আসাদুজ্জামান সম্রাট
প্রকাশ : ০৪ মে ২০২৬ ০৮:৫৩ এএম
বাংলাদেশের রাজনীতিতে স্বাধীনতার ৫৪ বছর পরও প্রাসঙ্গিক বিষয় মুক্তিযুদ্ধ। প্রতীকী ছবি
বাংলাদেশের রাজনীতিতে স্বাধীনতার ৫৪ বছর পরও প্রাসঙ্গিক বিষয় মুক্তিযুদ্ধ। ২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থানের পর গঠিত ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের প্রথম অধিবেশন এই সত্যকে আবারও সামনে নিয়ে এলো। রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকরা সদ্য সমাপ্ত সংসদ কার্যক্রমকে পর্যবেক্ষণ করতে গিয়ে প্রতিদিনই উপলব্ধি করেছেন, অধিবেশনে বিরোধী দলকে ঘায়েল করতে সরকারি দল বিএনপির বহুল ব্যবহৃত ও ক্ষেত্রবিশেষে একমাত্র অস্ত্র ছিল মুক্তিযুদ্ধ।
উল্লেখ্য, এই সংসদ অধিবেশনে পয়েন্ট অব অর্ডার, প্রশ্নোত্তর, অনির্ধারিত আলোচনা, রাষ্ট্রপতির ভাষণের ওপর ধন্যবাদ প্রস্তাব কিংবা সাধারণ ইস্যুসহ বিভিন্ন আলোচনায় সরকারি দল বিএনপি নিজেদের যেমন স্বাধীনতার সপক্ষের শক্তি হিসেবে উল্লেখ করেছে, তেমনি জামায়াতে ইসলামীকে মুক্তিযুদ্ধে পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর জেনোসাইড ও ধর্ষণে সহযোগী হিসেবে সক্রিয়ভাবে লিপ্ত থাকার কথা স্মরণ করিয়ে কুপোকাত করেছে। বিএনপির শীর্ষ এমপিরা স্বাধীনতার বিপক্ষ শক্তিকে (জামায়াত) নির্মূল করার আহ্বানও জানিয়েছেন তাদের বক্তব্যে। সংসদ যেন জামায়াতের জন্যে হয়ে উঠেছিল কাঠগড়াÑ যেখানে দাঁড়িয়ে জামায়াতের আমির নিজেকে ‘শহীদ পরিবারের সন্তান’ হিসেবে জাহির করে চেয়েছেন মুক্ত হতে; আবার নায়েবে আমির নিজেকে নিজেই ‘শিশু মুক্তিযোদ্ধা’ ঘোষণা করে চেষ্টা করেছেন অতীতকে অস্বীকার করার।
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের প্রথম বৈঠক বসে ১২ মার্চ। সেদিন থেকে ৩০ এপ্রিল পর্যন্ত ২৫ কার্যদিবসের বেশিরভাগ সময় অতিক্রান্ত হয়েছে সংসদে দেয়া রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিনের ভাষণ নিয়ে ধন্যবাদ প্রস্তাব সংক্রান্ত সাধারণ আলোচনায়। জামায়াত-এনসিপি জোট রাষ্ট্রপতির ভাষণ বর্জন করলেও তার বক্তব্যের ওপর আনীত ধন্যবাদ প্রস্তাব নিয়ে ৫০ ঘণ্টা সাধারণ আলোচনার প্রস্তাব করে। সরকারি দল বিএনপিও এতে সম্মতিজ্ঞাপন করে। রাষ্ট্রপতির ভাষণের ওপর আলোচনায় অংশ নিয়ে জামায়াত-এনসিপি জোট গুরুত্বারোপ করে ২০২৪-এর গণঅভ্যুত্থান, জুলাই জাতীয় সনদ ও গণভোটের রায়কে বাস্তবায়নের ওপর। একই সঙ্গে গণভোট বাতিল ও সংবিধান আকড়ে থাকার প্রবণতার অভিযোগে বিএনপির কঠোর সমালোচনা করে।
সদ্য সমাপ্ত এই সংসদ অধিবেশনে বিরোধী দলের নেতা ডা. শফিকুর রহমানের একটি মুলতবি প্রস্তাব নিয়ে আলোচনার সূত্র ধরে উভয় পক্ষ পরস্পরকে ঘায়েল করার চেষ্টা চলে। ‘জনগুরুত্বসম্পন্ন’ বিষয় হিসেবে ‘জুলাই জাতীয় সনদ (সংবিধান সংস্কার) বাস্তবায়ন আদেশ, ২০২৫ এবং সংবিধান সংস্কার পরিষদ অধিবেশন সংক্রান্ত’ বিষয়ে আলোচনার জন্য প্রস্তাব উত্থাপন করলে স্পিকার তা গ্রহণ করেন এবং ৩১ মার্চ এ নিয়ে আলোচনা হয়। আলোচনায় জামায়াত ও এনসিপি জোটের সদস্যরা বিএনপির বিরুদ্ধে গণঅভ্যুত্থানের স্পিরিটকে ধারণ এবং সংবিধান সংস্কার পরিষদ গঠন না করার তীব্র নিন্দা ও প্রতিবাদ জানান। এ সময় প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদসহ অনেকের তীব্র সমালোচনা করা হয়।
বিএনপির পক্ষ থেকে সংবিধানকে সমুন্নত রেখে এবং জুলাই সনদের আলোকে সংবিধান সংশোধনের প্রস্তাব করা হলেও জামায়াত-এনসিপি জোট প্রত্যাখ্যান করে। এ নিয়ে আলোচনায় বিএনপির সদস্যরা এই সংবিধানকে ‘মুক্তিযুদ্ধের অর্জন’ হিসেবে উল্লেখ করেন। তবে বিএনপি জোটের শরিক বাংলাদেশ জাতীয় পার্টির (বিজেপি) চেয়ারম্যান আন্দালিব রহমান পার্থ আরেকটু এগিয়ে প্রশ্ন রাখেন, ‘সংবিধান ছুড়ে ফেলব কেন। এই সংবিধানে এত গাত্রদাহ কেন। সংবিধান কি মনে করিয়ে দেয় এটা একাত্তরের পরাজয়ের দলিল?’
স্থানীয় সরকারমন্ত্রী মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেন, ‘আমাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ উঠেছে, বিশেষ করে আমাদের সম্মানিত এক সদস্য বলেছেন যে, আমি সংবিধানকে ধরে রাখার চেষ্টা করেছি এবং বডি ল্যাঙ্গুয়েজ দিয়ে তা প্রমাণ করার চেষ্টা করেছি। হ্যাঁ, আমি করেছি, কারণ এই সংবিধান আমাদের অস্তিত্ব, আমাদের আবেগ এবং ১৯৭১ সালে লাখ লাখ শহীদের রক্তের সঙ্গে জড়িত। এই সংবিধানের অনেকগুলো ধারা ও অধ্যায় বারবার পরিবর্তন করে একে একটা ‘ছেঁড়া পাতায়’ পরিণত করা হয়েছে। তারপরও এটি আমাদের সংবিধান, যার জন্য আমরা যুদ্ধ করেছি।’
বিদ্যুৎ জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু বলেন, ‘৭১ আমাদের গর্বের জায়গা। ৭১ না হলে আমরা আজ এই সংসদে বসতে পারতাম না, কেউ মন্ত্রী-এমপিও হতে পারতাম না। যারা ৪৭ নিয়ে কথা বলেন, তারা আসলে ৭১-কেও মানেননি।’
মুক্তিযুদ্ধের সঙ্গে জুলাই অভ্যুত্থানের তুলনার বিরোধিতা করে সংসদ সদস্য ও বীর মুক্তিযোদ্ধা ফজলুর রহমান বলেন, ‘আমি বলব, এই কথাটা বলাই অন্যায়। কারণ মুক্তিযুদ্ধের সঙ্গে ৫ আগস্টের সঙ্গে তুলনা করা হচ্ছে প্রশান্ত মহাসাগরের সঙ্গে কুয়ার তুলনা করা।’ তিনি বলেন, ‘তারা (আন্দোলনকারীরা) বলেছিল, কোনো মুক্তিযুদ্ধ হয় নাই। সেই দিন মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে আমি বলেছিলাম, এই আলবদরের বাচ্চারা, এখনও কিন্তু ফজলুর রহমান জীবিত আছে। মুক্তিযুদ্ধ হইছে, মুক্তিযুদ্ধই সত্য। ৩০ লক্ষ মানুষ জীবন দিয়েছে, এটাও সত্য। আমরা সেদিন তাদের সঙ্গে যুদ্ধ করেছিলাম।’
এমপি ফজলুর রহমান বলেন, ‘আমি যে কথাটা বলতে চেয়েছিলাম, বিরোধী দলের নেতা বলেছেন, তিনি মুক্তিযোদ্ধা পরিবারের লোক এবং তিনি শহীদ পরিবারের লোক এবং তিনি জামায়াতে ইসলামী করেন। এটা ডাবল অপরাধ। মুক্তিযোদ্ধা পরিবারের লোক কেউ জামায়াত করতে পারে না।’ তার এ বক্তব্য নিয়ে ২৮ এপ্রিলের সেই অধিবেশনে উত্তেজনা দেখা দেয় এবং প্রায় ১০ মিনিট সংসদ কার্যক্রম বন্ধ থাকে। পরে আবারও তিনি বলেন, ‘আমি আবারও বলে রাখলাম, শহীদ পরিবারের লোক জামায়াত করতেই পারে না। আর জামায়াত করলে ডাবল অপরাধ করছেন।’
অধিবেশনে জামায়াতে ইসলামীর সমালোচনা করে স্বাস্থ্যমন্ত্রী সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেন বকুল বলেন, ‘যখন বেশি বাড়াবাড়ি করে তখন বলতে ইচ্ছা করে, তোরা রাজাকার, তোরা আল-শামস, তোরা আল-বদর।’
সিনিয়র নেতারা ছাড়াও বিএনপিদলীয় সংসদ সদস্যদের বেশিরভাগই রাষ্ট্রপতির ভাষণের ওপর আলোচনায় অংশ নিয়ে মুক্তিযুদ্ধের সময় ১৯৭১-এ জামায়াতে ইসলামীর ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন। তারা বলেছেন, ’৭১-এর পরাজিত শক্তি অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সময়ে সারা দেশে মুক্তিযুদ্ধের নিদর্শনগুলো ধ্বংস করা থেকে শুরু করে অনেক অপরাধ করেছে। তারা নির্বাচন নিয়ে ষড়যন্ত্র করেছিল। কিন্তু তারা সফল হয়নি।
কী বলছে জামায়াত
বিএনপির শীর্ষ নেতা থেকে নতুন সংসদ সদস্যদের সমালোচনামূলক বক্তব্যের জবাব জামায়াত জোট থেকে সেভাবে দেওয়া হয়নি। তবে ফজলুর রহমানের বক্তব্যের পর বিরোধীদলীয় নেতা শফিকুর রহমান বলেন, ‘তিনি মুক্তিযুদ্ধে তার অবদান সবকিছু বলেছেন। কিন্তু নিজের অবদান বলতে গিয়ে আরেকজনের অবদানের ওপরে হাতুড়ি পেটানোর অধিকার কাউকে দেওয়া হয়নি। তিনি বলেছেন যে আমি বলে থাকি আমি শহীদ মুক্তিযোদ্ধা পরিবারের সদস্য। বলেই তিনি এটাকে চ্যালেঞ্জ করছেন। দুই নম্বর তিনি বলেছেন, কোনো মুক্তিযোদ্ধা কিংবা শহীদ মুক্তিযোদ্ধা পরিবারের কেউ জামায়াতে ইসলামী করতে পারে না। তাহলে তাকে জিজ্ঞেস করা লাগবে?’
জামায়াতে ইসলামীর নায়েবে আমির ও কুমিল্লা-১১ আসনের সংসদ সদস্য ডা. সৈয়দ আবদুল্লাহ মোহাম্মদ তাহের বলেন, ‘রাজাকার-আলবদরের বিষয়টি এখন ডেড ইস্যু। আমরা যারা এখানে বসে আছি, কেউই রাজাকার বা আলবদর ছিলাম না। যদি মুক্তিযোদ্ধার প্রসঙ্গ ওঠে, তাহলে আমিও একজন শিশু মুক্তিযোদ্ধা।’
এত সবের মধ্যেও জামায়াতের সাতক্ষীরার সংসদ সদস্য গাজী নজরুল ইসলামকে রণাঙ্গনের মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে সংসদে পরিচয় করিয়ে দিয়েছেন স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ বীর বিক্রম। তিনি বলেছেন, ‘বিরোধী দলে একেবারে মুক্তিযোদ্ধা নেই সেটা বলা ঠিক হবে না, গাজী নজরুল ইসলাম রণাঙ্গনে যুদ্ধ করেছেন।’