প্রবা প্রতিবেদক
প্রকাশ : ০২ ডিসেম্বর ২০২৩ ০৯:১৫ এএম
বিরোধীদলীয় নেতা ও জাতীয় পার্টির (জাপা) প্রধান পৃষ্ঠপোষক রওশন এরশাদ। ফাইল ছবি
নানা নাটকীয়তা সত্ত্বেও শেষ পর্যন্ত দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে প্রার্থিতার জন্য মনোনয়ন ফরম নেননি বিরোধীদলীয় নেতা ও জাতীয় পার্টির (জাপা) প্রধান পৃষ্ঠপোষক রওশন এরশাদ। ফলে বিদ্যমান পরিস্থিতিতে তার দ্বাদশ সংসদ নির্বাচনে অংশ নেওয়ার আর সুযোগ নেই। এর মধ্য দিয়ে ৩২ বছর পর রওশনকে ছাড়াই নির্বাচনে অংশ নিতে যাচ্ছে জাপা। রওশনের মতো এরশাদপুত্র সাদ এরশাদও এবার নির্বাচনে নেই। একই সঙ্গে রওশন অনুসারী জাপা নেতাদেরও মনোনয়ন দেওয়া হয়নি। তবে তাদের মধ্যে কেউ কেউ স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে মনোনয়নপত্র জমা দিয়েছেন। এ অবস্থায় প্রশ্ন জাগছেÑ এখন কী করবেন রওশন এরশাদ।
জাপার একাধিক শীর্ষ নেতার সঙ্গে আলাপ করে জানা গেছে, জি এম কাদের ও রওশন এরশাদের মধ্যে দা-কুমড়া সম্পর্ক বেশ পুরোনো। এর আগেও বিভিন্ন সময়ে দ্বন্দ্ব দেখা দিয়েছিল। তবে গত কয়েক বছর প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার হস্তক্ষেপে তা সুরাহা হয়। সর্বশেষ বিরোধী দলের নেতার পদ থেকে রওশনকে সরিয়ে দিয়ে জাপা থেকে উদ্যোগ নেওয়া হয়। প্রধানমন্ত্রীর হস্তক্ষেপে সে যাত্রায় রক্ষা পান তিনি।
সর্বশেষ মনোনয়ন নিয়ে জাপায় যে নাটক চলছিল, তাতেও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা হস্তক্ষেপ করবেন এমন একটা আশা রওশনপন্থিদের ছিল। কিন্তু সেটি হয়নি। এতে করে নির্বাচন থেকেই ছিটকে গেলেন রওশন। শারীরিকভাবে অসুস্থ ৮২ বছর বয়সি রওশন এখান থেকে কী ঘুরে দাঁড়াতে পারবেন, নাকি শেষ হতে যাচ্ছে তার রাজনৈতিক ক্যারিয়ারÑ এমন প্রশ্ন অনেকের।
রওশনবিরোধী জাপার এক নেতার মতে, রওশন এরশাদের রাজনীতির মূল শক্তি ছিল ‘প্রধানমন্ত্রীর ছায়া’। এর আগে প্রধানমন্ত্রীর হস্তক্ষেপে জাপার অনেক বিষয় সমাধান হলেও এবার তা হয়নি। ওই নেতা জানান, মনোনয়ন চূড়ান্ত হওয়ার আগে একাধিকবার প্রধানমন্ত্রীর সাক্ষাৎ চেয়েও পাননি বিরোধীদলীয় নেতা। এতে খোদ রওশন এরশাদও হতাশ হয়েছেন। নেতাদের প্রত্যাশা ছিল, প্রধানমন্ত্রীর হস্তক্ষেপে নিজেদের মধ্যে একটা সমঝোতা হবে। আর এতে অন্তত ১০ থেকে ১৫টি আসন তারা পাবেন। কিন্তু ৩টির বেশি আসন ছাড় দিতে চাননি জি এম কাদের। প্রধানমন্ত্রীর সাড়া না পেয়ে ক্ষোভে সেই ৩ আসনেও মনোনয়ন নেননি তারা। একপর্যায়ে তার জন্য ফাঁকা রাখা আসনেও প্রার্থী দিয়ে দেয় জাপা। এমনকি ছেলে সাদ এরশাদসহ রওশনের অনুসারী কোনো নেতাকেই প্রার্থী করেনি জাতীয় পার্টি। ফলে নিজ দলেই কোণঠাসা হয়ে পড়েন রওশনপন্থিরা।
জাপার আরেক নেতা জানান, প্রধানমন্ত্রীর ‘ছায়া’ উঠে যাওয়ায় দলে দুর্বল হয়ে পড়েন রওশনপন্থিরা। এখন যে যার মতো নিজের আখের গোছাতে ব্যস্ত হয়ে পড়েছেন। এ নিয়ে মুখ খোলেননি রওশন এরশাদও। রওশনপন্থি এক নেতা জানান, ‘আমরা তো কাউকে মনোনয়ন দিতে পারিনি। এখন কেউ স্বতন্ত্র প্রার্থী হলে আমরা না করতে পারি না। ম্যাডামও কাউকে কিছু বলছেন না।’
এ পরিস্থিতির মধ্যে জাপার সাবেক মহাসচিব ও বিরোধীদলীয় চিফ হুইপ মসিউর রহমান রাঙ্গা রংপুর-১ আসন থেকে, ব্রাহ্মণবাড়িয়া-২ আসনে জিয়াউল হক মৃধা এবং লক্ষ্মীপুর-১ (রামগঞ্জ) আসনে স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে মনোনয়ন নিয়েছেন সাবেক এমপি এম এ গোফরান। এ ছাড়া সম্মেলন প্রস্তুতি কমিটির (রওশন) যুগ্ম আহ্বায়ক শাহ জামাল রানা বিএনএম থেকে মনোনয়ন নিয়েছেন। তিনি ব্রাহ্মণবাড়িয়া-৩ আসন থেকে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী আন্দোলনের (বিএনএম) প্রার্থী হয়েছেন। তারা সবাই দলে রওশনপন্থি হিসেবে পরিচিত এবং মনোনয়ন চূড়ান্ত হওয়ার আগ পর্যন্ত রওশন এরশাদের পক্ষেই ছিলেন।
গতকাল শুক্রবার সন্ধ্যায় শাহ জামাল রানা বলেন, ‘দীর্ঘদিন ম্যাডামের (রওশন) সঙ্গে আছি। অপেক্ষাও কম করিনি। এখন পরিস্থিতির আলোকে সিদ্ধান্ত নিতে হয়েছে।’
তিনি আরও বলেন, ‘এলাকায় নেতাকর্মীদের একটা প্রত্যাশা থাকে। তাদের প্রত্যাশা পূরণের জন্যই নির্বাচনে অংশ নিচ্ছি।’
প্রার্থী হওয়ার আগে প্রায় একই রকম কথা বলেছিলেন মসিউর রহমান রাঙ্গাও। তা ছাড়া গতকাল রওশনপন্থি আরও তিনজন নেতার সঙ্গে কথা হয় প্রতিদিনের বাংলাদেশের। তাদের দুজনই নিজেদের রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ নিয়ে কিছু বলতে পারেননি। সামনে কী করবেন, তা-ও নিশ্চিত করে বলতে পারছেন না।
তবে বিরোধীদলীয় নেতার রাজনৈতিক সচিব গোলাম মসীহ বলেছেন, এক-দুই দিনের মধ্যে নতুন কর্মসূচি ঘোষণা করা হবে। এ লক্ষ্যে শনিবার (আজ) নেতাদের সঙ্গে বৈঠক করতে পারেন রওশন এরশাদ।
সম্মেলন প্রস্তুতি কমিটির যুগ্ম আহ্বায়ক ইকবাল হোসেন রাজু বলেন, ‘এখনও কর্মসূচির বিষয়ে কোনো কিছু শুনিনি। সামনে কী হবে, তা নিয়ে কোনো আলোচনা হয়নি। তবে দুই-এক দিনের মধ্যে একটা সিদ্ধান্ত আসতে পারে।’
এর আগে গত বুধবার রাতে জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যান জি এম কাদের ও মহাসচিব মুজিবুল হক চুন্নুর বিরুদ্ধে অসহযোগিতার অভিযোগ এনে আগামী জাতীয় নির্বাচনে অংশ না নেওয়ার ঘোষণা দেন রওশন এরশাদ।
এর কারণ হিসেবে তিনি জানান, দলের পরীক্ষিত নেতারা মনোনয়ন না পাওয়ায় এ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। ২০১৪ ও ২০১৮ সালের মতো এবারও নির্বাচনে অংশগ্রহণের প্রস্তুতি নিয়েছিলেন বলেও জানান তিনি।
দশম ও চলতি একাদশ জাতীয় সংসদে টানা বিরোধীদলীয় নেতার দায়িত্ব পালন করছেন রওশন এরশাদ।