শরিফুল খান প্লাবন
প্রকাশ : ০৮ মে ২০২৬ ১২:২২ পিএম
ছবি: প্রতিদিনের বাংলাদেশ
ফেব্রুয়ারি ২০২৬-এর জাতীয় সংসদ নির্বাচন বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে একটি উল্লেখযোগ্য মোড় নিয়ে এসেছে। বিএনপি দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করেছে, কিন্তু যে ফলাফল সবচেয়ে বেশি আলোচনা তৈরি করেছে তা হলো জামায়াতে ইসলামীর অভূতপূর্ব সাফল্য। মাত্র দুই বছর আগে নিষিদ্ধ একটি সংগঠন আজ সংসদে ৬৮টি আসন নিয়ে তৃতীয় বৃহত্তম শক্তি হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে। জুলাই অভ্যুত্থানের সময় যে লাখ লাখ তরুণ একটি ধর্মনিরপেক্ষ, অন্তর্ভুক্তিমূলক বাংলাদেশের স্বপ্ন দেখেছিল, এই রাজনৈতিক বাস্তবতা সেই স্বপ্নের সাথে কীভাবে খাপ খায় এটি এখন বাংলাদেশের চিন্তাশীল জনগোষ্ঠীর জন্য একটি জরুরি প্রশ্ন।
এই উত্থান সম্পূর্ণভাবে অপ্রত্যাশিত নয়। এটি একাধিক কারণের সংমিশ্রণের ফলাফল। প্রথমত, দীর্ঘদিনের নিষেধাজ্ঞার পর জামায়াত সাংগঠনিকভাবে পুনরুজ্জীবিত হয়েছে এবং তাদের সংগঠকদের নেটওয়ার্ক পুনরায় সক্রিয় করতে সক্ষম হয়েছে। তৃণমূল পর্যায়ে তাদের উপস্থিতি এবং সাংগঠনিক শৃঙ্খলা অনেক প্রতিষ্ঠিত দলের চেয়ে বেশি কার্যকর প্রমাণিত হয়েছে। আওয়ামী লীগ যখন রাজনৈতিক সংকটে ভুগছিল, তখন জামায়াত নীরবে তার অবকাঠামো এবং সংগঠন শক্তিশালী করছিল।
দ্বিতীয়ত, ছাত্র রাজনীতিতে তাদের প্রভাব অনস্বীকার্য। সেপ্টেম্বর ২০২৫-এ ঢাকা এবং জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়সহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের ছাত্র সংসদ নির্বাচনে ইসলামী ছাত্রশিবির উল্লেখযোগ্য সাফল্য পায়। এই ফলাফল শুধুমাত্র ছাত্র রাজনীতির একটি ঘটনা নয় এটি যুবসমাজের মধ্যে জামায়াতের ক্রমবর্ধমান আবেদন প্রকাশ করে। বিশেষ করে যারা জুলাই অভ্যুত্থানে সক্রিয় ছিল, তাদের একটি অংশ এখন জামায়াতকে একটি সুসংগঠিত এবং স্পষ্ট দৃষ্টিভঙ্গিসম্পন্ন সংগঠন হিসেবে দেখতে শুরু করেছে।
তৃতীয়ত, আওয়ামী লীগের অনুপস্থিতি একটি বিশাল রাজনৈতিক শূন্যতা তৈরি করেছে। জামায়াত যে ৩১.৭৬ শতাংশ ভোট পেয়েছে তা কেবল সংখ্যার বিষয় নয়; এটি নির্দিষ্ট ভৌগোলিক অঞ্চল এবং জনতাত্ত্বিক গোষ্ঠীর পছন্দ প্রতিফলিত করে।
একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো যে জামায়াতের এই উত্থান মূলত সেক্যুলার এবং প্রগতিশীল রাজনৈতিক শক্তিগুলোর নিজেদের সীমাবদ্ধতার একটি প্রতিফলন। বহুদিন ধরে তারা আদর্শগত প্রশ্নগুলোকে দৃঢ়তার সাথে সংজ্ঞায়িত করতে পারেনি। ধর্মনিরপেক্ষতা শুধু আওয়ামী লীগের সংবিধানে সীমাবদ্ধ থাকলে, কোনো কার্যকর রাজনৈতিক শক্তি হিসেবে কাজ করে না। একই সাথে, বিরোধীপক্ষের সাথে রাজনৈতিক জোট দীর্ঘমেয়াদে ইসলামপন্থী রাজনীতিকে শক্তিশালী করে যায়।
এখন প্রশ্ন হলো, জামায়াতে ইসলামী সংসদে প্রধান বিরোধী দল হিসেবে কী ভূমিকা পালন করবে? এটি দায়িত্বশীল সংসদীয় রাজনীতির নিয়ম মেনে চলবে, নাকি আদর্শগত অবস্থানকে প্রাধান্য দেবে? সংবিধান সংস্কার এবং আইন প্রণয়নে জামায়াতের অবস্থান এখানে সিদ্ধান্তমূলক হবে। বিএনপির দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা থাকায় সরকারের ওপর সরাসরি চাপ কম থাকতে পারে, কিন্তু সাংবিধানিক পরিবর্তনে কোনো সর্বসম্মত পদ্ধতি গ্রহণ করা হলে জামায়াতের সহযোগিতা বা বিরোধিতা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে। বিশেষত সংখ্যালঘু অধিকার, নারী শিক্ষা নীতি এবং পারিবারিক আইনের বিষয়ে তাদের অবস্থান সামাজিক সামঞ্জস্য বা বিভাজন উভয়ই সৃষ্টি করতে পারে।
একই সাথে, আন্তর্জাতিক দৃষ্টিভঙ্গি থেকে এই পরিস্থিতি জটিল। পশ্চিমা বিনিয়োগকারী এবং আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানগুলো এমন একটি রাজনৈতিক পরিবেশে সতর্কতার সাথে পদক্ষেপ নেয় যেখানে ইসলামপন্থী শক্তি সংসদে উল্লেখযোগ্য প্রভাব রাখে। চীনের সাথে অর্থনৈতিক সম্পর্ক এবং পশ্চিমার সাথে কূটনৈতিক সংযোগ উভয়ই এই পরিবর্তনের সাথে সামঞ্জস্য খুঁজে নিতে হবে।
তবে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নটি হলো, বাংলাদেশের গণতন্ত্র কি বৈচিত্র্যময় রাজনৈতিক মতামতকে সংসদীয় কাঠামোর মধ্যে সহাবস্থান করতে পারে? গণতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থার পরিপক্বতা বিভিন্ন দর্শনের দলগুলোর গণতান্ত্রিক নিয়ম মেনে চলার ক্ষমতায় নির্ভর করে। এই মুহূর্তে সেক্যুলার এবং প্রগতিশীল রাজনৈতিক শক্তিগুলোর জন্য চ্যালেঞ্জ এবং সুযোগ উভয়ই রয়েছে। তাদের আরও শক্তিশালী, আধুনিক এবং যুববান্ধব রাজনৈতিক কর্মসূচি তৈরি করতে হবে। যুবসমাজের প্রকৃত আকাঙ্ক্ষা কর্মসংস্থান, শিক্ষা, সামাজিক ন্যায়বিচার এবং অর্থনৈতিক সুযোগ এগুলো পূরণের জন্য কংক্রিট পরিকল্পনা প্রয়োজন। শুধু আদর্শগত বিবৃতি যথেষ্ট নয়। একই সাথে, জামায়াতের জন্য এটি প্রমাণ করার একটি ঐতিহাসিক সুযোগ যে একটি ইসলামী দার্শনিক ভিত্তিপ্রাপ্ত সংগঠনও গণতান্ত্রিক নীতিকানুন মেনে চলতে পারে, প্রতিযোগিতা চালাতে পারে এবং সংখ্যালঘুদের অধিকার সমান করতে পারে।
বাংলাদেশ এখন একটি গুরুত্বপূর্ণ সংক্রমণপর্যায়ে রয়েছে। জামায়াতের এই নির্বাচনী সাফল্য হলো এক নতুন রাজনৈতিক বাস্তবতা, যা দেশের গণতান্ত্রিক অনুশীলনের জন্য একটি বাস্তব পরীক্ষা। গণতন্ত্রের মূলশক্তি এটিই যে সংখ্যাগরিষ্ঠতা যত শক্তিশালী হোক না কেন, সংখ্যালঘুদের অধিকার এবং ভিন্নমত সুরক্ষিত থাকে। একইভাবে, নতুন শক্তিশালী বিরোধী দলগুলোকে তাদের ক্ষমতা গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ এবং শাসনতান্ত্রিক সীমার মধ্যে ব্যবহার করতে হয়।
বাংলাদেশ যদি এই পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়, তাহলে আমরা একটি পরিপক্ব গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার নিদর্শন দেখতে পাব, যেখানে বৈচিত্র্য স্বীকৃত, বহুমতবাদ সম্মানিত এবং প্রতিষ্ঠানগুলো শক্তিশালী থাকে। সেটাই হবে জুলাই অভ্যুত্থানের প্রকৃত সার্থকতার পরিমাপ।
লেখক: শরিফুল খান প্লাবন
সাংবাদিক