হাবিব বাবুল
প্রকাশ : ১২ মে ২০২৬ ২১:২০ পিএম
জার্মানির ব্যস্ততম নগরী ফ্রাঙ্কফুর্টে বর্ণাঢ্য আয়োজনে রবিবার উদযাপিত হলো বাঙালির প্রাণের উৎসব ‘পহেলা বৈশাখ’। ছবি: প্রতিদিনের বাংলাদেশ
জার্মানির ব্যস্ততম নগরী ফ্রাঙ্কফুর্টে বর্ণাঢ্য আয়োজনে রবিবার উদযাপিত হলো বাঙালির প্রাণের উৎসব ‘পহেলা বৈশাখ’। বিদেশের মাটিতে বাঙালির চিরন্তন ঐতিহ্য, সংস্কৃতি আর সৌহার্দ্যকে তুলে ধরতে কয়েকজন সংস্কৃতিমনা প্রবাসীর উদ্যোগে আয়োজিত এই অনুষ্ঠানটি পরিণত হয়েছিল এক টুকরো বাংলাদেশে। দিনব্যাপী এই উৎসবে ছিল দেশীয় সংস্কৃতির শৈল্পিক প্রকাশ, বাহারি খাবারের স্টল, ঐতিহ্যবাহী পোশাকের প্রদর্শনী এবং গান-কবিতা-নৃত্যে ঠাসা মনোজ্ঞ সাংস্কৃতিক পরিবেশনা।
ব্যতিক্রমধর্মী এই আয়োজনের নেপথ্যে ছিলেন চার নারী উদ্যোক্তা— দিলশাদ জাহান খান, পারভিন জাহাঙ্গীর, ডায়মণ্ড হীরা এবং চৈতি বানোয়ারি। তাদের সৃজনশীল পরিকল্পনা ও সুসংগঠিত প্রচেষ্টায় পুরো অনুষ্ঠানটি এক ভিন্ন মাত্রা পায়। নতুন প্রজন্মের কাছে বাংলা সংস্কৃতিকে পরিচিত করানোর এই মহতী উদ্যোগ উপস্থিত সবার প্রশংসা কুড়িয়েছে।
উৎসবের অন্যতম আকর্ষণ ছিল সৃজনশীল নামে সাজানো স্টলগুলো। প্রতিটি স্টলে ছিল দেশীয় ঐতিহ্যের ছাপ। উদ্যোক্তা দিলশাদ জাহান খানের ‘সাজের প্রহর’ স্টলটি সেজেছিল শাড়ি, থ্রি-পিস ও গয়নার আধুনিক ও নান্দনিক সংগ্রহে। সৌন্দর্যচর্চা ও প্রসাধনীর বৈচিত্র্য নিয়ে দর্শকদের নজর কেড়েছে নাদিয়ার ‘ব্লিসফুল বিউটি বাই নাদিয়া’। ফৌজিয়া শেখের ‘ফৌজিয়াস ক্লোসেট’ এবং টুম্পার ‘রিকস্টিউম জার্মানি’ স্টলে ছিল ট্রেন্ডি ও ঐতিহ্যবাহী পোশাকের চোখধাঁধানো সমাহার।
শুধু পোশাক নয়, খাবারের স্টলগুলোও ছিল উৎসবের প্রাণ। পুরো অনুষ্ঠানস্থলজুড়ে ভেসে বেড়াচ্ছিল দেশীয় মশলা, চা আর মিষ্টির সুবাস। যেন প্রবাসের মাটিতে বসেই সবাই ফিরে গিয়েছিলেন বাংলাদেশের কোন বৈশাখী উৎসবে।
‘খাই দাই (বিরিয়ানি)’ স্টলে পারভিন জাহাঙ্গীর পরিবেশন করেন সুস্বাদু বিরিয়ানি। তার রান্নার স্বাদ দর্শনার্থীদের মুগ্ধ করেছে। অনেকেই বলছিলেন, প্রবাসে থেকেও এমন দেশি স্বাদের বিরিয়ানি পাওয়া সত্যিই বিরল।
ডায়মণ্ড হীরার ‘টক ঝাল উৎসব ঘর’ ছিল নামের মতোই ব্যতিক্রমী। টক, ঝাল আর মশলাদার দেশীয় নানা খাবারে ভরপুর এই স্টলে দর্শনার্থীদের ভিড় ছিল সারাক্ষণ। খাবারের স্বাদ ও উপস্থাপনায় ছিল এক অনন্য আন্তরিকতা।
‘মিষ্টি ছোঁয়া বাই মিতা’-তে ইয়াসমিন আহমেদ নিয়ে আসেন নানা ধরনের দেশীয় মিষ্টান্ন। পিঠা, মিষ্টি এবং ডেজার্টের রঙিন আয়োজন যেন শৈশবের স্মৃতিকে ফিরিয়ে আনে সবার মনে।
শম্পা আহমেদের ‘মুসাওয়ির’স ফান’ ছিল শিশু-কিশোর ও পরিবারকেন্দ্রিক একটি আনন্দঘন আয়োজন। অন্যদিকে দীপা হাওলাদারের অংশগ্রহণও স্টলটিকে আরও প্রাণবন্ত করে তোলে।
‘মজুমদার চায়ের স্টল’-এ শিরীন মজুমদারের পরিবেশিত চা যেন আড্ডা আর গল্পের নতুন উপলক্ষ তৈরি করেছিল। এক কাপ ধোঁয়া ওঠা চায়ের সঙ্গে জমে উঠেছিল প্রবাসী বাংলাদেশিদের হাসি-আনন্দে ভরা মুহূর্ত।
‘খিচুড়ি কর্নার’-এ ফৌজিয়া হকের পরিবেশিত দেশীয় খিচুড়ি ও ভর্তার স্বাদ দর্শকদের বিশেষভাবে মুগ্ধ করে। সহজ অথচ হৃদয়ছোঁয়া এই আয়োজন যেন ঘরের খাবারের উষ্ণতাকেই মনে করিয়ে দেয়।
সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান ছিল পুরো আয়োজনের অন্যতম প্রাণকেন্দ্র। গান, কবিতা এবং নৃত্যে সাজানো পরিবেশনা অনুষ্ঠানটিকে এনে দেয় শিল্পসুষমার এক অনন্য মাত্রা। শিল্পীদের আন্তরিক পরিবেশনা দর্শকদের মুগ্ধ করে রাখে পুরো সময়জুড়ে।
সংগীতে অংশ নেন রিয়েল আনোয়ার, নিম্মি কাদের, মুক্তা খান, বাবুল খান এবং বাবুল তালুকদার। তাদের পরিবেশিত গানগুলো প্রবাসী দর্শকদের মনে জাগিয়ে তোলে দেশের স্মৃতি, ভালোবাসা ও আবেগ। বাংলা আধুনিক গান, লোকসংগীত এবং আবৃত্তির মিশেলে অনুষ্ঠানটি হয়ে ওঠে প্রাণবন্ত।
নৃত্যে অংশ নেন আয়েশা জামান আরশিকা। তার মনোমুগ্ধকর নৃত্য পরিবেশনা দর্শকদের মুগ্ধ করে এবং পুরো অনুষ্ঠানে এক নান্দনিক আবহ তৈরি করে।
অনুষ্ঠানের পরিচালনা ও সঞ্চালনায় ছিলেন নুরল আকন্দ খোকন। তার প্রাণবন্ত উপস্থাপনা, আন্তরিকতা এবং দর্শকদের সঙ্গে সহজ সংযোগ পুরো অনুষ্ঠানকে আরও উপভোগ্য করে তোলে। প্রতিটি পর্ব সুন্দরভাবে উপস্থাপনের মাধ্যমে তিনি অনুষ্ঠানটিকে সুসংগঠিত ও গতিময় রাখতে সক্ষম হন।
সব মিলিয়ে ‘পহেলা বৈশাখ’ ছিল শুধু একটি অনুষ্ঠান নয়; এটি ছিল প্রবাসে বসবাসরত বাংলাদেশিদের হৃদয়ের সংযোগস্থল। এখানে মানুষ শুধু কেনাকাটা বা খাবারের স্বাদ নিতেই আসেননি, বরং নিজেদের শেকড়, সংস্কৃতি ও পরিচয়কে নতুন করে অনুভব করতে পেরেছেন।
অনুষ্ঠানে অংশ নেওয়া অনেকেই বলেন, এমন আয়োজন প্রবাস জীবনের ব্যস্ততা ও একঘেয়েমির মধ্যে এক টুকরো স্বস্তি এনে দেয়। পরিবার-পরিজন নিয়ে আনন্দ করার পাশাপাশি নতুন প্রজন্মের কাছে বাংলা সংস্কৃতিকে তুলে ধরার ক্ষেত্রেও এই ধরনের অনুষ্ঠান অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
উদ্যোক্তারা জানান, অনুষ্ঠানে দর্শকদের ব্যাপক উপস্থিতি ও ইতিবাচক সাড়া তাদের অত্যন্ত অনুপ্রাণিত করেছে। ভবিষ্যতেও তারা আরও বড় পরিসরে এমন সাংস্কৃতিক ও সামাজিক আয়োজন করার পরিকল্পনা করছেন।
প্রবাসের মাটিতে বাংলা সংস্কৃতির এই উজ্জ্বল আয়োজন নিঃসন্দেহে দীর্ঘদিন দর্শক-শ্রোতাদের স্মৃতিতে জায়গা করে রাখবে। আন্তরিকতা, সৃজনশীলতা এবং দেশপ্রেমের এক অপূর্ব সম্মিলন ছিল ‘পহেলা বৈশাখ’। এমন আয়োজন বারবার ফিরে আসুক— এটাই এখন সবার প্রত্যাশা।