপঞ্জির অন্যতম মর্যাদাপূর্ণ মাস রজব। পবিত্র কুরআন-হাদিসের আলোকে এই মাসের বিশেষ গুরুত্ব রয়েছে। রজব হলো ইসলামী ক্যালেন্ডারের চারটি সম্মানিত মাসের একটি। কুরআনে কারিমে আল্লাহতায়ালা বলেন, ‘আল্লাহর কাছে মাসের সংখ্যা বারোটি, যার মধ্যে চারটি পবিত্র।’Ñ সূরা তাওবা : ৩৬
এই চার মাস হলোÑ জিলকদ, জিলহজ, মহররম ও রজব। এই মাসগুলোতে যুদ্ধবিগ্রহ নিষিদ্ধ ছিল। তবে আলেমদের ব্যাখ্যায় ‘যুদ্ধ’ শব্দটির অর্থ শুধু অস্ত্রধারী সংঘাত নয়। এর মধ্যে রয়েছে আত্মসংযমের সংগ্রাম, রাগ দমন, হতাশার বিরুদ্ধে লড়াই, খারাপ অভ্যাস ত্যাগ এবং জুলুম ও অন্যায়ের বিরুদ্ধে অবস্থান নেওয়া। তাই রজব মাস মুসলমানদের জন্য আত্মশুদ্ধি ও নৈতিক উন্নয়নের বিশেষ সময়।
সহিহ বোখারিতে বর্ণিত এক হাদিসে নবী করিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, বছর বারো মাসের, যার মধ্যে চারটি পবিত্র। এর তিনটি ধারাবাহিকÑ জিলকদ, জিলহজ ও মহররম। চতুর্থটি হলোÑ রজব, যা জুমাদাল উখরা ও শাবানের মাঝামাঝি অবস্থিত। ইসলামী গবেষকদের মতে, রজব মাসের বিশেষ ফজিলত নিয়ে নির্ভরযোগ্য কোনো হাদিস নেই, শুধু এটুকু ছাড়া যে এটি চারটি পবিত্র মাসের একটি। নির্দিষ্টভাবে রজবে রোজা রাখা বা দান করার আলাদা কোনো সওয়াব নির্ধারিত হয়নি।
তবে এক হাদিসে নবী করিম (সা.) শাবান মাসে বেশি রোজা রাখার কারণ ব্যাখ্যা করেছেন। তিনি বলেছেন, রজব ও রমজানের মাঝামাঝি এই মাসটি মানুষ অবহেলা করে অথচ এ মাসেই আমল আল্লাহর কাছে পেশ করা হয়। তাই তিনি চান, তার আমল রোজা অবস্থায় পেশ হোক।
এই হাদিসের আলোকে আলেমরা বলেন, রজব ও শাবান দুই মাসই ভালো আমলের প্রস্তুতির সময়। রমজান যেহেতু রোজার মাস, তাই রজবেও নফল রোজা রাখা যেতে পারে। তবে এতে কোনো বিশেষ ফজিলতের দাবি নেই। এটি বছরের অন্য মাসের নফল রোজার মতোই।
অনেক মুসলমান রজবকে রমজানের প্রস্তুতির মাস হিসেবে দেখেন। কেউ রমজানে ছুটে যাওয়া রোজা এ মাসে কাজা করেন। নারীরা হায়েজজনিত কারণে বাদ পড়া রোজা রজব ও শাবানে আদায় করেন। এ ছাড়া প্রতি মাসে তিন দিন রোজা রাখা, সোম ও বৃহস্পতিবার রোজা রাখাÑ এসব সুন্নত আমল রজবেও প্রযোজ্য। তাই এ মাসে রোজা রাখা স্বাভাবিকভাবেই মুসলমানদের কাছে প্রিয়। রমজান যেহেতু জাকাতুল ফিতরের মাস, তাই অনেকে আগেভাগেই রজব ও শাবানে দান-সদকা শুরু করেন। এই তিন মাসকে অনেকেই দান করার সুবর্ণ সময় বলে মনে করেন।
ঐতিহাসিকের মতে, নবী মুহাম্মদ (সা.) মক্কা থেকে বায়তুল মোকাদ্দাস এবং সেখান থেকে ঊর্ধ্বাকাশে গমনের ঘটনা ইসরা ও মিরাজ রজবের ২৭ তারিখে সংঘটিত হয়েছিল। এ কারণে অনেকেই এই মাসকে বিশেষ গুরুত্ব দেন। এই ঐতিহাসিক ঘটনা ছিল ইসলামের ইতিহাসে এক গুরুত্বপূর্ণ মোড়। হজরত খাদিজা (রা.) ও আবু তালিবের ইন্তেকালের পর আল্লাহতায়ালা নবীকে সান্ত্বনা ও সম্মান দিতে এই মহাযাত্রা করান। একই সঙ্গে এটি মুসলমানদের কাছে মসজিদে আকসার গুরুত্ব স্মরণ করিয়ে দেয়। তবে আলেমদের স্পষ্ট বক্তব্য হলো, ২৭ রজবে বিশেষভাবে রোজা রাখার বিষয়ে কোনো সহিহ হাদিস নেই। যদি দিনটি সোম বা বৃহস্পতিবারের সঙ্গে মিলে যায়, তখন সাধারণ সুন্নত হিসেবে রোজা রাখা যেতে পারে।
রজব মাসে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলোÑ আত্মপ্রস্তুতি। রমজানের আগমনের জন্য নিজেকে মানসিক ও আত্মিকভাবে তৈরি করা। আল্লাহতায়ালার কাছে বেশি বেশি ক্ষমা প্রার্থনা করা, খারাপ অভ্যাস পরিত্যাগের চেষ্টা করা, নফল নামাজ, দোয়া ও দান-সদকায় মনোযোগী হওয়া। সেই সঙ্গে রাসুলের শেখানো দোয়াটি বেশি বেশি পড়া। রজব মাস এলে হজরত রাসূলুল্লাহ (সা.) একটি দোয়া বেশি বেশি পড়তেন ও সাহাবাদের তা পাঠ করার জন্য বলতেন। দোয়াটি হলোÑ ‘আল্লাহুম্মা বারিক লানা ফি রাজাবা ওয়া শাবান, ওয়া বাল্লিগনা রামাজান।’ অর্থ : হে আল্লাহ! আপনি আমাকে রজব ও শাবান মাসে বরকত দান করুন এবং মহিমান্বিত রমজান মাসে পৌঁছে দিন।