মজুমদার ইমরান
প্রকাশ : ১৮ জানুয়ারি ২০২৬ ০৮:৫০ এএম
আপডেট : ১৮ জানুয়ারি ২০২৬ ১৬:২৭ পিএম
ঢাকার চীন মৈত্রী সম্মেলন কেন্দ্রে শনিবার আয়োজিত সভায় কাঁদলেন গুম-খুন ও নির্যাতনের শিকারদের স্বজনরা। ছবি: আলী হোসেন মিন্টু
তাদের জীবন থেকে হাসি-আনন্দের গল্প ফুরিয়ে গেছে কবেই। এখন কেবল বুকভরা কান্নায় কাটে তাদের প্রতিটি দিনরাত্রি। এ হচ্ছে সেই সব পরিবারের হতভাগ্য মানুষের কথা, যাদের আপনজনেরা ১৬ বছরের দুঃশাসনে শিকার হয়েছেন গুম-খুনের। তাদের কান্নার শুরু থাকলেও শেষ নেই। কেবলই ফিরে ফিরে আসে তাদের হাহাকার। ভারী হয়ে ওঠে পরিবেশ। ঠিক এমনই এক বিষাদময় আবহ সৃষ্টি হয় গতকাল শনিবার রাজধানীর বাংলাদেশ-চীন মৈত্রী সম্মেলন কেন্দ্রে বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমানের সঙ্গে গুম-খুন ও নির্যাতনের শিকার ব্যক্তিদের পরিবারের মতবিনিময় সভায়। সেখানে সবার বেদনার কথা শুনতে শুনতে বারবার অশ্রুসিক্ত হয়ে ওঠেন তারেক রহমান। কিছু সময়ের জন্য সম্মেলন কেন্দ্রটি পরিণত হয় শোকের আঙিনায়।
এদিন কেউ আসেন গুমের শিকার বাবাকে হারিয়ে একাকী বেড়ে ওঠার গল্প শোনাতে, কেউ বলেন স্বামী হারিয়ে বছরের পর বছর কীভাবে অবহেলিত জীবন পার করছেন। কারও কারও কণ্ঠে উচ্চারিত হয় বিচারবহির্ভূত হত্যা ও পৈশাচিক নির্যাতনের লোমহর্ষক বিবরণ। ১৬ বছর ধরে গুম-খুন-নির্যাতনের শিকার পরিবারগুলোর কষ্টের কথা মন দিয়ে শোনেন বিএনপির চেয়ারম্যান। তাদের সঙ্গে মতবিনিময় করেন তিনি। ‘আমরা বিএনপি পরিবার’ ও ‘মায়ের ডাক’-এর যৌথ আয়োজনের এই মতবিনিময় সভায় সারা দেশ থেকে আসা গুম, খুন ও বিচারবহির্ভূত হত্যার শিকার পরিবারের সদস্য ও স্বজনরা অংশ নেন।
অনুষ্ঠানটি যৌথভাবে সঞ্চালনা করেন মায়ের ডাকের সমন্বয়ক সানজিদা ইসলাম তুলি এবং আমরা বিএনপি পরিবারের সদস্য জাহিদুল ইসলাম রনি। অনুষ্ঠানে ২০১৩ সালের ২ ডিসেম্বর শাহবাগ থেকে গুম হওয়া পারভেজের কন্যা ঋদি কান্নাজড়িত কণ্ঠে বলেন, ‘এ বছর যায়, নতুন বছর আসে, কিন্তু আমাদের বাবা আর আসে না। ৫ আগস্টের পর এক বছরের বেশি সময় পার হয়ে গেল, কিন্তু আমরা কাউকে ফিরে পাইনি। ছোটবেলা থেকে আমার স্বপ্ন ছিল বাবার হাত ধরে স্কুলে যাওয়ার, কিন্তু সে স্বপ্ন পূরণ হয়নি।’ সাফার বাবা যখন নিখোঁজ হন তখন বয়স মাত্র দুই মাস। বাবাকে চিনেছেন ছবি দেখে। নিজের কষ্টের কথা জানাতে গিয়ে সাফা বলেন, ‘বাবাকে যখন গুম করা হয়, তখন আমার বয়স ছিল দুই মাস, এখন আমার ১৩ বছর বয়স। বাবার মুখটা আমি দেখতে পাইনি। বাবার ছবিটা ধরে অনেক জায়গায় গিয়েছি, খোঁজ পাইনি। বাবার সঙ্গে আমার কোনো স্মৃতি নেই। আমরা আমার বাবাকে ফেরত চাইÑ এই কথাটা অনেকবার বলেছি কিন্তু ফেরত পাইনি।’ তিন বছর বয়সে বাবাকে হারানো মিম বলেন, ‘সমবয়সিরা যখন বাবার হাত ধরে হেঁটে বেড়ায়, আমি তখন বাবাকে খুঁজে বেড়াই।’ এ সময় তারেক রহমানকে আবেগাপ্লুত হয়ে পড়তে দেখা যায়।
শোকাহত পরিবারগুলোর সদস্যদের প্রতি সহমর্মিতা প্রকাশ করে বিএনপি চেয়ারম্যান বলেন, ‘গুম-খুনের সেই বিভীষিকাময় দিন শেষ হয়েছে। দেশের মানুষ গণতন্ত্রের পথে এগিয়ে যাচ্ছে। অনেক সন্তান এখনও অপেক্ষায়, তারা আশা করে তাদের বাবা হঠাৎ করে ফিরে আসবেন। অনেক মা এখনও অপেক্ষায় আছেন, যার সন্তানের ফিরে আসার স্বপ্ন রয়েছে। যেসব মানুষরা তাদের স্বজন হারিয়েছেন, যেসব মায়েরা তাদের সন্তান হারিয়েছেন, যেসব বোনেরা তাদের স্বামীকে হারিয়েছেন, যেসব সন্তানেরা তাদের পিতাকে হারিয়েছেন, তাদের সত্যিকারভাবে যদি বলতে হয় আসলে আপনাদেরকে সান্ত্বনা দেওয়ার মতন ভাষা আমাদের কাছে নেই।’
তারেক রহমান আরও বলেন, ‘ফ্যাসিবাদী আমলে বিএনপির নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে দেওয়া প্রতিটি মামলা রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে করা হয়েছে। যারা বিগত সময়ে নানাভাবে নির্যাতন ও নিপীড়নের শিকার হয়েছেন, তাদের সান্ত্বনা দেওয়ার ভাষা নেই। গুম-খুন ও নানা নির্যাতনের শিকার হয়েও বিএনপির নেতাকর্মীরা রাজপথ ছাড়েননি।’
সভায় কথা বলতে গিয়ে গুম হওয়া পারভেজের ছেলে রাতুল এসে বলেন, ‘আমার বাবার সঙ্গে বাবার চাচাকেও র্যাব তুলে নিয়ে যায়। আজ ১২ বছর পার হয়ে ১৩ বছরে পড়ল, আমরা তাদের কোনো সন্ধান পাইনি। ১৩ বছর ধরে রাস্তায় রাস্তায় ঘুরে বেড়াই। এমন কোনো জায়গা নেই যেখানে যাইনি। আমরা কি কেউ এমন বাংলাদেশ চেয়েছিলাম? জনাব তারেক রহমানের কাছে আমি অনুরোধ করব, আগামীতে যদি জনগণের ম্যান্ডেট নিয়ে ক্ষমতায় আসতে পারেন, গুম-খুনের জন্য এমন একটা আইন করবেন, পরবর্তীতে কেউ যেন এই গুমের মতো জঘন্য কাজ করার সাহস পায় না।’
গুমের আরেক শিকার পারভেজ হোসেনের কন্যা হৃদি গুম কমিশনের উদ্দেশে বলেন, ‘গুম কমিশন বলেÑ ধরে নিন ওরা গুম, ওরা মৃত। কেন? এটা কি হাতের অঙ্ক যে আমরা ধরে নেব আমাদের বাবারা আর নেই? একটা দল করা কোনো অপরাধ না। দল সবাই করে। এর জন্য এটা কেমন বিচার এই বাংলাদেশে? আমি তারেক রহমান চাচ্চুর কাছে আশা করি যে, তিনি আমাদের বাবাদের খুঁজে দেবেন। এই বাংলাদেশের মাটিতে তাদের গুমের বিচার করবেন।’
২০১৬ সালের ১০ জুলাই সাতক্ষীরার শ্যামনগরে কথিত বন্দুকযুদ্ধে কাশিমাড়ী ইউনিয়নের সাধারণ সম্পাদক শহীদ অলি উল্লাহ অলির স্ত্রী ভয়ংকর সেই দিনটির কথা তুলে ধরতে গিয়ে কান্নায় ভেঙে পড়েন। এ সময় তারেক রহমান তাকে সান্ত্বনা দেন। আদাবর থানা যুবদল প্রতিষ্ঠাকালীন সদস্য শহীদ আব্দুর রশিদের সহধর্মিণী সাথী বেগম, তার বড় কন্যা নাফিসা তাবাসসুম রুহি ও ছোট কন্যা নাফিয়া তাবাসসুম রাকিকা তারেক রহমানের কাছে তাদের যন্ত্রণার স্মৃতিগুলো তুলে ধরেন। ২০২৩ সালের ২৯ অক্টোবর হরতাল পালনের সময় মোহাম্মদপুর টাউন হল এলাকায় আওয়ামী লীগের সন্ত্রাসী বাহিনী নৃশংসভাবে আব্দুর রশিদকে কুপিয়ে হত্যা করে। পরে একটি বহুতল ভবনের ছাদ থেকে নিচে ফেলে দিয়ে মৃত্যু নিশ্চিত করার পর উল্লাস করতে দেখা যায় ওই সন্ত্রাসীদের।