× ই-পেপার প্রচ্ছদ সর্বশেষ বাংলাদেশ রাজনীতি দেশজুড়ে বিশ্বজুড়ে বাণিজ্য খেলা বিনোদন মতামত চাকরি শিক্ষা আজকের কার্টুন ফিচার সকল বিভাগ ছবি ভিডিও লেখক আর্কাইভ কনভার্টার

নবীন-প্রবীণে গড়া মন্ত্রিসভা, পরিবর্তনের বার্তা দিচ্ছে

ফসিহ উদ্দীন মাহতাব ও ফারুক আহমাদ আরিফ

প্রকাশ : ১৮ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ ১০:৩৭ এএম

আপডেট : ১৮ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ ১২:৪২ পিএম

সংসদ ভবনের দক্ষিণ প্লাজায় শপথ নিয়েছেন মন্ত্রিসভার সদস্যরা। ছবি: সংগৃহীত

সংসদ ভবনের দক্ষিণ প্লাজায় শপথ নিয়েছেন মন্ত্রিসভার সদস্যরা। ছবি: সংগৃহীত

বিএনপি চেয়ারম্যান ও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বে গঠিত ৫০ সদস্যের নতুন মন্ত্রিসভা বাংলাদেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে সূচনা করল এক নতুন অধ্যায়ের। পুরনো অভিজ্ঞ নেতৃত্ব ও নবীন রাজনৈতিক মুখের সমন্বয়ে গঠিত এ মন্ত্রিসভা পরিবর্তনের বার্তা বহন করছে। রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা বলছেন, এটি ‘পরিবর্তনের প্রতিশ্রুতি’ হিসেবে জনগণের সামনে হাজির হয়েছে। তবে কার্যকর ও স্থায়ী উন্নয়ন নিশ্চিত করতে হলে সরকারকে কঠোর রাজনৈতিক, সামাজিক ও অর্থনৈতিক উদ্যোগ নিতে হবে।

গতকাল মঙ্গলবার দেশের ১১তম প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব নেন তারেক রহমান। নতুন মন্ত্রিসভার ২৫ জন পূর্ণমন্ত্রী ও ২৪ জন প্রতিমন্ত্রী রয়েছেন। ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জনের ভিত্তিতে গঠিত এই সরকার কেবল রাজনৈতিক ক্ষমতা গ্রহণের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়, বরং দেশকে পুনরুদ্ধার ও পুনর্গঠনের প্রতিশ্রুতি দিচ্ছে। সংশ্লিষ্ট একাধিক সূত্র বলছে, মন্ত্রিসভা গঠনে তারেক রহমান সরাসরি নেতৃত্ব দিয়েছেন। তালিকা প্রণয়নের ক্ষেত্রে কঠোর গোপনীয়তা বজায় রাখা হয় এবং দলের স্থায়ী কমিটির অনেক সদস্যকে চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের বাইরে রাখা হয়। রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকরা এটিকে ‘শক্তিশালী কেন্দ্রীয় নেতৃত্ব প্রতিষ্ঠার কৌশল’ হিসেবে দেখছেন।

বিশেষজ্ঞদের একাংশ সতর্ক করে বলেছে, এমন একক সিদ্ধান্তভিত্তিক পদ্ধতি স্বল্পমেয়াদে কার্যকর হলেও দীর্ঘমেয়াদে দলীয় গণতন্ত্র ও অভ্যন্তরীণ সমন্বয়ের বিষয়েও সতর্ক থাকতে হবে। কেন্দ্রীয় নিয়ন্ত্রণ ও দলীয় অংশগ্রহণের মধ্যে ভারসাম্য রক্ষা নতুন সরকারের জন্য গুরুত্বপূর্ণ হবে। নতুন মন্ত্রিসভায় দীর্ঘদিনের অভিজ্ঞ রাজনৈতিক নেতা যেমন রয়েছেন, তেমনি যুক্ত হয়েছেন তরুণ প্রজন্মের প্রতিনিধিরা। পাশাপাশি টেকনোক্র্যাট মন্ত্রীদের অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে; যারা নির্দিষ্ট খাতে বিশেষজ্ঞ হিসেবে নীতিনির্ধারণ ও বাস্তবায়নে সহায়ক হবেন বলে ধারণা করা হচ্ছে।

এ ব্যাপারে রাজনৈতিক বিশ্লেষক জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের সরকার ও রাজনীতি বিভাগের অধ্যাপক ও সামাজিক বিজ্ঞান অনুষদের ডিন ড. মো. শামসুল আলম প্রতিদিনের বাংলাদেশকে বলেন, নবীন ও প্রবীণের সমন্বয়ে গঠিত মন্ত্রিসভা আশার সঞ্চার করেছে। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান দলীয় অনুভূতি ও রাজনৈতিক বাস্তবতা বিবেচনায় নিয়ে একটি ভারসাম্যপূর্ণ দল গঠন করেছেন। তিনি বলেন, তারেক রহমানের মন্ত্রিসভায় নবীন-প্রবীণের সমন্বয় ঘটেছে। তাদের মধ্যে সংমিশ্রণ করে মন্ত্রণালয়গুলো বণ্টন করা হয়েছে। বিশেষ করে গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রণালয়গুলোতে দক্ষ ও অভিজ্ঞদের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। তিনি বলেন, তারেক রহমান অনেক চিন্তাভাবনা করে, সুদক্ষ বিশ্লেষণী ব্যবহার করে ও কর্মদক্ষতা গুণে এ ধরনের মন্ত্রিসভাটি জাতির কাছে উপস্থাপন করেছেন। মন্ত্রণালয়গুলোকে কমিয়ে এনে ২৫ জন মন্ত্রী ও ২৪ প্রতিমন্ত্রী নিয়েছেন। রাষ্ট্রীয় খরচের ব্যয় সাশ্রয় করার জন্য হয়তো এটি করা হয়েছে। তার আগে এমপিদের সঙ্গে অনুষ্ঠিত বৈঠকে তিনি শুল্কমুক্ত গাড়ি, কোনো প্লট গ্রহণ করবেন না বলে ঘোষণা করেছেন। এটি দেশ ও জাতির জন্য নতুন দিগন্তের সূচনা করবে। আমরা আশা করি, তিনি অত্যন্ত দক্ষতার সঙ্গে সমন্বয় করে দেশকে এগিয়ে নেবেন।

ড. মো. শামসুল আলম বলেন, তারেক রহমান জানেন সমগ্র জাতি তার দিকে তাকিয়ে আছে। প্রথমেই আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নয়ন ও দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণ, দুর্নীতির হ্রাস টানতে হবে। তা ছাড়া দলীয় শৃঙ্খলা বজায় রাখতে হবে। ভারতসহ বিভিন্ন দেশের সঙ্গে বৈদেশিক সম্পর্ক উন্নয়ন ও সমাধান করতে হবে। বাংলাদেশের স্বার্থকে সমন্বিত রেখে কাজ করতে হবে।

অপর রাজনৈতিক বিশ্লেষক বিশিষ্ট রাষ্ট্রবিজ্ঞানী ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্য অধ্যাপক ড. আনোয়ারুল্লাহ চৌধুরী প্রতিদিনের বাংলাদেশকে বলেন, নির্বাচনটি অবাধ, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ হয়েছে। বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমান দলীয় প্রধান হিসেবে সরকার গঠন করেছেন। এ সরকারের মাধ্যমে বাংলাদেশে গণতান্ত্রিক সরকারের আবারও পথচলা শুরু হলো। গত ১৮-২০ বছর যাবত দেশে কীভাবে মানুষের অধিকার কেড়ে নেওয়া হয়েছিল। এ জাতিকে পরাধীনতা শৃঙ্খলে বদ্ধ করা হয়েছিল।

তিনি বলেন, ছাত্র-জনতার নেতৃত্বে ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টে এদেশের মানুষ বিদ্রোহ করে গণঅভ্যুত্থান করে। রক্তপাতের মাধ্যমে স্বৈরাচার পালিয়ে গেলে ভোটের অধিকার প্রতিষ্ঠিত হয়। এদেশের মানুষ স্বাধীনভাবে, নির্বিঘ্নে ভোট দিতে পেরেছে। তারেক রহমানের মন্ত্রিসভা নিয়ে তিনি বলেন, মন্ত্রিসভায় যেমন অভিজ্ঞ রাজনীতিবিদ রয়েছেন, তেমনি উদ্যোমী তরুণ রাজনীতিবিদরা রয়েছেন। এটি একটি নতুন-পুরাতনের সংমিশ্রণ। তারা যদি সততা-নিষ্ঠার সঙ্গে দায়িত্ব পালন করেন, তাহলে দেশ অনেকদূর এগিয়ে যাবে। অন্ধকার যুগের যে সূচনা হয়েছিল তা থেকে আলোর দিকে যাত্রা শুরু হবে।

প্রশাসন বিশেষজ্ঞ ড. আব্দুস সবুর মনে করেন, ‘টেকনোক্র্যাট, অভিজ্ঞ ও নবীন নেতৃত্বের সমন্বয় প্রশাসনিক দক্ষতা বাড়ানোর ইতিবাচক উদ্যোগ। বিশেষ করে অর্থনীতি, বিনিয়োগ ও সামাজিক নিরাপত্তা খাতে দ্রুত নীতিগত সিদ্ধান্ত নিতে এটি সহায়ক হবে। বিশ্লেষকদের মতে, এ ধরনের বৈচিত্র্যময় মন্ত্রিসভায় মতানৈক্য ও নীতিগত দ্বন্দ্বের সম্ভাবনাও উড়িয়ে দেওয়া যায় না। দ্রুত সিদ্ধান্ত গ্রহণ ও কার্যকর বাস্তবায়নের জন্য সুসংহত সমন্বয় কাঠামো জরুরি। তিনি আরও বলেন, নতুন সরকার যদি কেবল পুরনো রাজনৈতিক পদ্ধতির পুনরাবৃত্তি না করে, বরং অন্তর্ভুক্তিমূলক ও ন্যায্য শাসনব্যবস্থা গড়ে তুলতে পারে, তাহলেই জনগণের আস্থা পুনরুদ্ধার সম্ভব হবে।

সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হবে অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধার ও বিনিয়োগ আস্থা ফিরিয়ে আনা : নতুন সরকারের সামনে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ অর্থনীতি। ২০২৪ সালের রাজনৈতিক অস্থিরতার পর বিনিয়োগকারীদের আস্থা কমেছে, পুঁজিবাজারে অস্থিরতা দেখা দিয়েছে এবং শিল্প খাতে প্রবৃদ্ধি মন্থর হয়েছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, কয়েকটি ক্ষেত্রে সরকারের অগ্রাধিকার দিতেই হবে। এর মধ্যে যেমনÑ দ্রুত অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করা। বৈদেশিক বিনিয়োগ আকর্ষণ, পুঁজিবাজারে আস্থা ফিরিয়ে আনা, রপ্তানি শিল্প, বিশেষ করে পোশাক খাতকে পুনরুজ্জীবিত করা। বেকারত্ব কমাতে দক্ষতা উন্নয়ন কর্মসূচি গ্রহণ ও সামাজিক নিরাপত্তাবলয় সম্প্রসারণ আবশ্যক। আরও্ মনে রাখতে হবে, বাংলাদেশের অর্থনীতির মেরুদণ্ড হিসেবে বিবেচিত পোশাক শিল্পে নতুন বিনিয়োগ আনতে হলে রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা ও নীতিগত ধারাবাহিকতা অপরিহার্য। একই সঙ্গে ব্যাংকিং খাত সংস্কার ও রাজস্ব ব্যবস্থায় স্বচ্ছতা নিশ্চিত করাও জরুরি বলে মনে করছেন অর্থনীতিবিদরা।

আইনশৃঙ্খলা, মানবাধিকার ও অন্তর্ভুক্তিমূলক শাসন : রাজনৈতিক উত্তেজনা ও সংঘর্ষের পটভূমিতে নতুন সরকারের জন্য সামাজিক শান্তি বজায় রাখা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সূত্র জানায়, আইনশৃঙ্খলা রক্ষা ও মানবাধিকার নিশ্চিত করতে একটি নিরপেক্ষ ও কার্যকর নিরাপত্তানীতি গ্রহণে সরকার মনোযোগী হবে। বিশ্লেষকদের মতে, কেবল শক্তিশালী প্রশাসন নয়; স্বচ্ছতা, জবাবদিহিতা ও জনসম্পৃক্ততা নিশ্চিত করাও জরুরি। জনগণ যেন নীতিনির্ধারণ প্রক্রিয়ায় মতামত দিতে পারে এবং সরকারের কর্মকাণ্ড সম্পর্কে নিয়মিত তথ্য পায়, এটি গণতান্ত্রিক সংস্কৃতির জন্য অপরিহার্য।

কূটনৈতিক সম্পর্ক পুনর্বিন্যাস জরুরি

থমকে থাকা কূটনৈতিক সম্পর্কগুলো উন্নয়নের ওপর গুরুত্বারোপ করেছেন বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব ইন্টারন্যাশনাল অ্যান্ড স্ট্র্যাটেজিক স্টাডিজের (বিআইআইএসএস) সাবেক চেয়ারম্যান বিশিষ্ট কূটনীতিক মুন্সী ফয়েজ আহমদ। তিনি গতকাল প্রতিদিনের বাংলাদেশকে বলেন, আমাদের এ কথা স্বীকার করতেই হবে যে, গত দেড় বছর আমাদের অনেক দেশের সঙ্গে কূটনৈতিক সম্পর্ক থমকে ছিল। তারেক রহমানের সরকারকে যেসব সম্পর্ক উন্নয়ন ও অগ্রগতি আনতে কাজ করতে হবে। বিশেষ করে ভারত আমাদের প্রতিবেশী তাদের সঙ্গে দ্রুত সুস্থ, সমমর্যাদাপূর্ণ সম্পর্কে নিয়ে আসতে হবে। এ সম্পর্ক ভালো না থাকলে উভয়ের ক্ষতি।

প্রকল্পগুলো চালু করা সম্পর্কে তিনি বলেন, বিভিন্ন দেশের অর্থায়নে অনেক প্রকল্প চলমান আছে। সেগুলোতে আরও গতি আনা ও নতুন প্রকল্প শুরু করা নিয়ে আলাপ-আলোচনা করতে হবে। আবার মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে নানা কারণে আমাদের সম্পর্ক ধাক্কা লেগেছে। সেখানে যেমন আমাদের দেশের প্রেক্ষাপট আছে তেমনি তাদেরও কিছু বিষয় জড়িত। সে দেশের নতুন সরকার তথা ট্রাম্পের শুল্কনীতির কারণে কিছু সমস্যা দেখা দিয়েছে। কেননা ট্রাম্প নিজেও কোনো নির্ভরশীল ব্যক্তি নন। তার সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগ না রাখতে পারলেও তার নিচের পর্যায়ের দায়িত্বশীলদের সঙ্গে আলোচনা করতে হবে, সম্পর্ক উন্নয়ন করতে হবে। গত সরকারের সময় ৩-৪টি স্তরে ডায়লগ ছিল তা আবার শুরু করতে হবে।

মুন্সী ফয়েজ আহমদ বলেন, আমাদের বিশ্বের অন্যান্য দেশের সঙ্গেও কূটনৈতিক সম্পর্ক উন্নয়ন করতে হবে। তা ছাড়া অর্থনৈতিক কূটনীতি, প্রযুক্তিগত কূটনীতিতেও গুরুত্ব দিতে হবে। 

শেয়ার করুন-

মন্তব্য করুন

Protidiner Bangladesh

সম্পাদক : মারুফ কামাল খান

প্রকাশক : কাউসার আহমেদ অপু

রংধনু কর্পোরেট, ক- ২৭১ (১০ম তলা) ব্লক-সি, প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড) ঢাকা -১২২৯

যোগাযোগ

প্রধান কার্যালয়: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৬৯৬ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (প্রিন্ট): +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮১০, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০ | ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (অনলাইন): +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০, +৮৮০১৭৯৯৪৪৯৫৫৯ । ই-মেইল: [email protected]

সার্কুলেশন: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮০৭, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৩৩২ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন মূল্য তালিকা