× ই-পেপার প্রচ্ছদ সর্বশেষ বাংলাদেশ রাজনীতি দেশজুড়ে বিশ্বজুড়ে বাণিজ্য খেলা বিনোদন মতামত চাকরি শিক্ষা আজকের কার্টুন ফিচার সকল বিভাগ ছবি ভিডিও লেখক আর্কাইভ কনভার্টার

মাহেরীন, আমাদের লজ্জা মোচনের নাম

অধ্যাপক মওদুদ আলমগীর পাভেল

প্রকাশ : ২৬ জুলাই ২০২৫ ১৬:৪১ পিএম

আপডেট : ২৬ জুলাই ২০২৫ ১৬:৫১ পিএম

মাহেরীন চৌধুরী

মাহেরীন চৌধুরী

কথা রেখেছেন মাহেরীন। জেট ফুয়েলের উত্তপ্ত অগ্নিকুণ্ডে নিজের শরীর পুরোপুরি অঙ্গার হয়ে যাওয়ার আগ পর্যন্ত বুকে আগলেছেন এক-এক করে ২০ জন শিশুকে। কদিন আগেই অভিভাবকদের কথা দিয়েছিলেন, কোনো একটা শিশুর কিছু হওয়ার আগে সেটা তার বুকের ওপর দিয়ে যাবে। 

মাঝে-মাঝে ভাবতে চেষ্টা করি, ওই জ্বলন্ত আগুনের শিখা যখন তাকে ঘিরে ফেলেছিল, তখন একবারও কি তার মনে হয়নি, আর নয়, এখন নিজেকেই সরিয়ে নিই। একবারও মনে হয়নি তার বাড়িতেও তো রয়েছে উদ্বিগ্ন পরিজন, যারা হয়তো তীব্র উৎকণ্ঠায় ছুটে এসেছেন স্কুল ক্যাম্পাসের সামনে। 

হয়তো আর কোনো শিশুকে উদ্ধার করে নিরাপদে পৌঁছানোর বাকি নেই ভেবে নিজে দরজার দিকে এগোতেই শুনেছেন কোনো অসহায় শিশুর আর্ত-আকুতি, ‘ম্যাম আমি এখানে’। আগুন, ঝলসানো বাতাস, পোড়া তেলের তীব্র জ্বলুনি আর ধোঁয়ার আড়ালে শেষ বেঞ্চের কোনায় জড়সড়ো এক জ্বলন্ত শিশু। পারেননি সেই অসহায় আকুতি এড়াতে। এগিয়ে গেছেন অন্ধকার ঠেলে বেঞ্চ হাতড়ে হাতড়ে। তার নিজের পরনের জামাকাপড় ততক্ষণে পুড়ে ছাই, নিজের চোখের সামনেই হাত-পা-মুখ থেকে পুড়ে যাচ্ছে চামড়া, তীব্র যন্ত্রণায় অসাড় হয়ে আসছে তার পা দুটো। তবুও উপায় নেই থামার, তিনি যে কথা দিয়েছেন তার বুক এড়িয়ে যেতে পারবে না একটা শিশুও। নিজের দু’হাত বাড়িয়ে আগলে ধরলেন, বাড়িয়ে দেওয়া কোমল হাত দুটো, জ্বলন্ত দুই জোড়া হাতের কম্পিত মহা-মিলন।

মায়ের হাতের মুঠোয় সন্তানের ছোট্ট দুটি হাত। ভীতসন্ত্রস্ত, বিধ্বস্ত ক্লাস রুমের কোনায় জড়সড় জ্বলন্ত শিশুকে পরম মাতৃস্নেহে তুলে নিলেন নিজের ভস্মীভূত কোলে। চামড়াহীন ছোট হাত দুটো তখন মাহেরীনের গলা আঁকড়ে পরম নিরাপদ আশ্রয়ে। পৃথিবী প্রত্যক্ষ করল ইতিহাসের শ্রেষ্ঠতম আলিঙ্গন। মানবতা পৌঁছে গেল তার শ্রেষ্ঠত্বে। 

মাহেরীন চৌধুরী শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান বীরউত্তম কিংবা তারেক রহমানের আত্মীয় কি না, সে পরিচয় তখন অর্থহীন। তিনি নিজেও সেটা জনসম্মুখে আনেননি কখনোই, মানবতার জন্য সর্বস্ব বিসর্জনের সাহসিকতা তখন আত্মীয়তার পরিচয় ছাপিয়ে অনেক উঁচুতে, দেশের জন্য সবকিছু বিসর্জনের আত্মিক সম্পর্ক আত্মার আত্মীয় হয়ে রক্ত সম্পর্ককে বারবার এমনিভাবেই ম্লান করে ফেলে। পুরো বিষয়টি জানার পরেও চিকিৎসকের কাছে তারেক রহমানের শান্তপ্রত্যাশা, ওনার অবস্থার গুরুত্ব বিবেচনায় যা করণীয় সেটুকুরই। ব্যাংকক, সিঙ্গাপুর, জার্মানি পাঠাবার দাবি নয়। এমনকি মৃত্যুর খবরের পরেও চিকিৎসকদের ধন্যবাদ দিয়েছেন যথাসাধ্য করার জন্য। এমন রাজনীতিই চায় জনগণ।

মাহেরীন ম্যামের হাত ধরে, কোলে উঠে জ্বলন্ত অগ্নিকুণ্ড থেকে বেঁচে যাওয়া শিশুরা হয়তো বাকি জীবন তাদের শৈশবের এই বীভৎস স্মৃতির ভয়াবহতা বয়ে বেড়াবে, কিন্তু নিশ্চিতভাবে দূর আকাশ থেকে ভেসে আসা ছয়টি শব্দে তারা বারবার প্রদীপ্ত হবে, হবে প্রত্যয়ী। চারদিকে আগুনের তীব্র হলকা আর গাঢ় ধোঁয়ায় মাঝে দিশেহারা শিশুদের পাশে মাহেরীন ম্যামের চিৎকার, ‘দৌড়াও, ভয় পেয়ো না, আমি আছি’। 

জীবনের প্রতিটি থেমে যাওয়ার মুহূর্তে মাহেরীন ম্যাম সব শিশুকে এগিয়ে যাওয়ার সাহস জুগিয়ে যাবেন প্রজন্ম থেকে প্রজন্মান্তরে। 

চারদিকে সুনসান নিস্তব্ধ নীরবতায় শতভাগ দগ্ধ আপাদমস্তক ব্যান্ডেজে মোড়া বার্ন ইনস্টিটিউটের আইসিইউতে স্বামীর হাত ধরে বলেছিলেন ‘আর দেখা হবে না’। হতভম্ব নির্বাক স্বামীর জিজ্ঞাসা, ‘কেন বেরিয়ে এলে না? আমাদেরও তো দুটো সন্তান রয়েছে।’ মাহেরীনের কাঁপা-কাঁপা উত্তর, ‘কী করব, ওরাও যে আমার সন্তান, আমি যে অভিভাবকদের কথা দিয়েছি ওদের কিছু হলে আমার বুকের ওপর দিয়ে যাবে।’ পৃথিবী থেকে চিরতরে চলে যাবার আগে কথোপকথন আর শব্দে থাকে না নির্বাক চোখের ভাষায় রূপান্তরিত হয় । 

শ্রেণিকক্ষে আর কোনো শিশু রয়ে গেলে কি-না, সেটা নিশ্চিত না হয়ে মাহেরীন কী করে বের হবেন? আগুনের তেজ কমে এলে শ্রেণিকক্ষের ধ্বংসস্তূপ থেকে যদি কোনো শিশুর জীবিত-মৃত অস্তিত্ব আবিষ্কৃত হয় তাহলে কী জবাব দেবেন অভিভাবকদের? 

মাহেরীন, পৃথিবীর এই বাক্যগুলো আপনার কাছে পৌঁছাবে কি না জানি না, আপনি আপনার প্রতিশ্রুতি থেকে বিচ্যুত হননি। সম্পূর্ণ দগ্ধ ওই শ্রেণিকক্ষের সবাইকে আপনি নিরাপদে পৌঁছে দিয়েছেন। মাহেরীন আর দেখা হবে না বলে আপনার আক্ষেপ একদম সত্যি নয়, এই পৃথিবীতে শিক্ষার নামের সব প্রতিষ্ঠানের প্রবেশ দ্বারে আপনি থাকবেন নিরাপত্তার প্রতীক হয়ে, শ্বেতশুভ্র বসনে স্মিত হাসিতে শাশ্বত উজ্জ্বলতায়। 

পুলিশ আর সেনাবাহিনীর কড়া নিরাপত্তা বেষ্টনী ভেদ করে ধ্বংসস্তূপ থেকে নিথর নিষ্প্রাণ বন্ধুকে পাঁজা কোলা করে বেরিয়ে আসা কিশোর সভ্যতাকে হতবাক করে দেয়। ‘বলেছিলাম তো কেউ বেঁচে নেই’, এমন জাগতিক মন্তব্যে কিশোরের দৃঢ় স্বর্গীয় উচ্চারণ, ‘না! আমি পৌঁছানো পর্যন্ত ও বেঁচে ছিল। আমাকে বলেছে, ‘জানতাম দোস্ত তুই আসবি।’ কিশোরের ওই ঋজু উচ্চারণে পৃথিবী কেঁপে ওঠে, প্রত্যয়ের বজ্রপাতে বাতাস স্তব্ধ হয়, আমাদের সামনে প্রশ্ন এসে দাঁড়ায় ‘আমরা মানুষ তো’! 

শ্রাবণের এই বর্ষায় নীলফামারীর জলঢাকার চৌধুরী বাড়ির কিংবা ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় ‘মাহেরীন আর মাসুকা ম্যামের কবর’ দেশের মানুষের শ্রদ্ধার অশ্রু জলের ফোঁটায় সিক্ত হবে প্রতিনিয়ত। পৃথিবীর সব যন্ত্রণা বুকে নিয়ে ওপারে চলে যাওয়া মাহেরীনরা যদি কখনও আমাদের স্মৃতি থেকে হারিয়ে যায়; তাহলে পৃথিবীর সবচেয়ে কলঙ্কিতদের তালিকায় স্থান হবে আমাদের। 

আপনাদের জন্য রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতির আলোকিত চাকচিক্য নিতান্ত তুচ্ছ আর আটপৌরে। এক টুকরো মেডেল আর কাগজের একটা পাতার চেয়ে অনেক বড় মর্যাদার ইতিহাস আপনাদের উত্তরাধিকারে। 

মাহেরীন-মাসুকা আপনাদের ভীষণ প্রয়োজন; আমাদের কথা দিন, যখনই বাংলাদেশ ক্লান্ত হবে ওপার থেকে আপনারা চিৎকার করে বলবেন, ‘দৌড়াও, থেমো না, আমি আছি।’ এ দেশের কৈশোর আর তারুণ্য কথা দাও, তোমরাও থামবে না’।

লেখক : আহ্বায়ক, বিএনপি মিডিয়া সেল

শেয়ার করুন-

মন্তব্য করুন

Protidiner Bangladesh

সম্পাদক : মারুফ কামাল খান

প্রকাশক : কাউসার আহমেদ অপু

রংধনু কর্পোরেট, ক- ২৭১ (১০ম তলা) ব্লক-সি, প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড) ঢাকা -১২২৯

যোগাযোগ

প্রধান কার্যালয়: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৬৯৬ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (প্রিন্ট): +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮১০, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০ | ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (অনলাইন): +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০, +৮৮০১৭৯৯৪৪৯৫৫৯ । ই-মেইল: [email protected]

সার্কুলেশন: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮০৭, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৩৩২ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন মূল্য তালিকা