এনসিপির লোগো
বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের পথ ধরে জুলাই গণঅভ্যুত্থানে অংশগ্রহণকারী তরুণদের একাংশের উদ্যোগে ২০২৫ সালের ২৮ ফেব্রুয়ারি গড়ে ওঠে জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি)। বিদ্যমান রাজনৈতিক দুর্বৃত্তায়ন ও অবক্ষয়ের বদলে ‘নতুন রাজনৈতিক বন্দোবস্তের’ প্রতিশ্রুতিতে প্রতিষ্ঠার পর থেকেই দেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে আলোচিত এই দল। প্রতিষ্ঠার এক বছরের মধ্যেই জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ২৯টি আসনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে ৬টি আসনে জয়ী হয়ে এবং ২টি সংরক্ষিত নারী আসন পাওয়ায় দলটি রাজনীতির মাঠেও আর উপেক্ষণীয় নয়। দলটি থেকে পদত্যাগ ও বহিষ্কারের খড়্গে চল্লিশ জনের বেশি কেন্দ্রীয় নেতা চলে গেলেও দলটির কার্যক্রম থেমে নেই। বরং কোনো কোনো ক্ষেত্রে সাংগঠনিক পরিসর বাড়ছে।
তিনটি স্তরে পুনর্গঠিত করা হবে দলকে
এনসিপি সূত্রে জানা গেছে, এরই মধ্যে তারা দুটি সহযোগী সংগঠন (‘জাতীয় ছাত্রশক্তি’ ও ‘জাতীয় শ্রমিক শক্তি’) ও দুটি অঙ্গসংগঠন (‘জাতীয় যুবশক্তি’ ও ‘জাতীয় নারীশক্তি’) গড়ে তুলেছে। অচিরেই আত্মপ্রকাশ করবে ‘জাতীয় কৃষক শক্তি’ ও ‘জাতীয় স্বেচ্ছাসেবক শক্তি’ নামে আরও দুটি সহযোগী সংগঠন। যে লক্ষ্যে বেশ কয়েক দফায় বিভিন্ন রাজনৈতিক দল, সংগঠন ও ব্যক্তিদের দলে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। সামনে আরও কয়েক দফায় বিভিন্ন রাজনৈতিক ও সামাজিক অঙ্গনের ব্যক্তিদের অন্তর্ভুক্ত করার পরিকল্পনা রয়েছে এনসিপির। এ উদ্দেশ্যে দলের হাইকমান্ড গঠন করেছে ‘ন্যাশনাল সার্চ কমিটি’। সাংগঠনিক জটিলতা ও দায়িত্বের দ্বন্দ্ব এড়াতে ‘পলিটিক্যাল কাউন্সিল’, ‘নির্বাহী পরিষদ’, ‘কেন্দ্রীয় কমিটি’Ñ এই তিন স্তরে দল পুনর্গঠনের সিদ্ধান্ত নিয়েছে দলটির নীতিনির্ধারকরা। কাজের ধারাবাহিকতা রক্ষার স্বার্থে বর্তমান আহ্বায়ক কমিটির মেয়াদও বাড়াচ্ছে এনসিপি। ঘরোয়া কর্মসূচির পাশাপাশি সাম্প্রতিক সময়ের বিভিন্ন ইস্যু নিয়েও মাঠের রাজনীতিতে আরও সক্রিয় হয়ে উঠেছে দলটির নেতাকর্মীরা।
এককভাবে স্থানীয় সরকার নির্বাচনের প্রস্তুতি
স্থানীয় সরকার পর্যায়ের নির্বাচনগুলোতে অংশগ্রহণের মধ্য দিয়ে সংগঠনকে বিস্তৃত করার প্রস্তুতিও নিচ্ছে এনসিপি। এ লক্ষ্যে জাতীয় কমিটি গঠনের পাশাপাশি জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে সাংগঠনিক কাঠামোর পরিধি বাড়ানোর জন্য দলটি ইতোমধ্যেই সারা দেশের ১০০টি উপজেলা ও পৌরসভার চেয়ারম্যান প্রার্থী ঘোষণা করেছে। এর আগে দলটি ঢাকা দক্ষিণ ও উত্তর সিটি করপোরেশনসহ দেশের পাঁচটি সিটি করপোরেশনের মেয়র পদেও প্রার্থী ঘোষণা করেছে। এভাবে ছোটদের এনসিপি চেষ্টা করছে ধীরে ধীরে বড় হয়ে ওঠার।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে দলটির সদস্য সচিব আখতার হোসেন প্রতিদিনের বাংলাদেশকে বলেন, ‘আমাদের সাংগঠনিক ভিত্তিকে মজবুত করার স্বার্থে আমাদের কেন্দ্রীয় নেতারা সারা দেশের গ্রাম-গঞ্জ পর্যন্ত সফর করবেন। ইতোমধ্যে সেই সফর শুরু হয়েছে। ধীরে ধীরে এ সফর আরও বাড়বেÑ এ ধরনের একটা পরিকল্পনা আমাদের আছে। খুব অল্প সময়ের মধ্যেই আমরা ব্যাপকভাবে একেবারে স্থানীয় পর্যায় পর্যন্ত, প্রান্তিক পর্যায় পর্যন্ত পৌঁছে যাব।’
দলের সাংগঠনিক বিস্তৃতি ও স্থানীয় সরকার নির্বাচন প্রসঙ্গে সদস্য সচিব বলেন, ‘এনসিপি এবং জামায়াতে ইসলামীÑ আমরা জাতীয় নির্বাচনের প্রেক্ষাপটে নির্বাচনী ঐক্যের মধ্যে আছি। সংসদীয় ক্ষেত্রে তার একটা রিফ্লেকশনও আছে। কিন্তু স্থানীয় সরকার নির্বাচনের ক্ষেত্রে এনসিপি মনে করছে, এককভাবেই প্রস্তুতি নেওয়া প্রয়োজন। সেই প্রয়োজনীয়তা থেকেই আমরা এককভাবে প্রস্তুতি নিতে শুরু করেছি এবং প্রার্থী ঘোষণাও শুরু করেছি। যদি নির্বাচনের আগে নানা কারণে জোটের প্রয়োজনীয়তা অনুভূত হয়, সে সময় আমরা সে ব্যাপারেও চিন্তা করব।’
সিটি করপোরেশনের পাশাপাশি উপজেলাতেও প্রার্থী চূড়ান্তের প্রক্রিয়া চলছে জানিয়ে এনসিপির সদস্য সচিব বলেন, ‘শুধু সিটি করপোরেশন না, স্থানীয় সরকারের উপজেলা পর্যায়ে যারা নির্বাচনে অংশ নেবেন, তাদের ব্যাপারেও আমাদের একটা কমিটি হয়েছে। উপজেলা পর্যায়ে আমরা অলরেডি আমাদের ১০০ জন প্রার্থীর তালিকা ঘোষণা করেছি। আমাদের উত্তরাঞ্চলের মুখ্য সংগঠক সারজিস আলম। তাকে মূলত উপজেলার প্রার্থী চূড়ান্তের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। আমরা ধাপে ধাপে প্রার্থী ঘোষণা করছি।’
রাজনৈতিক অবস্থান এখনও স্পষ্ট নয়
এদিকে রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা এনসিপিকে ক্রমবর্ধমান রাজনৈতিক শক্তি হিসেবে দেখলেও এর জাতীয় বিস্তার এবং সুনির্দিষ্ট আদর্শিক ভিত্তি প্রতিষ্ঠার ওপর বিশেষ গুরুত্বারোপ করেছেন। তারা বলছেন, সবার আগে এনসিপির যেটা দরকার সেটা হলোÑ একটি স্পষ্ট এবং সর্বজনীন বয়ান (Narrative) বা দলীয় আদর্শ তৈরি করা। যে বয়ান বা আদর্শের সঙ্গে দেশের সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষ বা মেজরিটি জনগণ নিজেদের সম্পৃক্ত করতে পারবে। দলটিতে বিভিন্ন মতাদর্শের মানুষের সমাগম ঘটেছে। দলটির সুনির্দিষ্ট আদর্শিক ভিত্তি ও রাজনৈতিক অবস্থান এখনও সুস্পষ্টভাবে দৃশ্যমান নয়।
এ প্রসঙ্গে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের সরকার ও রাজনীতি বিভাগের সাবেক শিক্ষক, অধ্যাপক ড. দিলারা চৌধুরী বলেন, ‘দল তৈরি করতে ডেডিকেশন লাগে। আদর্শিক বয়ান (ন্যারেটিভ) তৈরি করা লাগে। এই বয়ান আগে তৈরি করতে হবে, তারপর তৃণমূলের জনগণের কাছে যেতে হবে। জনগণ এই বয়ান বা দলীয় আদর্শ দেখে অন্যদল থেকে তাদের আলাদা করতে পারবে এবং দলে যোগ দেবে। আমি মনে করি, এনসিপি এটা এখনও করতে পারেনি।’
তৃণমূল হলো একটা দলের সবচেয়ে বড় শক্তি উল্লেখ করে দিলারা চৌধুরী বলেন, ‘এই মুহূর্তে দেশের একটা ভালো রাজনৈতিক দল প্রয়োজন। যে দলের সবাই দেশপ্রেম, সততা, নিষ্ঠার পাশাপাশি নারী-পুরুষ সকলের কাছে একটা ইউনিভার্সাল মেসেজ দেবে। সবার আশা-আকাঙ্ক্ষা তুলে ধরবে। এদিক থেকে এনসিপি ভালো প্লাটফর্ম। কিন্তু তারা তৃণমূলের শক্তিতে এখনও বলীয়ান হতে পারেনি। এই শক্তি অর্জন করতে হবে। এটা এক রাতে হবে না। দলটি একটা মাত্র নির্বাচন করেছে, সামনে স্থানীয় সরকার নির্বাচনে অংশ নেবে। তাতে দলের আরও পরিচিতি বাড়বে।’
পুরনো রাজনৈতিক দলগুলোর ওপর জনগণের অনাস্থার উল্লেখ করে অধ্যাপক দিলারা চৌধুরী বলেন, ‘এখন নতুন নেতৃত্ব চাই।’ এনসিপি সেই আশা পূরণ করবে বলে তিনি প্রত্যাশা প্রকাশ করেন। এনসিপিকে বড় দল হিসেবে টিকে থাকতে হলে উগ্র বাম (Ultra-Left) এবং উগ্র ডান (Ultra-Right) মতাদর্শের অনুসারীদের থেকে সাবধান হতে হবে বলেও পরামর্শ দেন।
এ প্রসঙ্গে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক ড. সাব্বির আহমেদ বলেন, ‘জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ছয় জন সদস্য নির্বাচিত হওয়ার পর এনসিপি এখন একটি বড় দল হয়ে ওঠার প্রক্রিয়ায় রয়েছে। তবে একটি দলকে সত্যিকার অর্থে ‘জাতীয় রাজনৈতিক দল’ হিসেবে গণ্য হতে হলে কেবল ঢাকাকেন্দ্রিক হলে চলবে না, বরং দলটির নেটওয়ার্ক প্রান্তীয় অঞ্চলেও ছড়িয়ে পড়তে হবে।
অধ্যাপক ড. সাব্বির বলেন, ‘এনসিপি বর্তমানে রাজনীতিতে আগ্রহী তরুণদের জন্য একটি ভালো প্লাটফর্ম। দলটি একটি ‘লিবারেল আইডোলজিক্যাল ক্রাউড’ বা উদারপন্থী আদর্শের মধ্যে আছে। জাতীয় সংসদ নির্বাচনের মধ্য দিয়ে দলটির একটি বাইট তৈরি হয়েছে। তাদের আরও বিস্তৃত হওয়ার সুযোগ আছে। তবে যতক্ষণ পর্যন্ত সারা দেশে নেটওয়ার্ক তৈরি না হবে, ততক্ষণ পর্যন্ত দলটি জাতীয় পর্যায়ের দল হয়ে উঠবে না বা একে জাতীয় পর্যায়ের দল বলা যাবে না।’
তিনি বলেন, ‘দলটি সংসদ নির্বাচন করেছে। এখন স্থানীয় নির্বাচনে যদি ভালো সংখ্যায় নির্বাচিত হয় কিংবা প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে, তাহলে বলা যাবে, এনসিপির একটা গ্রহণযোগ্যতা তৈরি হচ্ছে। ভবিষ্যতে আরও হবে। তবে এর আগে এনসিপিকে তার আদর্শিক অবস্থান জনগণের কাছে দৃশ্যমান বা পরিষ্কার করতে হবে।’