প্রবা প্রতিবেদন
প্রকাশ : ২৫ সেপ্টেম্বর ২০২২ ২১:৪০ পিএম
আপডেট : ২৬ সেপ্টেম্বর ২০২২ ১৩:৪৮ পিএম
সহ-সভাপতি জান্নাতুল ফেরদৌসের ওপর হামলার পর শনিবার মাঝরাতে প্রতিবাদ করেন শিক্ষার্থীরা। ছবি : সংগৃহীত
ঢাকার ইডেন কলেজ ছাত্রলীগের দুই প্রধান নেত্রী—সভাপতি তামান্না জেসমিন ওরফে রীভা ও সাধারণ সম্পাদক রাজিয়া সুলতানা—কলেজ প্রশাসনের চেয়ে বেশি শক্তিশালী দাবি করে তাদের বিরুদ্ধে নানা অভিযোগ তুলেছেন সংগঠনটির বেশিরভাগ নেত্রী। রীভা-রাজিয়াকে ক্যাম্পাসে অবাঞ্ছিত ঘোষণা করেছেন তারা। তাদের বিরুদ্ধে কেন্দ্রীয় কমিটি কোনো ব্যবস্থা না নিলে পদত্যাগেরও হুমকি দিয়েছেন ২৫ নেত্রী। সর্বশেষ শনিবার রাতে সংগঠনটির সহ-সভাপতি জান্নাতুল ফেরদৌসের ওপর অতর্কিত হামলা করায় তারা ক্ষোভে ফেটে পড়েন।
রবিবার (২৫ সেপ্টেম্বর) দুপুরে সংবাদ সম্মেলনে তারা এই ক্ষোভ দেখান। কলেজের বঙ্গমাতা শেখ ফজিলাতুন নেছা মুজিব ছাত্রীনিবাসে সংবাদ সম্মেলনে তারা বলেন, শনিবার রাত সাড়ে ১০টার দিকে সংগঠনটির সহ-সভাপতি জান্নাতুল ফেরদৌসের ওপর অতর্কিত হামলা হয়। রীভা ও রাজিয়ার উপস্থিতিতে তাদের অনুসারীরা হযরত আয়েশা সিদ্দিকা (রা.) ছাত্রীনিবাসের সামনে এই হামলা করেন। হামলাকারীরা আয়েশাসহ তিনজনের কাছ থেকে বিভিন্ন মূল্যবান জিনিসপত্র ছিনিয়ে নিয়ে রীভা ও রাজিয়াকে দেন। ছিনিয়ে নেওয়া জিনিসের মধ্যে মোবাইল ফোন, সোনার হার, ১৫ হাজার টাকা ও সোনার আংটি রয়েছে। জান্নাতুল ফেরদৌসের গলা থেকে সোনার হার এবং আরেকজনের হাত থেকে সোনার আংটি ছিনিয়ে নেওয়া হয়। এর আগে জান্নাতুল ফেরদৌসের কক্ষেও তারা হামলা চালিয়ে ল্যাপটপসহ বিভিন্ন জিনিসপত্র লুট করেন বলে অভিযোগ করা হয় সংবাদ সম্মেলনে।
শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানটির ছাত্রলীগ নেত্রীরা জানান, গত ২২ সেপ্টেম্বর রীভা ও রাজিয়ার বিরুদ্ধে কলেজে সিটবাণিজ্য ও চাঁদাবাজিসহ বিভিন্ন বিষয়ে গণমাধ্যমে সাক্ষাৎকার দেন সহ-সভাপতি জান্নাতুল ফেরদৌস। এ কারণে তার প্রতি ক্ষুব্ধ হন রীভা ও রাজিয়া। জান্নাতুল ফেরদৌসের ওপর হামলার পর শনিবার মধ্যরাত থেকে কলেজ ছাত্রলীগের দুই পক্ষ মুখোমুখি অবস্থান নেয়। এতে ক্যাম্পাসে উত্তেজনা ছড়ায়।
সংবাদ সম্মেলনে কলেজ ছাত্রলীগের ৪৮ সদস্যের কমিটির ২৫ নেত্রী উপস্থিত হন। তাদের মধ্যে সহ-সভাপতি জান্নাতুল ফেরদৌস ও সাংগঠনিক সম্পাদক সামিয়া আক্তার ওরফে বৈশাখীও ছিলেন। লিখিত বক্তব্যে সামিয়া অন্য বিভিন্ন বিষয়েও অভিযোগ করেন। তিনি বলেন, রীভা ও রাজিয়া বিভিন্নভাবে ছাত্রীদের কুপ্রস্তাব দিয়েছেন। তারা ক্যানটিনে চাঁদাবাজি করেন। ইন্টারনেট সার্ভিস থেকে এবং ক্যাম্পাসের মুদিদোকানেও চাঁদাবাজি করেন। অবৈধভাবে শতাধিক কক্ষ দখল করে চাঁদাবাজিরও অভিযোগ করা হয় সংবাদ সম্মেলনে।
তারা বলেন, এসব অত্যাচার বিষয়ে দায়িত্বপ্রাপ্ত নেতাদের জানিয়েও প্রতিকার না পাওয়ায় সংবাদ সম্মেলন করে তারা এই অভিযোগ তুলে ধরছেন। এ সময় তারা জান্নাতুল ফেরদৌসের ওপর হামলায় সাংগঠনিক ব্যবস্থা গ্রহণ, সাধারণ শিক্ষার্থীদের হেনস্তার বিচার, কলেজের অধ্যক্ষ সুপ্রিয়া ভট্টাচার্যকে নিয়ে অসম্মানজনক বক্তব্যের বিচার, চাঁদাবাজি বন্ধ, ছাত্রীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা, জান্নাতুল ফেরদৌসের যেসব আপত্তিকর ছবি তোলা হয়েছে তা সবার সামনে সব জায়গা থেকে মুছে ফেলা, ছিনিয়ে নেওয়া সব জিনিস বুঝিয়ে দেওয়াসহ আটটি দাবি জানান।
দাবি না মানলে সত্যি সত্যি পদত্যাগ কি না—সাংবাদিকরা এমন প্রশ্ন করলে সবাই একযোগে ‘ইয়েস ইয়েস’ বলে উত্তর দেন। সহ-সভাপতি মার্জানা আক্তার ঘোষণা দেন, সহ-সভাপতি, যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক ও সাংগঠনিক সম্পাদকসহ ২৫ জন এই সংবাদ সম্মেলনে আছেন। সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক পদত্যাগ না করলে তারা একসঙ্গে পদত্যাগ করবেন।
আরেক নেত্রী বলেন, ‘এমন নোংরা রাজনীতি আমরা করতে চাই না।’ সাংগঠনিক সম্পাদক সামিয়া আক্তার বলেন, ‘প্রতিকার না পেলে আমরা সবাই গণহারে পদত্যাগ করব। ক্যাম্পাসে সুষ্ঠু পরিবেশ বজায় রাখতে সাধারণ শিক্ষার্থীদের আমরা আমাদের মতো করে সাহায্য করব।’
সহ-সভাপতি জান্নাতুল ফেরদৌস তার ওপর হামলার ঘটনায় প্রশাসনের কাছে অভিযোগ দিয়েছেন।
সংবাদ সম্মেলনের প্রতিক্রিয়ায় ক্যাম্পাসে দুই পক্ষের ধাওয়া-পাল্টা-ধাওয়াসহ মারামারি হয়েছে। এতে অন্তত ১০ জন আহত হয়েছেন। তাদের কয়েকজনকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে। আহতদের মধ্যে সভাপতি রীভা ও যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক রিতু আক্তার রয়েছেন বলে জানিয়েছেন হাসপাতাল পুলিশ ফাঁড়ির ইনচার্জ পরিদর্শক মো. বাচ্চু মিয়া। বাচ্চু মিয়া জানান, রবিবার সন্ধ্যা সাড়ে ৬টার দিকে কলেজ কর্তৃপক্ষ অ্যাম্বুলেন্সে করে রীভাকে হাসপাতালে নেন। তাকে জরুরি বিভাগে ভর্তি করা হয়।
কলেজের শিক্ষিকা মোসাম্মৎ নার্গিস আক্তার বলেন, দুই পক্ষের সংঘর্ষে রীভা ও রিতু আক্তার আহত হলে তারা তাদের উদ্ধার করে হাসপাতালের জরুরি বিভাগে নিয়ে আসেন।
তদন্ত কমিটি
কলেজটির এসব ঘটনা তদন্তে দুই সদস্যের কমিটি গঠন করেছে বাংলাদেশ ছাত্রলীগ। বাংলাদেশ ছাত্রলীগের সভাপতি আল নাহিয়ান খান জয় ও সাধারণ সম্পাদক লেখক ভট্টাচার্য স্বাক্ষরিত এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়েছে, কেন্দ্রীয় ছাত্রলীগের সহ-সভাপতি তিলোত্তমা শিকদার ও কেন্দ্রীয় ছাত্রলীগের যুগ্ম-সাধারণ সম্পাদক বেনজির হোসেন নিশিকে নিয়ে দুই সদস্যবিশিষ্ট এই কমিটি গঠন করা হয়েছে।
বাংলাদেশ ছাত্রলীগের দপ্তর সম্পাদক ইন্দ্রনীল দেব শর্মা রনি প্রতিদিনের বাংলাদেশকে বলেন, ‘ইডেনের ঘটনার জন্য এরই মধ্যে তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। এই কমিটিকে তদন্ত করে প্রতিবেদন দিতে বলা হয়েছে।’
প্রবা/টিকে/এমজে