ডাকসু-জাকসু নির্বাচন
মজুমদার ইমরান ও দীপক দেব
প্রকাশ : ১৬ সেপ্টেম্বর ২০২৫ ০৯:৫৩ এএম
গ্রাফিক্স প্রবা
গণঅভ্যুত্থানের মাধ্যমে রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ঘিরে রাজনীতিতে শুরু হয়েছে নানা আলোচনা। ফেব্রুয়ারির প্রথমার্ধে নির্বাচনের সময় ধরে এরই মধ্যে নানা হিসাব-নিকাশ ও সমীকরণ চলছে রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে। জাতীয় নির্বাচনের আগে সম্প্রতি অনুষ্ঠিত ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ (ডাকসু) এবং জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ (জাকসু) নির্বাচনের ফল সে ভাবনায় দিয়েছে নতুন হাওয়া। মাত্র দুদিনের ব্যবধানে অনুষ্ঠিত দুটি প্রধান শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ছাত্র সংসদ নির্বাচনে আক্ষরিক অর্থেই ভরাডুবি হয়েছে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী ছাত্রদল এবং বাংলাদেশ গণতান্ত্রিক ছাত্র সংসদ বা বাগছাসের; যা জাতীয় রাজনীতির গতিপথেও যোগ করেছে নতুন মাত্রা। ছাত্র সংসদ নির্বাচনের এই ফলাফল আগামী দিনে জাতীয় রাজনীতিতে কতখানি প্রভাব ফেলবে, তা নিয়ে শুরু হয়েছে নতুন আলোচনা, চলছে বিতর্কের ঝড়।
বিএনপির ছাত্র সংগঠন ছাত্রদল এবং জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) ছাত্র সংগঠন বাগছাসের সামনে সুযোগ তৈরি হয়েছিল তরুণদের মধ্যে নিজেদের জনপ্রিয়তা যাচাইয়ের। কিন্তু ডাকসু-জাকসুতে ছাত্রদল ও বাগছাস প্যানেলের ভরাডুবি হয়েছে। দুটি বিশ্ববিদ্যালয়ের কোথাও চমক না দেখাতে পেরে ছাত্র সংগঠন দুটি এখন বড় চ্যালেঞ্জের মুখে। ফলে রাজনীতির গতিপথে এই দুই ছাত্র সংসদ নির্বাচনের ফল আগামীতে কতখানি প্রভাব ফেলবে, তা নিয়ে শুরু হয়েছে নতুন আলোচনা।
রাজনীতি-সচেতন মহল মনে করছেÑ জুলাই অভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে পুরনো ধারার রাজনীতির পরিবর্তনের যে বার্তা তা স্পষ্ট হয়েছে ডাকসু ও জাকসু নির্বাচনে। তরুণ প্রজন্ম বুঝিয়েছে জুলাই অভ্যুত্থানের স্প্রিট ধারণ করে তারা চায় আগের দলবাজি, চাঁদাবাজি, আধিপত্যবাদ, ট্যাগিং করার রাজনীতিকে বিসর্জন দিয়ে নতুন রাজনীতি। তারা পরিবর্তন চায়; আগের রাজনীতি চায় না। সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, এজন্য রাজনৈতিক দলগুলোর উচিত তরুণ প্রজন্মের চাওয়াকে ধারণ করে নিজেদের আত্মবিশ্লেষণ। একই সঙ্গে ছাত্র সংসদ নির্বাচন সামনে রেখে যেসব প্রশ্ন উত্থাপন হয়েছে, সেগুলোর বিষয়ে সজাগ হওয়া। তারা মনে করছেন, জাতীয় নির্বাচনকে ছাত্র সংসদ নির্বাচনের মতো করে হালকাভাবে নিলে দলগুলো বড় ধরনের ভুল করবে। তবে বিএনপি ও এনসিপিসহ অধিকাংশ রাজনৈতিক দলের নেতৃবৃন্দই মনে করছেন, ছাত্র সংসদ ও জাতীয় নির্বাচন সম্পূর্ণ আলাদা বিষয়। ছাত্র সংসদ নির্বাচনের কোনো প্রভাব জাতীয় রাজনীতিতে তথা ভোটের রাজনীতিতে পড়বে না।
তবে এক্ষেত্রে রাজনৈতিক বিশ্লষকদের মত, জুলাই অভ্যুত্থানের যে স্প্রিরিটÑ তা ধারণ করেই রাজনৈতিক সংস্কৃতির পরিবর্তনের পক্ষে রায় দিয়েছে তরুণ প্রজন্ম। বিশেষ করে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে আধিপত্যের রাজনীতি, ট্যাগিংয়ের রাজনীতি, জোর করে মিছিল মিটিংয়ে যোগ দেওয়ানোর সংস্কৃতি, গণরুম সংস্কৃতি সর্বোপরি ভয়ের যে অপসংস্কৃতি গড়ে তোলা হয়েছিল, সাধারণ শিক্ষার্থীরা চাইছেন না তা আবার ফিরে আসুক। তাই তারা ছাত্রশিবিরকে বেছে নিয়েছেন।
ডাকসুর ২৮টি পদের মধ্যে সহসভাপতি (ভিপি), সাধারণ সম্পাদক (জিএস) ও সহসাধারণ সম্পাদকসহ (এজিএস) ২৩টি পদে বিজয়ী হয়েছেন শিবির সমর্থিত প্যানেল ঐক্যবদ্ধ শিক্ষার্থী জোটের প্রার্থীরা। অন্যদিকে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় শিক্ষার্থী সংসদ (জাকসু) নির্বাচনে সংখ্যাগরিষ্ঠ পদে বিজয়ী হয়েছেন ইসলামী ছাত্রশিবির-সমর্থিত ‘সমন্বিত শিক্ষার্থী জোট’ প্যানেলের প্রার্থীরা। তারা জাকসুর ২৫টি পদের মধ্যে সাধারণ সম্পাদক (জিএস), দুটি যুগ্ম সাধারণ সম্পাদকসহ (এজিএস) ২০টি পদে জয় পেয়েছেন। এ ছাড়া স্বতন্ত্র প্রার্থীদের প্যানেল থেকে সহসভাপতি (ভিপি) পদ এবং দুটি করে পদে বাংলাদেশ গণতান্ত্রিক ছাত্র সংসদ (বাগছাস) সমর্থিত প্যানেলের প্রার্থী ও স্বতন্ত্ররা বিজয়ী হয়েছেন।
এদিকে জাতীয় নির্বাচনের মধ্য দিয়ে ক্ষমতায় আসার বিষয়ে অনেকটাই আত্মবিশ্বাসী বিএনপিকে এই ফল নতুন করে ভাবনায় ফেলেছে। রাজনীতি বিশ্লেষকরা মনে করছেন, বিশ্ববিদ্যালয় দুটিতে ছাত্রদল যেমন সাধারণ শিক্ষার্থীদের সামনে ইতিবাচক রাজনীতির বহিঃপ্রকাশ ঘটাতে ব্যর্থ হয়েছে, তেমনি সারা দেশে বিএনপির একশ্রেণির নেতাকর্মীর নেতিবাচক রাজনীতিও এর পেছনে কাজ করেছে। তবে বিএনপি নেতৃবৃন্দ মনে করছেন, ছাত্র সংসদ নির্বাচনের ফল জাতীয় রাজনীতিতে কোনো প্রভাব ফেলে না। অতীতেও এমন বহু নজির রয়েছে।
এ বিষয়ে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেন প্রতিদিনের বাংলাদেশকে বলেন, ‘ডাকসু, জাকসুসহ বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্র সংসদ ও হল সংসদ নির্বাচন আর জাতীয় নির্বাচন ও জাতীয় রাজনীতি এক জিনিস নয়। অতীতে অনেক ছাত্র সংগঠন ডাকসুসহ দেশের বিভিন্ন ছাত্র সংসদ ও হল সংসদ নির্বাচনে জয়লাভ করেও জাতীয় রাজনীতিতে কোনো প্রভাব ফেলতে পারেনি। অতীতে এমন বহু উদাহরণ আমাদের সামনে রয়েছে।’
তবে ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেন মনে করেন, মানুষের আস্থা অর্জনে রাজনীতিতে পরিবর্তন প্রয়োজন, ডাকসু নির্বাচন সব দলের জন্যই একটা বার্তা।
রাজনীতি সংশ্লিষ্টরা বলছেন, ‘ডাকসু-জাকসুতে এমন ফলের পর অনেকটা নিশ্চিতভাবেই বলা যায় রাকসু, চাকসু নির্বাচনেও শিবির সমর্থিত প্রার্থীদের পক্ষে ফল যাবে। আর জাতীয় নির্বাচনের আগে ছাত্র সংসদের এই ফল জামায়াতে ইসলামীকে অনেকটাই সুবিধাজনক পর্যায়ে নিয়ে যাবে।
এদিকে জাতীয় নির্বাচনের আগে ডাকসু ও জাকসু নির্বাচনকে জামায়াতে ইসলামীর জন্য একটা ড্রেস রিহার্সেল হিসেবে উল্লেখ করেছেন বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টির সাবেক সভাপতি মুজাহিদুল ইসলাম সেলিম। প্রতিদিনের বাংলাদেশকে এ বিষয়ে তিনি বলেন, ‘ডাকসু-জাকসু নির্বাচন অনেকের চোখ খুলে দিয়েছে। একই সঙ্গে এটা রেড সিগনালও বটে।’ তিনি বলেন, ‘অন্ধকারের শক্তির উদ্ভব রুখে দিতে হলে বিশ্ববিদ্যালয়ের নির্বাচনগুলো নিয়ে উদাসীন না হয়ে আরও বেশি সতর্ক হতে হবে।’
তবে বিষয়টিকে ভিন্নভাবে দেখছেন জামায়াতে ইসলামীর সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল মাওলানা আবদুল হালিম। তিনি প্রতিদিনের বাংলাদেশকে বলেন, ‘ডাকসু-জাকসু নির্বাচনের বার্তা হচ্ছে জনগণ দেশে অবাধ সুষ্ঠু নির্বাচন চায়। ডাকসু-জাকসু নির্বাচনে ছাত্র-ছাত্রীরা লাইনে দাঁড়িয়ে যেভাবে স্বতঃস্ফূর্তভাবে ভোট দিয়েছে, তাতে স্পষ্ট হয়েছে এমন একটি উৎসবমুখর জাতীয় নির্বাচনের জন্য জাতি উদগ্রীব।’ তরুণ সমাজের রায় যারা লালন করতে পারবে, তাদের পেছনেই জনগণ দাঁড়াবে বলেও মনে করেন এই নেতা।
অন্যদিকে বিএনপির মতো এনসিপি নেতৃবৃন্দও মনে করছেন, ছাত্র সংসদ নির্বাচনের ফল জাতীয় রাজনীতিতে খুব বেশি প্রভাব ফেলবে না। এ প্রসঙ্গে দলটির জ্যেষ্ঠ যুগ্ম আহ্বায়ক আরিফুল ইসলাম আদীব প্রতিদিনের বাংলাদেশকে বলেন, ‘ডাকসু-জাকসুসহ বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর ছাত্র সংসদ ও হল সংসদ নির্বাচনের প্রভাব জাতীয় রাজনীতিতে খুব একটা পড়বে না। আগামী জাতীয় নির্বাচনে এর প্রভাবও তুলনামূলক কম হবে। কারণ জাতীয় নির্বাচন অনেক ফ্যাক্টরের ওপর নির্ভর করে। তবে মনস্তাত্ত্বিকভাবে আগামীর রাজনীতিতে তরুণদের চিন্তাভাবনায় যে পরিবর্তন এসেছে; তার প্রভাব কিছুটা পড়লেও পড়তে পারে।’
তবে ডাকসু-জাকসু নির্বাচনে শিবিরের বিজয় ও ছাত্রদলসহ অন্যদের পরাজয়কে রাজনীতিতে পরিবর্তনের বার্তা হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের সরকার ও রাজনীতি বিভাগের অবসরপ্রাপ্ত অধ্যাপক ড. দীলারা চৌধুরী। তিনি প্রতিদিনের বাংলাদেশকে বলেন, ‘তরুণ প্রজন্ম বুঝিয়ে দিয়েছে তারা নতুন রাজনীতি চায়; পরিবর্তন চায়; আগের রাজনীতি আর চায় না। তাই বড় দলগুলোর উচিত আত্মবিশ্লেষণ করা। তরুণ প্রজন্মের চাওয়াটাকে ধারণ করা।’