প্রবা প্রতিবেদক
প্রকাশ : ১২ সেপ্টেম্বর ২০২৫ ১০:৫৬ এএম
জাতীয় ঐকমত্য কমিশনের তৃতীয় দফার আলোচনায় সনদ বাস্তবায়নের পদ্ধতি নিয়ে পুরোপুরি একমত হতে পারেনি রাজনৈতিক দলগুলো। বৃহস্পতিবার তৃতীয় দফার বৈঠকে কমিশনের পক্ষ সনদ বাস্তবায়নে গণভোট, অধ্যাদেশ, নির্বাহী আদেশ ও বিশেষ সাংবিধানিক আদেশসহ চারটি প্রস্তাব উপস্থাপন করা হয়। এর মধ্যে দুটি বিষয়ে একমত হলেও বাকি দুটিতে ঐকমত্য হয়নি। এ অবস্থায় আগামী রবিবার আবারও রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে বসার সিদ্ধান্ত নিয়েছে কমিশন।
ঢাকায় ফরেন সার্ভিস একাডেমিতে গতকাল সকালে জাতীয় ঐকমত্য কমিশনের সঙ্গে রাজনৈতিক দলগুলোর জুলাই জাতীয় সনদ বাস্তবায়নের উপায় নিয়ে আলোচনায় এসব সিদ্ধান্ত হয়। বৈঠকে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি), বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী, জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি), গণঅধিকার পরিষদ, গণসংহতি, বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টি (সিপিবি), বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টি, আমার বাংলাদেশ (এবি) পার্টিসহ ৩০টি রাজনৈতিক দল ও জোটের প্রতিনিধিগণ অংশ নেন।
সূচনা বক্তব্যে জাতীয় ঐকমত্য কমিশনের সহ-সভাপতি অধ্যাপক আলী রীয়াজ বলেন, ‘জুলাই সনদ বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে কমিশনের পক্ষ থেকে কোনো কিছু চাপিয়ে দেওয়া হবে না। বাস্তবায়নের ক্ষমতাও কমিশনের কাছে নেই। জুলাই সনদ বাস্তবায়নের জন্য সব রাজনৈতিক দলের সঙ্গে আলোচনা করে কমিশন সরকারকে জানাতে পারে। আমরা সেই প্রক্রিয়াটা অনুসরণ করছি।’
এ সময় কমিশনের সদস্য হিসেবে উপস্থিত ছিলেনÑ বিচারপতি মো. এমদাদুল হক, ড. ইফতেখারুজ্জামান, ড. বদিউল আলম মজুমদার, ড. মো. আইয়ুব মিয়া এবং ঐকমত্য গঠন প্রক্রিয়ায় যুক্ত প্রধান উপদেষ্টার বিশেষ সহকারী মনির হায়দার।
এদিকে বৈঠক শেষে গতকালই রাজনৈতিক দলগুলোর কাছে কমিশনের পক্ষ থেকে জুলাই জাতীয় সনদের চূড়ান্ত খসড়া পাঠানো হয়েছে। একই সঙ্গে সনদে স্বাক্ষরের জন্য দলগুলোর কাছে আগামী ১৩ সেপ্টেম্বর বিকাল ৫টার মধ্যে দুজন ব্যক্তির নাম পাঠানোর অনুরোধ জানানো হয়েছে।
এ ছাড়া বৈঠক শুরুর আগে দলগুলোর কাছে কমিশনের পক্ষ থেকে করা চারটি প্রস্তাবসহ সনদ বাস্তবায়ন নিয়ে দলগুলোর অবস্থান নিয়ে করা একটি প্রস্তাব তুলে দেওয়া হয়। তাতে বলা হয়েছে, বিভিন্ন বিকল্প পদ্ধতি খতিয়ে দেখে চারটি উপায়কে অগ্রাধিকার দেওয়ার সিদ্ধান্ত হয়েছে। সুপারিশগুলো হলো- পূর্ণাঙ্গ সনদ বা আংশিক সনদ নিয়ে গণভোট আয়োজন, রাষ্ট্রপতির ক্ষমতাবলে বিশেষ সাংবিধানিক আদেশ জারি, অধ্যাদেশ ও নির্বাহী আদেশ জারি করে বাস্তবায়ন এবং সংবিধানের ১০৬ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগের মতামত গ্রহণ।
এর ওপরই দলগুলো নিজেদের মতামত তুলে ধরে। আলোচনায় রাষ্ট্রপতির ক্ষমতাবলে বিশেষ সাংবিধানিক আদেশ জারির বিষয়টি নিয়ে বিরোধিতার পাশাপাশি গণভোট নিয়েও দ্বিমত পোষণ করেছে কয়েকটি দল। বিএনপিসহ কয়েকটি দল সংবিধান সংস্কারের সঙ্গে সম্পৃক্ত নয় এমন বিষয় অধ্যাদেশ জারির মাধ্যমে এবং সংবিধান সংস্কারের সঙ্গে যুক্ত বিষয়গুলো আগামী সংসদের জন্য ছেড়ে দেওয়ার বিষয়ে মত দিয়েছে। তবে জামায়াতসহ কয়েকটি দল বিশেষ সাংবিধানিক আদেশ জারি করে জুলাই সনদ বাস্তবায়নের পক্ষে মত দিয়েছে। এই অবস্থায় চারটির মধ্যে দুটি বিষয়ে একমত হয় দলগুলো।
আলোচনা শেষে সাংবাদিকদের ব্রিফকালে অধ্যাপক আলী রীয়াজ বলেন, ‘সুপারিশের যেসব বিষয় সংবিধান সংশ্লিষ্ট নয় সেসব বিষয় বাস্তবায়নের জন্যে অন্তর্বর্তী সরকার অধ্যাদেশ জারি করতে পারে এবং সুপারিশের যেসব বিষয় সরকারি বা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের আদেশ ও বিধি প্রণয়নের মাধ্যমে বাস্তবায়ন করা সম্ভব সেগুলো অন্তর্বর্তী সরকার ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ বাস্তবায়ন করতে পারে।’ সরকার এবং সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের পক্ষ থেকে ইতোমধ্যে অধ্যাদেশ জারি ও যথাযথ পদক্ষেপের মাধ্যমে তা বাস্তবায়নের কাজ শুরু হয়েছে বলেও উল্লেখ করেন তিনি।
এদিকে বৈঠক শেষে প্রেস ব্রিফিংয়ে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, ‘২৯টি রাজনৈতিক দল লিখিত মতামত দিয়েছে। নির্বাহী আদেশ, অধ্যাদেশ জারি, অফিস আদেশসহ মোটাদাগে ৬টি মতামত পাওয়া গেছে।’
বিএনপির স্থায়ী কমিটির এই সদস্য আরও বলেন, ‘সংবিধান সংশ্লিষ্ট ১৯টি মৌলিক বিষয়সহ জুলাই সনদের সমস্ত সুপারিশ বাস্তবায়নের জন্য সমস্ত রাজনৈতিক অঙ্গীকারবদ্ধ হয়ে নির্বাচনী ইশতেহারে দেবে। যারা নির্বাচিত হয়ে সংসদে যাবে তারা ২ বছরের মধ্যে বাস্তবায়ন করবে। এটাই বৈধ প্রক্রিয়া। এর বাইরের কোনো আইনগত বা সাংবিধানিক প্রক্রিয়া থাকলে তাতে আমরা একমত হব।’
কয়েকটি দল বিশেষ সাংবিধানিক আদেশ জারির মাধ্যমে জুলাই সনদ বাস্তবায়নের যে কথা বলেছে সে প্রসঙ্গে সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, ‘পদ্ধতিগত ত্রুটির কারণে আদালতে চ্যালেঞ্জ হলে জুলাই সনদের বৈধতা নিয়ে প্রশ্ন উঠবে। পদ্ধতিগত ত্রুটির কারণে যাতে আমরা ভুল সিদ্ধান্ত না নেই, সেটা লক্ষ্য রাখতে হবে।’ বিএনপি জুলাই সনদে স্বাক্ষর করতে প্রস্তুত উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘এর মধ্য দিয়ে নতুন যাত্রা শুরু হবে।’
জামায়াতে ইসলামীর নায়েবে আমির ডা. সৈয়দ আব্দুল্লাহ মোহাম্মদ তাহের বলেন, ‘কমিশনের পক্ষ থেকে জুলাই সনদ বাস্তবায়নের পাঁচটি বিকল্প প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। সেখানে জামায়াতের একটি সুনির্দিষ্ট প্রস্তাব আছে। আশা করি এই ৫টি প্রস্তাবের মধ্যে আমরা কাছাকাছি আসতে পারব এবং জুলাই সনদের আইনগত ভিত্তি হবে। জুলাই সনদের ভিত্তিতে আগামী ফেব্রুয়ারির নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে।’
জামায়াতের দেওয়া প্রস্তাব প্রসঙ্গে আইনজীবী শিশির মনির বলেন, ‘আমরা একটি বিশেষ সাংবিধানিক আদেশ জারি করে জুলাই সনদ বাস্তবায়নের কথা বলেছি। অর্থাৎ ঐকমত্য কমিশন যেসব বিষয়ে একমত পোষণ করেছেন, এর মধ্যে যে বিষয়গুলো সংবিধানের সঙ্গে সাংঘর্ষিক সেগুলোকে একটি বিশেষ সাংবিধানিক আদেশ জারি করে সংবিধানের ওপরে প্রাধান্য দেওয়া। বাকি ক্ষেত্রে সংবিধান যেমন আছে তেমনি থাকবে।’
দলগুলোর হাতে চূড়ান্ত খসড়া
জাতীয় ঐকমত্য কমিশনের সঙ্গে রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে বৈঠকের পর স্বাক্ষরের জন্য চূড়ান্ত খসড়া গতকাল বৃহস্পতিবার রাজনৈতিক দলগুলোকে পাঠানো হয়েছে। কিছু ক্ষেত্রে ভিন্নমত (নোট অব ডিসেন্টসহ) মোট ৮৪টি সংস্কার প্রস্তাবে ঐকমত্য হওয়ার কথা বলা হয়েছে এই খসড়ায়। সাত দফা অঙ্গীকারনামার ভিত্তিতে জুলাই জাতীয় সনদের খসড়া চূড়ান্ত করেছে জাতীয় ঐকমত্য কমিশন, যাতে সই করলে রাজনৈতিক দলগুলো এই সনদ নিয়ে আদালতে কোনো প্রশ্ন তুলতে পারবে না।
এই সনদ বাস্তবায়নের প্রতিটি ধাপে আইনি ও সাংবিধানিক সুরক্ষা নিশ্চিত করার অঙ্গীকার করবে দলগুলো। আগের সমন্বিত খসড়ায় বলা হয়েছিল, ‘জুলাই জাতীয় সনদ ২০২৫-এর প্রতিটি বিধান, প্রস্তাব ও সুপারিশ সাংবিধানিক ও আইনগতভাবে বলবৎ হিসেবে গণ্য হবে বিধায় এর বৈধতা, প্রয়োজনীয়তা, কিংবা জারির কর্তৃত্ব সম্পর্কে কোনো আদালতে প্রশ্ন তোলা যাবে না।’