× ই-পেপার প্রচ্ছদ সর্বশেষ বাংলাদেশ রাজনীতি দেশজুড়ে বিশ্বজুড়ে বাণিজ্য খেলা বিনোদন মতামত চাকরি শিক্ষা আজকের কার্টুন ফিচার সকল বিভাগ ছবি ভিডিও লেখক আর্কাইভ কনভার্টার

ঢাকা-৮

দুই প্রজন্মের লড়াইয়ে জমেছে ভোটের মাঠ

রাহাত হুসাইন

প্রকাশ : ০৬ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ ০৯:০৬ এএম

আপডেট : ০৬ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ ০৯:০৯ এএম

ঢাকা-৮ আসনে বিএনপি প্রার্থী মির্জা আব্বাস ও এনসিপির প্রার্থী নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারী। কোলাজ ছবি

ঢাকা-৮ আসনে বিএনপি প্রার্থী মির্জা আব্বাস ও এনসিপির প্রার্থী নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারী। কোলাজ ছবি

মতিঝিল, পল্টন, রমনা, শাহবাগ ও শাহজাহানপুর থানা নিয়ে গঠিত ঢাকা-৮ আসনটি প্রশাসনিক ও বাণিজ্যিক গুরুত্বের কারণে বরাবরই ‘হাইভোল্টেজ’ সংসদীয় এলাকা হিসেবে পরিচিত। এবার এই আসনে একাধিক প্রার্থী থাকলেও ভোটের মূল লড়াইয়ে মুখোমুখি দুই ভিন্ন প্রজন্ম।

একদিকে বিএনপির মনোনীত ধানের শীষ প্রতীকের প্রার্থী, ৭৪ বছর বয়সী অভিজ্ঞ রাজনীতিক মির্জা আব্বাস; অন্যদিকে গণঅভ্যুত্থানের পটভূমি থেকে উঠে আসা জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) ৩০ বছর বয়সী তরুণ নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারী। রাজধানীর গুরুত্বপূর্ণ ও স্পর্শকাতর এই নির্বাচনি এলাকা এখন রাজনৈতিক উত্তাপ ও আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে। 

স্থানীয়রা বলছেন, নতুন মুখের উপস্থিতি, আক্রমণাত্মক প্রচার আর পরিবর্তনের স্লোগান থাকলেও স্থানীয় ভোটারদের বড় একটি অংশ শেষ পর্যন্ত অভিজ্ঞতার দিকেই ঝুঁকছে। তাদের অনেকেই প্রশাসনিক ও বাণিজ্যিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ এই এলাকায় ‘নতুন পরীক্ষা’ করতে অনাগ্রহী। 

উল্লিখিত দুই প্রার্থী ছাড়াও ঢাকা-৮ আসনে কমিউনিস্ট পার্টির ত্রিদ্বীপ কুমার সাহা, বাংলাদেশের সমাজতান্ত্রিক দলের (মার্কসবাদী) এএইচএম রফিকুজ্জামান আকন্দ, ইসলামী আন্দোলনের কেফায়েত উল্লা, বাংলাদেশ জাসদের এএফএম ইসমাইল চৌধুরী, জাতীয় পার্টির জুবের আলম খান, গণঅধিকার পরিষদের মেঘনা আলম, জনতার দলের গোলাম সরোয়ার, সাংস্কৃতিক মুক্তিজোটের রাসেল কবির এবং ইসলামী ফ্রন্টের এসএম সরওয়ার প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন। তবে সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, প্রচারণা ও মাঠপর্যায়ের উপস্থিতিতে তারা মূল লড়াইয়ের বাইরে রয়েছেন। 

ভোটের প্রচার শুরুর আগেই আসনটি আলোচনায় আসে। ইনকিলাব মঞ্চের আহ্বায়ক শরীফ ওসমান হাদি ঢাকা-৮ আসন থেকে নির্বাচনে অংশ নেওয়ার ঘোষণা দিয়েছিলেন। তবে ভোটের আনুষ্ঠানিক প্রচার শুরুর প্রায় এক মাস আগে তিনি আততায়ীর গুলিতে নিহত হন। 

ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের ৮, ৯, ১০, ১১, ১২, ১৩, ১৯, ২০ ও ২১ নম্বর ওয়ার্ড নিয়ে গঠিত ঢাকা-৮ আসন। এখানে সচিবালয়, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন, ব্যাংক-বীমা প্রতিষ্ঠান, বড় বাণিজ্যিক ভবন ও গুরুত্বপূর্ণ সরকারি দপ্তর রয়েছে। ২ লাখ ৬৬ হাজার ভোটারের এই এলাকায় রাজনৈতিক সচেতনতা তুলনামূলক বেশি। স্থানীয়দের ভাষ্য, এখানে ভোটের সিদ্ধান্ত আবেগ নয়Ñ বাস্তব অভিজ্ঞতা, প্রশাসনিক দক্ষতা ও সমস্যা সমাধানের সক্ষমতার ওপর নির্ভর করে।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে স্থানীয় বাসিন্দা একজন অবসরপ্রাপ্ত সরকারি কর্মকর্তা বলেন, “স্লোগান দেওয়া আর সংসদে গিয়ে প্রশাসনিক ও বাণিজ্যিক এলাকার সমস্যা সামলানো এক বিষয় নয়। নতুন প্রার্থীরা কথা ভালো বলছেন, এতে সন্দেহ নেই। কিন্তু এই এলাকার সমস্যা জটিল। এসব বোঝে এমন একজন প্রতিনিধিই আমাদের দরকার।”

নয়াপল্টনের জোনাকি গলির বাসিন্দা ও ব্যবসায়ী নজরুল ইসলাম জুয়েল বলেন, “এলাকায় দীর্ঘদিন ধরেই রান্নার গ্যাস সংকট চলছে। এই সংকটের সমাধানই তিনি ভোটপ্রার্থীদের কাছে চান।”

তিনি প্রতিদিনের বাংলাদেশকে বলেন, “ছোটবেলা থেকেই এই এলাকায় বড় হয়েছি। তখন থেকেই দেখছি, এই এলাকার সন্তান মির্জা আব্বাস ভাইয়ের সঙ্গে মানুষের যে সংযোগ, সেটা অন্য কোনো প্রার্থীর সঙ্গে তুলনা হয় না।

“এলাকাবাসীর এমন মানুষ খুঁজে পাওয়া কঠিন, যিনি তার কাছ থেকে কোনো না কোনো সময় সাহায্য বা আর্থিক সহযোগিতা পাননি। তিনি মানুষের অভাব-অভিযোগ শুনে তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা নেওয়ার চেষ্টা করেন।”

রাজনৈতিক দিক থেকেও ঢাকা-৮ আসনের গুরুত্ব অনেক। বিএনপি, জাতীয় পার্টি, বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টি, ইসলামী আন্দোলন, জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল (জাসদ) এবং কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগসহ একাধিক রাজনৈতিক দলের কেন্দ্রীয় কার্যালয় এই আসনের ভেতরেই। ফলে জাতীয় রাজনীতির বহু সিদ্ধান্ত ও কর্মসূচির প্রভাব সরাসরি পড়ে এই এলাকায়।

এই বাস্তবতায় মির্জা আব্বাসকে এগিয়ে রাখছেন অনেকে। ১৯৭৭ সাল থেকে তিনি এই এলাকার রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত। অবিভক্ত ঢাকা সিটি করপোরেশনের মেয়র এবং খালেদা জিয়ার দ্বিতীয় মন্ত্রিসভায় গৃহায়ন ও গণপূর্তমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালনের অভিজ্ঞতা রয়েছে তার।

স্থানীয়দের মতে, “এলাকার অলিগলি, সমস্যা ও রাজনৈতিক সমীকরণ তার অজানা নয়।” অনেক ভোটারই তাকে ‘ঘরের লোক’ কিংবা ‘পোরখাওয়া নেতা’ হিসেবে বিবেচনা করেন।

নয়াপল্টন (রাজারবাগ) এলাকার বাসিন্দা সাহেরা আক্তার ইতোমধ্যে বিএনপির দেওয়া ভোটার স্লিপ হাতে পেয়েছেন। তবে ভোটের বিষয়ে তিনি নিজের সিদ্ধান্ত গোপন রাখার কথা জানিয়ে প্রতিদিনের বাংলাদেশকে বলেন, “প্রার্থী ও তাদের প্রতিনিধিরা ভোট চাইতে আসছেন। কিন্তু ভোট দেব গোপন কক্ষে। কাকে দেব, সেটা এখনই বলা যাবে না।’ প্রার্থীদের কাছে প্রত্যাশা জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘আমার কোনো প্রত্যাশা নেই। দেশ ভালো থাকলেই ভালো।”

অন্যদিকে ‘শাপলা কলি’ প্রতীক নিয়ে প্রথমবারের মতো জাতীয় নির্বাচনে নেমেছেন জামায়াতে ইসলামী জোটের এনসিপি প্রার্থী নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারী। ছাত্র-জনতার আন্দোলনে সক্রিয় থাকা এই তরুণ নেতা প্রচারণায় আক্রমণাত্মক অবস্থান নিয়েছেন।

তিনি সরাসরি বিএনপির প্রার্থী মির্জা আব্বাসের কড়া সমালোচনা করছেন। পাশাপাশি ‘নতুন রাজনীতি’র প্রতিশ্রুতি দিয়ে বিশেষ করে তরুণ ভোটারদের আকৃষ্ট করার চেষ্টা করছেন। তবে স্থানীয় কল্যাণমূলক কর্মকাণ্ডে আগে দৃশ্যমান ভূমিকা না থাকাকে কেউ কেউ তার বড় সীমাবদ্ধতা হিসেবেও দেখছেন।

মতিঝিলের টিঅ্যান্ডটি কলোনির বাসিন্দা তরুণ ভোটার প্রিন্স মাহমুদ গত বছর ভোটার হয়েছেন। তার প্রত্যাশা, এলাকাকে মাদক ও জুয়ামুক্ত করা এবং খেলাধুলার জন্য উন্মুক্ত জায়গা নিশ্চিত করা।

তিনি প্রতিদিনের বাংলাদেশকে বলেন, “এই আসনে দুইজন প্রার্থীর নামই বেশি শোনা যাচ্ছেÑ নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারী আর মির্জা আব্বাস। ভোটের মাঠে নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারীকে তো ইদানীং দেখছি। আর মির্জা আব্বাসের নাম ছোটকাল থেকেই শুনছি।

“আমাদের পরিবারের সবাই ১০ নম্বর ওয়ার্ডের ভোটার। রাজনীতিতে অভিজ্ঞতা খুব গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। ভোট কাকে দেব সেটা তো আমি বলব না।”

সরেজমিন দেখা যায়, ঢাকা-৮-এর প্রধান সড়কগুলোতে মির্জা আব্বাস ও নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারীর ব্যানার, তবে সরকারি কলোনিগুলোতে তুলনামূলকভাবে মির্জা আব্বাসের প্রচারণা বেশি চোখে পড়ছে। বিএনপি এসব এলাকায় নির্বাচনি ক্যাম্প স্থাপন করেছে এবং কর্মীরা ঘরে ঘরে ভোটার স্লিপ বিতরণ করছেন।

পাশাপাশি কিছু এলাকায় জাতীয় পার্টি, ইসলামী আন্দোলন ও কমিউনিস্ট পার্টিসহ অন্যান্য দলের প্রার্থীদের প্রচারণাও সীমিত আকারে দেখা গেছে। সব মিলিয়ে ঢাকা-৮ আসনে নির্বাচনী সমীকরণে দুই প্রজন্মের লড়াই স্পষ্ট হলেও ভোটারদের বড় অংশ ঝুঁকি নিতে আগ্রহী নন। প্রশাসনিক ও বাণিজ্যিক গুরুত্বের এই আসনে তারা পরিবর্তনের স্লোগানের চেয়ে দীর্ঘদিনের পরিচিত, পরীক্ষিত ও অভিজ্ঞ প্রার্থীর ওপরই আস্থা রাখতে স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করছেন।

২০০৮ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত এই আসনের এমপি ছিলেন আওয়ামী লীগের জোট শরিক ওয়ার্কার্স পার্টির নেতা রাশেদ খান মেনন। সর্বশেষ ২০২৪ সালের ৭ জানুয়ারি অনুষ্ঠিত দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে এই আসনে এমপি নির্বাচিত হন আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক আ ফ ম বাহাউদ্দিন নাছিম। তবে ওই বছরের ৫ আগস্ট ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানে আওয়ামী লীগ ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার পর থেকে তিনি আত্মগোপনে রয়েছেন।

শেয়ার করুন-

মন্তব্য করুন

Protidiner Bangladesh

সম্পাদক : মারুফ কামাল খান

প্রকাশক : কাউসার আহমেদ অপু

রংধনু কর্পোরেট, ক- ২৭১ (১০ম তলা) ব্লক-সি, প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড) ঢাকা -১২২৯

যোগাযোগ

প্রধান কার্যালয়: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৬৯৬ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (প্রিন্ট): +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮১০, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০ | ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (অনলাইন): +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০, +৮৮০১৭৯৯৪৪৯৫৫৯ । ই-মেইল: [email protected]

সার্কুলেশন: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮০৭, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৩৩২ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন মূল্য তালিকা