ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে কিশোরগঞ্জ জেলার রাজনৈতিক মহলে নানা জল্পনা-কল্পনার অবসান ঘটিয়ে অবশেষে কিশোরগঞ্জ-১ (সদর–হোসেনপুর) আসনে মনোনয়ন পেয়েছেন জেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক মো. মাজহারুল ইসলাম এবং কিশোরগঞ্জ-৫ (নিকলী–বাজিতপুর) আসনে মনোনয়ন পেয়েছেন কেন্দ্রীয় নির্বাহী কমিটির সদস্য ও বাজিতপুর উপজেলা বিএনপির সভাপতি শেখ মজিবুর রহমান ইকবাল।
বৃহস্পতিবার (৪ ডিসেম্বর) বিকালে গুলশানে চেয়ারপারসনের কার্যালয়ে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর নতুন ৩৬টি আসনের প্রার্থী ঘোষণা করেন। সেখানে কিশোরগঞ্জের এ দুই নতুন মনোনয়নের বিষয়টি নিশ্চিত করা হয়।
এর আগে গত ৩ নভেম্বর বিএনপি প্রথম দফায় ২৩৭টি আসনের প্রার্থীর নাম প্রকাশ করে। সেই তালিকায় কিশোরগঞ্জের ছয় আসনের মধ্যে চারটিতে দলীয় মনোনয়ন দেওয়া হয়েছিল।
কিশোরগঞ্জ-২ (কটিয়াদী-পাকুন্দিয়া) আসনে মনোনয়ন পেয়েছেন জেলা জজ কোর্টের পিপি ও পাকুন্দিয়া উপজেলা বিএনপির আহ্বায়ক অ্যাডভোকেট মো. জালাল উদ্দীন, কিশোরগঞ্জ-৩ (করিমগঞ্জ-তাড়াইল) আসনে সাবেক শিক্ষা মন্ত্রী ড. ওসমান ফারুক, কিশোরগঞ্জ-৪ (ইটনা-মিঠামইন-অষ্টগ্রাম) আসনে চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা অ্যাডভোকেট ফজলুর রহমান ও কিশোরগঞ্জ-৬ (ভৈরব-কুলিয়ারচর) আসনে মনোনয়ন পেয়েছেন কিশোরগঞ্জ জেলা বিএনপির সভাপতি মো. শরীফুল আলম।
এদিকে মনোনয়ন ঘোষণার পরপরই কিশোরগঞ্জ বিএনপির নেতাকর্মীদের মাঝে উৎসবমুখর পরিবেশ সৃষ্টি হয়—শুভেচ্ছা ও অভিনন্দনের মাধ্যমে সমর্থকেরা সিদ্ধান্তকে স্বাগত জানান। দীর্ঘদিন রাজপথে আন্দোলনে সক্রিয় থাকা জেলা বিএনপির তিনবারের সাধারণ সম্পাদক মাজহারুল ইসলাম ও কিশোরগঞ্জ-৫ (নিকলী–বাজিতপুর) আসনে মনোনীত উপজেলা বিএনপির সভাপতি শেখ মজিবুর রহমান ইকবাল দীর্ঘদিন ধরে তিনি এই আসনে বিএনপির সাংগঠনিক হাল ধরে রেখেছেন। একাধিকবার হামলা ও মামলার শিকার হয়েও তিনি ছিলেন মাঠে সক্রিয়। অবশেষে তাকে করা হলো কিশোরগঞ্জ-৫ আসনে বিএনপির প্রার্থী। প্রার্থী করায় তৃণমূল নেতাদের মধ্যে দেখা গেছে বাড়তি উচ্ছ্বাস।
কিশোরগঞ্জ-১ (সদর–হোসেনপুর) আসনে মো. মাজহারুল ইসলাম ছাড়াও বিএনপির মনোনয়ন প্রত্যাশী ছিলেন, সাবেক স্পেশাল জজ ও জেলা বিএনপির সাবেক সহ-সভাপতি মো. রেজাউল করিম খান চুন্নু, জেলা বিএনপির সাবেক সাধারণ সম্পাদক ওয়ালী উল্লাহ রাব্বানী, জেলা বিএনপির সাবেক সিনিয়র যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক ও সদর উপজেলা বিএনপির সভাপতি খালেদ সাইফুল্লাহ সোহেল, জেলা বিএনপির সদস্য ব্যারিস্টার এম আতিকুর রহমান। বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী আইনজীবী ফোরাম সুপ্রিম কোর্টের যুগ্ম সম্পাদক মো. ওমর ফারুকসহ বেশ কয়েকজন। এ আসনে সম্ভাব্য প্রার্থী হিসেবে আলোচনায় ছিলেন, সাবেক স্পেশাল জজ ও জেলা বিএনপির সাবেক সহ-সভাপতি মো. রেজাউল করিম খান চুন্নু এবং জেলা বিএনপির তিনবারের সাধারণ সম্পাদক মাজহারুল ইসলাম তাদের দুজনকে ঘিরেও ছিল তীব্র আগ্রহ ও আলোচনা। তবে শেষ পর্যন্ত কিশোরগঞ্জ-১ আসনে বিএনপির দলীয় মনোনয়ন পান কিশোরগঞ্জ জেলা বিএনপির তিনবারের সাধারণ সম্পাদক মো. মাজহারুল ইসলাম।
কিশোরগঞ্জ-৫ (নিকলী–বাজিতপুর) আসনে শেখ মুজিবুর রহমান ইকবাল ছাড়াও বিএনপির মনোনয়ন প্রত্যাশী ছিলেন, বাজিতপুর পৌরসভার সাবেক মেয়র এহসান কুফিয়া, প্রবীণ নেতা জেলা বিএনপির সাবেক সদস্য মীর মো. জলিল হোসেন, নিকলী উপজেলা বিএনপির সভাপতি অ্যাডভোকেট বদরুল মোমেন মিঠু, কেন্দ্রীয় কৃষকদল নেতা হাজী মাসুক মিয়া, সাবেক এমপি মজিবুর রহমান মঞ্জুর ছেলে মোস্তাফিজুর রহমান মামুন, জেলা বিএনপির সদস্য মো. বদরুল আলম শিপু, অ্যাডভোকেট জামিউল হক ফয়সাল ও সাবেক সচিব আব্দুল ওয়াহাব। এ আসনে সম্ভাব্য প্রার্থী হিসেবে আলোচনায় ছিলেন, বাংলাদেশ জাতীয় দলের চেয়ারম্যান ও ১২ দলীয় জোটের সমন্বয়ক সৈয়দ এহসানুল হুদা এবং কেন্দ্রীয় নির্বাহী কমিটির সদস্য ও বাজিতপুর উপজেলা বিএনপির সভাপতি শেখ মজিবুর রহমান ইকবাল তাদের দুজনকে ঘিরেও ছিল তীব্র আগ্রহ ও আলোচনা। তবে শেষ পর্যন্ত কিশোরগঞ্জ-৫ (নিকলী–বাজিতপুর) আসনে বিএনপির দলীয় মনোনয়ন পান কেন্দ্রীয় নির্বাহী কমিটির সদস্য ও বাজিতপুর উপজেলা বিএনপির সভাপতি শেখ মজিবুর রহমান ইকবাল।
মনোনয়ন পাওয়ার পর প্রতিক্রিয়ায় শেখ মজিবুর রহমান ইকবাল বলেন, বিএনপি ঘাঁটি হিসাবে পরিচিত কিশোরগঞ্জ-৫ (নিকলী–বাজিতপুর) আসনে জয়ের সম্ভাবনা শতভাগ আমাদের। আমি দলের নিয়ম কানুন আদর্শ মেনে নেতাকর্মীদের সাথে নিয়ে দীর্ঘ ১৭টি বছর কাজ করেছি। দল আমাকে নমিনেশন দিয়েছে। আমি ধানের শীষ প্রতীকে বিপুল ভোট পেয়ে নির্বাচিত হব।’
মনোনয়ন পাওয়ার পর প্রতিক্রিয়ায় মো. মাজহারুল ইসলাম বলেন, “দল আমার দীর্ঘদিনের শ্রম, ত্যাগ ও নির্যাতন-নিপীড়নের মূল্যায়ন করেছে। ১৭ বছর ধরে স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনে রাজপথে থেকেছি, দমন-পীড়ন সহ্য করেছি। আজ দলের বিশেষ করে তারেক রহমান ও মহাসচিবসহ সকল নেতার প্রতি কৃতজ্ঞতা জানাই। অন্য মনোনয়ন প্রত্যাশীদের সঙ্গে ঐক্যবদ্ধ হয়েই ধানের শীষকে বিজয়ী করব।”
মো. মাজহারুল ইসলাম আরও বলেন, “আমাদের প্রিয় দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়া গুরুতর অসুস্থ অবস্থায় চিকিৎসাধীন আছেন। তার সুস্থতা কামনায় দেশবাসীর কাছে দোয়া প্রার্থনা করছি। আল্লাহ যেন তাকে দ্রুত আরোগ্য দান করেন।”
কিশোরগঞ্জ জেলা বিএনপির সভাপতি মো. শরীফুল আলম বলেন, কিশোরগঞ্জ-১ (সদর-হোসেনপুর) ও কিশোরগঞ্জ-৫ (বাজিতপুর-নিকলী) এ ২টি আসনে মনোনয়ন ঘোষণার ফলে কিশোরগঞ্জের ছয়টি আসনে এখন বিএনপির মনোনীত প্রার্থী চূড়ান্ত হয়েছে।
উল্লেখ্য, কিশোরগঞ্জ জেলার ৬টি আসনের মধ্যে ৪টি আসনে এর আগে বিএনপির মনোনয়ন ঘোষণা করা হলেও কিশোরগঞ্জ-১ (সদর-হোসেনপুর) ও কিশোরগঞ্জ-৫ (বাজিতপুর-নিকলী) এ ২টি আসনে দলীয় মনোনয়ন ঘোষণা করা হয়নি। ফলে এই দুই আসনে বিএনপির মনোনয়ন নিয়ে আলোচনা-কৌতূহলের অন্ত ছিলো না। পূর্বে স্থগিত থাকা কিশোরগঞ্জ জেলার এই দুটি আসনের জন্যই বৃহস্পতিবার (৪ ডিসেম্বর) প্রার্থী ঘোষণা করেন দলটির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর।
কিশোরগঞ্জ-১ (সদর-হোসেনপুর) আসনে অতীতে বিজয়ী হয়েছেন ১৯৭০ ও ১৯৭৩ সালে আওয়ামী লীগের সৈয়দ নজরুল ইসলাম, ১৯৭৯ সালে বিএনপির ডা. ফজলুল করিম, ১৯৮৬ সালে আওয়ামী লীগের অ্যাডভোকেট ফজলুর রহমান, ১৯৮৮ সালে জাতীয় পার্টির মো. আলমগীর হোসাইন, ১৯৯১ সালে বিএনপির মাওলানা আতাউর রহমান খান, ১৯৯৬, ২০০১, ২০০৮, ২০১৪ ও ২০১৮ সালের নির্বাচনে আওয়ামী লীগের সৈয়দ আশরাফুল ইসলাম এবং ২০১৯ (উপনির্বাচন) ও ২০২৪ সালে আওয়ামী লীগের ডা. জাকিয়া নূর লিপি।
কিশোরগঞ্জ-৫ (নিকলী–বাজিতপুর) আসনে অতীতে বিজয়ী হয়েছেন ১৯৭৩ সালের নির্বাচনে আওয়ামী লীগের মঞ্জুর আহমেদ, ১৯৭৯ সালে বিএনপির আমির উদ্দিন আহমেদ, ১৯৮৬ সালে মুসলিম লীগের একেএম খালেকুজ্জামান, ১৯৮৮ সালে সম্মিলিত বিরোধী দল ‘কপ’-এর খন্দকার মফিজুর রহমান রোকন, ১৯৯১ সালে বিএনপির আমির উদ্দিন আহমেদ, ১৯৯৬ ও ২০০১ সালের নির্বাচনে বিএনপির মজিবুর রহমান মঞ্জু এবং ২০০৮, ২০১৪, ২০১৮ ও ২০২৪ নির্বাচনে আওয়ামী লীগের আফজাল হোসেন এখানে জয়লাভ করেন।